বাংলাদেশের একজন শিক্ষার্থী যখন প্রথমবার পাঠ্যবইয়ে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস পড়ে, তখন তার সামনে ১৯৭১ সালের একটি নির্দিষ্ট ছবি তৈরি হয়। সেই ছবিতে থাকে পাকিস্তানি শাসকদের বৈষম্য, বাঙালির দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রাম, ৭ মার্চের ভাষণ, ২৫ মার্চের গণহত্যা, স্বাধীনতার ঘোষণা, সশস্ত্র প্রতিরোধ এবং ১৬ ডিসেম্বরের বিজয়। কিন্তু শিক্ষার্থীটি যদি কয়েক বছর পর অন্য একটি সংস্করণের পাঠ্যবই খুলে দেখে, তাহলে তার সামনে আগের ছবিটির কিছু অংশ বদলে যেতে পারে। কোনো নেতার নাম গুরুত্ব হারাতে পারে, কোনো ঐতিহাসিক ভাষণ পাঠ্যবই থেকে বাদ পড়তে পারে, আবার এমন কোনো ব্যক্তির অবদান সামনে আসতে পারে, যাঁর ভূমিকা আগের সংস্করণে তুলনামূলক কম আলোচিত হয়েছিল।
তখন একটি স্বাভাবিক প্রশ্ন জন্ম নেয়—ইতিহাস কি সত্যিই বদলে গেছে, নাকি ইতিহাসকে উপস্থাপনের পদ্ধতি বদলে গেছে?
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস নিয়ে এই প্রশ্ন নতুন নয়। স্বাধীনতার পর থেকে বিভিন্ন রাজনৈতিক পর্যায়ে ইতিহাসের ব্যাখ্যা, রাষ্ট্রীয় স্মৃতিচর্চা এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ব্যবহৃত পাঠ্যবইয়ের মধ্যে পরিবর্তন দেখা গেছে। বিশেষ করে ১৯৯৬, ২০০১, ২০০৯ এবং ২০২৪-পরবর্তী সময়ে পাঠ্যবইয়ে মুক্তিযুদ্ধের বয়ান কীভাবে পরিবর্তিত হয়েছে, তা নিয়ে সংবাদমাধ্যম ও গবেষকদের মধ্যে আলোচনা হয়েছে। ২০১৭ সালে দ্য ডেইলি স্টার-এর একটি বিশদ প্রতিবেদনে বিভিন্ন সময়ে প্রকাশিত পাঠ্যবইয়ের তুলনা করে দেখানো হয়েছিল, রাজনৈতিক পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে ১৯৭১ সালের ইতিহাসের উপস্থাপনাও কীভাবে বদলেছে।
এই পরিবর্তনের কেন্দ্রে রয়েছে একটি বড় প্রশ্ন: বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের নেতৃত্ব, স্বাধীনতার ঘোষণা এবং মুক্তিযুদ্ধের রাজনৈতিক উত্তরাধিকার কীভাবে ব্যাখ্যা করা হবে? এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে শেখ মুজিবুর রহমান, জিয়াউর রহমান, আওয়ামী লীগ, বিএনপি এবং স্বাধীনতার পর রাষ্ট্র পরিচালনার ইতিহাস। ফলে পাঠ্যবইয়ের কোনো পরিবর্তনকে শুধু সম্পাদনার বিষয় হিসেবে দেখলে পুরো ঘটনাটি বোঝা যায় না। অনেক ক্ষেত্রে এর সঙ্গে যুক্ত থাকে রাজনৈতিক পরিচয়, জাতীয় স্মৃতি এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে রাষ্ট্রের অতীতকে তুলে ধরার প্রশ্ন।
১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ কোনো একক ব্যক্তির বিচ্ছিন্ন কর্মকাণ্ডে সংঘটিত হয়নি। এর পেছনে ছিল দীর্ঘ রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক আন্দোলন, ভাষার অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম, অর্থনৈতিক বৈষম্যের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ, ১৯৭০ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের বিজয়, ক্ষমতা হস্তান্তর নিয়ে সংকট, পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর অভিযান এবং বাঙালির সশস্ত্র প্রতিরোধ। এই প্রেক্ষাপটে শেখ মুজিবুর রহমানের রাজনৈতিক নেতৃত্ব, ৭ মার্চের ভাষণ, স্বাধীনতার ঘোষণার প্রশ্ন, জিয়াউর রহমানের বেতার ঘোষণাপাঠ এবং মুক্তিযুদ্ধের সামরিক সংগঠনে বিভিন্ন ব্যক্তির ভূমিকা—সবই ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কিন্তু এই ঘটনাগুলোর কোনটিকে কতটা গুরুত্ব দেওয়া হবে, কোন ভাষায় ব্যাখ্যা করা হবে এবং কোন ব্যক্তির নাম প্রথমে আসবে, তা নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক দীর্ঘদিন ধরে চলেছে।
সমস্যা শুরু হয় যখন ঐতিহাসিক গুরুত্ব নির্ধারণের মানদণ্ড হিসেবে প্রমাণের বদলে রাজনৈতিক পরিচয় কাজ করতে থাকে।
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট শেখ মুজিবুর রহমান হত্যাকাণ্ডের পর বাংলাদেশের রাজনীতিতে বড় পরিবর্তন আসে। পরবর্তী সময়ে সামরিক শাসন, রাজনৈতিক পুনর্বিন্যাস এবং নতুন রাষ্ট্রীয় বয়ানের মধ্যে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসও নতুনভাবে উপস্থাপিত হতে থাকে। জিয়াউর রহমানের শাসনামলে স্বাধীনতার ঘোষণার ক্ষেত্রে তাঁর ভূমিকার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়। ১৯৭৮ সালে রাষ্ট্রীয় ইতিহাসের উপস্থাপনায় পরিবর্তনের কথা উল্লেখ করেছে দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস-এর ২০২৫ সালের একটি বিশ্লেষণ। পরবর্তী কয়েক দশকে শেখ মুজিবুর রহমান ও জিয়াউর রহমানের ভূমিকা নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর পাল্টাপাল্টি ব্যাখ্যা জাতীয় ইতিহাসের আলোচনাকে আরও জটিল করে তোলে।
এখানে একটি বিষয় স্পষ্ট করা জরুরি। স্বাধীনতার ঘোষণার ক্ষেত্রে শেখ মুজিবুর রহমানের রাজনৈতিক নেতৃত্ব এবং জিয়াউর রহমানের বেতার ঘোষণাপাঠকে পরস্পরের সম্পূর্ণ বিকল্প হিসেবে উপস্থাপন করলে ১৯৭১ সালের ঘটনাপ্রবাহের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হারিয়ে যায়। একজনের রাজনৈতিক নেতৃত্বের ঐতিহাসিক গুরুত্ব ব্যাখ্যা করতে গিয়ে অন্যজনের ঘোষণাপাঠ ও সামরিক ভূমিকা অস্বীকার করার প্রয়োজন নেই। একইভাবে কোনো ব্যক্তির সামরিক বা বেতার ঘোষণার ভূমিকা স্বীকার করার অর্থ এই নয় যে, দীর্ঘ স্বাধীনতা আন্দোলনের রাজনৈতিক নেতৃত্বের গুরুত্ব কমিয়ে দিতে হবে। ইতিহাসের কাজ হলো ঘটনাগুলোর সম্পর্ক ও প্রেক্ষাপট ব্যাখ্যা করা, কোনো রাজনৈতিক পক্ষের জন্য এক ব্যক্তিকে সম্পূর্ণ ইতিহাসে পরিণত করা নয়।
১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় ফেরার পর পাঠ্যবইয়ে মুক্তিযুদ্ধ-সম্পর্কিত বিষয়বস্তু বাড়ানো হয়। শেখ মুজিবুর রহমানের জীবনী, ৭ মার্চের ভাষণ এবং জাতীয় চার নেতার অবদান নিয়ে বিভিন্ন লেখা যুক্ত করা হয়েছিল। মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি ও ইতিহাসকে শিক্ষার্থীদের কাছে আরও বিস্তৃতভাবে উপস্থাপন করার এই উদ্যোগের রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপট ছিল। তবে ইতিহাসের বিষয়বস্তু সম্প্রসারণের পাশাপাশি প্রশ্ন ছিল—এই পরিবর্তনগুলো কি দীর্ঘমেয়াদি গবেষণা ও শিক্ষাবিদদের ঐকমত্যের ভিত্তিতে করা হচ্ছে, নাকি ক্ষমতায় থাকা দলের ঐতিহাসিক অবস্থানকে প্রতিফলিত করছে?
২০০১ সালে বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট সরকার ক্ষমতায় আসার পর পাঠ্যবইয়ে আবার পরিবর্তন আসে। দ্য ডেইলি স্টার-এর ২০১৭ সালের অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, কিছু বইয়ে শেখ মুজিবুর রহমানের নাম ও ৭ মার্চের ভাষণের উল্লেখ কমানো বা বাদ দেওয়া হয়েছিল। স্বাধীনতার ঘোষণার বিবরণেও পরিবর্তন আনা হয়। কিছু ক্ষেত্রে জিয়াউর রহমানের ভূমিকা বেশি গুরুত্ব পায় এবং আগের সংস্করণে থাকা কয়েকটি নাম বা বাক্য বাদ পড়ে। প্রতিবেদনে ২০০১ সালের প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরের কয়েকটি পাঠ্যবইয়ের নির্দিষ্ট উদাহরণ তুলে ধরা হয়েছিল।
এই পরিবর্তনগুলোর তাৎপর্য শুধু কয়েকটি বাক্য বাদ পড়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। পাঠ্যবইয়ে কোনো নেতার নাম কমিয়ে দেওয়া হলে শিক্ষার্থীদের কাছে তাঁর ঐতিহাসিক ভূমিকার গুরুত্বও কমে যেতে পারে। আবার অন্য কারও নাম ও ভূমিকা বেশি গুরুত্ব পেলে শিক্ষার্থীরা সেই ব্যক্তিকে স্বাধীনতার ইতিহাসের কেন্দ্রীয় চরিত্র হিসেবে দেখতে শুরু করতে পারে। এভাবেই শব্দ, বাক্য, ছবি এবং অধ্যায়ের বিন্যাসের মাধ্যমে ইতিহাসের সামগ্রিক ধারণা বদলে যেতে পারে।
২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ আবার ক্ষমতায় ফেরার পর পাঠ্যবইয়ের ইতিহাস পুনর্বিবেচনার উদ্যোগ নেওয়া হয়। শেখ মুজিবুর রহমানের জীবনী ও স্বাধীনতা সংগ্রামে তাঁর ভূমিকা আবার গুরুত্ব পায়। একই সঙ্গে স্বাধীনতার ঘোষণার বর্ণনায় জিয়াউর রহমানের নামের উপস্থাপনাও পরিবর্তিত হয়। বিভিন্ন সময়ে পাঠ্যবইয়ের এই ওঠানামা দেখায়, বাংলাদেশের ইতিহাস শিক্ষার একটি বড় দুর্বলতা হলো—কোনো কোনো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় রাজনৈতিক ক্ষমতার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে নতুন করে সাজানো হয়েছে, অথচ পাঠ্যবইয়ের ইতিহাসকে দলীয় রাজনীতির ঊর্ধ্বে রাখার জন্য স্থায়ী ও স্বচ্ছ প্রক্রিয়া যথেষ্ট শক্তিশালী হয়ে ওঠেনি।
এখানে প্রশ্নটি আওয়ামী লীগ কিংবা বিএনপির মধ্যে কে বেশি পরিবর্তন এনেছে, শুধু তা নয়। আরও গভীর প্রশ্ন হলো, ইতিহাসের পাঠ্যবই পরিবর্তনের ক্ষমতা কার হাতে থাকবে এবং সেই পরিবর্তনের ভিত্তি কী হবে? একটি সরকার নির্বাচনের মাধ্যমে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব পায়, কিন্তু সেই দায়িত্বের অর্থ এই নয় যে, দেশের অতীতকে নিজের রাজনৈতিক ব্যাখ্যার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করে পুনর্লিখনের অবাধ অধিকারও পেয়ে যায়। সরকার শিক্ষানীতি পরিবর্তন করতে পারে, নতুন গবেষণার ভিত্তিতে ভুল সংশোধন করতে পারে এবং অবহেলিত ঘটনা যুক্ত করতে পারে। কিন্তু সেই কাজের জন্য প্রয়োজন প্রমাণ, স্বচ্ছতা এবং স্বাধীন বিশেষজ্ঞদের অংশগ্রহণ।
২০২৪ সালের আগস্টে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের পাঠ্যবই আবার আলোচনায় আসে। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে ২০২৫ সালের পাঠ্যবইয়ে স্বাধীনতার ঘোষণার বিবরণে পরিবর্তন আনা হয়। জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের তৎকালীন চেয়ারম্যানের বক্তব্য উদ্ধৃত করে দ্য ডেইলি স্টার জানায়, নতুন বইয়ে উল্লেখ করা হয় যে, ২৬ মার্চ জিয়াউর রহমান স্বাধীনতার ঘোষণা দেন এবং ২৭ মার্চ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের পক্ষে আরেকটি ঘোষণা দেন। এ ছাড়া শেখ মুজিবুর রহমানের পরিচিতি ও তাঁর সম্পর্কিত কিছু বিষয়বস্তুর উপস্থাপনাতেও পরিবর্তন আসে।
২০২৫ সালের পাঠ্যবইয়ে এই পরিবর্তন শুধু স্বাধীনতার ঘোষণার বিবরণেই সীমাবদ্ধ ছিল না। জুলাই ২০২৪-এর গণ-অভ্যুত্থান নিয়ে নতুন লেখা যুক্ত করা হয় এবং শেখ মুজিবুর রহমানের ঐতিহাসিক পরিচিতির কিছু অংশ পুনর্বিন্যস্ত হয়। ২০২৬ সালের পাঠ্যবই নিয়েও সংবাদমাধ্যমে একই ধরনের পরিবর্তনের খবর প্রকাশিত হয়। এরপর ২০২৭ সালের পাঠ্যবইয়ের জন্য আরও সংশোধনের পরিকল্পনার খবর সামনে এসেছে। দ্য ডেইলি স্টার-এর ৮ অক্টোবর ২০২৬-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, নতুন বইয়ে জিয়াউর রহমান, খালেদা জিয়া, ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর, ১৯৯০ সালের গণ-অভ্যুত্থান এবং ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলন নিয়ে অতিরিক্ত বিষয়বস্তু যুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য মনে রাখা দরকার। পাঠ্যবইয়ে নতুন কোনো ঐতিহাসিক ঘটনা যুক্ত করা মানেই ইতিহাস বিকৃতি নয়। আগে অবহেলিত কোনো ব্যক্তি, আন্দোলন বা ঘটনার তথ্য গবেষণার ভিত্তিতে যুক্ত হলে তা ইতিহাস শিক্ষাকে সমৃদ্ধ করতে পারে। একইভাবে কোনো বইয়ে ভুল তথ্য থাকলে তা সংশোধন করাও প্রয়োজনীয়। কিন্তু সমস্যা দেখা দেয় তখন, যখন একটি সরকারের আমলে কোনো ঐতিহাসিক ব্যক্তিকে বিশেষভাবে তুলে ধরা হয় এবং পরবর্তী সরকার এসে তাঁর অবদান কমিয়ে অন্য কাউকে সামনে নিয়ে আসে—অথচ পরিবর্তনের পক্ষে নির্ভরযোগ্য প্রমাণ ও ব্যাখ্যা স্পষ্টভাবে উপস্থাপন করা হয় না।
এই পুরো ঘটনাপ্রবাহ থেকে বোঝা যায়, পাঠ্যবইয়ের ইতিহাস নিয়ে বিরোধের পেছনে অন্তত তিনটি বিষয় কাজ করে। প্রথমত, ক্ষমতার বৈধতা প্রতিষ্ঠার চেষ্টা। রাজনৈতিক দলগুলো নিজেদের অতীতের সঙ্গে যুক্ত করে বর্তমানের গ্রহণযোগ্যতা বাড়াতে চায়। দ্বিতীয়ত, জাতীয় স্মৃতির ওপর নিয়ন্ত্রণ। কোন ঘটনা মানুষ মনে রাখবে, কোন নেতাকে শ্রদ্ধা করবে এবং কোন আন্দোলনকে রাষ্ট্রের ভিত্তি হিসেবে দেখবে, তা নির্ধারণে শিক্ষার ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তৃতীয়ত, স্বাধীন ও দীর্ঘমেয়াদি ঐতিহাসিক পর্যালোচনার দুর্বলতা। গবেষণা, দলিল এবং বিশেষজ্ঞ মতামতের ভিত্তিতে পাঠ্যবই নিয়মিত মূল্যায়নের শক্তিশালী ব্যবস্থা না থাকলে রাজনৈতিক পালাবদল সহজেই ইতিহাসের বয়ানে প্রভাব ফেলতে পারে।
তবে বাংলাদেশের এই অভিজ্ঞতাকে শুধু রাজনৈতিক নেতাদের ব্যক্তিগত দ্বন্দ্ব দিয়ে ব্যাখ্যা করলেও ভুল হবে। স্বাধীনতার পর রাষ্ট্র গঠন, সামরিক শাসন, গণতান্ত্রিক রাজনীতির প্রত্যাবর্তন, মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি নিয়ে সামাজিক আন্দোলন এবং বিভিন্ন প্রজন্মের ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতা—সব মিলিয়ে বাংলাদেশের জাতীয় পরিচয় নির্মিত হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধ এখানে শুধু অতীতের একটি যুদ্ধ নয়; এটি রাষ্ট্রের জন্ম, ভাষা ও সংস্কৃতির অধিকার, রাজনৈতিক স্বাধীনতা এবং আত্মপরিচয়ের সঙ্গে যুক্ত। সে কারণে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের ব্যাখ্যা নিয়ে বিরোধের রাজনৈতিক গুরুত্বও অনেক বেশি।
কিন্তু ইতিহাসকে জাতীয় ঐক্যের ভিত্তি করতে হলে তার ভেতরে মতভিন্নতার জায়গা থাকতে হবে। কোনো ব্যক্তির ভূমিকা নিয়ে গবেষকদের মধ্যে মতপার্থক্য থাকতেই পারে। নতুন দলিল আবিষ্কৃত হলে পুরোনো ব্যাখ্যাও সংশোধিত হতে পারে। এমনকি দীর্ঘদিন ধরে প্রতিষ্ঠিত কোনো ধারণা নতুন প্রমাণের মুখে পুনর্বিবেচনার প্রয়োজনও হতে পারে। ইতিহাসের গবেষণায় এগুলো স্বাভাবিক ঘটনা। কিন্তু গবেষণালব্ধ সংশোধন আর রাজনৈতিক সুবিধার জন্য অতীতের পুনর্বিন্যাস এক বিষয় নয়। প্রথমটির ভিত্তি হলো প্রমাণ; দ্বিতীয়টির ক্ষেত্রে রাজনৈতিক স্বার্থ প্রভাবশালী হয়ে উঠতে পারে।
তাহলে সমাধান কী?
প্রথমত, পাঠ্যবই প্রণয়নের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক দলগুলোর সরাসরি প্রভাব কমিয়ে স্বাধীন ইতিহাসবিদ, শিক্ষাবিদ, আর্কাইভ গবেষক এবং সংশ্লিষ্ট বিষয়ে বিশেষজ্ঞদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। দ্বিতীয়ত, গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক দাবি ব্যবহারের আগে তার উৎস উল্লেখ করতে হবে। তৃতীয়ত, পাঠ্যবইয়ের সংস্করণ পরিবর্তন হলে কোন তথ্য কেন পরিবর্তিত হলো, তার ব্যাখ্যা প্রকাশ করা প্রয়োজন। চতুর্থত, শিক্ষার্থীদের শুধু একটি নির্দিষ্ট বয়ান মুখস্থ করানোর পরিবর্তে ঐতিহাসিক দলিল, প্রত্যক্ষদর্শীর বিবরণ এবং বিভিন্ন গবেষণার তুলনামূলক পাঠের সুযোগ দিতে হবে। এতে তারা শুধু পরীক্ষায় নম্বর পাওয়ার জন্য ইতিহাস পড়বে না; বরং প্রমাণ যাচাই করে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতাও অর্জন করবে।
মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের ক্ষেত্রে এই দায়িত্ব আরও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ ১৯৭১ সালের ইতিহাসের সঙ্গে জড়িয়ে আছে লাখো মানুষের আত্মত্যাগ, নির্যাতিত মানুষের অভিজ্ঞতা, শরণার্থীদের দুর্ভোগ, মুক্তিযোদ্ধাদের সংগ্রাম এবং স্বাধীন বাংলাদেশের জন্ম। রাজনৈতিক নেতৃত্বের ভূমিকা অবশ্যই আলোচিত হবে, কিন্তু সেই আলোচনার মধ্যে সাধারণ মানুষের সংগ্রাম, নারীদের অভিজ্ঞতা, আঞ্চলিক প্রতিরোধ, মুক্তিযোদ্ধাদের অবদান এবং আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপট যেন হারিয়ে না যায়। কোনো একজন নেতার অবদানকে স্বীকার করার জন্য অন্যদের অবদান মুছে ফেলার প্রয়োজন নেই।
সবচেয়ে বড় কথা, পাঠ্যবই কোনো রাজনৈতিক দলের নির্বাচনী ইশতেহার নয়। এটি এমন একটি শিক্ষামাধ্যম, যার মাধ্যমে একটি প্রজন্ম তার রাষ্ট্রের জন্ম, সমাজের সংগ্রাম এবং অতীতের ভুল-সাফল্য সম্পর্কে ধারণা তৈরি করে। সরকার পরিবর্তিত হলে শিক্ষানীতি পরিবর্তিত হতে পারে, নতুন গবেষণার ভিত্তিতে ইতিহাসের ব্যাখ্যাও উন্নত হতে পারে। কিন্তু কোনো ঐতিহাসিক ঘটনা বা ব্যক্তির গুরুত্ব নির্ধারণের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক আনুগত্য যদি প্রমাণের চেয়ে বড় হয়ে ওঠে, তাহলে শিক্ষার্থীরা ইতিহাসের ধারাবাহিকতা নয়, বরং ক্ষমতার পালাবদলের সঙ্গে বদলে যাওয়া বয়ান শিখবে।
একটি জাতির ইতিহাস কোনো এক সরকারের সম্পত্তি নয়। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস আওয়ামী লীগ, বিএনপি কিংবা অন্য কোনো রাজনৈতিক দলের একক সম্পদও নয়। এটি বাংলাদেশের মানুষের ইতিহাস। এই ইতিহাসের মধ্যে যেমন রাজনৈতিক নেতৃত্বের অবদান রয়েছে, তেমনি রয়েছে সাধারণ মানুষের প্রতিরোধ, ত্যাগ ও সংগ্রাম। ইতিহাসের দায়িত্ব হলো এসব অবদানকে প্রমাণের আলোকে যথাযথ স্থানে রাখা—কাউকে অযথা বড় করা কিংবা কাউকে ইচ্ছাকৃতভাবে ছোট করা নয়।
শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি তাই শুধু এই নয় যে, সরকার বদলালে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের বয়ান কেন বদলায়। আরও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো—আমরা কি এমন একটি শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারব, যেখানে সরকার পরিবর্তিত হলেও ঐতিহাসিক সত্য যাচাইয়ের মানদণ্ড পরিবর্তিত হবে না? যেখানে নতুন তথ্য যুক্ত হবে, ভুল সংশোধিত হবে, কিন্তু কোনো দলের রাজনৈতিক প্রয়োজন মেটাতে ইতিহাসকে বারবার নতুন পোশাক পরানো হবে না?
কারণ একটি জাতির ভবিষ্যৎ শুধু তার অতীতকে স্মরণ করার ওপর নির্ভর করে না; সেই অতীতকে কতটা সততা, সাহস এবং প্রমাণনির্ভরতার সঙ্গে তুলে ধরতে পারে, তার ওপরও নির্ভর করে। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার ঊর্ধ্বে নিয়ে যাওয়ার অর্থ কোনো প্রশ্ন নিষিদ্ধ করা নয়। বরং এর অর্থ হলো, প্রশ্ন করার স্বাধীনতা, প্রমাণ যাচাইয়ের সুযোগ এবং সব ঐতিহাসিক অবদানকে ন্যায্যভাবে মূল্যায়নের সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠা করা। তবেই পাঠ্যবইয়ে মুক্তিযুদ্ধ কেবল ক্ষমতাসীন সরকারের পছন্দের ইতিহাস হয়ে থাকবে না; হয়ে উঠবে একটি জাতির অভিন্ন, সমালোচনামূলক ও প্রমাণভিত্তিক স্মৃতি।
আপনার মতামত জানানঃ