লিবিয়া থেকে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইতালির লাম্পেডুসা দ্বীপে যাওয়ার পথে নৌকায় অন্তত সাত বাংলাদেশি অভিবাসনপ্রত্যাশীর মৃত্যু হয়েছে। নৌকায় থাকা অবস্থায় তারা হাইপোথারমিয়ায় (শরীরের তাপমাত্রা হ্রাস) আক্রান্ত হয়ে মারা যান বলে দ্বীপটির প্রসিকিউটর লুইগি প্যাট্রোনাজ্জিও মঙ্গলবার এক বিবৃতিতে জানিয়েছেন। ব্রিটিশ বার্তা সংস্থা রয়টার্স এখবর জানিয়েছে।
বিবৃতিতে বলা হয়েছে, লাম্পেডুসার কাছে লাম্পিওনি নামের দ্বীপ থেকে প্রায় ১৮ মাইল দূরে রাতে নৌকাটি দেখতে পায় কোস্টগার্ড। পরে তারা উদ্ধার অভিযান পরিচালনা করে।
লুইগি প্যাট্রোনাজ্জিও বলেছেন, কোস্টগার্ডের সদস্যরা ল্যাম্পেদুসার কাছে জনবসতিহীন দ্বীপ ল্যাম্পিওনের উপকূল থেকে ২৯ কিলোমিটার দূরে অভিবাসীদের নৌকাটি সারারাত ভাসতে দেখেছেন। পরে অভিবাসীদের উদ্ধারে অভিযান পরিচালনা করা হয়। তার কার্যালয় অবৈধ অভিবাসন এবং অভিবাসীদের মৃত্যুর ঘটনায় তদন্ত শুরু করেছে বলে জানিয়েছেন তিনি।
ল্যাম্পেদুসার মেয়র স্যালভাতোরে মার্তেল্লো ওই সাত বাংলাদেশি অভিবাসীর মৃত্যুর তথ্য নিশ্চিত করেছেন। তিনি বলেছেন, অভিবাসীদের বহনকারী ওই নৌকায় অন্তত ২৮০ জন ছিলেন; যাদের বেশিরভাগই বাংলাদেশ এবং মিসরের নাগরিক।
হাজার হাজার আশ্রয়প্রার্থী এবং অভিবাসনপ্রত্যাশীর ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইউরোপে যাওয়ার অন্যতম প্রধান রুট ইতালি। গত কয়েক মাস ধরে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে অভিবাসনপ্রত্যাশীদের ইউরোপ যাওয়ার প্রবণতা ব্যাপক বৃদ্ধি পেয়েছে।
ইতালির সরকারি তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের শুরু থেকে সোমবার পর্যন্ত ইতালির বিভিন্ন বন্দরে এক হাজার ৭৫১ জন অভিবাসী পৌঁছেছেন।
বাংলাদেশি শ্রমিকদের সমুদ্রপথে বৈধভাবে বিদেশ যাওয়ার সুযোগ নেই। দেশের আইন অনুযায়ী তিনটি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ছাড়া তাদের আর কোনো বহির্গমন পথ নেই। প্রতারকচক্র সবকিছু জেনেও সাধারণ মানুষকে উন্নত জীবনের স্বপ্ন দেখিয়ে সমুদ্রপথে পাঠানোর নামে ঠেলে দিচ্ছে মৃত্যুর মুখে।
অবৈধভাবে সমুদ্রপথে যাত্রা করে স্বপ্নের দেশে নোঙ্গর করে না অনেক সমুদ্রযান। দালালদের খপ্পরে পড়ে অনেক মানুষের জীবন হয় বিপন্ন। টাকা-পয়সা হাতিয়ে নিয়ে মাঝপথেই প্রতারকরা পালিয়ে গেছে, এমন ঘটনা অহরহ ঘটছে।
অনেক ক্ষেত্রে আটকে রেখে পরিবারের সদস্যদের কাছে দাবি করা হয় মুক্তিপণ। মেটাতে না পারলে চলে অমানুষিক অত্যাচার। অনেককে বিক্রি করে দেয়া হয় দাসশ্রমিক হিসেবে।
ইতালির সরকারি তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের শুরু থেকে সোমবার পর্যন্ত ইতালির বিভিন্ন বন্দরে এক হাজার ৭৫১ জন অভিবাসী পৌঁছেছেন।
প্রায়ই সংবাদ শিরোনাম হয় দালালের হাত ধরে ইতালি ও স্পেন প্রবেশের চেষ্টায় ভূমধ্যসাগরে ডুবে শত শত অভিবাসনপ্রত্যাশীর মৃত্যু। খবর আসে, আমেরিকায় যাওয়ার পথে বনে-জঙ্গলে দালালের অমানুষিক নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন তারা। ইউরোপে ঢোকার আশায় বলকানের বরফঢাকা জঙ্গলে হাজারো মানুষ মৃত্যুঝুঁকি নিয়ে অপেক্ষায় থাকার সংবাদও আসে।
ভালো পারিশ্রমিকের আশায় কয়েক বছর ধরে পাচারকারীদের সহায়তায় লিবিয়া যাচ্ছেন বাংলাদেশিরা। সেখান থেকেই ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইউরোপে যাওয়ার চেষ্টা করে নৌকাডুবিতে প্রাণ হারাচ্ছেন অনেক বাংলাদেশি। এরপরও ঝুঁকিপূর্ণ এ প্রবণতা বন্ধ হয়নি। এ ছাড়া প্রতারণার শিকার হয়ে লিবিয়ায় মানবপাচারকারীদের হাতে বহু বাংলাদেশি আছেন আটক অবস্থায়।
জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক সংস্থা ইউএনএইচসিআর’র দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে অবৈধভাবে ইউরোপে প্রবেশের তালিকায় শীর্ষে আছে বাংলাদেশ।
মানব পাচারের দিক থেকে আন্তজার্তিক সংস্থার তালিকাতে কেন বাংলাদেশ শীর্ষে? আমরা যদি এর কারণ খুঁজি তাহলে সর্বপ্রথম যে কারণটি আসবে তা হলো বেকারত্ব। দেশের বিপুল পরিমাণ বেকার ও দরিদ্র জনগোষ্ঠীর ধারণা, বিদেশে গেলে তাদের ভাগ্যের চাকা ঘুরবে। পারিবারিক সচ্ছলতা আসবে এই বিশ্বাস নিয়ে অবৈধ পথে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বিদেশে পাড়ি দেয় তারা। তাদের এই বিশ্বাসকে পুঁজি করে স্বার্থ হাসিল করে পাচারকারীরা।
বাংলাদেশ কোস্ট গার্ডের সূত্র মতে কক্সবাজার ও টেকনাফের ৮০টি পয়েন্ট দিয়ে মানব পাচার হয়। বিভিন্ন ধরনের প্রতিবন্ধকতার জন্য জন্য মানব পাচার কমানো যাচ্ছে না। মানব পাচারকারী চক্রের সাথে পুলিশ, সীমান্ত রক্ষীবাহিনী, প্রশাসন ও রাজনৈতিক দলের নেতাসহ উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার হাত আছে বলে মনে করা হয়।
বিশেষজ্ঞরা বলেন, মানব পাচারের আরো একটি কারণ হলো অসচেতনতা। পাচার হওয়া ভিক্টিম যারা ফিরে আসে তাদের নিয়ে বিভিন্ন প্রোগ্রাম বা ভিক্টিমদের বক্তব্য, তাদের দুর্দশার কথাগুলো প্রত্যন্ত অঞ্চলের সহজ সরল মানুষের মাঝে তুলে ধরার মাধ্যমে সচেতনতা তৈরি করা যেতে পারে। যে এলাকা থেকে মানব পাচার বেশি হচ্ছে সেই এলাকা চিহ্নিত করে সচেতন করা। বেকারত্ব কমাতে যুবক ও মহিলাদের কারিগরি শিক্ষা বৃদ্ধি করে নিজ দেশে কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা। জনশক্তি রপ্তানিতে সরকারি কূটনৈতিক পদক্ষেপ গ্রহণ করে উন্নত দেশগুলোর সাথে সম্পর্ক বাড়ানো। এছাড়া উপকূল ও সীমান্ত এলাকাতে পর্যাপ্ত কোস্ট গার্ড ও সীমান্ত রক্ষীবাহিনীর সংখ্যা বাড়াতে হবে। তাদের প্রয়োজনীয় অস্ত্র ও আধুনিক যন্ত্রপাতির ব্যবস্থা করতে হবে। সমুদ্রসীমা সুরক্ষার জন্য আধুনিক পদ্ধতি অবলম্বন দরকার বলে মনে করেন তারা।
তারা বলেন, সমুদ্র পথে টহল বাড়াতে হবে। টেকনাফসহ সীমান্ত এলাকাগুলিতে ওয়াচ-টাওয়ার করে মানুষদের সার্বক্ষণিক চলাচল পর্যবেক্ষণ করা যেতে পারে। মানব পাচারের এই চক্র ভেঙে দিতে রিসিভিং কান্ট্রির অনেক ভূমিকা পালন করতে হবে। এই বিষয়ে সরকারের আরো বেশি সচেতন হওয়া এবং সুনজর দেওয়া উচিত। এছাড়া জল, স্থল ও আকাশ পথে নজরদারি বাড়াতে হবে। ২১ শতক, সভ্য এক ধরণীতে দাস প্রথা বড়ই বেমানান। মানব পাচার জঘন্যতম একটি ব্যবসা। এটি নির্মূলের মাধ্যমে আমরা আধুনিক দাস প্রথা থেকে মুক্তি পেতে পারি।
এসডব্লিউ/এমএন/কেএইচ/১৯২১
আপনার মতামত জানানঃ