একটি শিশু আগুনের তাপ অনুভব করে। পরে সে মনে করে, কীভাবে হাত সরিয়েছিল, কেন ভয় পেয়েছিল। তাপের অভিজ্ঞতা আর নিজের ভয়কে লক্ষ করা এক ধরনের অভিজ্ঞতা নয়। কিন্তু জন লকের মতে, আমাদের ধারণা গড়ে ওঠার জন্য দুটিই গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর রাজনৈতিক লেখাতেও পরিচিত একটি বিষয়কে নতুন করে দেখতে হয়: মানুষ যে সরকারের অধীনে জন্মেছে, সেই সরকারকে মানতে সে কি সম্মতি দিয়েছে?
ইংরেজ দার্শনিক জন লক (১৬৩২–১৭০৪) জ্ঞান ও রাজনীতির এই দুই প্রশ্নের উত্তর আলাদা গ্রন্থে দিয়েছেন। তবে দুই জায়গাতেই পাঠককে পরিচিত দাবির ভিত্তি পরীক্ষা করতে হয়। কোনো ধারণাকে সত্য বলার কারণ কী? কাউকে শাসন করার অধিকার দেওয়ার কারণই বা কী?
মনের ‘সাদা কাগজে’ কী লেখা হয়?
দেকার্ত কিছু ধারণাকে সহজাত বলে মনে করতেন। লক ‘অ্যান এসে কনসার্নিং হিউম্যান আন্ডারস্ট্যান্ডিং’-এ আপত্তি তোলেন: জন্ম থেকেই নির্দিষ্ট ধারণা বা নীতি মনে লেখা আছে, এমনটা ধরে নেওয়ার প্রয়োজন কী? যে বিশ্বাসের শুরু আমরা মনে করতে পারি না, সেটিও শৈশবে শেখা হতে পারে।
লকের ‘সাদা কাগজ’ রূপকটি ধারণার উৎস নিয়ে। মন জন্মের সময় নির্দিষ্ট ধারণা নিয়ে আসে না—এর অর্থ এই নয় যে তার শেখার বা বিচার করার কোনো ক্ষমতা নেই। ধারণার উপাদান আসে দুই পথে। বাইরের জগতের রং, শব্দ বা তাপ পাই ইন্দ্রিয়ের মাধ্যমে। আর মনে করা, চাওয়া, সন্দেহ করা বা তুলনা করার মতো নিজের মনের কাজগুলো লক্ষ করে পাই আরেক ধরনের ধারণা। লক দ্বিতীয় পথটির নাম দেন ‘প্রতিফলন’।
মন এই উপাদান নিয়ে কাজও করে। একটি সোনার পাহাড় কেউ না দেখেও তার ধারণা গড়তে পারে, কারণ সোনা আর পাহাড়ের ধারণা মিলিয়ে নেওয়া যায়। অভিজ্ঞতা থেকে ধারণা আসে বলার অর্থ তাই, প্রতিটি জটিল ধারণার অনুরূপ কোনো বস্তু আমাদের সামনে থাকতে হবে—এমন নয়।
কিন্তু ধারণা থাকা আর জানা এক কথা নয়। লকের সংজ্ঞায় জ্ঞান হলো ধারণাগুলোর মিল বা অমিল উপলব্ধি করা। যেখানে নিশ্চিত জ্ঞান পাওয়া যায় না, সেখানে যুক্তিসংগত বিশ্বাসের জায়গা আছে; প্রমাণ যতটা শক্ত, বিশ্বাসও ততটা দৃঢ় হওয়া উচিত। আজ কোনো খবরের বেলায় এর প্রয়োগ হতে পারে: একটি ছবি কোনো ঘটনা ঘটার প্রমাণ দিলেও কে দায়ী বা কেন ঘটেছে, তা নির্ধারণে আরও তথ্য লাগতে পারে।
আমি কি সেই মানুষ, যে কাজটি করেছিল?
লক মানুষ ও ব্যক্তিকে একই প্রশ্ন দিয়ে বিচার করেননি। একটি জীবিত মানবদেহ কীভাবে সময়ের সঙ্গে একই দেহ হিসেবে টিকে থাকে, সেটি এক প্রশ্ন। কোনো অতীত কাজকে আমি আমার নিজের কাজ হিসেবে চিনতে পারি কীভাবে, সেটি আরেক প্রশ্ন।
তাঁর বিখ্যাত উদাহরণে, এক রাজপুত্রের অতীত জীবনের চেতনা যদি এক মুচির দেহে জেগে ওঠে, সেখানে দেহটি মুচির হলেও লকের বিচারে ব্যক্তিটি রাজপুত্র। রূপকটির উদ্দেশ্য আত্মা স্থানান্তরের প্রমাণ দেওয়া নয়; ব্যক্তি-পরিচয়ে চেতনার ভূমিকা বোঝানো। এই পরিচয় গুরুত্বপূর্ণ, কারণ প্রশংসা, দোষ ও দায় আমরা ব্যক্তির ওপরই আরোপ করি।
কিন্তু এখানেই আপত্তি ওঠে। কেউ শৈশবের কোনো ঘটনা মনে করতে না পারলে কি তা তাঁর জীবনের অংশ থাকে না? আবার কোনো ঘটনার স্মৃতি বলে যা মনে হচ্ছে, তা ভুলও হতে পারে। অতীতের অভিজ্ঞতাকে নিজের বলে চিনতে পারা পরিচয়ের গুরুত্বপূর্ণ দিক হলেও তা দিয়ে পরিচয়ের সব প্রশ্ন মেটে কি না, লকের আলোচনা সেই বিতর্কের দরজা খুলে দেয়।
রাষ্ট্রের ক্ষমতা নাগরিকের কাছ থেকে আসে
‘সেকেন্ড ট্রিটিজ অব গভর্নমেন্ট’-এ লকের সূচনা এমন এক অবস্থা থেকে, যেখানে মানুষ স্বভাবত স্বাধীন ও সমান। এই স্বাধীনতার অর্থ যা খুশি করা নয়: প্রাকৃতিক বিধি অনুযায়ী অন্যের জীবন, স্বাধীনতা ও সম্পদের ক্ষতি করার অধিকার কারও নেই। রাজনৈতিক সমাজের বাইরে নিজের বিরোধে নিজেই বিচারক হওয়ার ঝুঁকি থাকে। সাধারণ আইন, নিরপেক্ষ বিচার ও তা কার্যকর করার ক্ষমতা পেতে মানুষ রাজনৈতিক সমাজ গড়ে তোলে।
এই যুক্তিতে সরকার অধিকার রক্ষার দায়িত্ব পায়; অধিকারগুলো সরকারের দান নয়। জনগণের দেওয়া ক্ষমতা আস্থার ভিত্তিতে ন্যস্ত। শাসকেরা সেই আস্থা ভেঙে স্বেচ্ছাচারী হলে জনগণের সরকার বদলানোর অধিকার আছে। সাধারণ নীতিগত মতভেদ আর সেই আস্থার ভাঙন এক নয়।
তবে ‘সম্মতি’ বলতে কী বোঝায়? লক প্রকাশ্য ও প্রচ্ছন্ন সম্মতির মধ্যে পার্থক্য করেন। দেশের ভূখণ্ড বা সুবিধা ভোগ থেকে তিনি কিছু বাধ্যবাধকতা অনুমান করেন; সেটিকে প্রকাশ্য সম্মতিতে রাজনৈতিক সমাজের পূর্ণ সদস্য হওয়ার সমতুল্য করেন না। প্রশ্ন থেকে যায়: দেশ ছাড়ার বাস্তব সুযোগ যার নেই, তার সেখানে থাকাকে কতটা স্বেচ্ছায় দেওয়া সম্মতি বলা যায়?
সম্পত্তি, সহনশীলতা ও স্বাধীনতার সীমানা
লক মনে করেন, প্রকৃতির কোনো সাধারণ সম্পদের সঙ্গে মানুষ নিজের শ্রম যুক্ত করলে তার ওপর ব্যক্তিগত দাবি তৈরি হতে পারে। গাছ থেকে ফল সংগ্রহ এর সহজ উদাহরণ। তবে তাঁর প্রাথমিক যুক্তিতে অপচয় না করা এবং অন্যদের জন্য যথেষ্ট ও সমমানের সম্পদ রেখে দেওয়ার শর্ত আছে। অর্থের প্রচলন কীভাবে অসম সঞ্চয়ের সুযোগ তৈরি করে, সেটিও তিনি আলোচনা করেন। এখান থেকে আজকের প্রশ্ন: যে জমিকে কেউ অব্যবহৃত বলছে, অন্য কোনো জনগোষ্ঠী কি আগে থেকেই অন্যভাবে তা ব্যবহার করছে?
ধর্মীয় সহনশীলতার পক্ষে লকের যুক্তি ছিল, রাষ্ট্র নাগরিক স্বার্থ রক্ষা করবে; বলপ্রয়োগ করে কারও মনে আন্তরিক বিশ্বাস তৈরি করতে পারবে না। কিন্তু তাঁর সহনশীলতা সর্বজনীন ছিল না। নাস্তিকদের তিনি এর বাইরে রাখেন। যে যুক্তি রাষ্ট্রের ক্ষমতার সীমা টানে, সেই যুক্তিই নিজের সময়ের অবিশ্বাস ও পক্ষপাত অতিক্রম করতে পারেনি।
ঔপনিবেশিক প্রশ্নেও এই অস্বস্তি আছে। লক ইংরেজ ঔপনিবেশিক প্রশাসনের কাজে যুক্ত ছিলেন। তাঁর গ্রন্থে দাসত্বের পক্ষে সীমিত একটি যুক্তিও আছে, যেটিকে তিনি ন্যায়সংগত যুদ্ধের ধারাবাহিকতা হিসেবে দেখান। সেই যুক্তি ও আটলান্টিক দাসপ্রথার সম্পর্ক নিয়ে গবেষকদের মতভেদ আছে। কিন্তু তাঁর স্বাধীনতার ভাষা পড়লে প্রশ্নটি এড়িয়ে যাওয়া যায় না: কার স্বাধীনতা বাস্তবে স্বীকৃতি পেয়েছিল, আর কার ক্ষেত্রে তা উপেক্ষা করা হয়েছিল?
লককে আজ পড়ার মূল্য তাঁর প্রতিটি উত্তর মেনে নেওয়ায় নয়। তাঁর প্রশ্নগুলো তাঁর নিজের বিরুদ্ধেও প্রয়োগ করা যায়। কোনো বিশ্বাসের পক্ষে যথেষ্ট প্রমাণ আছে কি? কোনো শাসনকে বৈধ বলার পক্ষে বাস্তব সম্মতি আছে কি? আর আমরা স্বাধীনতার কথা বলার সময় কাদের সেই স্বাধীনতার বাইরে রাখছি?
আপনার মতামত জানানঃ