বাংলাদেশে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভূমিকা নিয়ে বিতর্ক নতুন নয়। অপরাধ দমন, সন্ত্রাস নিয়ন্ত্রণ এবং জননিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব যেসব প্রতিষ্ঠানের ওপর, তাদের কর্মকাণ্ড ঘিরেই যখন মানুষের জীবন, অধিকার ও আইনের শাসন নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়, তখন সেই বিতর্ক আর কেবল কোনো নির্দিষ্ট ঘটনার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। বরং তা রাষ্ট্রের বিচারব্যবস্থা, প্রশাসনিক জবাবদিহি এবং নাগরিকের নিরাপত্তার মতো মৌলিক বিষয়গুলোর সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়ে। সাম্প্রতিক সময়ে পুলিশের মহাপরিদর্শক বা আইজিপির ‘ক্রসফায়ার’ নিয়ে বক্তব্য এবং এর পরপরই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযান ঘিরে দুটি মৃত্যুর ঘটনা নতুন করে সেই প্রশ্ন সামনে নিয়ে এসেছে।
গত ২৭ অক্টোবর রাজধানীর যাত্রাবাড়ীর ধলপুরে একটি মাদকবিরোধী অভিযানকে কেন্দ্র করে গুলিতে প্রাণ হারান কারখানাশ্রমিক মারুফ ওরফে দুখু মিয়া। এসআরবি (অধুনালুপ্ত র্যাব) সদস্যদের অভিযানের সময় এ ঘটনা ঘটে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের দাবি, অভিযানের একপর্যায়ে তাঁদের ওপর হামলা হলে আত্মরক্ষার্থে তাঁরা আকাশের দিকে ফাঁকা গুলি ছোড়েন। কিন্তু সেই সময় গোলাগুলির মধ্যে দুখু মিয়ার মৃত্যু হয়। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, প্রাণঘাতী গুলিটি ঠিক কার অস্ত্র থেকে বের হয়েছিল, তা এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
এর মাত্র দুই দিন পর, ২৯ অক্টোবর ভোর চারটার দিকে বরিশালের হিজলায় গুলিতে নিহত হন জেলে আকতার হোসেন হাওলাদার। এ ঘটনায় প্রত্যক্ষদর্শীদের অভিযোগ নৌ পুলিশের বিরুদ্ধে। তবে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা সেখানে নিজেদের কোনো অভিযান পরিচালনার কথা অস্বীকার করেছেন। ফলে এই মৃত্যুর প্রকৃত কারণ এবং দায় কার, তা নিয়েও তৈরি হয়েছে অনিশ্চয়তা।
দুটি ঘটনা ভিন্ন জায়গায়, ভিন্ন পরিস্থিতিতে ঘটলেও একটি জায়গায় তাদের মিল রয়েছে। উভয় ক্ষেত্রেই গুলিতে মানুষের মৃত্যু হয়েছে, অথচ মৃত্যুর দায় নিয়ে এখনো স্পষ্ট কোনো উত্তর পাওয়া যায়নি। রাষ্ট্রের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব যাদের হাতে, তাদের অভিযান ঘিরে এমন মৃত্যুর ঘটনা স্বাভাবিকভাবেই জনমনে উদ্বেগ তৈরি করে। বিশেষ করে যখন ঘটনাগুলো ঘটে পুলিশের সর্বোচ্চ পর্যায়ের একজন কর্মকর্তার বিতর্কিত বক্তব্যের পর।
আইজিপি মো. আলী হোসেন ফকিরের বক্তব্য ছিল, সরকার অনুমতি দিলে প্রয়োজনে ‘ক্রসফায়ার’ করা হবে। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও মানবাধিকার পরিস্থিতিতে ‘ক্রসফায়ার’ শব্দটি অত্যন্ত সংবেদনশীল। দীর্ঘদিন ধরে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের অভিযোগ, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ক্ষমতার অপব্যবহার এবং রাষ্ট্রীয় জবাবদিহির প্রশ্নের সঙ্গে শব্দটি জড়িয়ে আছে। ফলে পুলিশের শীর্ষ কর্মকর্তার মুখে এমন বক্তব্য আসার পর তা নিয়ে ব্যাপক আলোচনা ও সমালোচনা তৈরি হওয়াই স্বাভাবিক।
সমালোচনার মুখে পুলিশ সদর দপ্তরের পক্ষ থেকে বক্তব্যটির ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে। পুলিশ কর্মকর্তাদের সংগঠন বাংলাদেশ পুলিশ সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশনও আইজিপির বক্তব্যের প্রতি সমর্থন জানিয়েছে। তাদের দাবি, অপরাধ দমনে কঠোর অবস্থান এবং আত্মরক্ষার প্রয়োজনীয়তা বোঝাতেই তিনি এমন শব্দ ব্যবহার করেছেন। সংগঠনটি তাঁর বক্তব্যকে ‘সময়োপযোগী আহ্বান’ বলেও উল্লেখ করেছে।
কিন্তু এখানেই একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তৈরি হয়। অপরাধ দমনে কঠোর অবস্থান নেওয়া এবং বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডকে বৈধতা দেওয়ার মধ্যে মৌলিক পার্থক্য রয়েছে। পুলিশকে অপরাধীর বিরুদ্ধে কঠোর হতে হবে, এতে কোনো দ্বিমত নেই। কিন্তু সেই কঠোরতা অবশ্যই আইনের সীমার মধ্যে থাকতে হবে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের আত্মরক্ষার অধিকার রয়েছে, কিন্তু সেই অধিকার কোনোভাবেই বিচারিক প্রক্রিয়ার বিকল্প হতে পারে না।
একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে অপরাধের অভিযোগে কাউকে আটক করা, তার বিরুদ্ধে তদন্ত পরিচালনা করা, সাক্ষ্যপ্রমাণ সংগ্রহ করা এবং আদালতে বিচার নিশ্চিত করাই আইনের স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। অপরাধী যত ভয়ংকরই হোক, তার অপরাধের বিচার করার দায়িত্ব আদালতের। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দায়িত্ব অপরাধীকে আইনের আওতায় নিয়ে আসা, শাস্তি কার্যকর করা নয়। এই সীমারেখা অস্পষ্ট হয়ে গেলে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অপব্যবহারের আশঙ্কা বাড়ে।
আইজিপির বক্তব্যের পর পুলিশ সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশনের সমর্থন বিষয়টিকে আরও গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে। কারণ একটি বাহিনীর সদস্যরা তাঁদের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের বক্তব্য থেকে অনেক সময় বুঝতে চেষ্টা করেন, কোন ধরনের আচরণ প্রতিষ্ঠানের কাছে গ্রহণযোগ্য এবং কোন কাজের জন্য তাঁদের জবাবদিহি করতে হবে। শীর্ষ পর্যায় থেকে কোনো বিতর্কিত বক্তব্য এলে এবং পরে সেটিকে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে সমর্থন করা হলে মাঠপর্যায়ের সদস্যদের কাছে তার একটি বিশেষ বার্তা পৌঁছাতে পারে।
প্রশ্ন হলো, এই বার্তা কি আইন মেনে দায়িত্ব পালনের, নাকি অপরাধ দমনের নামে আরও কঠোর হওয়ার? পুলিশ কর্মকর্তাদের সংগঠন চাইলে আত্মরক্ষার অধিকার এবং অপরাধ দমনের প্রয়োজনীয়তার পাশাপাশি বলপ্রয়োগের আইনি সীমা, মানবাধিকার এবং জবাবদিহির বিষয়গুলো সামনে আনতে পারত। কিন্তু বক্তব্যটির পক্ষে অবস্থান নেওয়ার ফলে জনমনে উদ্বেগ আরও বেড়েছে।
এখানে ধলপুর ও হিজলার দুটি মৃত্যুর ঘটনাকে সরাসরি ‘ক্রসফায়ার’ হিসেবে চিহ্নিত করা ঠিক হবে না। তদন্ত শেষ হওয়ার আগে কোনো ঘটনার প্রকৃত চরিত্র নির্ধারণ করা দায়িত্বশীল আচরণ নয়। একইভাবে, এসব ঘটনার সঙ্গে আইজিপির বক্তব্যের সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে, এমন দাবিও প্রমাণ ছাড়া করা যায় না। তবে সময়ের প্রেক্ষাপটকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। যখন পুলিশের প্রধান প্রকাশ্যে ‘ক্রসফায়ার’-এর সম্ভাবনার কথা বলেন, তারপর অভিযান ঘিরে মানুষের মৃত্যু ঘটে এবং সেই মৃত্যুর দায় নিয়ে অস্পষ্টতা তৈরি হয়, তখন জনমনে প্রশ্ন ওঠা খুবই স্বাভাবিক।
বিষয়টি আরও জটিল হয়ে উঠেছে সরকারের বক্তব্যের কারণে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ সম্প্রতি বলেছেন, বর্তমান সরকারের সময়ে এখন পর্যন্ত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দ্বারা কোনো বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, গুম কিংবা হেফাজতে মৃত্যুর ঘটনা ঘটেনি। সরকারের পক্ষ থেকে এমন বক্তব্য দেওয়ার উদ্দেশ্য হতে পারে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভাবমূর্তি রক্ষা করা। কিন্তু মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ থাকলে কেবল অস্বীকারের মাধ্যমে সেই উদ্বেগ দূর করা সম্ভব নয়।
মানবাধিকার সংগঠন অধিকার এবং হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির (এইচআরএসএস) তথ্য অনুযায়ী, বিএনপি সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হেফাজতে সাতজনের মৃত্যুর অভিযোগ উঠেছে। অবশ্য হেফাজতে কোনো ব্যক্তির মৃত্যুর প্রকৃত কারণ, সেখানে নির্যাতন বা অবহেলা ছিল কি না, কিংবা সংশ্লিষ্ট বাহিনীর সদস্যদের দায় রয়েছে কি না, তা নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমেই নির্ধারণ করতে হবে। কিন্তু অভিযোগ ওঠার পর তদন্তের আগেই সবকিছু অস্বীকার করা হলে প্রকৃত সত্য উদ্ঘাটনের পথ বাধাগ্রস্ত হতে পারে।
হেফাজতে মৃত্যুর ক্ষেত্রে একটি বড় সমস্যা হলো ভুক্তভোগী নিজে আর নিজের বক্তব্য তুলে ধরতে পারেন না। তাঁর পরিবারের সদস্যদের অভিযোগ, প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য, চিকিৎসা প্রতিবেদন, ময়নাতদন্ত এবং অন্যান্য প্রমাণের ভিত্তিতে ঘটনার প্রকৃত চিত্র বের করতে হয়। অনেক সময় ক্ষমতাবান প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে মামলা করা বা আইনি পদক্ষেপ নেওয়া ভুক্তভোগীর পরিবারের জন্য কঠিন হয়ে পড়ে। ভয়, সামাজিক চাপ এবং আর্থিক সীমাবদ্ধতাও তাদের পিছিয়ে দিতে পারে। ফলে মামলা না হওয়া বা অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়াকে কোনো ঘটনা ঘটেনি বলে ধরে নেওয়া যায় না।
গুমের অভিযোগের ক্ষেত্রেও একই ধরনের সতর্কতা প্রয়োজন। খুলনার মোংলার মিরাজ শেখকে গত ১০ এপ্রিল কোস্টগার্ডের পরিচয়ে তুলে নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস ওয়াচ ঘটনাটিকে গণ-অভ্যুত্থানের পর প্রথম গুমের অভিযোগ হিসেবে বর্ণনা করেছে। এই অভিযোগের সত্যতা এখনো চূড়ান্তভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়নি। কিন্তু একজন মানুষ নিখোঁজ হয়েছেন এবং তাঁর পরিবারের পক্ষ থেকে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ তোলা হয়েছে—এটুকুই বিষয়টিকে গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করার জন্য যথেষ্ট।
সরকারের দায়িত্ব হলো অভিযোগের সত্যতা যাচাই করা, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির অবস্থান নিশ্চিত করা এবং দায়ী কেউ থাকলে তাঁর বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া। অভিযোগকে প্রমাণ ছাড়াই সত্য ধরে নেওয়া যেমন ঠিক নয়, তেমনি তদন্ত শেষ হওয়ার আগেই সেটিকে ভিত্তিহীন বলে উড়িয়ে দেওয়াও দায়িত্বশীলতার পরিচয় নয়। রাষ্ট্রের উচিত সত্য অনুসন্ধান করা, কোনো প্রতিষ্ঠানের ভাবমূর্তি রক্ষার জন্য সত্যকে আড়াল করা নয়।
বাংলাদেশের অতীত অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিরুদ্ধে বিচারবহির্ভূত হত্যা, গুম কিংবা নির্যাতনের অভিযোগ নতুন কিছু নয়। বিশেষ করে বিগত বছরগুলোতে ‘ক্রসফায়ার’ শব্দটি বহু বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। অনেক ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষ থেকে আত্মরক্ষার কথা বলা হলেও মানবাধিকার সংগঠন, ভুক্তভোগীর পরিবার এবং বিভিন্ন পর্যবেক্ষকের পক্ষ থেকে ভিন্ন অভিযোগ উঠে এসেছে। এসব অভিজ্ঞতা নাগরিকদের মনে একটি গভীর অবিশ্বাস তৈরি করেছে। সেই অবিশ্বাস দূর করতে হলে শুধু আশ্বাস বা বক্তব্য যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন দৃশ্যমান জবাবদিহি।
রাষ্ট্রের হাতে আইন প্রয়োগের ক্ষমতা রয়েছে। প্রয়োজনে পুলিশ অস্ত্র ব্যবহার করতে পারে, তবে তা হতে হবে আইনসম্মত, প্রয়োজনীয় এবং পরিস্থিতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। জীবন রক্ষার জন্য তাৎক্ষণিক হুমকি থাকলে আত্মরক্ষার ব্যবস্থা নেওয়া এক বিষয়, আর কাউকে শাস্তি দেওয়ার উদ্দেশ্যে প্রাণঘাতী বলপ্রয়োগ করা সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়। এই পার্থক্যটি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রতিটি সদস্যের কাছে পরিষ্কার থাকা জরুরি।
একই সঙ্গে প্রতিটি প্রাণঘাতী গুলির ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া প্রয়োজন। কোন অস্ত্র থেকে গুলি ছোড়া হয়েছে, কারা সেখানে উপস্থিত ছিলেন, অভিযানের নির্দেশনা কী ছিল, কী পরিস্থিতিতে বলপ্রয়োগ করা হয়েছিল এবং মৃত্যুর জন্য কার দায় রয়েছে—এসব প্রশ্নের উত্তর তদন্তের মাধ্যমে বের করতে হবে। তদন্ত যেন সংশ্লিষ্ট বাহিনীর নিজস্ব বক্তব্যের ওপর নির্ভরশীল না হয়, সেটিও নিশ্চিত করা জরুরি। প্রয়োজন হলে স্বাধীন তদন্ত সংস্থা বা বিচারিক তদন্তের ব্যবস্থা করা যেতে পারে।
ধলপুরে মারুফ ওরফে দুখু মিয়া এবং হিজলায় আকতার হোসেন হাওলাদারের মৃত্যু তাই কেবল দুটি পৃথক মৃত্যুর ঘটনা নয়। এগুলো রাষ্ট্রের আইন প্রয়োগের পদ্ধতি এবং নাগরিকের জীবনের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে ভাবার সুযোগ তৈরি করেছে। নিহত ব্যক্তিরা অপরাধী ছিলেন কি না, তাঁরা কোনো অভিযানের অংশ ছিলেন কি না কিংবা তাঁদের মৃত্যুর পেছনে কী পরিস্থিতি কাজ করেছে—এসব প্রশ্নের উত্তর প্রমাণের ভিত্তিতে নির্ধারিত হওয়া উচিত। কিন্তু তাঁদের জীবনের মূল্য যে কোনো পরিস্থিতিতেই রাষ্ট্রের কাছে গুরুত্বপূর্ণ, সেটি নিশ্চিত করা সরকারের দায়িত্ব।
মানুষ পুলিশের কাছে নিরাপত্তা চায়। তারা চায় মাদক ব্যবসা বন্ধ হোক, সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড নিয়ন্ত্রণে আসুক, অপরাধীরা গ্রেপ্তার হোক এবং সাধারণ মানুষ নির্ভয়ে চলাফেরা করতে পারুক। কিন্তু অপরাধ দমনের নামে বিচারবহির্ভূত পদ্ধতি ফিরে আসুক, এমন প্রত্যাশা মানুষের নয়। অপরাধের বিরুদ্ধে কঠোরতা এবং মানবাধিকারের প্রতি শ্রদ্ধা—দুটি বিষয় একে অপরের বিপরীত নয়। বরং একটি কার্যকর ও আধুনিক আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থার জন্য দুটিই অপরিহার্য।
বর্তমান সরকারের সামনে তাই একটি বড় পরীক্ষা রয়েছে। তারা কি অতীতের বিতর্কিত পুলিশি সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে এসে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে পারবে, নাকি কঠোরতার নামে পুরোনো পদ্ধতির পুনরাবৃত্তি ঘটবে? এই প্রশ্নের উত্তর সরকারের বক্তব্যে নয়, পাওয়া যাবে তাদের বাস্তব পদক্ষেপে। ধলপুর ও হিজলার মৃত্যুর নিরপেক্ষ তদন্ত, গুমের অভিযোগগুলোর সুষ্ঠু অনুসন্ধান, হেফাজতে মৃত্যুর প্রতিটি ঘটনার জবাবদিহি এবং অপরাধে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়ার মধ্য দিয়েই সরকার তার অবস্থান প্রমাণ করতে পারে।
আইনের শাসনের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো, এখানে কেউ আইনের ঊর্ধ্বে নয়। একজন সাধারণ নাগরিক যেমন অপরাধ করলে বিচারের মুখোমুখি হবেন, তেমনি রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা ব্যবহারকারী কোনো সদস্যও আইন ভঙ্গ করলে তাঁকে জবাবদিহি করতে হবে। এই নীতি প্রতিষ্ঠিত না হলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রতি মানুষের আস্থা ফিরে আসবে না।
‘ক্রসফায়ার’ কোনো অপরাধ দমনের বিকল্প হতে পারে না। একটি রাষ্ট্রের শক্তি কতজন অপরাধীকে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে, তা দিয়ে পরিমাপ করা যায় না। বরং অপরাধীকে জীবিত গ্রেপ্তার করে আদালতে সোপর্দ করা, নিরপেক্ষ বিচার নিশ্চিত করা এবং নিরপরাধ মানুষের জীবন রক্ষা করার সক্ষমতাই একটি রাষ্ট্রের প্রকৃত শক্তির পরিচয়। পুলিশের কঠোরতা প্রয়োজন, কিন্তু সেই কঠোরতার সীমা নির্ধারণ করবে আইন।
আইজিপির বক্তব্যের পর দুটি মৃত্যুর ঘটনা তাই সরকার ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নেতৃত্বের সামনে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন রেখে গেছে—তারা কি নাগরিকের নিরাপত্তা ও আইনের শাসনকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেবে, নাকি অপরাধ দমনের নামে সীমাহীন ক্ষমতার ধারণাকে প্রশ্রয় দেবে? এই প্রশ্নের উত্তর শুধু সরকারের জন্য নয়, দেশের প্রতিটি নাগরিকের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। কারণ রাষ্ট্রের হাতে অস্ত্র থাকতে পারে, ক্ষমতা থাকতে পারে, কিন্তু সেই ক্ষমতার চূড়ান্ত উদ্দেশ্য হওয়া উচিত মানুষের জীবন রক্ষা করা; মানুষের জীবন কেড়ে নেওয়া নয়।
আপনার মতামত জানানঃ