Trial Run

ইউরোপীয় নেতাদের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের গুপ্তচরবৃত্তি, কাঠগড়ায় বাইডেন

ছবি:সংগৃহীত

ইউরোপীয় মিত্র দেশগুলোর নেতাদের ওপর গুপ্তচরবৃত্তি করেছে যুক্তরাষ্ট্র। ডেনমার্কের একটি বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থার অংশীদারিত্বে এই আড়িপাতা হয়েছিল।মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনও এতে ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত ছিলেন বলে অভিযোগ উঠেছে।

সুইডেন, নরওয়ে, ফ্রান্স ও জার্মানির শীর্ষ নেতাদের ওপর গুপ্তচরবৃত্তি করতে ডেনিশ গোয়েন্দা সংস্থা ডিফেন্স ইন্টেলিজেনস সার্ভিসের সহায়তায় দেশটির তথ্যপ্রবাহ তারে ২০১২ থেকে ২০১৪ সালে আড়িপেতে মার্কিন জাতীয় নিরাপত্তা সংস্থা (এনএসএ)।

মার্কেল ছাড়াও তখনকার জার্মান পররাষ্ট্রমন্ত্রী ফ্রাংক ওয়াল্টার স্টেইনমিয়ার ও সাবেক জার্মান বিরোধীদলীয় নেতা পিয়ার স্টেইনব্রাকের ওপর গুপ্তচরবৃত্তি করা হয়েছে।

বার্তা সংস্থা এএফপি ও কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল–জাজিরার খবরে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের ওই গোয়েন্দাগিরির খবর গত রোববার প্রকাশ করে ডেনমার্কের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম ডেনমার্ক রেডিও। খবরে বলা হয়েছে, ডেনিশ গোয়েন্দা সংস্থা ডিফেন্স ইন্টেলিজেনস সার্ভিসের সহযোগিতায় দেশটির তথ্যপ্রবাহ তারে (কেবল্‌স) আড়ি পেতে সুইডেন, নরওয়ে, ফ্রান্স ও জার্মানির শীর্ষ নেতাদের ওপর গুপ্তচরবৃত্তি করে যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তা সংস্থা (এনএসএ)। ২০১২ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত এসব গুপ্তচরবৃত্তি করা হয়। গুপ্তচরবৃত্তির অভিযোগ নিয়ে ২০১৪ ও ২০১৫ সালে একটি অভ্যন্তরীণ তদন্ত করে ডিফেন্স ইন্টেলিজেনস সার্ভিস। সেখানেই এই তথ্য উঠে এসেছে। শ্রেণিবদ্ধ এই তথ্য পেয়েছে, এমন ৯টি অজ্ঞাত সূত্র ডেনমার্ক রেডিওকে এই তথ্য জানিয়েছে।

ডেনমার্ক রেডিওর প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে সন্দেহে ছিল জার্মানির নেতাদের ঘিরে। দেশটির চ্যান্সেলর ম্যার্কেল

ছাড়াও তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ফ্রাঙ্ক–ওয়াল্টার স্টেইনমেয়ার ও বিরোধী দলের সাবেক নেতা পিয়ার স্টেইনব্রুকের ওপরও গুপ্তচরবৃত্তি করে এনএসএ।

ডেনমার্কের ডিফেন্স ইন্টেলিজেনস সার্ভিসের তদন্তে আরও বলা হয়েছে, ইন্টারনেট তারের মাধ্যমে ডেনমার্কে আদান–প্রদান তথ্যপ্রবাহে প্রবেশ করে এনএসএ। তারা বার্তা, টেলিফোন কল, সার্চিংসহ ইন্টারনেট ট্রাফিক, চ্যাট, ম্যাসেজিং সার্ভিসে আড়ি পাতে।

সুইডেন, নরওয়ে, জার্মানি, নেদারল্যান্ডস ও যুক্তরাজ্যের সঙ্গে বার্তা আদান–প্রদানে জন্য ইন্টারনেটের কয়েকটি কেব্‌ল স্টেশন রয়েছে ডেনমার্কের। আর সেই নেটওয়ার্কে প্রবেশাধিকার ছিল ডেনিশ ডিফেন্স ইন্টেলিজেনস সার্ভিসের। সেই সংস্থার সঙ্গে যোগসাজশের মাধ্যমে তাতে আড়ি পাতে যুক্তরাষ্ট্র। ডেনমার্কের পাশাপাশি ইউরোপের ওই দেশগুলোও যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ মিত্র।

রয়টার্স জানিয়েছে, ওয়াশিংটনে এনএসএকে এ বিষয়ে মন্তব্যের জন্য অনুরোধ করা হলে তারা তাৎক্ষণিকভাবে সাড়া দেয়নি, আর যুক্তরাষ্ট্রের ডিরেক্টর অব ন্যাশনাল ইন্টেলিজেন্সের (ডিএনআই) দপ্তর মন্তব্যের অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করে। ডেনমার্কের এক মন্ত্রী বলেন, মিত্রদের ওপর গুপ্তচরবৃত্তি বা আড়ি পাতা ‘অগ্রহণযোগ্য’। অভিযোগটি সত্য হলে তা অবশ্যই গুরুতর।

ইউরোপীয় নেতাদের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দারা দীর্ঘদিন ধরেই নজরদারি চালাচ্ছে। সংবাদটি এমন এক সময় প্রকাশ হয়েছে যখন ইউরোপীয় ইউনিয়নের একাংশ যুক্তরাষ্ট্রের বলয় থেকে বের হতে চাইছে। ইউরোপের নিরাপত্তার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর প্রয়োজন রয়েছে কিনা এমন বিতর্ক গত কয়েক মাস ধরেই চলছে। ফরেন পলিসি থেকে শুরু করে ওয়াল স্ট্রিট জার্নালে প্রকাশিত একাধিক প্রতিবেদনে ইউরোপীয় নেতাদের যুক্তরাষ্ট্রবিরোধী অবস্থান সংবলিত বক্তব্য দেখা গেছে। তখন থেকেই মূলত আঁচ করা যাচ্ছিল, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইউরোপের স্বাভাবিক সম্পর্কে একটা উত্তেজনা চলছে।

খবরে বলা হয়েছে, গুপ্তচরবৃত্তি চালানোর তথ্য আগে থেকেই জানতেন ডেনমার্কের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ট্রায়ান ব্রামসেন। তবে তিনি ডেনমার্কস রেডিওকে বলেছেন, ‘কাঠামোগতভাবে ঘনিষ্ঠ মিত্রদের টেলিফোনে আড়ি পাতা গ্রহণযোগ্য নয়।’ এফই কিংবা এনএসএ কোনো সংস্থায় সাম্প্রতিক প্রতিবেদন নিয়ে কোনো মন্তব্য করেনি। গত রবিবার ডেনমার্কস রেডিও খবর প্রকাশের পর হুইসেলব্লোয়ার এডওয়ার্ড স্লোডেন অভিযোগ করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন প্রথম থেকেই এই কেলেংকারির ঘটনা জানতেন। ওই নজরদারি যখন চালানো হয় তখন যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট ছিলেন বাইডেন।

যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএর সাবেক কন্ট্রাক্টর এডওয়ার্ড স্লোডেন ২০১৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা সংস্থার ফোনে আড়ি পাতা ও ইন্টারনেট নজরদারির বিপুল তথ্য ফাঁস করে দেন। তৎকালীন যুক্তরাষ্ট্র সরকার তার বিরুদ্ধে সরকারি সম্পত্তি চুরির অভিযোগ আনে। পরে রাশিয়ায় আশ্রয় নেন স্লোডেন।

ফ্রান্সের ইউরোপবিষয়ক মন্ত্রী ক্লেমেন্ত বুনে দ্য গার্ডিয়ানকে বলেন, ‘অভিযোগ প্রমাণিত হলে এটা ভয়াবহ ব্যাপার। ইউরোপে আমাদের অংশীদার ডেনমার্ক আমেরিকান সার্ভিসের সঙ্গে সহযোগিতার ভিত্তিতে কোনো ভুল করেছে কিনা তা আমাদের খতিয়ে দেখতে হবে। মিত্রদের মধ্যে অবশ্যই বিশ্বাস ও ন্যূনতম সহযোগিতা থাকতে হবে।’ এদিকে সুইডেনের প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিটার হালতভিস্ত ও নরওয়ের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ফ্রাংক বেক জেনসেন অবিলম্বে এই অভিযোগের যাবতীয় তথ্যপ্রাপ্তির দাবি জানান। বিষয়টি তারা গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছেন বলেও তাদের দাবি। বিষয়টি নিয়ে এখনো যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ও ইউরোপের শীর্ষ নেতারা মুখ খোলেননি। তবে ক্ষমতা ছাড়ার আগে জার্মান চ্যান্সেলর এই নজরদারি বিষয়টির শেষ দেখে ছাড়বেন বলে তার পার্টির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে।

গুপ্তচরবৃত্তি নিয়ে ক্ষুব্ধ জার্মানি-ফ্রান্স

ইউরোপে মার্কিন গুপ্তচরবৃত্তি নিয়ে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছে জার্মানি ও ফ্রান্স। সোমবার বিষয়টি নিয়ে জার্মান চ্যান্সেলর আঙ্গেলা ম্যার্কেলের সঙ্গে কথা বলেছেন ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ। দুই নেতার ফোনালাপের পর পুরো ঘটনার জন্য যুক্তরাষ্ট্র ও ডেনমার্কের কাছে জবাব চেয়েছেন ম্যাক্রোঁ। ম্যার্কেল জানিয়েছেন, তিনি ফরাসি প্রেসিডেন্টের বক্তব্যকে সমর্থন করেন। তবে, কূটনৈতিক মহলের একাংশের বক্তব্য, ম্যাক্রোঁর তুলনায় ম্যার্কেলের প্রতিক্রিয়া অপেক্ষাকৃত নরম।

ফরাসি প্রেসিডেন্টের বক্তব্য, আমেরিকার সঙ্গে ইউরোপের সম্পর্ক বন্ধুত্বপূর্ণ। তা সত্ত্বেও তার কেন এমন ঘটনা ঘটালো, তার জবাব ওয়াশিংটনকে দিতে হবে। অন্যদিকে, ডেনমার্ক ইউরোপের রাষ্ট্র। বন্ধু প্রতিবেশী। ফলে তাদেরকেও উত্তর দিতে হবে, কেন মার্কিন গুপ্তচরবৃত্তিতে সাহায্য করেছে তারা।

সোমবার সকাল পর্যন্ত বিষয়টি নিয়ে কোনও মন্তব্য করেননি জার্মান চ্যান্সেলর। পরে ফরাসি প্রেসিডেন্টের সঙ্গে ফোনালাপের পর এ নিয়ে মুখ খোলেন তিনি। অবিলম্বে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে এর ব্যাখ্যা দাবি করেছেন তিনি।

শুধু জার্মানি ও ফ্রান্স নয়, স্ক্যান্ডিনেভিয়া অঞ্চলের দেশগুলোও বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। সুইডেন ও নরওয়ের রাষ্ট্রপ্রধানরাও বিষয়টি নিয়ে সরব হয়েছেন। ডেনমার্কের কাছে জবাব চেয়েছেন তারা। তাদের বক্তব্য, বন্ধুত্বপূর্ণ প্রতিবেশী হয়ে ডেনমার্ক কীভাবে এ কাজ করলো। ডেনমার্কের পক্ষ থেকে অবশ্য এখনও পর্যন্ত এ বিষয়ে কোনও প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।

এসডব্লিউ/এমএন/কেএইচ/১৩২৩ 


State watch সকল পাঠকদের জন্য উন্মুক্ত সংবাদ মাধ্যম, যেটি পাঠকদের অর্থায়নে পরিচালিত হয়। যে কোন পরিমাণের সহযোগিতা, সেটি ছোট বা বড় হোক, আপনাদের প্রতিটি সহযোগিতা আমাদের নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে ভবিষ্যতে বড় অবদান রাখতে পারে। তাই State watch-কে সহযোগিতার অনুরোধ জানাচ্ছি। 

ছড়িয়ে দিনঃ
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

আপনার মতামত জানানঃ