শহীদ শরিফ ওসমান বিন হাদির পরিবারকে ঢাকায় একটি ফ্ল্যাট কেনার জন্য সরকারি অনুদান হিসেবে এক কোটি টাকা দেওয়ার সিদ্ধান্ত সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশের রাজনীতিতে যেমন আলোড়ন তুলেছে, তেমনি সাধারণ মানুষের মনে গভীর নৈতিক ও বাস্তব প্রশ্নও উত্থাপন করেছে। বিষয়টি শুধু একটি পরিবারের প্রতি সহানুভূতি বা রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং এটি জনগণের করের টাকা ব্যবহারের ন্যায়সংগততা, রাষ্ট্রের অগ্রাধিকার নির্ধারণ এবং ‘কে শহীদ, কে নয়’—এই জটিল রাজনৈতিক ও সামাজিক বিতর্কের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত।
শরিফ ওসমান বিন হাদি ছিলেন ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক এবং ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঢাকা–৮ আসন থেকে স্বতন্ত্র প্রার্থী হওয়ার ঘোষণা দেওয়া একজন রাজনৈতিক কর্মী। নির্বাচনী তফসিল ঘোষণার পরদিন রাজধানীর ব্যস্ত এলাকায় গুলিবিদ্ধ হয়ে তাঁর মৃত্যু হয়, যা নিঃসন্দেহে রাষ্ট্রের নিরাপত্তা ব্যবস্থার বড় ব্যর্থতার দিকটি সামনে নিয়ে আসে। এই প্রেক্ষাপটে রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে তাঁর পরিবারকে আর্থিক সহায়তা দেওয়ার ঘোষণা অনেকের কাছেই মানবিক ও নৈতিক দায়িত্বের অংশ বলে মনে হয়েছে। বিশেষ করে যখন রাষ্ট্রপ্রধান নিজেই জাতির উদ্দেশে ভাষণে বলেছিলেন যে, রাষ্ট্র তাঁর স্ত্রী ও সন্তানের দায়িত্ব নেবে, তখন সেই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের একটি দৃষ্টান্ত হিসেবেও এই সিদ্ধান্তকে দেখা যায়।
কিন্তু প্রশ্নটি এখানেই শেষ নয়। রাষ্ট্রের দায়িত্ব কি কেবল প্রতিশ্রুতি রক্ষা করা, নাকি সেই প্রতিশ্রুতির পরিসর ও ধরনও ন্যায়সংগত হওয়া জরুরি? এক কোটি টাকার অনুদান দিয়ে রাজধানীর অভিজাত এলাকায় ফ্ল্যাট কেনা কি রাষ্ট্রীয় সহায়তার একমাত্র বা সবচেয়ে যুক্তিসংগত রূপ? যখন দেশের হাজার হাজার পরিবার সহিংসতা, রাজনৈতিক সংঘর্ষ, এমনকি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ব্যর্থতার কারণে আপনজন হারায়, তখন তাদের অধিকাংশই ন্যূনতম ক্ষতিপূরণ বা দীর্ঘমেয়াদি সহায়তা তো দূরের কথা, মামলার ন্যায়বিচারটুকুও পায় না। এই বাস্তবতায় একটি নির্দিষ্ট ঘটনার ক্ষেত্রে এত বড় অঙ্কের আর্থিক সুবিধা দেওয়া স্বাভাবিকভাবেই বৈষম্যের প্রশ্ন তোলে।
জনগণের টাকা মানে রাষ্ট্রের নিজস্ব কোনো অর্থভাণ্ডার নয়; এটি আসে সাধারণ মানুষের কর, ভ্যাট, নানা প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ কর থেকে। একজন দিনমজুর যখন নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যে বাড়তি ভ্যাট দেয়, একজন মধ্যবিত্ত যখন আয়করের বোঝা টানে, তখন সেই অর্থের ব্যবহারে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ স্বচ্ছতা ও ন্যায়বোধ থাকা প্রত্যাশিত। এখানে প্রশ্ন উঠছে—রাষ্ট্র কি একটি নীতিমালা অনুযায়ী শহীদ বা নিহত ব্যক্তিদের পরিবারকে সহায়তা দেয়, নাকি তা রাজনৈতিক পরিচয়, আলোচিত মৃত্যু কিংবা জনচাপের ওপর নির্ভর করে?
বাংলাদেশে অতীতে মুক্তিযোদ্ধা পরিবার, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নিহত সদস্যদের পরিবার কিংবা কিছু ক্ষেত্রে রাজনৈতিক সহিংসতার শিকার ব্যক্তিদের ক্ষতিপূরণ দেওয়ার নজির আছে। কিন্তু সেসব ক্ষেত্রেও সাধারণত একটি নির্দিষ্ট কাঠামো, নির্ধারিত অঙ্ক এবং স্পষ্ট মানদণ্ড অনুসরণ করা হয়। শরিফ ওসমান বিন হাদির ক্ষেত্রে সেই মানদণ্ড কী, তা এখনো স্পষ্ট নয়। তিনি কি রাষ্ট্রীয়ভাবে ঘোষিত শহীদ? যদি হন, তাহলে সেই ঘোষণার আইনি ভিত্তি কী? আর যদি না হন, তাহলে অন্য রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডের শিকারদের পরিবার একই সুবিধা পায় না কেন—এই প্রশ্ন অনিবার্যভাবে সামনে আসে।
এই সিদ্ধান্তের পেছনে রাজনৈতিক বাস্তবতাও উপেক্ষা করা যায় না। একটি উত্তাল রাজনৈতিক সময়ে একজন উদীয়মান রাজনৈতিক কর্মীর হত্যাকাণ্ড রাষ্ট্রের জন্য বড় চাপ তৈরি করেছিল। এক দিনের রাষ্ট্রীয় শোক পালন, সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে দায়িত্ব নেওয়ার ঘোষণা—এসবই রাজনৈতিক বার্তার অংশ। এর মাধ্যমে রাষ্ট্র দেখাতে চেয়েছে যে, তারা এই হত্যাকে সাধারণ কোনো অপরাধ হিসেবে দেখছে না। কিন্তু রাষ্ট্রীয় বার্তা দিতে গিয়ে যদি আর্থিক সিদ্ধান্তে ভারসাম্য হারানো হয়, তাহলে তা দীর্ঘমেয়াদে আস্থার সংকট তৈরি করতে পারে।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো ‘সবার জন্য কেন নয়’—এই প্রশ্ন। রাজনৈতিক সহিংসতায় নিহত একজনের পরিবার এক কোটি টাকা পেলে, তাহলে একই ধরনের সহিংসতায় নিহত অন্য পরিবারের কী হবে? সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আন্দোলন, হরতাল, সংঘর্ষে বহু মানুষ নিহত ও আহত হয়েছে। তাদের পরিবারগুলো অনেক সময় চরম দারিদ্র্যের মধ্যে পড়ে যায়। রাষ্ট্র যদি নীতিগতভাবে বলে যে, রাজনৈতিক সহিংসতার শিকার পরিবারের দায়িত্ব রাষ্ট্র নেবে, তাহলে সেই দায়িত্ব সবার ক্ষেত্রেই সমানভাবে প্রয়োগ করা উচিত। তা না হলে এটি সহানুভূতির রাজনীতি হয়ে দাঁড়ায়, ন্যায়বিচারের নয়।
এই ঘটনায় আরেকটি সংবেদনশীল বিষয় হলো পরিবারের অন্য সদস্যদের রাষ্ট্রীয় সুবিধা পাওয়া। শরিফ ওসমান বিন হাদির ভাইকে যুক্তরাজ্যের বার্মিংহামে সহকারী হাইকমিশনে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে—এই তথ্যও আলোচনায় এসেছে। যদিও সরকার বলছে এটি আলাদা সিদ্ধান্ত, তবু সাধারণ মানুষের চোখে বিষয়গুলো আলাদা থাকে না। তারা একটি সামগ্রিক চিত্র দেখে এবং মনে করে, একটি পরিবার কি অতিরিক্ত রাষ্ট্রীয় সুবিধা পাচ্ছে? এই ধারণা সত্য হোক বা না হোক, রাষ্ট্রের সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় এমন সম্ভাব্য জনমতের কথাও বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।
সমর্থকদের যুক্তি হলো—শরিফ ওসমান বিন হাদির মৃত্যু ছিল রাজনৈতিক সহিংসতার চরম উদাহরণ, এবং রাষ্ট্র যদি তাঁর পরিবারকে নিরাপত্তা ও স্থিতিশীল ভবিষ্যৎ দিতে চায়, তাহলে একটি ফ্ল্যাট কেনার জন্য অনুদান দেওয়া অযৌক্তিক নয়। রাজধানীতে বাসস্থান নিশ্চিত করা মানে শুধু ছাদ নয়, বরং নিরাপত্তা, শিক্ষা ও সামাজিক স্থিতির নিশ্চয়তা। এই যুক্তিতে মানবিক আবেদন আছে, সন্দেহ নেই।
কিন্তু সমালোচকদের প্রশ্ন আরও গভীর। তারা বলছেন, রাষ্ট্র যদি সত্যিই দায়িত্ব নিতে চায়, তাহলে সেটি হতে পারে একটি নীতিভিত্তিক কল্যাণ কাঠামোর মাধ্যমে—যেখানে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবার নিয়মিত ভাতা, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসুবিধা পাবে। এককালীন বড় অঙ্কের অর্থ দিয়ে ফ্ল্যাট কিনে দেওয়া প্রতীকী হলেও কাঠামোগত সমাধান নয়। বরং এতে ভবিষ্যতে অনুরূপ ঘটনার ক্ষেত্রে চাপ ও প্রত্যাশা বাড়বে, যা রাষ্ট্রের পক্ষে বহন করা কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
এই পুরো বিতর্কের কেন্দ্রে আছে রাষ্ট্র ও নাগরিকের সম্পর্ক। রাষ্ট্র কি আবেগের বশে সিদ্ধান্ত নেবে, নাকি নীতি ও কাঠামোর ভিত্তিতে? একজন নাগরিক রাষ্ট্রের কাছে শুধু সহানুভূতি নয়, ন্যায়বিচার ও সমতা প্রত্যাশা করে। শরিফ ওসমান বিন হাদির পরিবার নিঃসন্দেহে সহানুভূতির যোগ্য। কিন্তু সেই সহানুভূতি যদি অন্য সমানভাবে ক্ষতিগ্রস্ত নাগরিকদের বঞ্চনার কারণ হয়, তাহলে তা শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রের নৈতিক অবস্থানকেই দুর্বল করে।
সবশেষে বলা যায়, এই অনুদান সিদ্ধান্তটি একদিকে মানবিক ও রাজনৈতিক বার্তা বহন করলেও অন্যদিকে এটি জনগণের টাকার ব্যবহার নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তুলেছে। রাষ্ট্রের উচিত ছিল এই সিদ্ধান্তকে একটি স্পষ্ট নীতিমালার আওতায় এনে ব্যাখ্যা করা—কেন এই পরিবার, কেন এই অঙ্ক, এবং ভবিষ্যতে অনুরূপ ক্ষেত্রে কী করা হবে। তা না হলে এই ঘটনা একটি দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে, যা বারবার ‘সবাইকে কেন নয়’ প্রশ্নটি সামনে এনে রাষ্ট্রের ন্যায়সংগততার পরীক্ষায় ফেলবে। রাষ্ট্র যদি সত্যিই দায়িত্বশীল হতে চায়, তাহলে ব্যক্তিকেন্দ্রিক সহানুভূতির বাইরে গিয়ে সবার জন্য ন্যায্য ও স্বচ্ছ কাঠামো গড়ে তোলাই হবে সবচেয়ে যুক্তিসংগত পথ।
আপনার মতামত জানানঃ