বাংলাদেশের রাজনীতিতে শেখ হাসিনার উপস্থিতি এখন আর শুধু দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সমীকরণের বিষয় নয়; এটি ক্রমেই ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক ইস্যুতে পরিণত হয়েছে। ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর ভারতে অবস্থান করছেন বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। বাংলাদেশে তাঁর প্রত্যর্পণ নিয়ে রাজনৈতিক দাবি, কূটনৈতিক আলোচনা এবং আইনি জটিলতা চলমান। কিন্তু এর মধ্যেই নতুন করে আলোচনায় এসেছে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন—ভারত চাইলে কি শেখ হাসিনাকে সম্পূর্ণ নীরব রাখতে পারে না? নাকি তাঁকে নীরব রাখার ক্ষেত্রে ভারতেরই কোনো রাজনৈতিক বাধা রয়েছে?
আমেরিকার জর্জটাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের সিকিউরিটি স্টাডিজ প্রোগ্রামের অধ্যাপক ও দক্ষিণ এশিয়াবিষয়ক বিশ্লেষক সি ক্রিস্টিন ফেয়ারের মতে, শেখ হাসিনাকে নীরব রাখতে ভারতের অসুবিধার পেছনে আন্তর্জাতিক রাজনীতির চেয়ে দেশটির অভ্যন্তরীণ রাজনীতির ভূমিকা বেশি গুরুত্বপূর্ণ। সম্প্রতি ঢাকায় প্রথম আলোকে দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে তিনি এমন মন্তব্য করেছেন। তাঁর এই বক্তব্য দক্ষিণ এশিয়ার কূটনীতি, ভারতীয় রাজনীতি এবং বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে আলোচনা তৈরি করেছে।
ক্রিস্টিন ফেয়ারের বক্তব্যের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ দিক হলো, তিনি বিষয়টিকে কেবল একজন রাজনৈতিক নেতার আশ্রয় গ্রহণ কিংবা প্রত্যর্পণের প্রশ্ন হিসেবে দেখছেন না। বরং ভারতের রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতা, দেশটির অভ্যন্তরীণ স্বার্থ এবং শেখ হাসিনাকে ঘিরে ভারতীয় রাজনীতির সম্ভাব্য সমীকরণকে সামনে আনছেন। তাঁর বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ভারত অতীতে নিজ ভূখণ্ডে অবস্থানরত গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদের বক্তব্য ও রাজনৈতিক তৎপরতা নিয়ন্ত্রণের সক্ষমতা দেখিয়েছে। তাহলে শেখ হাসিনার ক্ষেত্রে সেই সক্ষমতা প্রয়োগ করা এত কঠিন কেন?
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে প্রথমেই বুঝতে হবে শেখ হাসিনার বর্তমান অবস্থান ভারতের জন্য কতটা সংবেদনশীল। দীর্ঘ সময় ধরে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকারের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক ছিল ঘনিষ্ঠ। নিরাপত্তা সহযোগিতা, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, আঞ্চলিক যোগাযোগ, বাণিজ্য এবং ভূরাজনৈতিক স্বার্থের বিভিন্ন ক্ষেত্রে দুই দেশের মধ্যে সহযোগিতা তৈরি হয়েছিল। ভারতের কাছে শেখ হাসিনার সরকার ছিল দক্ষিণ এশিয়ায় একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার। ফলে তাঁর ক্ষমতাচ্যুতি এবং পরবর্তী সময়ে ভারতে অবস্থান নেওয়া দিল্লির জন্য নিছক একটি আশ্রয়সংক্রান্ত ঘটনা নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে দীর্ঘদিনের কূটনৈতিক সম্পর্ক ও রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশ।
ক্রিস্টিন ফেয়ারের বক্তব্যে এই অতীত সম্পর্কের বিষয়টি বিশেষভাবে উঠে এসেছে। তাঁর মতে, শেখ হাসিনা ক্ষমতায় থাকাকালে ভারতের জন্য একজন মূল্যবান সম্পদ হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন। অর্থাৎ ভারতের নিরাপত্তা ও আঞ্চলিক কৌশলগত স্বার্থের ক্ষেত্রে তাঁর সরকারের ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ। এই প্রেক্ষাপটে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পরও তাঁকে ঘিরে ভারতের সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে একাধিক বিবেচনা কাজ করতে পারে।
তবে প্রশ্ন হচ্ছে, ভারতের মতো একটি শক্তিশালী রাষ্ট্র কি একজন সাবেক বিদেশি সরকারপ্রধানের রাজনৈতিক বক্তব্য নিয়ন্ত্রণ করতে অক্ষম? ক্রিস্টিন ফেয়ার এই ধারণার সঙ্গে একমত নন। তিনি উদাহরণ হিসেবে দালাই লামা এবং মিয়ানমারের অং সান সু চির প্রসঙ্গ এনেছেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, ভারত অতীতে এমন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদের আশ্রয় দিয়েছে, যাঁদের বক্তব্য বা রাজনৈতিক অবস্থান আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারত। প্রয়োজন হলে ভারত তাঁদের বক্তব্যের ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধতা তৈরি করতে পেরেছে।
বিশেষ করে তিব্বতের আধ্যাত্মিক নেতা দালাই লামার প্রসঙ্গটি তাৎপর্যপূর্ণ। চীনের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক বহু বছর ধরেই জটিল। তিব্বত প্রশ্ন দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কের অন্যতম সংবেদনশীল বিষয়। ভারতে অবস্থান করেও দালাই লামার রাজনৈতিক বক্তব্যের ক্ষেত্রে বিভিন্ন সময়ে সতর্কতা ও কৌশলগত বিবেচনা দেখা গেছে। ভারতের কাছে চীনের সঙ্গে সম্পর্কের গুরুত্ব বিবেচনায় তাঁর বক্তব্যের রাজনৈতিক প্রভাবও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
অং সান সু চির ক্ষেত্রেও ক্রিস্টিন ফেয়ার একই ধরনের তুলনা টেনেছেন। তাঁর বক্তব্যের মূল কথা হলো, ভারত চাইলে নিজ ভূখণ্ডে অবস্থানরত কোনো বিদেশি রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের প্রকাশ্য বক্তব্য ও তৎপরতার ওপর প্রভাব বিস্তারের সক্ষমতা রাখে। তাহলে শেখ হাসিনার ক্ষেত্রে সেই ব্যবস্থা কার্যকর করা যাচ্ছে না কেন? ফেয়ারের মতে, এর উত্তর খুঁজতে হবে ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বাস্তবতায়।
এই বক্তব্যের মধ্যে ভারতের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত রয়েছে। শেখ হাসিনাকে ঘিরে ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে কী ধরনের স্বার্থ কাজ করছে, সেটি স্পষ্টভাবে ব্যাখ্যা করেননি ক্রিস্টিন ফেয়ার। তবে তাঁর বিশ্লেষণ থেকে বোঝা যায়, বিষয়টি শুধু বাংলাদেশের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক রক্ষার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সমীকরণও এখানে বিবেচ্য হতে পারে।
ভারতের ক্ষমতাসীন বিজেপি সরকারের জন্য বাংলাদেশ একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবেশী রাষ্ট্র। দুই দেশের মধ্যে সীমান্ত, নিরাপত্তা, বাণিজ্য, যোগাযোগ, জ্বালানি এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার মতো বহু বিষয় রয়েছে। ফলে বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর দিল্লির সামনে নতুন বাস্তবতা তৈরি হয়েছে। একদিকে বাংলাদেশের নতুন রাজনৈতিক পরিস্থিতির সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক রাখার প্রয়োজন, অন্যদিকে দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অংশীদার শেখ হাসিনার অবস্থান ও ভবিষ্যৎ নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার চাপ।
এখানে ভারতের দ্বৈত কূটনৈতিক বাস্তবতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। বাংলাদেশে নতুন সরকারের সঙ্গে কার্যকর সম্পর্ক বজায় রাখা দিল্লির জন্য গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে শেখ হাসিনাকে আশ্রয় দেওয়ার সিদ্ধান্তও ভারতের সামনে রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক দায়িত্ব তৈরি করেছে। তাঁকে সম্পূর্ণ রাজনৈতিকভাবে নিষ্ক্রিয় রাখলে এক ধরনের বার্তা যাবে, আবার তাঁর প্রকাশ্য বক্তব্য অব্যাহত থাকলে বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে নতুন অস্বস্তি তৈরি হতে পারে। এই দুই অবস্থার মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করাই ভারতের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।
শেখ হাসিনার বক্তব্য বাংলাদেশের রাজনীতিতে কেন এত গুরুত্বপূর্ণ, সেটিও বিবেচনা করা প্রয়োজন। বাংলাদেশের ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তাঁর রাজনৈতিক পরিচয় এবং আওয়ামী লীগের ওপর তাঁর প্রভাব রয়েছে। দেশের বাইরে অবস্থান করেও তিনি যদি রাজনৈতিক বক্তব্য দেন, সংবাদ সম্মেলন করেন কিংবা বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে মন্তব্য করেন, তাহলে সেসব বক্তব্য দেশের রাজনৈতিক আলোচনায় প্রভাব ফেলতে পারে। তাঁর সমর্থকেরা সেগুলোকে রাজনৈতিক অবস্থান হিসেবে গ্রহণ করতে পারেন, আবার বিরোধীরা সেগুলোকে নতুন বিতর্কের বিষয় হিসেবে সামনে আনতে পারেন।
এমন পরিস্থিতিতে ভারত যদি তাঁকে রাজনৈতিক বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ অব্যাহত রাখে, তাহলে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে ভারতের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে। বিশেষ করে বাংলাদেশের জনগণের একটি বড় অংশ যদি মনে করে, ভারত বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিবর্তনের বাস্তবতাকে যথাযথভাবে সম্মান করছে না, তাহলে দুই দেশের সম্পর্কের ওপর তার নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
অন্যদিকে শেখ হাসিনাকে নীরব রাখার বিষয়টি ভারতের জন্যও সহজ সিদ্ধান্ত নয়। দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সম্পর্ক, ব্যক্তিগত নিরাপত্তা, মানবিক বিবেচনা এবং আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক অবস্থানের মতো বিষয় রয়েছে। কোনো বিদেশি রাজনৈতিক নেতাকে আশ্রয় দেওয়ার পর তাঁর বক্তব্যের ওপর কী ধরনের বিধিনিষেধ আরোপ করা হবে, সেটিও একটি জটিল প্রশ্ন। বিশেষ করে রাজনৈতিক আশ্রয় এবং প্রত্যর্পণের মতো বিষয় যখন আলোচনায় থাকে, তখন সিদ্ধান্তের প্রতিটি পদক্ষেপ আন্তর্জাতিকভাবে পর্যবেক্ষণের আওতায় আসে।
ক্রিস্টিন ফেয়ার সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ প্রসঙ্গেও গুরুত্বপূর্ণ মন্তব্য করেছেন। তাঁর মতে, ভারত সম্ভবত তাঁকে বাংলাদেশের কাছে হস্তান্তর করতে আগ্রহী নয়। কারণ, শেখ হাসিনা বাংলাদেশের মাটিতে ফিরে গিয়ে কারাবন্দী অবস্থায় মারা গেলে বা মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হলে বাংলাদেশের রাজনীতিতে নতুন সংকট তৈরি হতে পারে। তাঁর ধারণা, এমন পরিস্থিতিতে শেখ হাসিনা অনেকের কাছে শহীদ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হতে পারেন। এর ফলে বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় নতুন মেরুকরণ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এটি অবশ্য ক্রিস্টিন ফেয়ারের নিজস্ব রাজনৈতিক মূল্যায়ন। বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থা, সম্ভাব্য বিচারিক প্রক্রিয়া এবং শেখ হাসিনার ভবিষ্যৎ নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নির্ভর করবে আইন ও রাষ্ট্রীয় প্রক্রিয়ার ওপর। তবে তাঁর বিশ্লেষণের গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, শেখ হাসিনার প্রত্যাবর্তন শুধু একটি প্রত্যর্পণ বা আইনি প্রক্রিয়ার বিষয় নয়; এর সঙ্গে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার প্রশ্নও জড়িয়ে রয়েছে।
ফেয়ার আরও বলেছেন, রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের ক্ষেত্রে প্রত্যর্পণ চুক্তি প্রয়োগের প্রশ্নটি জটিল হতে পারে এবং আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হয়। অর্থাৎ দুই দেশের মধ্যে প্রত্যর্পণ চুক্তি থাকলেই কোনো ব্যক্তিকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে হস্তান্তর করা যায় না। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বিরুদ্ধে অভিযোগের প্রকৃতি, মামলার ধরন, চুক্তির শর্ত এবং আইনি ব্যতিক্রমের বিষয়গুলো বিবেচনায় নিতে হয়।
বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে প্রত্যর্পণ চুক্তি রয়েছে। ফলে শেখ হাসিনাকে ফেরত পাঠানোর প্রশ্নে চুক্তির শর্ত, আইনি বাধ্যবাধকতা এবং সংশ্লিষ্ট ব্যতিক্রমগুলো গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। তবে শুধু রাজনৈতিক বক্তব্যের ভিত্তিতে বলা যাবে না যে ভারত তাঁকে ফেরত দেবে না কিংবা চুক্তির কোনো নির্দিষ্ট ধারা তাঁর ক্ষেত্রে নিশ্চিতভাবে প্রযোজ্য হবে না। এ বিষয়ে চূড়ান্ত অবস্থান নির্ভর করবে আইনি ব্যাখ্যা ও দুই দেশের সিদ্ধান্তের ওপর।
এখানে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ভারত শেখ হাসিনাকে কত দিন এবং কী ধরনের রাজনৈতিক পরিসরে থাকতে দেবে। তাঁর অবস্থান যদি দীর্ঘায়িত হয়, তাহলে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের ওপর চাপও দীর্ঘায়িত হতে পারে। বাংলাদেশের নতুন রাজনৈতিক নেতৃত্বের কাছে শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ একটি গুরুত্বপূর্ণ দাবি হয়ে থাকলে দিল্লির জন্য বিষয়টি আরও সংবেদনশীল হবে।
বাংলাদেশের দৃষ্টিকোণ থেকে বিষয়টি শুধু শেখ হাসিনাকে ফেরত পাওয়ার প্রশ্ন নয়। বরং ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে সমমর্যাদা, পারস্পরিক শ্রদ্ধা এবং রাজনৈতিক বাস্তবতার স্বীকৃতিও গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে কোন ব্যক্তি বা দল ক্ষমতায় থাকবে, সেটি বাংলাদেশের জনগণের রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের বিষয়। ভারত যদি এই বাস্তবতাকে গুরুত্ব দেয়, তাহলে দুই দেশের সম্পর্ক নতুন ভিত্তিতে এগিয়ে নেওয়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
তবে ভারতের নিজস্ব স্বার্থও উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতিতে বাংলাদেশ ভারতের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। উত্তর-পূর্বাঞ্চলের নিরাপত্তা, বঙ্গোপসাগরে কৌশলগত অবস্থান, আঞ্চলিক যোগাযোগ এবং অর্থনৈতিক সহযোগিতার কারণে বাংলাদেশের সঙ্গে সুসম্পর্ক দিল্লির দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থের অংশ। ফলে শেখ হাসিনাকে ঘিরে কোনো সিদ্ধান্ত নিতে গিয়ে ভারতকে শুধু অতীতের সম্পর্ক নয়, ভবিষ্যতের কূটনৈতিক বাস্তবতাও বিবেচনায় নিতে হবে।
ক্রিস্টিন ফেয়ারের সাক্ষাৎকারের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, তিনি দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিকে আবেগের পরিবর্তে বাস্তব পরিস্থিতির ভিত্তিতে বিশ্লেষণ করার ওপর জোর দিয়েছেন। আফগানিস্তান-পাকিস্তান সীমান্ত বিরোধ থেকে শুরু করে পাকিস্তানের সেনাবাহিনীর ক্ষমতা, বেলুচিস্তানের সংঘাত এবং ইমরান খানের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ—বিভিন্ন বিষয়ে তাঁর বক্তব্যে রাষ্ট্রীয় স্বার্থ, নিরাপত্তা এবং ক্ষমতার বাস্তব সমীকরণ গুরুত্ব পেয়েছে। শেখ হাসিনার প্রসঙ্গেও তিনি একই ধরনের বাস্তববাদী দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরেছেন।
তাঁর বিশ্লেষণের সবচেয়ে আলোচিত বক্তব্যটি হলো, আন্তর্জাতিক রাজনীতির চেয়ে ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিই শেখ হাসিনাকে নীরব রাখতে না পারার প্রশ্নের উত্তর দিতে পারে। এই বক্তব্যের তাৎপর্য এখানেই যে, এটি দিল্লির সিদ্ধান্ত গ্রহণের পেছনে সম্ভাব্য অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। তবে কোন রাজনৈতিক শক্তি বা স্বার্থ এই অবস্থানের পেছনে কাজ করছে, সে বিষয়ে তাঁর সাক্ষাৎকারে নির্দিষ্ট প্রমাণ বা বিস্তারিত ব্যাখ্যা নেই। তাই এটিকে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিশ্লেষণ হিসেবে দেখা উচিত, চূড়ান্তভাবে প্রতিষ্ঠিত তথ্য হিসেবে নয়।
সব মিলিয়ে শেখ হাসিনাকে ঘিরে ভারতের অবস্থান এখন একটি জটিল কূটনৈতিক পরীক্ষায় পরিণত হয়েছে। তাঁকে আশ্রয় দেওয়া, তাঁর রাজনৈতিক বক্তব্যের পরিসর নির্ধারণ করা এবং বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্কের ভারসাম্য বজায় রাখা—প্রতিটি ক্ষেত্রেই দিল্লিকে সতর্ক সিদ্ধান্ত নিতে হচ্ছে। একদিকে অতীতের রাজনৈতিক সম্পর্ক, অন্যদিকে বর্তমান বাংলাদেশের বাস্তবতা; এই দুইয়ের মধ্যে ভারত কোনটিকে কতটা গুরুত্ব দেবে, সেটিই ভবিষ্যৎ সম্পর্কের গতিপথ নির্ধারণে ভূমিকা রাখবে।
শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি শুধু শেখ হাসিনাকে নীরব রাখা সম্ভব কি না, তা নয়। বরং ভারত কেন তাঁকে ঘিরে একটি সুস্পষ্ট ও স্থিতিশীল নীতি গ্রহণ করতে পারছে না, সেটিই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। যদি সত্যিই ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি এই সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করে, তাহলে সেটি বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রেও নতুন অনিশ্চয়তা তৈরি করতে পারে। ক্রিস্টিন ফেয়ারের বক্তব্য সেই অনিশ্চয়তার দিকেই ইঙ্গিত করছে।
বাংলাদেশের জন্য এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, আবেগ বা রাজনৈতিক অবস্থানের বাইরে গিয়ে জাতীয় স্বার্থের ভিত্তিতে ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক পরিচালনা করা। আর ভারতের জন্যও বাস্তবতা হলো, বাংলাদেশের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্ক কোনো একজন সাবেক রাজনৈতিক নেতাকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হতে পারে না। দুই দেশের সম্পর্কের ভিত্তি হওয়া উচিত পারস্পরিক সম্মান, আস্থা এবং জনগণের স্বার্থ। শেখ হাসিনাকে ঘিরে দিল্লির পরবর্তী পদক্ষেপ সেই নীতিরই একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা হয়ে থাকবে।
আপনার মতামত জানানঃ