বাংলাদেশের মানচিত্রে সাজেক একটি পর্যটনকেন্দ্রের নাম হলেও বাস্তবে এটি পাহাড়ের রাজনীতি, নিরাপত্তা, স্থানীয় জনগোষ্ঠীর অধিকার এবং রাষ্ট্রের প্রশাসনিক সক্ষমতা নিয়ে বড় একটি প্রশ্নের প্রতীক হয়ে উঠেছে। মেঘে ঢাকা পাহাড়, সবুজ উপত্যকা আর সারি সারি রিসোর্টের জন্য পরিচিত সাজেক এখন এমন এক অনিশ্চয়তার মুখে, যেখানে কখনো পর্যটকদের ফিরিয়ে নিতে হচ্ছে, কখনো সড়ক অবরোধে আটকে পড়ছেন স্থানীয় বাসিন্দারা, আবার কখনো শোনা যাচ্ছে গুলির শব্দ। ফলে প্রশ্ন উঠছে, বাংলাদেশের পার্বত্য অঞ্চলগুলোতে আসলে কী ঘটছে? রাষ্ট্রের উপস্থিতি থাকা সত্ত্বেও কেন সেখানে বারবার নিরাপত্তাহীনতা তৈরি হচ্ছে? আর পাহাড়ের পরিস্থিতি কি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বই হুমকির মুখে পড়ছে?
২০২৬ সালের ২২ অক্টোবর সাজেকের পরিস্থিতি এই প্রশ্নগুলোকে নতুন করে সামনে নিয়ে আসে। সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, স্থানীয় দুটি সংগঠনের ডাকা সড়ক অবরোধের মধ্যে পর্যটকদের গাড়িবহর আটকে পড়ে। পরে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে সশস্ত্র গোষ্ঠীর গোলাগুলির ঘটনা ঘটে। নিরাপত্তার কারণে সাজেক থেকে পর্যটকদের সরিয়ে নেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়। আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তরের তথ্য উদ্ধৃত করে প্রকাশিত প্রতিবেদনে জানানো হয়, প্রায় তিন হাজার পর্যটককে নিরাপদে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। পুলিশ ও অন্যান্য সূত্রের প্রতিবেদনে গোলাগুলির সময় নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য আহত হওয়ার তথ্যও এসেছে। পরদিন, ২৩ অক্টোবর, সাজেক পর্যটকশূন্য হয়ে পড়ার খবর প্রকাশিত হয়। সড়ক যোগাযোগ ও পর্যটন কার্যক্রম বন্ধ থাকায় স্থানীয় ব্যবসায়ীরা ক্ষতির মুখে পড়েন। পরিস্থিতি স্বাভাবিক বলে প্রশাসনের বক্তব্য থাকলেও যাতায়াতের অনিশ্চয়তা কাটেনি।
ঘটনাগুলোর দিকে শুধু পর্যটনশিল্পের দৃষ্টিতে তাকালে সংকটের প্রকৃত গভীরতা বোঝা যাবে না। কারণ সাজেকের সমস্যা এক দিনের অবরোধ কিংবা একটি গোলাগুলির ঘটনার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর পেছনে রয়েছে পার্বত্য চট্টগ্রামের দীর্ঘদিনের আঞ্চলিক রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা, সশস্ত্র গোষ্ঠীর উপস্থিতি, স্থানীয় মানুষের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ, ভূমি ও সম্পদের প্রশ্ন এবং রাষ্ট্রের নীতির বাস্তবায়ন নিয়ে বিতর্ক। বর্তমান পরিস্থিতি বুঝতে হলে এসব বিষয়কে একসঙ্গে বিবেচনা করতে হবে।
সাজেক প্রশাসনিকভাবে রাঙামাটি জেলার বাঘাইছড়ি উপজেলার অন্তর্ভুক্ত। তবে সেখানে পৌঁছানোর প্রধান সড়কপথ খাগড়াছড়ি হয়ে গেছে। এই ভৌগোলিক বাস্তবতা সাজেককে প্রশাসনিক ও পরিবহন ব্যবস্থাপনার দিক থেকে কিছুটা বিশেষ অবস্থানে রেখেছে। পাহাড়ি ভূপ্রকৃতি, দীর্ঘ সড়কপথ এবং সীমিত যোগাযোগব্যবস্থার কারণে কোনো জায়গায় অবরোধ সৃষ্টি হলে তার প্রভাব দ্রুত বিস্তৃত হয়। শহরের কোনো সড়ক বন্ধ হলে বিকল্প পথে চলাচলের সুযোগ থাকতে পারে, কিন্তু সাজেকের মতো দুর্গম এলাকায় বিকল্প যোগাযোগের সুযোগ অনেক সীমিত। ফলে একটি অবরোধ পর্যটক, ব্যবসায়ী, কৃষক, শিক্ষার্থী এবং স্থানীয় পরিবারের দৈনন্দিন জীবনকে একসঙ্গে বিপর্যস্ত করতে পারে।
সাম্প্রতিক অবরোধের পেছনে রয়েছে স্থানীয় সংগঠনগুলোর নিরাপত্তাসংক্রান্ত দাবি। সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সাজেক গণ-অধিকার রক্ষা কমিটি এবং সাজেক কার্বারি অ্যাসোসিয়েশন অনির্দিষ্টকালের অবরোধের ঘোষণা দেয়। তাদের অন্যতম দাবি ছিল পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির সন্তু লারমা নেতৃত্বাধীন অংশের সশস্ত্র সদস্যদের সাজেক এলাকা থেকে সরিয়ে নেওয়া। সংগঠনগুলোর অভিযোগ, ওই এলাকায় সশস্ত্র তৎপরতা ও স্থানীয় বাসিন্দাদের ভয়ভীতি দেখানোর ঘটনা ঘটছে। তবে জনসংহতি সমিতি অভিযোগ অস্বীকার করে পাল্টা বক্তব্য দিয়েছে। সংগঠনটির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, সাজেকে সাধারণ মানুষের ওপর অন্য সশস্ত্র গোষ্ঠীর নিপীড়নের বিষয়টি আড়াল করতে এসব অভিযোগ তোলা হচ্ছে। অর্থাৎ এখানে শুধু নিরাপত্তার সংকট নয়, ঘটনার দায় এবং স্থানীয় নিয়ন্ত্রণ নিয়ে পরস্পরবিরোধী বক্তব্যও রয়েছে।
এই বিরোধের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, পার্বত্য চট্টগ্রামে বিভিন্ন আঞ্চলিক রাজনৈতিক সংগঠনের মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা দীর্ঘদিনের। শান্তিচুক্তির মাধ্যমে রাষ্ট্র ও পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির মধ্যে একটি রাজনৈতিক সমঝোতা প্রতিষ্ঠিত হলেও পরবর্তী সময়ে আঞ্চলিক সংগঠনগুলোর মধ্যে বিভক্তি ও সংঘাত পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। বিভিন্ন সংগঠনের রাজনৈতিক লক্ষ্য, নেতৃত্বের বিরোধ, এলাকার ওপর প্রভাব বিস্তারের প্রতিযোগিতা এবং অর্থ সংগ্রহের অভিযোগ পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলেছে। এসব সংগঠনকে একক কোনো শক্তি হিসেবে দেখাও ভুল হবে; তাদের অবস্থান, দাবি এবং পারস্পরিক সম্পর্ক এক নয়। একইভাবে কোনো একটি সংগঠনের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগকে যাচাই ছাড়াই সব পাহাড়ি মানুষের ওপর আরোপ করাও অন্যায়।
সাজেকের অস্থিরতার সঙ্গে পর্যটন অর্থনীতির সম্পর্কও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা দরকার। একসময় দুর্গম পাহাড়ি এলাকা হিসেবে পরিচিত সাজেক গত কয়েক বছরে দেশের অন্যতম জনপ্রিয় পর্যটনকেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। সেখানে রিসোর্ট, কটেজ, রেস্তোরাঁ, পরিবহনসেবা এবং অন্যান্য ব্যবসা গড়ে উঠেছে। স্থানীয় অনেক মানুষের কর্মসংস্থানও এই খাতের ওপর নির্ভরশীল। ফলে পর্যটন শুধু বাইরের মানুষের বিনোদনের বিষয় নয়, এটি স্থানীয় অর্থনীতির একটি বড় অংশ।
সাজেকের অস্থিরতার পেছনে পর্যটন ব্যবসার প্রসার এবং আঞ্চলিক সংগঠনগুলোর প্রভাব বিস্তারের সম্ভাব্য সম্পর্ক নিয়েও সংবাদমাধ্যমে আলোচনা হয়েছে। স্থানীয় কয়েকজনের বক্তব্যের ভিত্তিতে পর্যটন ব্যবসা থেকে চাঁদা আদায় এবং এলাকার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বিরোধের অভিযোগ প্রকাশিত হয়েছে। তবে এসব অভিযোগকে সব পক্ষের বিরুদ্ধে প্রমাণিত সত্য হিসেবে ধরে নেওয়া যাবে না; সংশ্লিষ্ট সংগঠনগুলোর বক্তব্য ও স্বাধীন তদন্ত প্রয়োজন। তবু পর্যটন অর্থনীতির দ্রুত সম্প্রসারণ যে এলাকার জমি, ব্যবসা, পরিবহন ও আর্থিক প্রবাহের গুরুত্ব বাড়িয়েছে, তা স্পষ্ট। অর্থনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ একটি এলাকায় নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার প্রতিযোগিতা তৈরি হলে নিরাপত্তা পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে।
এই পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বড় ক্ষতিগ্রস্ত কারা? সাধারণ মানুষ। পর্যটকদের নিরাপদে সরিয়ে নেওয়া জরুরি, কিন্তু অবরোধের কারণে স্থানীয় বাসিন্দাদের খাদ্যসামগ্রী কেনা, কৃষিপণ্য বাজারজাত করা এবং জরুরি প্রয়োজনে যাতায়াত করাও ব্যাহত হয়। পরিবহন বন্ধ থাকলে জিপচালক ও শ্রমিকদের আয় থেমে যায়। রিসোর্টে বুকিং বাতিল হলে কর্মচারী, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী এবং সরবরাহকারীরাও ক্ষতিগ্রস্ত হন। স্থানীয় পর্যটন ব্যবসায়ীদের বক্তব্য অনুযায়ী, বারবার কার্যক্রম বন্ধ হওয়ায় তাঁদের আয় ও ভবিষ্যৎ ব্যবসা নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। অর্থাৎ কোনো রাজনৈতিক দাবি আদায়ের কৌশল হিসেবে সড়ক অবরোধ ব্যবহার করা হলে তার বোঝা শেষ পর্যন্ত সাধারণ মানুষের ওপরই পড়ে।
কিন্তু প্রশ্ন হলো, রাষ্ট্রের নিরাপত্তাব্যবস্থা থাকা সত্ত্বেও এ ধরনের পরিস্থিতি বারবার তৈরি হচ্ছে কেন? প্রথম কারণ, পাহাড়ের নিরাপত্তা সমস্যাকে শুধু বাহিনী মোতায়েন করে সমাধান করা যায় না। সশস্ত্র তৎপরতা নিয়ন্ত্রণে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভূমিকা অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু কোনো এলাকার মানুষের মধ্যে যদি দীর্ঘস্থায়ী অবিশ্বাস, রাজনৈতিক বঞ্চনার অনুভূতি কিংবা প্রশাসনের ওপর আস্থার ঘাটতি থাকে, তাহলে সাময়িকভাবে পরিস্থিতি শান্ত হলেও সংকটের মূল কারণ থেকে যেতে পারে। একইভাবে স্থানীয় কোনো গোষ্ঠী যদি ভয় দেখিয়ে বা অস্ত্রের শক্তিতে মানুষের চলাচল ও অর্থনৈতিক কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ করতে পারে, তাহলে সাধারণ মানুষ রাষ্ট্রের কার্যকর সুরক্ষা থেকে বঞ্চিত বোধ করবে।
দ্বিতীয় কারণ, পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তিচুক্তি বাস্তবায়ন নিয়ে দীর্ঘদিনের মতপার্থক্য। ১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর বাংলাদেশ সরকার ও পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির মধ্যে এই চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এর উদ্দেশ্য ছিল দীর্ঘ সংঘাতের অবসান, রাজনৈতিক সমঝোতা এবং পার্বত্য অঞ্চলের মানুষের অধিকার ও প্রশাসনিক কাঠামোসংক্রান্ত সমস্যাগুলোর সমাধান। কিন্তু চুক্তির বাস্তবায়ন কতটা সম্পন্ন হয়েছে, তা নিয়ে সরকার ও বিভিন্ন পক্ষের বক্তব্যে পার্থক্য রয়েছে। ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রীর বক্তব্য উদ্ধৃত করে জানানো হয়, চুক্তির ৭২টি ধারার মধ্যে ৬৫টি পূর্ণাঙ্গভাবে বাস্তবায়িত হয়েছে এবং সাতটি ধারা পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়নি বলে সরকার সংসদে জানিয়েছে। অন্যদিকে জনসংহতি সমিতি ও চুক্তি বাস্তবায়নের দাবিতে আন্দোলনরত পক্ষগুলোর বক্তব্যে আরও বিস্তৃত অসম্পূর্ণতার অভিযোগ রয়েছে।
এই পার্থক্য থেকেই বোঝা যায়, শুধু কতটি ধারা বাস্তবায়িত হয়েছে, তা গণনা করলেই সমস্যার সমাধান হবে না। কোন ধারার বাস্তবায়ন কতটা কার্যকর, ভূমি বিরোধের নিষ্পত্তি কত দূর এগিয়েছে, স্থানীয় প্রশাসনিক প্রতিষ্ঠানগুলো কতটা কাজ করছে এবং সাধারণ মানুষ বাস্তবে কতটা নিরাপদ—এসব প্রশ্নেরও উত্তর প্রয়োজন। পার্বত্য চট্টগ্রামের ভূমি বিরোধ বহুদিনের একটি স্পর্শকাতর বিষয়। জমির মালিকানা, বসতি, ঐতিহাসিক অধিকার এবং বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর স্বার্থ জড়িয়ে থাকায় এ সমস্যা সহজে মেটে না। ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম ভূমি কমিশনকে কার্যকর করার দাবি দীর্ঘদিনের। ভূমি প্রশ্ন অমীমাংসিত থাকলে স্থানীয় বিরোধ, উচ্ছেদের অভিযোগ এবং পারস্পরিক অবিশ্বাসের ঝুঁকি থেকে যায়।
তৃতীয় কারণ, নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক সমস্যাকে অনেক সময় পরস্পরবিচ্ছিন্নভাবে দেখা হয়। সশস্ত্র গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে অভিযান চালানো প্রয়োজন হতে পারে, কিন্তু অভিযানের পাশাপাশি অপরাধের নিরপেক্ষ তদন্ত, অস্ত্রের অবৈধ সরবরাহ বন্ধ, চাঁদাবাজি দমন এবং সাধারণ মানুষের অভিযোগ গ্রহণের কার্যকর ব্যবস্থা না থাকলে স্থায়ী নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠিত হয় না। আবার রাজনৈতিক দাবি থাকলেই অস্ত্র ব্যবহার, ভয়ভীতি প্রদর্শন কিংবা বেসামরিক মানুষের চলাচল বন্ধ করে দেওয়ার অধিকার কারও তৈরি হয় না। রাষ্ট্রের দায়িত্ব হলো—যে পক্ষই আইন ভঙ্গ করুক, তার বিরুদ্ধে প্রমাণভিত্তিক ও নিরপেক্ষ ব্যবস্থা নেওয়া।
এবার আসা যাক সবচেয়ে সংবেদনশীল প্রশ্নে—বাংলাদেশের পাহাড়ি অঞ্চলগুলো কি দেশের হাত থেকে বেরিয়ে যাচ্ছে? বর্তমান সাজেক পরিস্থিতির ভিত্তিতে এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর মতো প্রমাণ নেই। কোনো এলাকায় সশস্ত্র গোষ্ঠীর উপস্থিতি, অবরোধ কিংবা প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণে সাময়িক দুর্বলতা তৈরি হওয়া আর কোনো ভূখণ্ডের ওপর রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব হারিয়ে ফেলা এক বিষয় নয়। বাংলাদেশের আইন, প্রশাসন ও নিরাপত্তা কাঠামো পার্বত্য চট্টগ্রামেও কার্যকর। সাজেকের সাম্প্রতিক ঘটনায় পুলিশ, সেনাবাহিনী এবং জেলা প্রশাসনের কার্যক্রমের খবরও প্রকাশিত হয়েছে। তাই শুধু অস্থিরতা দেখে বলা যায় না যে পাহাড় বাংলাদেশের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে।
তবে এর অর্থ এই নয় যে উদ্বেগের কোনো কারণ নেই। যদি কোনো সশস্ত্র গোষ্ঠী নিয়মিতভাবে মানুষের চলাচল নিয়ন্ত্রণ করে, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে জোরপূর্বক অর্থ আদায় করে, স্থানীয় বাসিন্দাদের ভয় দেখায় কিংবা সরকারি কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্ত কার্যকর হতে বাধা দেয়, তাহলে সেটি রাষ্ট্রের কার্যকর কর্তৃত্ব ও নাগরিকদের নিরাপত্তার জন্য গুরুতর চ্যালেঞ্জ। এই ধরনের পরিস্থিতিকে অবহেলা করা যাবে না। রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব শুধু মানচিত্রে সীমান্তরেখা থাকার বিষয় নয়; দেশের প্রতিটি অঞ্চলে নাগরিকের অধিকার রক্ষা, আইন কার্যকর করা এবং ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার সক্ষমতার সঙ্গেও তা সম্পর্কিত।
তবে পাহাড়ের সংকটকে শুধু ‘রাষ্ট্র বনাম পাহাড়ি জনগোষ্ঠী’ হিসেবে উপস্থাপন করা বিপজ্জনক। পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়ি ও বাঙালি—উভয় জনগোষ্ঠীরই নিরাপত্তা, মর্যাদা, জীবিকা ও ন্যায়বিচারের অধিকার রয়েছে। স্থানীয় মানুষের সাংস্কৃতিক পরিচয়, ভূমির অধিকার কিংবা রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বের প্রশ্নকে নিরাপত্তার অজুহাতে উপেক্ষা করা উচিত নয়। আবার কোনো জনগোষ্ঠীর পরিচয়কে সামনে রেখে সশস্ত্র তৎপরতা বা সহিংসতাকে বৈধতা দেওয়াও গ্রহণযোগ্য নয়। রাষ্ট্রের দায়িত্ব হলো সব নাগরিকের জন্য সমান আইনি সুরক্ষা নিশ্চিত করা, অপরাধীকে অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করা এবং কোনো সম্প্রদায়কে সামগ্রিকভাবে দায়ী না করা।
সাজেকের বর্তমান সংকট থেকে বেরিয়ে আসতে হলে প্রথমেই প্রয়োজন অবরোধ ও গোলাগুলির ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত। কে গুলি করেছে, কারা পর্যটকদের চলাচল আটকে দিয়েছে, কারা আইন ভেঙেছে এবং স্থানীয় মানুষের ওপর কোনো ধরনের হুমকি বা জবরদস্তি হয়েছে কি না—এসব বিষয় প্রমাণের ভিত্তিতে নির্ধারণ করতে হবে। কোনো পক্ষের বক্তব্যকে একমাত্র সত্য ধরে ব্যবস্থা নেওয়া হলে অবিশ্বাস বাড়বে। তদন্তের ফল অনুযায়ী অপরাধীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নিতে হবে, তবে তা যেন কোনো সম্প্রদায় বা রাজনৈতিক পরিচয়ের বিরুদ্ধে সমষ্টিগত শাস্তিতে পরিণত না হয়।
দ্বিতীয়ত, সাজেক ও আশপাশের এলাকায় নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে এমনভাবে, যাতে সাধারণ মানুষের চলাচল ও জীবিকা অযথা ব্যাহত না হয়। পর্যটকদের জন্য নিরাপদ যাতায়াতের ব্যবস্থা যেমন প্রয়োজন, তেমনি স্থানীয় বাসিন্দাদের খাদ্য, চিকিৎসা, শিক্ষা এবং কৃষিপণ্য পরিবহনের জন্য নির্ভরযোগ্য যোগাযোগব্যবস্থাও জরুরি। অবরোধের ঝুঁকি থাকলে প্রশাসনকে আগাম সতর্কতা, জরুরি যোগাযোগ এবং বিকল্প সহায়তার ব্যবস্থা রাখতে হবে। তবে নিরাপত্তার নামে দীর্ঘমেয়াদি বিচ্ছিন্নতা তৈরি করলে স্থানীয় অর্থনীতি আরও দুর্বল হবে।
তৃতীয়ত, আঞ্চলিক সংগঠনগুলোর সঙ্গে সংলাপ প্রয়োজন, কিন্তু সেই সংলাপ হতে হবে স্পষ্ট শর্তের ভিত্তিতে। রাজনৈতিক দাবি শান্তিপূর্ণভাবে উত্থাপন করা যাবে, স্থানীয় মানুষের অভিযোগ শোনা হবে এবং নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগের সমাধান খোঁজা হবে। একই সঙ্গে সশস্ত্র তৎপরতা, চাঁদাবাজি, অপহরণ, ভয়ভীতি কিংবা বেসামরিক মানুষকে জিম্মি করার মতো কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে শূন্য সহনশীলতা থাকতে হবে। সংলাপ ও আইন প্রয়োগ পরস্পরের বিকল্প নয়; স্থায়ী সমাধানের জন্য দুটিই প্রয়োজন।
চতুর্থত, পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তিচুক্তির বাস্তবায়ন নিয়ে সরকার, আঞ্চলিক সংগঠন, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি এবং নাগরিক সমাজের অংশগ্রহণে একটি স্বচ্ছ পর্যালোচনা জরুরি। কোন বিষয়ে অগ্রগতি হয়েছে, কোন বিষয় আটকে আছে এবং কেন আটকে আছে—তা জনসমক্ষে স্পষ্ট করা উচিত। ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তির প্রতিষ্ঠানগুলোকে কার্যকর করা, স্থানীয় সরকারব্যবস্থা শক্তিশালী করা এবং মানুষের অভিযোগ নিষ্পত্তির সময়সীমা নির্ধারণ করা প্রয়োজন। দীর্ঘদিনের সমস্যার সমাধান অনির্দিষ্ট ভবিষ্যতের ওপর ছেড়ে দিলে নতুন প্রজন্মের মধ্যেও হতাশা ও অবিশ্বাস জমতে পারে।
পঞ্চমত, পর্যটন অর্থনীতিকে এমনভাবে গড়ে তুলতে হবে, যাতে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর অধিকার ও পরিবেশ সুরক্ষিত থাকে। রিসোর্টের জমি, অনুমোদন, ব্যবসায়িক কার্যক্রম এবং আর্থিক লেনদেনে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে। কোনো সশস্ত্র গোষ্ঠী যেন পর্যটন ব্যবসাকে অর্থ সংগ্রহ বা এলাকার ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার হাতিয়ার বানাতে না পারে, সে জন্য কার্যকর নজরদারি প্রয়োজন। একই সঙ্গে স্থানীয় ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা, পরিবহনকর্মী, কৃষক এবং কর্মচারীদের জন্য বিকল্প জীবিকা ও সংকটকালীন সহায়তার ব্যবস্থাও থাকা উচিত। পর্যটন বন্ধের প্রতিটি সিদ্ধান্তে নিরাপত্তা ও স্থানীয় মানুষের আর্থিক ক্ষতির মধ্যে ভারসাম্য বিবেচনা করতে হবে।
সবশেষে, সাজেকের সংকট আমাদের একটি মৌলিক সত্য মনে করিয়ে দেয়—পাহাড়ের স্থিতিশীলতা শুধু নিরাপত্তা অভিযান দিয়ে নিশ্চিত করা যায় না, আবার শুধু রাজনৈতিক সমঝোতার ওপর নির্ভর করেও অস্ত্রের দাপট বন্ধ করা যায় না। প্রয়োজন কার্যকর প্রশাসন, আইনের নিরপেক্ষ প্রয়োগ, স্থানীয় মানুষের আস্থা, ভূমি ও রাজনৈতিক সমস্যার সমাধান এবং সবার জন্য ন্যায়বিচার। রাষ্ট্রকে একই সঙ্গে দৃঢ় ও ন্যায়সংগত হতে হবে: সশস্ত্র অপরাধের বিরুদ্ধে কঠোর, কিন্তু নিরীহ মানুষের অধিকার রক্ষায় সংবেদনশীল।
সাজেক বাংলাদেশের ভূখণ্ডের অংশ, এবং বর্তমান অস্থিরতা থেকে বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব হারিয়ে যাচ্ছে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর ভিত্তি নেই। কিন্তু রাষ্ট্রের দায়িত্ব শুধু ভূখণ্ডের মালিকানা বজায় রাখা নয়; সেই ভূখণ্ডে বসবাসকারী মানুষের নিরাপত্তা, মর্যাদা ও অধিকার নিশ্চিত করাও। পাহাড়ের কোনো বাসিন্দা যদি ভয় নিয়ে চলাচল করেন, কোনো ব্যবসায়ী যদি জোরপূর্বক অর্থ দেওয়ার আশঙ্কায় থাকেন, কোনো কৃষক যদি নিজের উৎপাদিত ফসল বাজারে নিতে না পারেন কিংবা কোনো পর্যটক যদি নিরাপদে বাড়ি ফিরতে না পারেন, তাহলে প্রশাসনিক উপস্থিতি থাকা সত্ত্বেও রাষ্ট্রের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠবেই।
সুতরাং সাজেকের সংকটকে জাতীয় নিরাপত্তার প্রশ্ন হিসেবে দেখতে হবে, তবে তা যেন পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে সন্দেহ বা বৈরিতা তৈরির অজুহাত না হয়। বাংলাদেশের পাহাড়কে নিরাপদ রাখার সবচেয়ে কার্যকর পথ হলো—অবৈধ অস্ত্র ও সশস্ত্র আধিপত্যের অবসান, শান্তিচুক্তির বাস্তবায়নে অগ্রগতি, ভূমি বিরোধের ন্যায়সংগত নিষ্পত্তি এবং পাহাড়ি-বাঙালি নির্বিশেষে সব নাগরিকের অধিকার রক্ষা। পাহাড়কে রাষ্ট্রের সঙ্গে আরও দৃঢ়ভাবে যুক্ত করার উপায় ভয় নয়, ন্যায়বিচার; অবহেলা নয়, কার্যকর প্রশাসন; আর সংঘাত নয়, জবাবদিহিমূলক রাজনৈতিক সমাধান।
আপনার মতামত জানানঃ