Trial Run

প্লট কেলেঙ্কারিতে জড়াল জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রীর নাম

ছবি : প্রথমআলো

পূর্বাচল প্লট বরাদ্দে শুরু থেকেই অনিয়ম আর দুর্নীতির ছড়াছড়ি। রাজউক ও প্রশাসনের অনিয়মে গোটা প্রকল্পই এখন ঘুণে জর্জরিত এক কাঠ ব্যতিত ভিন্ন কিছু নয়। পূর্বাচল প্রকল্পের দুর্নীতিতে বিভিন্ন সময় রাজউক আর প্রশাসনের নাম জড়িয়েছে, চাকরি থেকে বরখাস্ত থেকে শুরু করে মামলা মোকদ্দমা এখনো চলছে আদালতে। এরইমধ্যে পূর্বাচল উপশহর প্রকল্পে নাম জড়ালো জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেনের। প্রবাসী এক ব্যক্তির প্লট গায়েব করে নিজের নামে নেওয়ার এই অভিযোগ ওঠে।

জানা যায়, পূর্বাচল উপশহর প্রকল্পের ৩০০ ফুট প্রশস্ত সড়ক ঘেঁষেই প্লটটির অবস্থান। ১০ কাঠা আয়তনের ওই প্লটটির বাজারমূল্য প্রায় ১৫ কোটি টাকা। যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী আবুল কাশেম মোহাম্মদ সাইফুল্লাহ কিস্তির মাধ্যমে সমস্ত টাকাই পরিশোধ করেছেন। সম্প্রতি দেশে ফিরে প্লটটি রেজিস্ট্রি করে বুঝে নিতে চাইলে তাকে জানানো হয় প্লটটির ফাইল গায়েব হয়ে গেছে। পরে জানতে পারেন তার প্লটটি পেয়েছেন জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন।

প্লট বাতিলের খবর জানার পর আবুল কাশেম তার সপক্ষে যাবতীয় কাগজপত্র নিয়ে রাজউকের চেয়ারম্যান-বোর্ড সদস্যদের কাছে যান। কিন্তু রাজউকের লোকজন তাকে কোনো সদুত্তর দিতে পারেনি। একপর্যায়ে উচ্চ আদালতের দ্বারস্থ হন আবুল কাশেম। রিট আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে আদালত আবুল কাশেম মোহাম্মদ সাইফুল্লাহকে প্লটটি বুঝিয়ে দেওয়ার নির্দেশ দেন। কিন্তু রাজউক সেটা বুঝিয়ে দিতে গড়িমসি শুরু করেন।

এদিকে বেশ আগেই রাজউকের কাছে প্লট প্রাপ্তির আবেদন করেছিলেন জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন। তাকে একটি ভালো লোকেশনের বড় প্লট দেওয়ার চেষ্টা করছিলেন রাজউকের চেয়ারম্যানসহ বোর্ড সদস্যরা। প্রতিমন্ত্রীর আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে গত ০৬/২০২০তম বোর্ড সভায় রাজউক প্লট বরাদ্দ বিধিমালার ১৩/ক ধারায় ফরহাদ হোসেনকে সেই প্লটটি বরাদ্দ দেন। এ ধারায় বলা হয়েছে, রাষ্ট্রীয় ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ রাজউক গুণী ব্যক্তিদের প্লট বরাদ্দ দিতে পারে, যদি তার ঢাকায় বসবাসের মতো কোনো জমি বা ফ্ল্যাট না থাকে। ওই বোর্ড সভায়ই রাজউক চেয়ারম্যান সাইদ নূর আলম উত্তরা তৃতীয় পর্বে নিজেও পাঁচ কাঠার একটি প্লট বরাদ্দ নেন।

ভুক্তভোগী আবুল কাশেম এই প্লট নিয়ে রাজউকের বিভিন্ন কর্মকর্তার দ্বারস্থ হচ্ছেন। এ অবস্থায় আইন শাখার অফিস সহকারী আবু সালেক শিকদার মন্টু তাকে আশ্বাস দেন, কিছু টাকা খরচ করলে রাজউক আর আপিল করবে না। তাহলে আপনাকে একটা প্লট দিয়ে দেবে। যদি আপিল করেন, তাহলে আপনি জীবনেও আর প্লট পাবেন না। কিন্তু কত টাকা দিতে হবে জানতে চাইলে মন্টু আপাতত তিন লাখ টাকা দাবি করেন। সেই টাকা দিতে হবে আইন কর্মকর্তা মাহমুদুল করিম ও পূর্বাচল প্রকল্পের উপপরিচালককে।

রাজউক এর আগেও বহু ফাইল গায়েব করে অন্যদের বিশেষ করে প্রভাবশালীদের এমনকি নিজেদের লোকদের দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। এবার প্রতিমন্ত্রী নাহিদ হোসেন পূর্বাচলে প্লট বরাদ্দ চাইলে তার নামে এক প্রবাসীর প্লট বাতিল করে দিয়েছেন রাজউক। এ প্রসঙ্গে জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন বলেন, তার বাবা নামি ব্যক্তিত্ব ছিলেন। কিন্তু তিনি প্লট নেননি। তিনি নিজেও প্লট নিতে চাননি। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে তিনি রাজউকে প্লটের জন্য আবেদন করেছিলেন। তবে রাজউকের কাউকে তিনি বলেননি অন্যের প্লট বাতিল করে তাকে প্লট দিতে।

ফরহাদ হোসেন বলেন, ‘আমি এটাও রাজউকের কাউকে বলিনি যে ৩০০ ফুট রাস্তার পাশে ভালো লোকেশনে আমাকে প্লট দিতে হবে। ১০ কাঠার প্লট দিতে হবে- এটাও বলিনি। রাজউক এভাবে আরেকজনের প্লট বাতিল করে আমাকে দেবে জানলে আমি আবেদনই করতাম না। আসলে রাজউকের লোকজন খুব দুষ্ট। এ কাহিনি করে ওরা আমার ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ করছে। এ বিষয়ে আমি রাজউকের সঙ্গে প্রয়োজনে কথা বলব।’

তবে সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, পূর্বাচল প্রকল্প ঘিরে এর আগেও বহু রাঘব বোয়ালের নাম জড়িয়েছে। হরিলুটের প্রকপ্ল হিসেবে পরিচিত এই প্রকল্পে নতুন কোনো প্রভাবশালীর নাম জড়ালে এখন আর বিষয়টা অত আহামরি শোনায় না, এতোটাই প্রচলিত হয়ে গেছে এই প্রকল্প ঘিরে। বছর কয়েক আগে রাজধানীতে নিজের প্লট থাকা সত্ত্বেও তথ্য গোপন ও ক্ষমতার অপব্যবহারের মাধ্যমে একাধিক প্লট নেওয়ার অভিযোগ ওঠে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) সাবেক চেয়ারম্যান মো. নূরুল হুদার বিরুদ্ধে। এছাড়া পূর্বাচল প্রকল্পে দুর্নীতির অভিযোগে করা অর্থ আত্মসাৎ মামলায় ঢাকা জেলা প্রশাসনের সাবেক সার্ভেয়ার মো. হালিম ভূঁইয়াকে আটক করেছিল দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। তারও আগে জালিয়াতির অভিযোগে গ্রেপ্তার এবং বরখাস্ত হোন প্রকল্পেরই চার কর্মকর্তা। এমন অসংখ্য জালিয়াতি দুর্নীতি আর অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে প্রকল্পের সাথে জড়িত অথবা বাইরের অসংখ্যজনের বিরুদ্ধে।সেখানে নতুন একটি নাম যোগ হলো। হরিলুটের এই প্রকল্পে এমপি মন্ত্রীরাই-বা বাইরে থাকবেন কেনো বলে ক্ষোভ প্রকাশ করেন সংশ্লিষ্টরা। ফাইল জালিয়াতি, অনিয়ম, দুর্নীতি এবং প্রকল্প ঘিরে যত প্রতারণা জড়িয়ে আছে সেসবের সুষ্ঠু সমাধান চেয়ে সরকারের প্রতি আহ্বান জানান তারা।  একইসাথে ভুক্তভোগীদের হয়রানি বন্ধ করে তাদের প্লট বুঝিয়ে দেওয়ারও আহ্বান জানান।

এসডাব্লিউ/ডিএস/কেএইচ/ ১৩১৫

ছড়িয়ে দিনঃ
  • 73
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    73
    Shares