Trial Run

করোনাভাইরাস : ফেব্রুয়ারীতে ঢাকার বইমেলা হচ্ছে না

অনলাইনে আয়োজন করার কথা ভাবছে বাংলা একাডেমি

Photo : DW

অমর একুশে গ্রন্থমেলা, ব্যাপকভাবে পরিচিত একুশে বইমেলা হিসাবে। প্রতি বছর পুরো ফেব্রুয়ারি মাস জুড়ে এই মেলা বাংলা একাডেমির বর্ধমান হাউজ প্রাঙ্গণে ও বর্ধমান হাউজ ঘিরে অনুষ্ঠিত হয়। ২০১৪ সাল থেকে অমর একুশে গ্রন্থমেলা বাংলা একাডেমির মুখোমুখি সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে সম্প্রসারণ করা হয়েছে। তবে বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গনেও মেলার একটি অংশ আয়োজন করা হয়। প্রতিবছর ফেব্রুয়ারী মাস জুড়ে অনুষ্ঠিত ঢাকার এই বইমেলাকে বলা হয় বাঙালির প্রাণের উৎসব। লেখক, প্রকাশক ও পাঠকের মিলনমেলা হিসাবে অনেকে আখ্যায়িত করে থাকেন ঢাকার এই বইমেলাকে। বাংলাদেশে করোনাভাইরাস মহামারির কারণে ২০২১ সালের একুশে বই মেলা উন্মুক্ত প্রাঙ্গণে এবছর আয়োজন করা হচ্ছে না বলে জানিয়েছে এর আয়োজক বাংলা একাডেমি। ঐতিহ্য বজায় রাখতে অনলাইনে মেলা করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলা একাডেমি কর্তৃপক্ষ।

বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক হাবিবুল্লাহ সিরাজী গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে বইমেলা না করার সিদ্ধান্ত বাংলা একাডেমির,  তবে তা চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হবে। অনলাইনে এই মেলা কীভাবে আয়োজন করা যায় সেটা নিয়ে তারা এখন পরিকল্পনা করছেন। পৃথিবীর অন্য অনেক দেশের মতই বাংলাদেশেও শীতের সময় করোনাভাইরাসের সংক্রমণ বাড়ছে এবং বই মেলাতে যেহেতু বিপুল সংখ্যক মানুষের সমাগম হয়, তাই সংক্রমণ যেন আরো বেশি ছড়িয়ে না পড়ে সেই বিবেচান থেকেই অনলাইনে বইমেলা করার পরিকল্পনা করছে বাংলা একাডেমি।

বাংলাদেশের সৃজনশীল বইয়ের প্রকাশনা শিল্প টিকে আছে একুশের বইমেলার উপর ভিত্তি করে। অধিকাংশ প্রকাশনী সারাবছর বই প্রকাশ না করে ফেব্রুয়ারীর বই মেলার জন্য অপেক্ষা করে। একুশের এই মেলাকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশের প্রকাশনী শিল্প টিকে আছে। নতুন, পুরাতন ও নবীন লেখকরা সারাবছর জুড়ে অপেক্ষা করেন একুশের বইমেলার জন্য। চলতি বছর বাংলা একাডেমির হিসাবে বই বিক্রি হয়েছে ৮২ কোটি টাকা। ২০১৯ সালের মেলায় ৩০ দিনে ৮০ কোটি টাকার বই বিক্রি হয়েছিল। ২০১৮ সালের মেলায় বই বিক্রি হয়েছিল ৭০ কোটি টাকার। ২০১৭ সালে বিক্রি হয়েছিল ৬৫ কোটি ৪০ লাখ টাকা, ২০১৬ সালে ৪২ কোটি, ২০১৫ সালে বই বিক্রি হয়েছিল প্রায় ২২ কোটি টাকা। আর ২০১৪ সালে মাস জুড়ে বই বিক্রি হয়েছিল মাত্র সাড়ে ১৬ কোটি টাকা।

এছাড়াও  অতীতের সব রেকর্ড ভেঙে চলতি বছর ফেব্রুয়ারীর বইমেলায় নতুন বই প্রকাশ হয়েছিল ৪ হাজার ৯১৯টি। তবে এ হিসাব বাংলা একাডেমির তথ্যকেন্দ্রে জমা পড়া বইয়ের। এর বাইরেও মেলায় নতুন বই প্রকাশিত হয়েছিল বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়। অনলাইনে বইমেলা করলে পাঠক-লেখকদের মধ্যে কতটা সম্পর্ক তৈরি হবে এবং কি পরিমাণ বই প্রকাশ হবে সেটা নিয়ে বেশ সন্দেহ থাকলেও মন্দা অর্থনীতির এই সময়ে বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গনে বইমেলার আয়োজন বাতিল করাতে অনেক প্রকাশক বাংলা একাডেমিকে স্বাগত জানিয়েছেন। অনেকে মিশ্র প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন।

বাংলাদেশে এ সময়ের জনপ্রিয় সৃজনশীল বইয়ের প্রকাশনী সংস্থা চৈতন্য প্রকাশনীর তরুণ প্রকাশক জনাব রাজিব চৌধুরী করোনা মহামারী পরিস্থিতিতে ২০২১ এর বাংলা একাডেমির বইমেলা না করার সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়ে বলেন, এ ব্যাপারে আমি পজেটিভ। বইমেলা হলে স্টল ভাড়া, ডেকোরেশন, স্টল পরিচালনাকারীদের সম্মানী সব মিলিয়ে যে খরচ সেটা বই বিক্রি করে তুলে আনা এবার সম্ভব হতো না। করোনা পরিস্থিতির এই সময়ে পুরো মাস স্বাস্থবিধি মেনে মেলা পরিচালনা করাটা কতটুকু সম্ভব হত সেটাও প্রশ্ন থেকে যায়। আর বই বিক্রি কি রকম হবে সব মিলিয়ে ঝুকিটা বেশি থাকে প্রকাশকদের। বই বিক্রির প্লাটফর্ম হিসেবে অনলাইন কে সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়ে আমরা বই বিক্রি ও প্রচারে যাব এবার।

এ বছর বইমেলাকে উপলক্ষ্য করে কয়টি বই প্রকাশ করার কথা ভেবেছে চৈতন্য এবং পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে কি একই পরিমাণ বই প্রকাশ করবে আপনার প্রতিষ্ঠান – এমন প্রশ্নের জবাবে প্রকাশক রাজিব চৌধুরী বলেন, আমরা করোনা সময় থেকে এখন পর্যন্ত বেশ কয়েকটা বই প্রকাশ করেছি। চৈতন্য সারাবছর বই প্রকাশ করে। তবে মেলা উপলক্ষে আমাদের ২৫ টি বই প্রকাশ করার পরিকল্পনা ছিল এবং মহামারীর কারণে পরিবর্তিত পরিস্থিতিতেও আমরা ২৫টি বই প্রকাশ করব।

তবে মেলাকেন্দ্রিক অধিকাংশ প্রকাশক বাংলা একাডেমির সিদ্ধান্তে হতাশা প্রকাশ করেছেন। অন্যদিকে তরুণ লেখক ও পাঠকদের মধ্যেও বাংলা একাডেমির বইমেলা না করার সিদ্ধান্তে হতাশ হয়েছেন বলে জানা গেছেন। ঢাকার একুশে বইমেলা মূলত তরুণ্যের উৎসব হিসাবেও খ্যাত। তাই তরুণ প্রজন্মের পাঠক ও লেখকদের মধ্যে অনলাইনে একুশের বইমেলা কতটা জমবে সেটা নিয়ে সন্দেহ কাজ করছে।

এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যায়নরত সৃজনশীল বইয়ের পাঠক রাকিবুল হাসান বলেন, আমরা সারাবছর একুশের বইমেলার জন্য অপেক্ষা করি, তবে এবারের মহামারী পরিস্থিতিতে বাংলা একাডেমির সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানানো ছাড়া বিকল্প নাই। যারা বইয়ের সত্যিকারের পাঠক তারা একাডেমি প্রাঙ্গণে মেলা না হলেও পছন্দের বই ঠিকই সংগ্রহ করবে।

বাংলা একাডেমির ‘অমর একুশে বইমেলা’য় লক্ষ লক্ষ মানুষের সমাগম এবার না ঘটলেও পাঠকরা ঠিকই অনলাইন বইমেলা থেকে পছন্দের বইটি সংগ্রহ করবেন বলে সবাই আশা করছেন। ফেব্রুয়ারীর একুশের সেই জমজমাট আসরের জন্য আমাদের সবাইকে ২০২২ সালের বইমেলার জন্য অপেক্ষা করতেই হবে ।

এসডব্লিউ/নসদ/২৩৪০

ছড়িয়ে দিনঃ
  • 69
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    69
    Shares