Trial Run

প্রশ্নবিদ্ধ তদন্ত রিপোর্টে ক্ষুণ্ন হচ্ছে পুলিশের ভাবমূর্তি

নারায়ণগঞ্জে সম্প্রতি দু’টি মামলার তদন্ত কর্মকর্তার দায়িত্ব অবহেলা এবং পিআরবি না মেনে দেয়া তদন্ত রিপোর্ট নিয়ে বির্তক দেখা দিয়েছে। অপহরণ ও গুমের ঘটনায় দায়ের করা এসব মামলা নিয়ে পুলিশের দায়ের করা তদন্ত রিপোর্ট প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। মামলার তদন্তে থাকা কর্মকর্তার বিতর্কিত তদন্ত রিপোর্টে যেমন পুলিশের ভাবমূর্তি ক্ষুণœ হয়েছে, তেমনি বিনা অপরাধে নিরীহ ব্যক্তিরা সাজা ভোগ করেছে।

ফতুল্লা থানার একটি মামলায় গার্মেন্টকর্মী তাসলিমাসহ তার পাঁচ স্বজনকে কথিত গুম ও অপহরণের মামলায় বিভিন্ন মেয়াদে জেল খাটতে হয়েছে। ছয় বছর আগে যাকে অপহরণ ও ‘হত্যা’ করা হয়েছিল সেই মামুন গত বুধবার আদালতে হাজির হলে দেখা দেয় চাঞ্চল্য।

এর আগে স্কুলছাত্রী জিসামনি অপহরণের মামলায় তিন যুবক পুলিশি নির্যাতনে আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তি দিতে বাধ্য হলেও পরে ৫১ দিন পর জিসামনি জীবিত ফিরে এলে পুলিশি তদন্ত নিয়ে জনমনে প্রশ্ন ওঠে। এ মামলার তদন্ত কর্মকর্তাকে ক্লোজডও করেন জেলা পুলিশ সুপার। বিষয়টি উচ্চ আদালত পর্যন্ত গড়ায়।

অথচ মহামারী করোনা সংকট থেকে উত্তরণে নারায়ণগঞ্জ জেলা পুলিশের রয়েছে উজ্জ্বল ভূমিকা। পুলিশ সুপার মো: জায়েদুল আলম করোনাকালীন হটস্পট নারায়ণগঞ্জে পেশাদারিত্বের সাথে দায়িত্ব পালন করছেন। নারায়ণগঞ্জে মানুষকে ভালো রাখার জন্য তিনি চেষ্টা করে যাচ্ছেন। অথচ তার অধীনস্থ কয়েকজন কর্মকর্তার বিতর্কিত কাজের জন্য ম্লান হচ্ছে পুলিশ সুপারের সুনাম।

ভুক্তভোগীদের দাবি পুলিশি তদন্ত যদি আরো নিষ্ঠার সাথে করা হতো তাহলে তাদের হয়রানির শিকার হতে হতো না। ভবিষ্যতে মামলার তদন্তগুলো যেন দায়সারা গোছের না হয় সেদিকে দৃষ্টি দেয়ার সুপারিশ করেছেন জেলার সুশীল সমাজের নেতারা। তবে পুলিশ প্রশাসন বলছে, বিতর্কিত কর্মকাণ্ড ঘটিয়ে যারাই পুলিশের ইমেজ ক্ষুণœ করার চেষ্টা করবে তাদের বিরুদ্ধে অবশ্যই বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে অতীতেও যেমনটি হয়েছে।

অপহরণ মামলার ৬ বছর পর মামুনের ফিরে আসা

ফতুল্লা থেকে অপহরণের ছয় বছর পর আদালতে হাজির হয়েছেন মামুন নামের এক যুবক। তবে তাকে অপহরণ ও হত্যা করার অভিযোগে দেড় বছর কারাভোগ করতে হয়েছিল গার্মেন্টকর্মী তাসলিমাকে। ওই মামলায় তাসলিমার বাবা ও ভাইসহ আরো তিনজনও ছিলেন জেলহাজতে। মামলাটি এখন বিচার সম্পন্ন হওয়ার পথে।

পুলিশের তদন্ত কর্মকর্তা এসআই মিজান ছয়জনকে রিমান্ডে নেয়ার আবেদনে উল্লেখ করেছিলেন মামুনকে বিষাক্ত শরবত পান করিয়ে নির্মমভাবে হত্যা করে লাশ শীতলক্ষ্যায় ফেলে গুম করা হয়েছে। তবে আসামিরা পুলিশি নির্যাতনের শিকার হয়েও আদালতে ১৬৪ ধারায় দোষ স্বীকার করেননি। পরে মামলাটি সিআইডিতে হস্তান্তর করা হলে সিআইডির সহকারী পুলিশ সুপার হারুণ অর রশীদ তদন্ত করেন। তদন্ত শেষে তিনি ২০১৯ সালের ১৮ ডিসেম্বর চার্জশিটে এ ছয়জনকে অভিযুক্ত করে বলেন, মামুনকে চেতনা নাশক পানীয় পান করিয়ে সিএনজি চালিত অটোরিকশায় অপহরণ করে অজ্ঞাত স্থানে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। তবে কোথায় কী অবস্থায় রাখা হয়েছে, সেটা জানা যায়নি। গত বুধবার সেই যুবক আদালতে হাজির হলে উভয়পক্ষের মধ্যে হট্টগোলের ঘটনা ঘটে। দেখা দেয় চাঞ্চল্য।

নারায়ণগঞ্জে ‘নিহত’ জিসামনি ও মামুনের ফিরে আসা

জানাগেছে, ২০১৪ সালে নিখোঁজ হলেও ২০১৬ সালের ৯ মে ছেলেকে অপহরণ করে হত্যার উদ্দেশ্যে গুম করা হয়েছে অভিযোগ এনে ফতুল্লা থানায় মামলা করেন মামুনের বাবা আবুল কালাম। সেই মামলায় আসামি করা হয় গার্মেন্টকর্মী তাসলিমা, তার বাবা রহমত উল্লাহ, ভাই রফিক, খালাতো ভাই সাগর, সোহেল ও ছাত্তার মোল্লাকে।

এ ব্যাপারে মো: মামুন নয়া দিগন্তকে জানায়, বাবা-মা কাজের কথা বলায় তাদের সাথে অভিমান করে বাড়ি ছেড়ে চলে যান তিনি। ছয় বছর রাজশাহী ও নাটোরে অবস্থান করে হোটেলসহ নানা ধরনের ছোটখাট কাজ করেছেন। কেউ তাকে অপহরণ করেনি।

অপহরণ ও হত্যার অভিযোগে দেড় বছর কারাভোগ করে আদালত থেকে জামিন পেয়েছেন তাসলিমা। তিনি জানান, প্রেমের প্রস্তাবে রাজি না হওয়ায় মামুনকে অপহরণ ও খুন করার অপবাদ দেয়া হয়েছে তার বিরুদ্ধে। তিনি এ ঘটনার বিচার দাবি করেন।

একই মামলায় তাসলিমা বাবা রহমত উল্লাহও এক বছর জেল খাটেন। তারা এখন জামিনে আছেন। তিনি জানান, আমরা বিনা দোষে এক বছর জেল খেটেছি। এর সাথে যারা জড়িত তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করেন তিনি।

আসামিপক্ষের আইনজীবী অ্যাডভোকেট এমদাদ হোসেন সোহেল বলেন, মিথ্যা মামলা দিয়ে হয়রানি করা হয়েছে তার মক্কেলদের। মামলার বিষয়ে সঠিক তদন্ত না করেই ছয়জনকে আসামি করে গ্রেফতার করা হয়। আদালতে দাখিল করা পুলিশের তদন্ত প্রতিবেদনে আসামিদের দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছে। পরে মামলা দায়িত্ব নেয়া সিআইডি তাদের তদন্ত রিপোর্টে অপহরণ করা হয়েছে বলে আদালতকে জানান। অপহরণ না হয়েও অপহরণের মামলায় কারা ভোগ করায় মামলার বাদিসহ সংশ্লিষ্টদের শাস্তি ও ক্ষতিপূরণ দাবি করেন তিনি।

বাদিপক্ষের আইনজীবী অ্যাডভোকেট শেখ মো: ফরিদ জানান, মামলায় বাদি কোনো আসামির নাম উল্লেখ করেননি। পুলিশ পরে ওই ছয়জনের নাম সংযুক্ত করেন। মামলাটি বর্তমানে বিচারাধীন আছে জানিয়ে তিনি বলেন, অপহৃত মামুন গত বুধবার আদালতে হাজির হলে আদালত আমার জিম্মায় তাকে হস্তান্তর করেছেন।

নারায়ণগঞ্জ সিআইডির বিশেষ পুলিশ সুপার মো: নাসির উদ্দীন জানান, মামলাটি রুজু করা হয়েছে ৩৬৪ ধারায়। কিন্তু সিআইডি চার্জশিট দিয়েছে ৩৬৫ ধারায়। এখানে কাউকে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দী করা হয়নি। সিআইডির তদন্তে যদি কোনো গাফিলতি থাকে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে।

৫১ দিন পর জিসামনি রহস্যজনক ফেরা

গত ৪ জুলাই নারায়ণগঞ্জ শহরের দেওভোগ এলাকার স্কুলছাত্রী জিসামনি নিখোঁজ হলে প্রথমে জিডি এর এক মাস পর ৬ আগস্ট তার বাবা নারায়ণগঞ্জ সদর মডেল থানায় অপহরণ মামলা দায়ের করেন। ওই মামলায় পুলিশ ৭ আগস্ট তিন আসামি জিসার কথিত প্রেমিক আবদুল্লাহ, অটোচালক রকিব ও নৌকার মাঝি খলিলকে গ্রেফতার করে। তারা কিশোরীকে ধর্ষণের পর হত্যা করে শীতলক্ষ্যা নদীতে লাশ ভাসিয়ে দেয়ার কথা স্বীকার করে ৯ আগস্ট আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দী দেন। ২৩ আগস্ট ওই কিশোরী জীবিত ফিরে এলে পুলিশের তদন্ত ও আদালতে দেয়া আসামিদের জবানবন্দী প্রশ্নবিদ্ধ হয়। এ ঘটনায় তদন্ত কর্মকর্তা শামীম আল মামুনকে তদন্তের দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেয়াসহ তাকে থানা থেকে ক্লোজড (প্রত্যাহার) করে জেলা পুলিশ লাইনসে সংযুক্ত করা হয়। বিষয়টি একপর্যায়ে উচ্চ আদালতেরও নজরে আসে।

জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি অ্যাডভোকেট মো: মহসীন মিয়া বলেন, নিরীহ মানুষজন যেন হয়রানির শিকার না হয় সে ব্যাপারে পুলিশকে তদন্তকার্যে আরো আন্তরিক ও নিষ্ঠাবান হতে হবে। কেননা করোনাকালে নারায়ণগঞ্জে পুলিশের উজ্জ্বল ভূমিকা রয়েছে। সেটা সমুজ্জ্বল রাখতে হবে। দু-একজনের কারণে সেটা যেন ক্ষুণœ না হয়।

পুলিশ সুপার মো: জায়েদুল আলম বলেন, মামলাটি (মামুন অপহরণ) তদন্ত করেছে সিআইডি। তাই বিষয়টি তারাই ভালো বলতে পারবে। তবে আমি তদন্ত রিপোর্ট দেখেছি। সেখানে খুব একটা ভুল চোখে পড়েনি। আর ফতুল্লা পুলিশ চার্জশিট দেয়ার আগেই মামলাটি সিআইডিতে হন্তান্তর করা হয়েছে।

 

ছড়িয়ে দিনঃ
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •