সাম্প্রতিক বছরগুলিতে ভারতীয় নাগরিকত্ব ত্যাগের প্রবণতা যে আর বিচ্ছিন্ন বা ব্যতিক্রমী ঘটনা নয়, বরং একটি ধারাবাহিক ও ক্রমবর্ধমান সামাজিক-রাজনৈতিক বাস্তবতা—তা সংসদে পেশ করা পরিসংখ্যান স্পষ্ট করে দিচ্ছে। গত পাঁচ বছরে প্রায় নয় লক্ষ ভারতীয় নাগরিকত্ব ত্যাগ করেছেন এবং গত চৌদ্দ বছরে এই সংখ্যা বিশ লক্ষ ছাড়িয়েছে। পররাষ্ট্র মন্ত্রকের প্রতিমন্ত্রী কীর্তি বর্ধন সিং সংসদে জানিয়েছেন, সরকার নিয়মিতভাবে নাগরিকত্ব পরিত্যাগকারীদের বার্ষিক রেকর্ড রাখে এবং সেই রেকর্ড অনুযায়ী সাম্প্রতিক বছরগুলিতে এই প্রবণতা ক্রমশ ঊর্ধ্বমুখী। এই তথ্য নিছক সংখ্যার হিসাব নয়; এর আড়ালে লুকিয়ে আছে গভীর সামাজিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও মনস্তাত্ত্বিক কারণ, যা ভারতের বর্তমান ও ভবিষ্যৎ বাস্তবতাকে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করে।
নাগরিকত্ব কেবল একটি আইনি পরিচয় নয়, এটি রাষ্ট্রের সঙ্গে ব্যক্তির সম্পর্কের সবচেয়ে মৌলিক ভিত্তি। একটি দেশের নাগরিক হওয়া মানে সেই দেশের রাজনৈতিক কাঠামো, সামাজিক চুক্তি ও ভবিষ্যৎ কল্পনার সঙ্গে নিজেকে যুক্ত করা। যখন উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মানুষ সেই পরিচয় ত্যাগ করেন, তখন তা ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তের সীমা ছাড়িয়ে একটি বৃহত্তর প্রবণতার ইঙ্গিত দেয়। ভারতের ক্ষেত্রে এই প্রবণতা বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ দেশটি দীর্ঘদিন ধরে জনসংখ্যার আধিক্য, অভিবাসন ও প্রবাসী ভারতীয়দের ভূমিকা নিয়ে গর্ব করে এসেছে। অথচ এখন সেই ভারতীয়রাই ক্রমশ অন্য দেশের নাগরিকত্ব গ্রহণ করছেন, যা এক ধরনের ‘ব্রেন ড্রেন’-এর পাশাপাশি ‘সিটিজেনশিপ ড্রেন’-এর কথাও সামনে আনছে।
এই নাগরিকত্ব ত্যাগের পেছনে অন্যতম বড় কারণ অর্থনৈতিক সুযোগ। উন্নত দেশগুলিতে উচ্চ বেতন, স্থিতিশীল কর্মসংস্থান, সামাজিক সুরক্ষা ও জীবনমানের প্রতিশ্রুতি বহু ভারতীয় পেশাজীবীকে আকর্ষণ করছে। বিশেষ করে তথ্যপ্রযুক্তি, স্বাস্থ্য, গবেষণা ও প্রকৌশল ক্ষেত্রে কর্মরত উচ্চ দক্ষতাসম্পন্ন ভারতীয়রা বিদেশে দীর্ঘদিন বসবাসের পর নাগরিকত্ব গ্রহণের সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন। অনেক ক্ষেত্রেই এটি নিছক চাকরির সুবিধা নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা, সন্তানের ভবিষ্যৎ শিক্ষা ও সামাজিক স্থিতিশীলতার প্রশ্নে নেওয়া সিদ্ধান্ত। বিদেশে স্থায়ী বসবাসের পর নাগরিকত্ব গ্রহণ করলে ভিসা, কাজের অনুমতি বা রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা অনেকটাই কমে যায়, যা জীবনের উপর মানসিক চাপও হ্রাস করে।
তবে অর্থনৈতিক কারণই একমাত্র ব্যাখ্যা নয়। সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিবেশও এই সিদ্ধান্তে বড় ভূমিকা রাখছে। সাম্প্রতিক বছরগুলিতে ভারতের রাজনৈতিক মেরুকরণ, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিয়ে বিতর্ক, সংখ্যালঘু নিরাপত্তা, নাগরিক অধিকার ও আইনের শাসন সংক্রান্ত প্রশ্ন অনেক শিক্ষিত ও সচেতন নাগরিককে ভাবিয়ে তুলেছে। অনেকেই মনে করছেন, বিদেশে বসবাস ও নাগরিকত্ব গ্রহণ করলে তারা ব্যক্তিগত স্বাধীনতা, মতপ্রকাশের সুযোগ ও সামাজিক সহনশীলতার ক্ষেত্রে তুলনামূলকভাবে বেশি নিরাপত্তা পাবেন। এই অনুভূতি সবার ক্ষেত্রে এক নয়, কিন্তু নাগরিকত্ব ত্যাগকারীদের একটি অংশের সিদ্ধান্তে এটি যে প্রভাব ফেলছে, তা অস্বীকার করা যায় না।
আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল প্রশাসনিক ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো নিয়ে অসন্তোষ। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, বিচারব্যবস্থা ও আমলাতান্ত্রিক জটিলতা নিয়ে বহু ভারতীয় দীর্ঘদিন ধরেই হতাশ। উন্নত দেশগুলিতে তুলনামূলকভাবে স্বচ্ছ ও দক্ষ প্রশাসনিক ব্যবস্থার অভিজ্ঞতা অনেককে সেখানে স্থায়ী হতে উৎসাহিত করছে। নাগরিকত্ব গ্রহণের মাধ্যমে তারা সেই ব্যবস্থার পূর্ণ সুবিধাভোগী হতে চান। বিশেষ করে যারা বহু বছর বিদেশে কর প্রদান করেছেন, সমাজে অবদান রেখেছেন, তাদের কাছে নাগরিকত্ব একটি স্বাভাবিক পরিণতি বলে মনে হয়।
এই প্রবণতার আরেকটি দিক হল বৈশ্বিকায়নের প্রভাব। আজকের বিশ্বে পরিচয় আর একমাত্রিক নয়। অনেক ভারতীয় নিজেদের ‘গ্লোবাল সিটিজেন’ হিসেবে দেখতে চান, যেখানে জন্মভূমির সঙ্গে আবেগগত সম্পর্ক বজায় রেখেও তারা অন্য দেশের নাগরিকত্ব গ্রহণ করেন বাস্তব সুবিধার জন্য। ভারতের দ্বৈত নাগরিকত্বের অনুমতি না থাকায়, তাদের সামনে প্রায়শই কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হয়—ভারতীয় নাগরিকত্ব ধরে রাখা নাকি বিদেশি নাগরিকত্ব গ্রহণ করে আইনি ও সামাজিক সুবিধা নিশ্চিত করা। ওভারসিজ সিটিজেন অব ইন্ডিয়া (OCI) কার্ডের মতো ব্যবস্থাগুলি কিছুটা সেতুবন্ধন তৈরি করলেও, নাগরিকত্বের পূর্ণ অধিকার ও রাজনৈতিক অংশগ্রহণের সুযোগ সেখানে সীমিত।
পরিসংখ্যান বলছে, ২০১১ থেকে ২০১৯ সালের মধ্যে প্রায় ১১ লক্ষ ৮৯ হাজার ভারতীয় নাগরিকত্ব ত্যাগ করেছেন এবং সাম্প্রতিক বছরগুলিতে এই সংখ্যা আরও বেড়েছে। এটি শুধু একটি নির্দিষ্ট শ্রেণির মানুষের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং বিভিন্ন পেশা, অঞ্চল ও সামাজিক পটভূমি থেকে আসা মানুষ এই সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন। যদিও উচ্চ দক্ষতাসম্পন্ন পেশাজীবীদের সংখ্যাই বেশি, তবু মধ্যবিত্ত পরিবারগুলিও সন্তানের ভবিষ্যৎ ও জীবনমানের কথা ভেবে এই পথ বেছে নিচ্ছেন।
এর প্রভাব ভারতের জন্য বহুমাত্রিক। একদিকে বিপুল মানবসম্পদ ও প্রতিভা হারানোর আশঙ্কা রয়েছে, যা দেশের গবেষণা, উদ্ভাবন ও অর্থনৈতিক উন্নয়নে দীর্ঘমেয়াদে প্রভাব ফেলতে পারে। অন্যদিকে প্রবাসী ভারতীয়দের রেমিট্যান্স, বিনিয়োগ ও বৈশ্বিক নেটওয়ার্ক ভারতের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। প্রশ্ন হল, নাগরিকত্ব ত্যাগের এই প্রবণতা কি সেই ইতিবাচক প্রভাবকে দুর্বল করবে, নাকি নতুন ধরনের প্রবাসী সম্পর্ক তৈরি করবে যেখানে নাগরিকত্বের পরিবর্তন হলেও অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক সংযোগ বজায় থাকবে?
সরকারি দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বিষয়টি জটিল। একদিকে এটি ব্যক্তির অধিকার—কেউ কোন দেশের নাগরিকত্ব নেবে, তা তার ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত। অন্যদিকে এত বড় সংখ্যায় নাগরিকত্ব ত্যাগ রাষ্ট্রের জন্য উদ্বেগের কারণ হওয়া স্বাভাবিক। এটি নীতিনির্ধারকদের সামনে প্রশ্ন তোলে—দেশের ভেতরে এমন কী পরিবর্তন প্রয়োজন, যাতে নাগরিকরা ভবিষ্যৎ ও নিরাপত্তার প্রশ্নে বিদেশের দিকে তাকাতে বাধ্য না হন। কর্মসংস্থান, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যব্যবস্থার উন্নতি, সামাজিক সহনশীলতা, আইনের শাসন ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা জোরদার করা—এসবই নাগরিকদের আস্থা ফিরিয়ে আনার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
সবশেষে বলা যায়, ভারতীয় নাগরিকত্ব ত্যাগের ক্রমবর্ধমান প্রবণতা কোনও একক কারণে ব্যাখ্যা করা যায় না। এটি একটি বহুমাত্রিক সামাজিক বাস্তবতা, যেখানে ব্যক্তিগত স্বপ্ন, বৈশ্বিক সুযোগ, দেশীয় সীমাবদ্ধতা ও ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তা একসঙ্গে কাজ করছে। এই প্রবণতাকে কেবল দেশত্যাগ বা দেশপ্রেমের অভাব হিসেবে দেখা হলে তার গভীরতা বোঝা যাবে না। বরং এটি ভারতের জন্য একটি আয়না, যেখানে দেশের শক্তি ও দুর্বলতা দুটোই প্রতিফলিত হচ্ছে। সেই আয়নায় চোখ রেখে যদি নীতিনির্ধারক ও সমাজ একসঙ্গে ভাবতে পারে—কীভাবে ভারতকে এমন একটি দেশ হিসেবে গড়ে তোলা যায়, যেখানে নাগরিকরা কেবল জন্মসূত্রে নয়, ভবিষ্যতের আশাতেও এই পরিচয় ধরে রাখতে চান—তবেই এই পরিসংখ্যানের পেছনের বাস্তব অর্থ অনুধাবন করা সম্ভব হবে।
আপনার মতামত জানানঃ