বাংলার নবাবি ইতিহাসে ক্ষমতার দ্বন্দ্ব, উত্তরাধিকার নিয়ে সংঘাত এবং রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রের বহু ঘটনা রয়েছে। সিংহাসনের প্রশ্নে যেখানে পিতা-পুত্রের সম্পর্কও সংঘাতের মুখে পড়েছিল, সেখানে একজন নারীর বিচক্ষণতা সাময়িকভাবে ঠেকিয়ে দিয়েছিল সম্ভাব্য রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ। তিনি জিনাত-উন-নিসা বেগম। বাংলার নবাব মুর্শিদকুলী খানের কন্যা এবং নবাব সুজাউদ্দিন মুহাম্মদ খানের স্ত্রী হিসেবে তিনি এমন এক রাজনৈতিক সংকটের কেন্দ্রে ছিলেন, যার পরিণতি বাংলার শাসনব্যবস্থার ভবিষ্যৎ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
আঠারো শতকের প্রথম ভাগে বাংলা ছিল মোগল সাম্রাজ্যের অন্যতম সমৃদ্ধ প্রদেশ। কৃষি, বাণিজ্য, বস্ত্রশিল্প ও রাজস্ব আদায়ের কারণে বাংলার অর্থনৈতিক গুরুত্ব ছিল অপরিসীম। কিন্তু এই সমৃদ্ধির পাশাপাশি ক্ষমতার উত্তরাধিকার নিয়ে অনিশ্চয়তাও ছিল প্রবল। দিল্লির মোগল সম্রাটের আনুষ্ঠানিক কর্তৃত্বের অধীনে বাংলার শাসকদের দায়িত্ব ও ক্ষমতা নির্ধারিত হলেও বাস্তবে প্রাদেশিক প্রশাসন পরিচালনায় নবাবদের প্রভাব ছিল ব্যাপক। ফলে নবাবের মৃত্যুর পর কে ক্ষমতায় বসবেন, তা কেবল পারিবারিক বিষয় ছিল না; এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকত রাজস্ব, প্রশাসন, সামরিক শক্তি এবং প্রভাবশালী দরবারি গোষ্ঠীগুলোর স্বার্থ।
মুর্শিদকুলী খান বাংলার প্রশাসনে নিজের অবস্থান সুদৃঢ় করেছিলেন। তাঁর কোনো পুত্রসন্তান ছিল না। একমাত্র কন্যা জিনাত-উন-নিসা বেগম ছিলেন তাঁর অত্যন্ত প্রিয়। বুরহানপুরে অবস্থানকালে মুর্শিদকুলী খানের অধীনে কাজ করতেন সুজাউদ্দিন মুহাম্মদ খান। তাঁর কর্মদক্ষতা ও সম্ভ্রান্ত পরিচয়ে সন্তুষ্ট হয়ে মুর্শিদকুলী খান কন্যা জিনাতের সঙ্গে সুজাউদ্দিনের বিয়ে দেন। পরবর্তী সময়ে মুর্শিদকুলী খান বাংলার দেওয়ানি ও সুবাদারি লাভ করলে সুজাউদ্দিনকে উড়িষ্যার দেওয়ান ও নায়েব নাজিমের দায়িত্ব দেওয়া হয়।
ইতিহাসবিষয়ক বিবরণে সুজাউদ্দিনকে কর্মঠ ও দক্ষ প্রশাসক হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। তবে তাঁর ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে সমালোচনাও ছিল। নারীদের প্রতি তাঁর আকর্ষণ এবং দাম্পত্য সম্পর্কের টানাপোড়েন জিনাত-উন-নিসার সঙ্গে তাঁর সম্পর্ককে জটিল করে তুলেছিল বলে ঐতিহাসিক বিবরণে উল্লেখ পাওয়া যায়। মুর্শিদকুলী খানও একপর্যায়ে জামাতার প্রতি অসন্তুষ্ট হন। এই পরিস্থিতিতে সুজাউদ্দিন মুর্শিদাবাদ ছেড়ে উড়িষ্যায় অবস্থান করার সিদ্ধান্ত নেন।
কিন্তু পারিবারিক দূরত্বের আড়ালে তখন আরও বড় একটি প্রশ্ন তৈরি হচ্ছিল—মুর্শিদকুলী খানের মৃত্যুর পর বাংলার শাসনভার কার হাতে যাবে? তাঁর দৌহিত্র সরফরাজ খানকে তিনি উত্তরাধিকারী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে আগ্রহী ছিলেন। ঐতিহাসিক নিখিলনাথ রায়ের ‘মুর্শিদাবাদের ইতিহাস’ অনুসারে, মৃত্যুর কিছু আগে মুর্শিদকুলী খান সরফরাজের হাতে নিজের সম্পত্তি অর্পণ করেন এবং অধীনস্থ কর্মচারীদের ন্যায় ও করুণার সঙ্গে বিবেচনা করার নির্দেশ দেন। তবে সম্পত্তি অর্পণ, পারিবারিক উত্তরাধিকার এবং মোগল সম্রাটের আনুষ্ঠানিক নিয়োগ—এই বিষয়গুলো এক ছিল না। বাংলার সুবাদারির জন্য দিল্লির অনুমোদনও গুরুত্বপূর্ণ ছিল।
১৭২৭ সালের ৩০ জুন মুর্শিদকুলী খানের মৃত্যু হলে উত্তরাধিকার নিয়ে সংকট প্রকাশ্য রূপ নেয়। সুজাউদ্দিন তখন উড়িষ্যায় ছিলেন। তিনি আলিবর্দী খান ও হাজি আহমদের পরামর্শে দিল্লির সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করছিলেন। শ্বশুরের মৃত্যুর সংবাদ পেয়ে তিনি মুর্শিদাবাদের দিকে যাত্রা করেন। পথে তিনি মোগল সম্রাটের ফরমান লাভ করেন, যাতে তাঁকে বাংলার দেওয়ানি ও সুবাদারি প্রদান করা হয় বলে ঐতিহাসিক বিবরণে উল্লেখ রয়েছে।
মুর্শিদাবাদে পৌঁছে সুজাউদ্দিন নিজের শাসনাধিকার দাবি করলে সরফরাজ খান পরিস্থিতিকে নিজের উত্তরাধিকারের জন্য হুমকি হিসেবে দেখেন। পিতার সঙ্গে ক্ষমতা ভাগাভাগির প্রশ্নে তাঁর আপত্তি তৈরি হয় এবং সংঘাতের আশঙ্কা দেখা দেয়। একদিকে ছিলেন অভিজ্ঞ ও সামরিক শক্তিসম্পন্ন সুজাউদ্দিন, অন্যদিকে ছিলেন প্রয়াত নবাবের মনোনীত উত্তরাধিকারী হিসেবে পরিচিত সরফরাজ। এই দ্বন্দ্ব দীর্ঘস্থায়ী হলে মুর্শিদাবাদের প্রশাসন, রাজস্ব আদায় এবং সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারত।
এই সংকটের মুহূর্তে জিনাত-উন-নিসা বেগম মধ্যস্থতার উদ্যোগ নেন বলে ঐতিহাসিক সূত্রে বর্ণিত হয়েছে। তিনি সরফরাজকে বোঝানোর চেষ্টা করেন, পিতার বিরুদ্ধে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়া তাঁর নিজের ভবিষ্যৎ এবং রাজ্যের স্থিতিশীলতা—দুইয়ের জন্যই ক্ষতিকর হতে পারে। সুজাউদ্দিন জীবিত থাকা পর্যন্ত সংঘাতে না গিয়ে তাঁর কর্তৃত্ব মেনে নেওয়াই পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার বাস্তবসম্মত পথ হতে পারে—জিনাতের বক্তব্যের মূল সুর ছিল এমনই।
এই মধ্যস্থতার তাৎপর্য ছিল শুধু একটি সম্ভাব্য যুদ্ধ থামানো নয়; বরং পরিবারের ভেতরের বিরোধকে বৃহত্তর রাজনৈতিক সংঘাতে রূপ নেওয়া থেকে বিরত রাখার চেষ্টা। ক্ষমতার দ্বন্দ্বে আবেগ ও প্রতিশোধের পরিবর্তে বাস্তব পরিস্থিতি বিবেচনা করা যে কতটা গুরুত্বপূর্ণ, জিনাতের ভূমিকা তার একটি ঐতিহাসিক উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। তবে ঘটনার বিবরণে জিনাতের উদ্যোগের পাশাপাশি সরফরাজের সমর্থকদের পরামর্শ এবং সুজাউদ্দিনের হাতে মোগল সম্রাটের ফরমান থাকার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। অর্থাৎ সংকট নিরসনে একাধিক রাজনৈতিক ও সামরিক বাস্তবতা কাজ করেছিল।
সুজাউদ্দিন বাংলার শাসনভার গ্রহণের পর পারিবারিক সম্পর্ক পুনর্গঠনের চেষ্টা করেন। বণিক বার্তার প্রকাশিত বিবরণ অনুযায়ী, তিনি জিনাত-উন-নিসার কাছে অতীতের আচরণের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করেন। পরে সরফরাজকে বিহারের দেওয়ানির দায়িত্ব দেওয়ার বিষয়টি আলোচনায় আসে। কিন্তু জিনাত এতে আপত্তি জানান। তিনি সরফরাজকে মুর্শিদাবাদের কাছাকাছি রাখতে আগ্রহী ছিলেন এবং আলিবর্দী খানকে অন্যত্র দায়িত্ব দেওয়ার পক্ষে মত দেন।
ঐতিহাসিক সুশীল চৌধুরীর উদ্ধৃত বিবরণ অনুযায়ী, জিনাত-উন-নিসাই আলিবর্দী খানকে ডেকে বিহারের দায়িত্ব দেওয়ার বিষয়ে জানান এবং তাঁকে মূল্যবান খিলাত প্রদান করেন। এই পদক্ষেপের মাধ্যমে তিনি একদিকে সরফরাজকে কেন্দ্রীয় ক্ষমতার কাছাকাছি রাখার চেষ্টা করেন, অন্যদিকে দরবারের প্রভাবশালী ব্যক্তিদের অবস্থান পুনর্বিন্যাস করতে চেয়েছিলেন। এতে তাঁর রাজনৈতিক বিচক্ষণতার পরিচয় পাওয়া গেলেও পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহ দেখায়, কেবল পারিবারিক মধ্যস্থতা দিয়ে ক্ষমতার প্রতিদ্বন্দ্বিতা দীর্ঘদিন নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হয়নি।
সুজাউদ্দিনের মৃত্যুর পর বাংলার রাজনীতিতে নতুন সংকট দেখা দেয়। আলিবর্দী খান মুর্শিদাবাদের ক্ষমতা দখলের উদ্যোগ নেন। ১৭৪০ সালের গিরিয়ার যুদ্ধে তিনি সরফরাজ খানকে পরাজিত ও নিহত করেন। এর মধ্য দিয়ে বাংলার নবাবি রাজনীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ পালাবদল ঘটে। যে উত্তরাধিকার নিয়ে একসময় জিনাত-উন-নিসা সংঘাত ঠেকানোর চেষ্টা করেছিলেন, শেষ পর্যন্ত সেই ক্ষমতার দ্বন্দ্বই রক্তক্ষয়ী পরিণতি লাভ করে।
নিখিলনাথ রায় ও সুশীল চৌধুরীর বিবরণে উঠে আসে, গিরিয়ার যুদ্ধের পর আলিবর্দী খান জিনাত-উন-নিসার কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করেছিলেন এবং তাঁর প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করেছিলেন। এই ঘটনা জিনাতের ব্যক্তিগত মর্যাদা ও দরবারে তাঁর অবস্থানের গুরুত্বের ইঙ্গিত দেয়। তবে তাঁর রাজনৈতিক প্রচেষ্টা সরফরাজের জীবন কিংবা পরিবারের উত্তরাধিকার রক্ষা করতে পারেনি।
জিনাত-উন-নিসা বেগমের কাহিনি বাংলার ইতিহাসে নারীর রাজনৈতিক ভূমিকার একটি তাৎপর্যপূর্ণ দৃষ্টান্ত। তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে নবাব না হয়েও পারিবারিক সম্পর্ক, দরবারি যোগাযোগ এবং রাজনৈতিক পরামর্শের মাধ্যমে ক্ষমতার সিদ্ধান্তে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করেছিলেন। তাঁর ভূমিকা বিচার করতে হলে তাঁকে কেবল একজন কন্যা বা স্ত্রী হিসেবে দেখলে চলবে না; বরং তাঁকে এমন এক রাজনৈতিক বাস্তবতার অংশ হিসেবে দেখতে হবে, যেখানে পারিবারিক সম্পর্ক, মোগল সম্রাটের অনুমোদন, সামরিক শক্তি এবং দরবারি স্বার্থ পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত ছিল।
এই ইতিহাস একই সঙ্গে একটি কঠিন সত্যও সামনে আনে। বিচক্ষণতা ও মধ্যস্থতা সাময়িকভাবে সংঘাত কমাতে পারে, কিন্তু ক্ষমতার কাঠামোতে যদি প্রতিদ্বন্দ্বী স্বার্থ, সামরিক শক্তির প্রতিযোগিতা এবং উত্তরাধিকার নিয়ে অনিশ্চয়তা থেকে যায়, তাহলে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠা কঠিন হয়ে পড়ে। জিনাত-উন-নিসা একসময় পিতা ও পুত্রের মধ্যে যুদ্ধের আশঙ্কা প্রশমিত করতে পেরেছিলেন; কিন্তু পরবর্তী রাজনৈতিক সংঘাত ঠেকাতে পারেননি। বাংলার নবাবি ইতিহাসে তাঁর ভূমিকা তাই একই সঙ্গে প্রজ্ঞা, সীমাবদ্ধতা এবং ক্ষমতার নির্মম বাস্তবতার স্মারক।
আপনার মতামত জানানঃ