Trial Run

সরকার ও মালিকদের গাফিলতিতে অর্থ পাচ্ছে না শ্রমিকরা

করোনায় কর্মহীনদের বিদেশি সহায়তা

করোনাভাইরাসের প্রথম ধাক্কায় বাংলাদেশ যখন লকডাউনে বিপর্যস্ত, তখনই গণমাধ্যমে এসেছিল কাজ হারানো শ্রমিকদের ভয়াবহ আর্থিক সঙ্কটের কথা। এর মধ্যে গত মে মাসেই জানা যায়, রফতানিমুখী শিল্পের কাজ হারানো শ্রমিকদের প্রণোদনা দিতে ১১ কোটি ৩০ লাখ ইউরো দিচ্ছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও জার্মানি। ওই অনুদান নিশ্চিতের পর ছয় মাস চলে গেছে, কিন্তু এখনো প্রণোদনার সেই অর্থ পাননি শ্রমিকরা। কঠিন সময়টি তারা পার করছেন নিঃস্ব হাতে। যে সময় প্রণোদনার অর্থ তাদের সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন, সে সময় তাদের জন্য বরাদ্দকৃত টাকা অলস পড়ে আছে। সরকারের গাফিলতি ও মালিক সংগঠনের অবহেলার কারণেই এ অবস্থা।

  • ইইউর টাকায় শ্রমিকদের পূর্ণ প্রণোদনা দেয়া হবে জেনে পোশাক খাতের মালিকদের পাশাপাশি অন্য রফতানি শিল্পের মালিকরাও সোচ্চার হয়

  • মালিক সংগঠনগুলো এ বিষয়ে প্রতিযোগিতায় নামলে সরকার তাদের একত্রে বসে কাজ করার নির্দেশনা দেয়

  • কোন কারখানার শ্রমিকরা প্রণোদন পাবেন আর কারা পাবেন না, এটা নির্ধারণে মতামত দিতে মালিকরা অনেক সময় ক্ষেপণ করে

গত ২০ মে ২০২০ ইইউর বাংলাদেশ মিশন এক বিবৃতিতে জানায়, কোভিড-১৯ মহামারি মোকাবিলায় সহায়তা হিসেবে বাংলাদেশকে ৩৩ কোটি ৪০ লাখ ইউরো দেবে তারা। এর মধ্যে বাংলাদেশের মানুষের আর্থসামাজিক অবস্থার উন্নয়নের জন্য দেবে ২৬ কোটি ৩০ লাখ ইউরো। আর ১১ কোটি ৩০ লাখ ইউরো দেবে রপ্তানিমুখী উৎপাদনশীল শিল্প খাতের কর্মহীন হয়ে পড়া শ্রমিকদের জন্য। শ্রমিকদের প্রণোদনার জন্য দেয়া ১১ কোটি ৩০ লাখ ইউরোর মধ্যে ইইউ দিচ্ছে ৯ কোটি ৩০ লাখ ইউরো। বাকি ২ কোটি ইউরো হচ্ছে জার্মানির অনুদান। প্রতি ইউরো ১০০ টাকা ৪৭ পয়সা হিসাবে মোট অর্থের পরিমাণ দাঁড়ায় ১ হাজার ১৩৫ কোটি ৩১ লাখ টাকা।

ইইউ ও জার্মানি চাইছিল দ্রুত এ প্রণোদনার অর্থ শ্রমিকদের হাতে পৌঁছানো হোক। তাই অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগকে (ইআরডি) মে মাসের মধ্যভাগেই অর্থ দেওয়ার কথা জানানো হয়। বাংলাদেশ সরকারও জানায় যে, ১০ লাখ শ্রমিককে এ অর্থ ভাগ করে দেয়া হবে। শ্রমিকেরা মাসে তিন হাজার করে টাকা পাবেন। টাকা দেওয়া হবে তিন মাস পর্যন্ত। ব্যাংক হিসাব বা মোবাইল আর্থিক পরিষেবার মাধ্যমে শ্রমিকদের এ টাকা দেওয়া হবে। গত সেপ্টেম্বর মাসের প্রথম সপ্তাহেই এই অর্থ বিতরণের কথা ছিল। কিন্তু এখনো তা ছাড় করা হয়নি।

পোশাক খাতের মালিকদের চাপে সরকার এপ্রিল থেকে আগস্ট পর্যন্ত শ্রমিকদের মজুরি পরিশোধে ২ শতাংশ সার্ভিস চার্জে প্রায় সাড়ে ১০ হাজার কোটি টাকা প্রণোদনা ঋণ দেয়। কিন্তু লকডাউন ওঠার পর দেখা যায় কাজ হারানো শ্রমিকদের কিছুই পাওয়ার নেই। শ্রমিক নেতারা বলছেন, ইইউ ও জার্মানির অনুদান কাজ হারানো মানুষগুলোর জন্য এই দুঃসময়ের অবলম্বন হতে পারত। মোবাইল ফোনের মাধ্যমে ১০ লাখ শ্রমিককে অর্থ সহায়তা দেয়ার ব্যবস্থা গ্রহণ করতে এত দীর্ঘ সময় লাগার কথা নয়। মূলত মালিক সংগঠনগুলোর দর কষাকষির ফেরে পড়েই শ্রমিকদের এভাবে বঞ্চিত থাকতে হচ্ছে।

শুরু থেকেই পোশাক খাতে প্রণোদনা দেয়ার সময় এর সঙ্গে রফতানি খাতের অন্য শিল্পগুলোর নামও জুড়ে দেয় সরকার। কিন্তু শ্রমিকদের মজুরি পরিশোধে সরকারের দেয়া প্রণোদনার সুবিধা পোশাক খাতের মালিকরা ছাড়া আর কোনো খাতের মালিকরা নিতে পারেনি। তাছাড়া ওই প্রণোদনা ছিল ২ শতাংশ সার্ভিস চার্জের বিনিময়ে দেয়া ঋণ। কিন্তু ইইউর টাকায় শ্রমিকদের পূর্ণ প্রণোদনা দেয়া হবে জেনে পোশাক খাতের মালিকদের পাশাপাশি অন্য রফতানি শিল্পের মালিকরাও সোচ্চার হয়।

মালিক সংগঠনগুলো এ বিষয়ে প্রতিযোগিতায় নামলে সরকার তাদের একত্রে বসে কাজ করার নির্দেশনা দেয়। এরপর বাংলাদেশ তৈরি পোশাক প্রস্তুত ও রপ্তানিকারক সমিতি (বিজিএমইএ), বাংলাদেশ নিটওয়্যার প্রস্তুত ও রপ্তানিকারক সমিতি (বিকেএমইএ), লেদারগুডস অ্যান্ড ফুটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (এলএফএমইএ) মিলে তালিকা তৈরির কাজে হাত দেয়। কোন কারখানার শ্রমিকরা প্রণোদন পাবেন, কোন কারখানার শ্রমিকরা পাবেন না, এটা নির্ধারণে মতামত দিতে মালিকরা অনেক সময় ক্ষেপণ করে।

শ্রমিকনেতা শহিদুল ইসলাম

শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বশীল কয়েকজন আমলা পুরো বিষয়টির দেখভাল করছেন বলে জানা গেছে। তাদের সূত্রে জানা গেছে, মালিক সংগঠনগুলো সমঝোতায় এসেছে যে, ইইউর অর্থে মাসে ৩ হাজার টাকা করে তিন মাস টাকা পাওয়ার তালিকায় প্রাথমিকভাবে পোশাক খাত, বস্ত্র-সুতা এবং চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য খাত অগ্রাধিকার পাবে। পোশাক খাতের শ্রমিকদের মোট তালিকা ইতিমধ্যে অর্থ মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে আগস্ট মাসেই। বিকেএমইএর ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকা সেপ্টেম্বরের আগেই মন্ত্রণালয়ে পৌঁছানোর কথা। অথচ এখনো শ্রমিকরা অর্থপ্রাপ্তি থেকে বহু দূরে।

শ্রমিক নেতারা বলছেন, মালিক সংগঠনগুলোর ভূমিকাই এর জন্য দায়ী। গার্মেন্টস শ্রমিক ঐক্য ফোরামের কেন্দ্রীয় নেতা শহিদুল ইসলাম বলেন, বিকেএমইএর প্রথম সহসভাপতি মোহাম্মদ হাতেম সংবাদ মাধ্যমকে আগস্ট মাসে বলেছিলেন, ‘কর্মহীন এত শ্রমিক নাও থাকতে পারে।’ মালিকদের এই মনোভাবই শ্রমিকদের অর্থ না পাওয়ার মূল কারণ। মালিকরা যদি মনে বলেন, কর্মহীন শ্রমিকের সংখ্যা এত বেশি নয়, এর অর্থ হলো তারা মনে করছেন ঘোষিত প্রণোদনার অর্থটা শ্রমিকদের প্রাপ্য নয়। মালিকরা চায় শ্রমিকদের এসব টাকা দেয়া হলে তারা যেন বেতন কিছু কম দিতে পারে। এজন্য তারা প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্তদের খুঁজে বের করার পথে বাধা সৃষ্টি করেছে এবং শ্রমিকদের অর্থ প্রদানের বিষয়টিকে ঝুলিয়ে দিয়েছে।

অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, দেরি হলেও এ অর্থ দেয়া হবে। কারণ এ বিষয়ক একটি চুক্তি সাক্ষর হয়েছে গত ২ ডিসেম্বর। অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের পক্ষে সচিব বেগম ফাতিমা ইয়াসমিন ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের পক্ষে এডিবির অ্যাক্টিং ডিরেক্টর জিন লুইস ভিলে চুক্তিটি স্বাক্ষর করেন। গতকাল স্বাক্ষরিত চুক্তিটি ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রতিনিধির কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে হস্তান্তর করা হয়। চুক্তি মোতাবেক শিগগিরই প্রণোদনার অর্থ ছাড় করা হবে বলে জানিয়েছে তারা।

এসডাব্লিউ/এসএন/আরা/১২৫০

ছড়িয়ে দিনঃ
  • 47
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    47
    Shares