মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতি নতুন করে জটিল হয়ে উঠেছে। ইরান, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সংঘাতের প্রভাব ছড়িয়ে পড়েছে উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে লোহিত সাগর পর্যন্ত। জ্বালানি পরিবহনের গুরুত্বপূর্ণ পথ হরমুজ প্রণালিতে অস্থিরতা তৈরি হওয়ার পর বাব আল-মানদেব প্রণালির কৌশলগত গুরুত্বও বেড়েছে। আর এই পরিস্থিতিতে নতুন করে আলোচনায় এসেছে ইয়েমেনের সশস্ত্র গোষ্ঠী হুতি। একসময় ইয়েমেনের উত্তরাঞ্চলে সীমাবদ্ধ থাকা এই গোষ্ঠী এখন ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন ও দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ পরিচালনার সক্ষমতা দিয়ে আঞ্চলিক নিরাপত্তার বড় উদ্বেগে পরিণত হয়েছে। সৌদি আরবের মতো বিপুল সামরিক সক্ষমতাসম্পন্ন দেশও তাদের সব হামলা প্রতিহত করতে পারছে না। প্রশ্ন উঠেছে, কীভাবে এত শক্তিশালী হয়ে উঠল হুতিরা, কোথা থেকে পাচ্ছে তাদের অস্ত্র এবং কেন তাদের সামরিক সক্ষমতা ধ্বংস করা এত কঠিন?
২০২৬ সালের ১০ অক্টোবর সৌদি আরবের কিং খালেদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ক্ষেপণাস্ত্র হামলার ঘটনা এই প্রশ্নগুলোকে আরও সামনে নিয়ে এসেছে। প্রথম আলোর প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হুতিরা ওই হামলার দায় স্বীকার করে। হামলায় প্রাণহানি ও বিপুলসংখ্যক মানুষের আহত হওয়ার খবর প্রকাশিত হয়। সৌদি আরবের মতো দেশে গুরুত্বপূর্ণ বেসামরিক অবকাঠামো লক্ষ্য করে এমন হামলা শুধু নিরাপত্তাব্যবস্থার দুর্বলতাই সামনে আনে না, বরং আধুনিক যুদ্ধের চরিত্র সম্পর্কেও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তৈরি করে। অত্যাধুনিক যুদ্ধবিমান, আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা এবং বিপুল সামরিক বাজেট থাকা সত্ত্বেও কেন একটি অপেক্ষাকৃত দরিদ্র দেশের সশস্ত্র গোষ্ঠী এত বড় হুমকি হয়ে উঠছে, তার উত্তর লুকিয়ে আছে দীর্ঘদিনের যুদ্ধ, অস্ত্রের প্রযুক্তি, ভৌগোলিক বাস্তবতা এবং আঞ্চলিক রাজনীতির জটিল সমীকরণে।
হুতিদের বর্তমান পরিচয় বুঝতে হলে ফিরে তাকাতে হবে ইয়েমেনের ইতিহাসের দিকে। গোষ্ঠীটি মূলত জায়দি শিয়া সম্প্রদায়ের সঙ্গে সম্পর্কিত। ইয়েমেনের উত্তরাঞ্চলে এই সম্প্রদায়ের দীর্ঘ ঐতিহাসিক ও ধর্মীয় উপস্থিতি রয়েছে। রাজনৈতিক বঞ্চনা, সামাজিক বৈষম্য এবং কেন্দ্রীয় সরকারের বিরুদ্ধে অসন্তোষকে ভিত্তি করে ১৯৯০-এর দশকে হুতি আন্দোলনের বিকাশ ঘটে। তাদের প্রাথমিক পরিচিতি ছিল ‘আনসার আল্লাহ’, যার অর্থ আল্লাহর সমর্থক। আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ধর্মীয় নেতা বদরেদ্দিন আল-হুতির নাম থেকেই পরে ‘হুতি’ পরিচিতি জনপ্রিয় হয়। তাঁর ছেলে হুসেইন আল-হুতি আন্দোলনের অন্যতম নেতা ছিলেন। ২০০৪ সালে সরকারি বাহিনীর হাতে তাঁর মৃত্যুর পর সংঘাত আরও তীব্র হয়ে ওঠে। পরবর্তী সময়ে আবদুলমালিক আল-হুতির নেতৃত্বে সংগঠনটি সামরিক ও রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে বিস্তার লাভ করে।
হুতিদের উত্থানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বাঁক আসে ২০১৪ সালে। ওই বছর তারা ইয়েমেনের রাজধানী সানা দখল করে নেয়। এর ফলে দেশটির রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ও সামরিক অস্ত্রভান্ডারের একটি অংশ তাদের নিয়ন্ত্রণে আসে। সরকারি বাহিনীর কাছ থেকে পাওয়া অস্ত্র, গোলাবারুদ ও সামরিক সরঞ্জাম তাদের প্রাথমিক সামরিক শক্তি বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ২০১৫ সালের মার্চে সৌদি আরবের নেতৃত্বে হুতিবিরোধী সামরিক অভিযান শুরু হলে সংঘাত আরও বিস্তৃত হয়। দীর্ঘ গৃহযুদ্ধে ইয়েমেনের অর্থনীতি, অবকাঠামো ও জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। লাখ লাখ মানুষ প্রাণ হারান বা বাস্তুচ্যুত হন এবং দেশটিতে ভয়াবহ মানবিক সংকট তৈরি হয়। কিন্তু দীর্ঘদিনের যুদ্ধ হুতিদের সামরিকভাবে দুর্বল করার পাশাপাশি তাদের জন্য নতুন অভিজ্ঞতা অর্জনের ক্ষেত্রও তৈরি করে। তারা বুঝতে শেখে, সরাসরি শক্তির লড়াইয়ে প্রতিপক্ষের সঙ্গে পাল্লা দেওয়া কঠিন হলেও ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন, বিচ্ছিন্ন অবস্থান এবং আকস্মিক আক্রমণ ব্যবহার করে শক্তিশালী বাহিনীকেও চাপে রাখা সম্ভব।
হুতিদের শক্তির অন্যতম উৎস তাদের ক্ষেপণাস্ত্রভান্ডার। তাদের হাতে বিভিন্ন পাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র রয়েছে বলে বিভিন্ন প্রতিরক্ষা বিশ্লেষণে উল্লেখ করা হয়েছে। এসব অস্ত্রের কয়েকটির নকশা বা প্রযুক্তিগত বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে ইরানি ক্ষেপণাস্ত্রের মিল রয়েছে বলে ধারণা করা হয়। এর মধ্যে ‘খাইবার শেখান’, ‘তুফান’, ‘বুরকান’ ও ‘বদর’ সিরিজের ক্ষেপণাস্ত্রের নাম উল্লেখযোগ্য। একই সঙ্গে ‘কুদস’ পরিবারের ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রও তাদের অস্ত্রভান্ডারের অংশ বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। তবে এসব অস্ত্রের প্রকৃত সংখ্যা, কার্যকর পাল্লা, নির্ভুলতা এবং সব সংস্করণের বাস্তব সক্ষমতা সম্পর্কে স্বাধীনভাবে যাচাই করা তথ্য সীমিত।
ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র সাধারণত উড্ডয়নের একটি পর্যায়ে দ্রুত উচ্চতায় উঠে পরে নির্দিষ্ট গতিপথ অনুসরণ করে লক্ষ্যবস্তুর দিকে এগিয়ে যায়। অন্যদিকে ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র তুলনামূলক নিচু উচ্চতায় উড়ে লক্ষ্যবস্তুর দিকে যেতে পারে। দুই ধরনের অস্ত্রের গতিপথ, গতি ও শনাক্তকরণের বৈশিষ্ট্য আলাদা হওয়ায় এগুলো প্রতিহত করার কৌশলও এক নয়। কোনো আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থাকে একসঙ্গে একাধিক ধরনের হুমকি মোকাবিলা করতে হলে তার ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি হয়। বিশেষ করে বড় ভৌগোলিক এলাকায় ছড়িয়ে থাকা বিমানবন্দর, তেল স্থাপনা, সামরিক ঘাঁটি ও বাণিজ্যিক অবকাঠামো রক্ষা করা অত্যন্ত জটিল কাজ।
হুতিদের ড্রোন সক্ষমতাও তাদের সামরিক শক্তির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তাদের ব্যবহৃত ‘ওয়ায়েদ-১’ ও ‘ওয়ায়েদ-২’ ড্রোনকে ইরানের ‘শাহেদ-১৩১’ ও ‘শাহেদ-১৩৬’ ধরনের একমুখী আক্রমণকারী ড্রোনের সঙ্গে তুলনা করা হয়। এ ধরনের ড্রোন নির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তুর দিকে উড়ে গিয়ে আঘাত হানার জন্য তৈরি। আধুনিক যুদ্ধক্ষেত্রে এগুলোর গুরুত্ব বেড়েছে মূলত তুলনামূলক কম খরচে তৈরি ও ব্যবহার করা সম্ভব হওয়ার কারণে। একটি অত্যাধুনিক প্রতিরোধী ক্ষেপণাস্ত্রের দাম অনেক বেশি হতে পারে, অথচ আক্রমণকারী ড্রোন তুলনামূলক সস্তা হলে প্রতিরক্ষাকারী পক্ষকে ব্যয়বহুল অস্ত্র ব্যবহার করতে বাধ্য করা যায়। ফলে আকাশ প্রতিরক্ষার অস্ত্রভান্ডার দ্রুত কমে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়।
এখানেই হুতিদের যুদ্ধকৌশলের বড় সুবিধা। তাদের প্রতিটি আক্রমণ সফল হওয়া জরুরি নয়। একাধিক ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র পাঠিয়ে প্রতিপক্ষকে ক্রমাগত সতর্ক থাকতে বাধ্য করাও তাদের জন্য কৌশলগত সুবিধা তৈরি করতে পারে। কোনো একটি হামলা প্রতিহত করতে পারলেও পরবর্তী হামলার আশঙ্কা থেকে যায়। এতে বিমানবন্দর, তেল স্থাপনা, বন্দর ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় করতে হয়। বাণিজ্যিক বিমান চলাচল ব্যাহত হতে পারে, জাহাজ চলাচলের খরচ বাড়তে পারে এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থা কমে যেতে পারে। অর্থাৎ একটি আক্রমণের সামরিক ক্ষয়ক্ষতির বাইরেও তার অর্থনৈতিক ও মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব থাকে।
হুতিদের অস্ত্রের উৎস নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বিতর্ক চলছে। সৌদি আরব ও যুক্তরাষ্ট্রের অভিযোগ, ইরান তাদের অস্ত্র, অর্থায়ন এবং প্রযুক্তিগত সহায়তা দিয়ে থাকে। ইরান এসব অভিযোগের অনেকটাই অস্বীকার করেছে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিবেদন, জাতিসংঘের পর্যবেক্ষণ এবং অস্ত্রবিশেষজ্ঞদের বিশ্লেষণে হুতিদের ব্যবহৃত কিছু অস্ত্রের সঙ্গে ইরানি প্রযুক্তির সম্পর্কের কথা উঠে এসেছে। তবে প্রতিটি অস্ত্র সরাসরি ইরান থেকে তৈরি অবস্থায় এসেছে, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর মতো তথ্য সব ক্ষেত্রে নেই। অনেক সময় একটি অস্ত্রের নকশা, যন্ত্রাংশ কিংবা প্রযুক্তি অন্য জায়গা থেকে সংগ্রহ করে স্থানীয়ভাবে সংযোজন বা পরিবর্তন করা হয়। ফলে অস্ত্রের উৎস নির্ধারণের ক্ষেত্রে পুরো সরবরাহব্যবস্থা বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন।
প্রতিবেদনগুলোতে আরও বলা হয়েছে, হুতিদের অস্ত্র কর্মসূচিতে বিদেশি যন্ত্রাংশ সরবরাহের নেটওয়ার্ক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। চীনভিত্তিক কিছু প্রতিষ্ঠানের তৈরি বিশেষ ধাতব যন্ত্রাংশ, শিল্পকারখানায় ব্যবহৃত সরঞ্জাম এবং ক্ষেপণাস্ত্র নির্মাণে কাজে লাগতে পারে এমন উপাদানের বিষয়ে তদন্তের তথ্য প্রকাশিত হয়েছে। কিছু যন্ত্রাংশ বেসামরিক শিল্পেও ব্যবহার করা যায়। তাই কোনো যন্ত্রাংশ পাওয়া গেলেই সেটি সরাসরি সামরিক উদ্দেশ্যে সরবরাহ করা হয়েছিল বলে ধরে নেওয়া যায় না। তবে একই চালানে ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির সঙ্গে সম্পর্কিত একাধিক বিশেষায়িত উপাদান পাওয়া গেলে সরবরাহব্যবস্থার উদ্দেশ্য নিয়ে তদন্তের প্রয়োজন বাড়ে।
অস্ত্রের যন্ত্রাংশ ইয়েমেনে পৌঁছানোর পর সেগুলো সংযোজন, মেরামত বা পরিবর্তনের মাধ্যমে ব্যবহারযোগ্য করে তোলার সক্ষমতাও গুরুত্বপূর্ণ। হুতিরা শুধু প্রস্তুত অস্ত্রের ওপর নির্ভর করছে না, বরং দীর্ঘ সংঘাতের মধ্যে স্থানীয় উৎপাদন ও রক্ষণাবেক্ষণের সক্ষমতা বাড়ানোর চেষ্টা করেছে বলে বিভিন্ন বিশ্লেষণে উঠে এসেছে। এ ধরনের সক্ষমতা তাদের জন্য বড় সুবিধা। কারণ বিমান হামলায় কোনো গুদাম বা কারখানা ধ্বংস হলেও সব সরবরাহব্যবস্থা একসঙ্গে বন্ধ হয়ে যায় না। অস্ত্র বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে রাখা, বিকল্প সরবরাহপথ ব্যবহার করা এবং সীমিত সরঞ্জাম দিয়ে কাজ চালিয়ে নেওয়ার সক্ষমতা থাকলে সামরিক অভিযান চালিয়েও প্রতিপক্ষের যুদ্ধক্ষমতা সম্পূর্ণ ধ্বংস করা কঠিন হয়ে পড়ে।
এই বাস্তবতা সৌদি আরবের জন্য বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। দেশটির রয়েছে আধুনিক যুদ্ধবিমান, উন্নত রাডার এবং প্যাট্রিয়ট ও থাডের মতো আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা। কিন্তু প্রতিরক্ষাব্যবস্থার উন্নত প্রযুক্তি থাকলেই সব হামলা শতভাগ ঠেকানো সম্ভব হয় না। প্রথমত, কোনো ক্ষেপণাস্ত্র বা ড্রোনকে প্রতিহত করতে হলে সেটিকে যথাসময়ে শনাক্ত করতে হয়। দ্বিতীয়ত, তার গতিপথ ও সম্ভাব্য লক্ষ্য নির্ধারণ করতে হয়। তৃতীয়ত, উপযুক্ত প্রতিরোধী অস্ত্র ব্যবহার করে আঘাত হানার আগেই সেটিকে ধ্বংস করতে হয়। এই ধাপগুলোর যেকোনো একটিতে সমস্যা হলে হামলা সফল হওয়ার ঝুঁকি থাকে।
সৌদি আরবের বিশাল আয়তনও প্রতিরক্ষার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। দেশটির সব বিমানবন্দর, তেলক্ষেত্র, বন্দর, শহর ও সামরিক স্থাপনায় একই মাত্রার প্রতিরক্ষা মোতায়েন করা বাস্তবে কঠিন। একটি নির্দিষ্ট স্থাপনায় প্রতিরক্ষা জোরদার করলে অন্য কোনো এলাকায় তুলনামূলক দুর্বলতা তৈরি হতে পারে। আবার একই সময়ে বিভিন্ন দিক থেকে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র আসার আশঙ্কা থাকলে কোন হুমকির বিরুদ্ধে আগে প্রতিরোধী ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করা হবে, সেই সিদ্ধান্তও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। প্রতিরোধী অস্ত্রের মজুত সীমিত হলে দীর্ঘমেয়াদি সংঘাতে সমস্যাটি আরও গুরুতর হয়। কারণ আক্রমণকারী অপেক্ষাকৃত কম খরচে বারবার হামলা চালাতে পারলেও প্রতিরক্ষাকারীকে প্রতিবার ব্যয়বহুল প্রতিরোধী অস্ত্র ব্যবহার করতে হতে পারে।
হুতিদের বিরুদ্ধে সৌদি আরবের লড়াইয়ের সঙ্গে যুক্ত রয়েছে মধ্যপ্রাচ্যের বৃহত্তর ভূরাজনীতি। ২০২৩ সালের অক্টোবরে গাজা যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর হুতিরা ইসরায়েল-সংশ্লিষ্ট বলে দাবি করা বিভিন্ন বাণিজ্যিক জাহাজকে লক্ষ্য করে লোহিত সাগরে হামলা চালায়। তারা এসব পদক্ষেপকে ফিলিস্তিনিদের প্রতি সমর্থন হিসেবে ব্যাখ্যা করে। এর ফলে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও জাহাজ চলাচলের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ে। অনেক জাহাজকে বিকল্প দীর্ঘ পথ ব্যবহার করতে হয়, যা পরিবহন ব্যয় ও সময় বাড়াতে পারে। পরে ইরান, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সংঘাতের সঙ্গে হুতিদের ভূমিকা আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। তবে এই আঞ্চলিক পরিস্থিতির বিভিন্ন ঘটনা ও পক্ষগুলোর দাবি স্বাধীনভাবে যাচাই করে দেখা প্রয়োজন; কারণ যুদ্ধকালীন তথ্যের মধ্যে প্রচারণা ও অসম্পূর্ণ বিবরণ থাকতে পারে।
ইয়েমেনের ভূগোলও হুতিদের কৌশলগত সুবিধা দেয়। দেশটির উত্তরাঞ্চলে পাহাড়ি এলাকা এবং দুর্গম ভূখণ্ড রয়েছে। সেখানে সামরিক অভিযান পরিচালনা করা সহজ নয়। পাহাড়ি অঞ্চলে ছড়িয়ে থাকা স্থাপনা, গোপন গুদাম এবং পরিবর্তনশীল অবস্থান শনাক্ত ও ধ্বংস করতে গোয়েন্দা তথ্যের ওপর নির্ভর করতে হয়। শুধু বিমান হামলা চালিয়ে কোনো সশস্ত্র গোষ্ঠীকে সম্পূর্ণ নির্মূল করা কঠিন, বিশেষ করে যখন তাদের স্থানীয় সমর্থন, সংগঠিত নেতৃত্ব এবং বিকল্প সরবরাহব্যবস্থা থাকে। সামরিক চাপ বাড়লে তারা সাময়িকভাবে আড়ালে যেতে পারে, আবার পরিস্থিতি অনুকূলে এলে নতুন করে আক্রমণ চালাতে পারে।
এ পরিস্থিতিতে সৌদি আরবের সামনে চ্যালেঞ্জ কেবল হুতিদের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ধ্বংস করা নয়। একই সঙ্গে দেশের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো রক্ষা, জ্বালানি রপ্তানির বিকল্প পথ সচল রাখা, প্রতিরোধী অস্ত্রের মজুত বজায় রাখা এবং দীর্ঘমেয়াদি সংঘাতের অর্থনৈতিক ক্ষতি সীমিত রাখাও জরুরি। হুতিদের সক্ষমতা কমাতে সামরিক অভিযানের পাশাপাশি অস্ত্রের সরবরাহপথ বন্ধ করা, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বাড়ানো এবং ইয়েমেনের সংঘাতের রাজনৈতিক সমাধান খোঁজার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ যুদ্ধের মূল রাজনৈতিক ও সামাজিক কারণগুলো অমীমাংসিত থাকলে নতুন করে সশস্ত্র সংঘাতের ঝুঁকি থেকে যায়।
সব মিলিয়ে হুতিদের উত্থান আধুনিক যুদ্ধের একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা তুলে ধরে। সামরিক শক্তিতে পিছিয়ে থাকা কোনো গোষ্ঠীও তুলনামূলক কম খরচের ড্রোন, ক্ষেপণাস্ত্র, বিদেশি প্রযুক্তি, স্থানীয় উৎপাদন এবং দীর্ঘ যুদ্ধের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে শক্তিশালী রাষ্ট্রের জন্য বড় নিরাপত্তা-চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে। সৌদি আরবের উন্নত আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা বহু হামলা ঠেকাতে সক্ষম হলেও প্রতিটি হামলা প্রতিহত করার নিশ্চয়তা দিতে পারে না। অন্যদিকে হুতিদের প্রকৃত অস্ত্রের সংখ্যা ও সক্ষমতা সম্পর্কে পূর্ণাঙ্গ তথ্য না থাকায় তাদের সামরিক শক্তির সুনির্দিষ্ট মূল্যায়নও কঠিন। কিন্তু একটি বিষয় স্পষ্ট—ইয়েমেনের এই গোষ্ঠীকে আর শুধু স্থানীয় বিদ্রোহী শক্তি হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। তাদের কর্মকাণ্ড এখন আঞ্চলিক নিরাপত্তা, বিশ্ববাণিজ্য এবং জ্বালানি সরবরাহের ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে। মধ্যপ্রাচ্যের ভবিষ্যৎ সংঘাত কোন দিকে যাবে, তা নির্ভর করবে সামরিক শক্তির পাশাপাশি কূটনীতি, রাজনৈতিক সমঝোতা এবং গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক নৌপথের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ওপর।
আপনার মতামত জানানঃ