মিয়ানমারের মান্দালয়ে উৎপত্তি হওয়া ৭ দশমিক ৭ মাত্রার এক ভূমিকম্প গতকাল একযোগে অনুভূত হয়েছে ছয়টি দেশে। উৎপত্তিস্থল থেকে দূরত্বের কারণে বাংলাদেশে কোনো ক্ষয়ক্ষতি না হলেও বিপর্যয় নেমে এসেছে মিয়ানমার ও থাইল্যান্ডে।
মিয়ানমারের মান্দালয়ে উৎপত্তি হওয়া ৭ দশমিক ৭ মাত্রার এক ভূমিকম্প গতকাল একযোগে অনুভূত হয়েছে ছয়টি দেশে। উৎপত্তিস্থল থেকে দূরত্বের কারণে বাংলাদেশে কোনো ক্ষয়ক্ষতি না হলেও বিপর্যয় নেমে এসেছে মিয়ানমার ও থাইল্যান্ডে। চলতি বছরে এখন পর্যন্ত কয়েক দফায় ভূমিকম্প অনুভূত হয়েছে বাংলাদেশে। এর প্রতিটিরই উৎপত্তিস্থল দেশের বাইরে। বাংলাদেশের আশপাশে বারবার এ ধরনের ভূমিকম্পের উৎপত্তিকে দেশে বড় ভূমিকম্পের সতর্ক সংকেত হিসেবে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা।
তাদের ভাষ্যমতে, উৎপত্তিস্থল দূরে হওয়ায় এসব ভূমিকম্পে এখন পর্যন্ত তেমন কোনো ক্ষয়ক্ষতি দেখা যায়নি। কিন্তু কাছাকাছি বড় ধরনের ভূমিকম্প হলে তাতে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির ঝুঁকি রয়েছে। বিশেষ করে ঘনবসতিপূর্ণ ঢাকা মহানগরীতে তা ভয়াবহ আকার নেয়ার জোর আশঙ্কা রয়েছে। এক দশকেরও বেশি সময় ধরে এ পরিস্থিতির আশঙ্কা প্রকাশ করে আসছেন বিশেষজ্ঞরা। বিশেষ করে ২০১৫ সালের নেপাল ভূমিকম্পের পর এ নিয়ে ব্যাপক মাত্রায় আলোচনা শুরু হয়। কিন্তু এ ধরনের পরিস্থিতি মোকাবেলার মতো রাষ্ট্রীয়ভাবে ন্যূনতম কোনো প্রস্তুতি নেয়া হয়নি এখনো। বরং দিনে দিনে ঢাকার জনঘনত্ব আরো বেড়েছে। একই সঙ্গে নানা উন্নয়ন প্রকল্পের মাধ্যমে বিভিন্ন ধরনের অবকাঠামো নির্মাণ করা হয়েছে, এতে যেকোনো উদ্ধার তৎপরতাকে মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত করার জোর আশঙ্কা রয়েছে।
চলতি বছরের জানুয়ারির প্রথম সাত দিনে দেশে ভূমিকম্প অনুভূত হয়েছে দুবার। ৭ জানুয়ারি সকালে অনুভূত হওয়া ভূমিকম্পটি ছিল তীব্র। এর আগে ৩ জানুয়ারি হওয়া ভূমিকম্পটি ছিল মাঝারি মাত্রার। ৭ জানুয়ারির ভূমিকম্পটির উৎপত্তিস্থল চীনের জিজাং এলাকা। আর ৩ জানুয়ারির ভূমিকম্পটির উৎপত্তিস্থল ছিল মিয়ানমারের হোমালিন।
গত দুই বছরে নিয়মিত বিরতিতে ভূমিকম্প হতে দেখা গেছে বাংলাদেশে। এ অঞ্চলের ভূমিকম্পের ইতিহাস বিশ্লেষণে দেখা যায়, গত ১০০-১৫০ বছরে প্রায় পাঁচ থেকে ছয়টি বড় ভূমিকম্প হয়েছে। এরও আগে ১৭৬২ সালে চট্টগ্রাম ও পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলে প্রায় ৮ দশমিক ৫ মাত্রার মারাত্মক এক ভূমিকম্প হয়। ওই ভূমিকম্পসৃষ্ট সুনামিতে বঙ্গোপসাগর-তীরবর্তী এলাকাগুলোয় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়। ১৮৬৯ সালে সিলেটের খুব কাছেই ৭ দশমিক ৫ মাত্রার ভূমিকম্প হয়েছিল। ১৮৮৫ সালে সিরাজগঞ্জের কাছে আরেকটি ভূমিকম্প হয়। ১৮৯৭ সালে সংঘটিত হয় ৮ মাত্রার গ্রেট ইন্ডিয়ান আর্থকোয়েক, যার উৎপত্তিস্থল ছিল শিলং। ১৯০৮ সালে শ্রীমঙ্গলে ভূমিকম্প হয়েছিল ৭ দশমিক ৬ মাত্রার। সর্বশেষ ১৯৩০ সালে ধুবড়ি আর্থকোয়েকে রংপুর অঞ্চলে বেশ ক্ষয়ক্ষতি দেখা দেয়। এর মাত্রা ছিল ৭ দশমিক ১।
বিশ্লেষকরা বলছেন, প্রতি ১০০-১৫০ বছর পরপর ৭ মাত্রার ভূমিকম্প আসে। আর প্রতি ২৫০ থেকে ৩০০ বছর পরপর আসে ৮ মাত্রার ভূমিকম্প। ১৫০ বছরের চক্র অনুযায়ী বাংলাদেশে এখন ৭ মাত্রার ভূমিকম্প হওয়ার আশঙ্কা অনেক বেশি। বিশেষ করে গত পাঁচ-ছয় বছরে এ আশঙ্কা আরো বেড়েছে।
বিশেষজ্ঞদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরেই ভূমিকম্পে রাজধানীতে বড় বিপর্যয়ের আশঙ্কা প্রকাশ করা হলেও বিগত সরকারের নীতিনির্ধারকরা বিষয়টিকে আমলেই নেয়নি। অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর কিছু সময় অতিবাহিত হলেও এখনো এ বিষয়ে কার্যকর কোনো পদক্ষেপের উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না।
সম্প্রতি ঘটে যাওয়া ছোট ছোট ভূমিকম্প বাংলাদেশে বড় ভূমিকম্পের ঝুঁকি বাড়িয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ও বাংলাদেশ আর্থকোয়েক সোসাইটির প্রতিষ্ঠাতা সেক্রেটারি ড. মেহেদী আহমেদ আনসারী। তিনি বলেন, ‘এখানে দুটো থিওরি আছে। ছোট ছোট ভূমিকম্প হলে বড় ভূমিকম্প নাও হতে পারে আবার বড় ঝাঁকুনির প্রস্তুতি হিসেবে ছোট ছোট ভূমিকম্প হয়ে থাকে। প্রশ্ন হলো আমরা কোনটা বিবেচনায় নিয়ে এগোব? আমাদের তো অবশ্যই সতর্ক পদক্ষেপ নিতে হবে। বড় ভূমিকম্পের প্রস্তুতি যদি নেই, তাহলে আমাদের ঝুঁকি কমে। কিন্তু আমরা যদি মনে করি ছোট ছোট ভূমিকম্প হচ্ছে, তাই বড় ভূমিকম্প হবে না, কিন্তু সত্যিই যদি বড় ভূমিকম্প হয়ে যায়, তাহলে যে বিপর্যয় নেমে আসবে তা কল্পনা করাও অসম্ভব।’
তিনি বলেন, ‘২০১৫ সালে যখন নেপালে ভূমিকম্প হয়, তখন আমি সরকারি যেসব কমিটিতে কাজ করেছিলাম, বারবার বলেছিলাম রানা প্লাজা দুর্ঘটনার পর আমরা যেমন ভবনগুলো পরীক্ষা করেছি, চেক করে সার্টিফিকেশন ব্যবস্থা করেছি; ঠিক একইভাবে ঢাকা-চট্টগ্রামসহ বড় শহরগুলোর ভবন পরীক্ষা করে সার্টিফিকেশনের ব্যবস্থা করতে হবে। এত বছর হয়ে গেল, কেউ কথা কানেই তুলল না।’
সাম্প্রতিক সময়ের ভূমিকম্পগুলোয় বাংলাদেশ বা ঢাকায় তেমন কোনো ক্ষয়ক্ষতি এখনো হয়নি। তবে ভূমিকম্পের মাত্রা বিপজ্জনক পর্যায়ে গেলেই ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা। বিশেষ করে রাজধানী ঢাকায় বিপর্যয়ের মাত্রা ভয়াবহ হবে বলে মনে করছেন তারা। এ বিষয়ে তাদের বক্তব্য হলো গত কয়েক দশকে ঢাকার সম্প্রসারণ হয়েছে দ্রুত ও অপরিকল্পিতভাবে। ঢাকার পুরনো অংশটি গড়ে উঠেছিল শক্তিশালী গঠনের মাটির ওপর। কিন্তু গত কয়েক দশকে বর্ধিত হওয়া অংশে মাটির গঠন দুর্বল। এসব এলাকার বড় অংশই গড়ে উঠেছে মূলত ভরাট হওয়া জলাভূমির ওপর। রিখটার স্কেলে ৭ বা এর চেয়ে বেশি মাত্রার ভূমিকম্পে এসব এলাকায় বড় ধরনের প্রাণ ও সম্পদের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে। এমনকি যথাযথভাবে পাইলিংয়ের মাধ্যমে নির্মিত ভবনগুলোও এ বিপর্যয়ের আওতামুক্ত নয়।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগের অধ্যাপক ড. আদিল মুহাম্মদ খান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘ঢাকার মাটি দুই ধরনের। সদরঘাট থেকে সোজা গাজীপুরের মধুপুর পর্যন্ত অংশটি প্লাইস্টোসিন আমলের লাল মাটি দিয়ে গঠিত। এ ধরনের মাটির গঠন খুবই শক্তিশালী। বুড়িগঙ্গা নদী থেকে শুরু করে পুরান ঢাকা, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, এয়ারপোর্ট, টঙ্গী, গাজীপুর ও সাভারের একাংশ পুরোটাই এ ধরনের শক্ত ভূমি। কিন্তু ঢাকার পার্শ্ববর্তী এলাকা বিশেষ করে কেরানীগঞ্জ, হেমায়েতপুর, পূর্বাচলের একাংশ, নারায়ণগঞ্জের একাংশের ভূমি সাম্প্রতিককালের প্লাবন সমভূমি শ্রেণীর। এটি এখনো গঠিত হচ্ছে। বন্যা হচ্ছে, বর্ষায় পানি বাড়ছে, এতে পলি দিয়ে এ ভূমির গঠন হচ্ছে। এখানে বিল্ডিং করতে হলে ৩০-৪০ মিটার পর্যন্ত পাইলিং করতেই হবে। এমনকি পাইলিংয়ের মাধ্যমে নির্মিত ভবনের ক্ষেত্রেও ঝুঁকি থেকেই যায়।’
তিনি বলেন, ‘এমন পরিস্থিতিতে জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। ঢাকায় ভূমিকম্প হলে শুধু বিল্ডিং ভেঙে পড়বে তা-ই নয়, এখানে উদ্ধারকাজ করা অসম্ভব হয়ে পড়বে। বিশেষ করে যেসব এলাকায় রাস্তা সরু, সেখানে ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি ঢুকবে না। ফায়ার সার্ভিসের ভবনও তো ভেঙে পড়বে। রাস্তায় যদি মেট্রোরেল পড়ে যায়, বা এক্সপ্রেসওয়ে ধসে পড়ে তাহলে তো ঢাকার রাস্তায় গাড়িঘোড়া চলবে না। ভূমিকম্পের সময় মানুষ যেন বাসা থেকে বের হয়ে ফাঁকা জায়গায় গিয়ে দাঁড়াতে পারে, সে ব্যবস্থাও এখানে নেই। তুরস্কের বিল্ডিং অথরিটি ছিল চরম দুর্নীতিগ্রস্ত। ফলে সেখানে নিয়ম না মেনেই বড় বড় ভবন হয়েছে। তবে তুরস্কে অনেক খোলা জায়গা ছিল, যেটা ঢাকায় নেই। এখন ভূমিকম্প হলে বিদ্যুতায়িত হয়ে অনেক জায়গায় আগুন লাগারও আশঙ্কা আছে। তার মানে এ নগরী আগুন, ভূমিকম্পসহ নানাবিধ ঝুঁকির মধ্যে দাঁড়িয়ে আছে। কিন্তু সে ঝুঁকি কমানোর জন্য কোনো প্রস্তুতি সরকার বা রাষ্ট্র নেয়নি। উল্টো আবাসন ব্যবসায়ীদের চাপের মুখে নতি স্বীকার করে বারবার নগর পরিকল্পনার ব্যত্যয় ঘটানো হয়েছে। সরু রাস্তায় বহুতল ভবন নির্মাণের অনুমোদন দিয়ে নগরীকে আরো বাসযোগ্যহীন করে তুলছে।’
নানা পরিবর্তন-পরিবর্ধন শেষে ৪০০ বছরের নগরী ঢাকার বর্তমান আয়তন দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৫২৮ বর্গকিলোমিটারে। ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন ছাড়াও এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুর, সাভার ও কেরানীগঞ্জের একাংশ। এসব এলাকাকে অন্তর্ভুক্ত করে ডিটেইল্ড এরিয়া প্ল্যান (ড্যাপ) প্রণয়ন করেছে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক)। সংস্থাটির দাবি, নতুন এ পরিকল্পনায় নিশ্চিত হবে নগরের ভূমির পরিকল্পিত ব্যবহার।
এ দাবির সঙ্গে একমত নন গবেষকরা। তাদের অভিযোগ, দুর্বল গঠনের মাটি বা ভরাট করা জলাভূমির ওপর পুরোপুরি অপরিকল্পিতভাবে সম্প্রসারিত ঢাকা এরই মধ্যে নাজুক ও ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থানে চলে গেছে। শুধু ড্যাপ দিয়ে এ ঝুঁকি প্রশমন করা সম্ভব নয়।
ড. মেহেদী আহমেদ আনসারী বলেন, ‘এটা ঠিক যে জলাভূমি ভরাট করে বিল্ডিং বানানোর প্রযুক্তি আছে, ভালো পাইলিং দিলে সেটা হয়তো ভূমিকম্প সহনীয়ও হবে, কিন্তু তার পরও পুরোপুরি বিপদমুক্ত, সে কথা বলার সুযোগ নেই। জলাভূমি ভরাট করে বানানো ভবন দেখা গেল ভূমিকম্পের সময় ধরাশায়ী হয়ে গেল। এমন প্রচুর উদাহরণ রয়েছে। এর একটি ক্ল্যাসিক উদাহরণ হলো মেক্সিকোয় ১৯৮৫ সালের ভূমিকম্পের ঘটনা। তখন সেখানে ডোবা-নালা-জলাভূমি ভরাট করে বানানো ভবন ধসে পড়েছে এবং ১৫ হাজার মানুষ মারা গেছে। ভূমিকম্পের উৎপত্তি হয়েছিল মেক্সিকো সিটি থেকে ৩০০ কিলোমিটার দূরে। কিন্তু এর প্রতিক্রিয়া পড়েছে শহরের দুর্বল মাটির ভবনগুলোর ওপর। আমাদের এখানেও ভূমিকম্পের উৎসগুলো ঢাকা থেকে ২০০-৩০০ কিলোমিটার দূরে। ঢাকায় খাল-বিল ভরাট করে যে ভবনগুলো বানানো হয়েছে, সেগুলো খুবই ঝুঁকিপূর্ণ। ভরাট মাটিতে পাইলিংয়ের কারণে ভবন ঠিক থাকার কথা থাকলেও মাটির কারণে ভেঙে পড়ার ঝুঁকি থাকে। তাই ভবন বানানোর আগে মাটি উন্নয়ন করাটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ।’
আপনার মতামত জানানঃ