সৌদি আরবে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ঘটনা শুধু দুটি প্রাণের অবসান নয়; এটি বাংলাদেশের কূটনৈতিক তৎপরতা, প্রবাসী নাগরিকদের সুরক্ষা এবং রাজনৈতিক নেতৃত্বের দায়িত্ববোধ নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তুলে দিয়েছে। যে রাষ্ট্রের লাখ লাখ নাগরিক বিদেশের মাটিতে শ্রম দিয়ে অর্থনীতি সচল রাখেন, সেই রাষ্ট্রের দুই নাগরিকের বিচার ও মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের খবর যদি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ সংবাদমাধ্যমের মাধ্যমে জানতে পারে বলে জানায়, তাহলে সেই রাষ্ট্রের নাগরিক সুরক্ষাব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। আর এমন একটি মর্মান্তিক ঘটনার পর যখন দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের কাছ থেকে সহমর্মিতা, জবাবদিহি ও কার্যকর পদক্ষেপের পরিবর্তে আসে দায় এড়ানোর বক্তব্য এবং মৃত মানুষকে নিয়ে অবমাননাকর মন্তব্য, তখন সংকটটি আর কেবল কূটনীতির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। এটি হয়ে ওঠে রাষ্ট্রীয় দায়িত্ববোধ ও রাজনৈতিক বিবেকের সংকট।
সৌদি আরবে বাংলাদেশের দুই নাগরিকের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের পর যে প্রশ্নটি সবার আগে সামনে আসা প্রয়োজন ছিল, তা হলো—তাঁদের আইনি সুরক্ষায় বাংলাদেশ রাষ্ট্র কী করেছিল? তাঁরা কখন গ্রেপ্তার হয়েছিলেন, তাঁদের বিরুদ্ধে কী অভিযোগ আনা হয়েছিল, বিচারপ্রক্রিয়া কত দিন ধরে চলেছিল, তাঁরা আইনজীবী পেয়েছিলেন কি না, আত্মপক্ষ সমর্থনের যথেষ্ট সুযোগ পেয়েছিলেন কি না এবং মৃত্যুদণ্ডের আগে বাংলাদেশ দূতাবাস বিষয়টি জানত কি না—এসব প্রশ্নের নির্ভরযোগ্য উত্তর জনগণের জানা প্রয়োজন। কারণ, মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়ে যাওয়ার পর উদ্বেগ প্রকাশ করা এবং তথ্য চাওয়া যতটা জরুরি, তার চেয়েও বেশি জরুরি হলো এমন পরিণতি ঠেকাতে আগে থেকে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল, তা স্পষ্ট করা।
ঘটনার পূর্ণাঙ্গ তথ্য প্রকাশিত না হওয়ায় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের ভূমিকা সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেওয়া যায় না। কিন্তু তথ্যের ঘাটতি নিজেই একটি বড় প্রশ্ন। দুই বাংলাদেশি নাগরিকের বিচার ও মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের বিষয়ে বাংলাদেশ সরকার আগে থেকে অবগত ছিল কি না, অবগত থাকলে কী পদক্ষেপ নিয়েছিল এবং অবগত না থাকলে কেন জানতে পারেনি—সরকারকে এসব প্রশ্নের জবাব দিতে হবে। নাগরিকের জীবন ও অধিকার রক্ষার দায়িত্ব কেবল দেশের সীমানার মধ্যে শেষ হয়ে যায় না। বিদেশে থাকা একজন বাংলাদেশিও রাষ্ট্রের নাগরিক। তাঁর বিপদে রাষ্ট্রের দায়িত্ব রয়েছে, তাঁর আইনি সুরক্ষার প্রশ্নেও রয়েছে রাষ্ট্রের দায়।
বাংলাদেশের অর্থনীতিতে প্রবাসীদের অবদান নিয়ে রাজনৈতিক নেতারা প্রায়ই গর্ব করেন। রেমিট্যান্সকে বলা হয় দেশের অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি। প্রবাসীদের পাঠানো অর্থে পরিবার চলে, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে সহায়তা মেলে, গ্রামীণ অর্থনীতিতে গতি আসে। তাঁদের অবদানকে সামনে রেখে বক্তৃতা দেওয়া হয়, তাঁদের সম্মান জানানোর প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়। অথচ তাঁদের কারও জীবন যখন বিদেশের মাটিতে আইনি সংকটের মুখে পড়ে, তখন রাষ্ট্রীয় সুরক্ষার বাস্তব চিত্র কী—সেই প্রশ্নের উত্তর সব সময় স্পষ্ট হয় না। প্রবাসীরা কি কেবল রেমিট্যান্স পাঠানোর সময় রাষ্ট্রের গর্ব, নাকি বিপদের সময়ও তাঁরা রাষ্ট্রের সমান গুরুত্ব পাওয়া নাগরিক?
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম সৌদি আরবে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ডকে দেশের জন্য ‘বড় শিক্ষা’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তাঁর বক্তব্যে প্রবাসীদের আইন মেনে চলার বিষয়ে সতর্কবার্তার প্রসঙ্গ সামনে এসেছে। অবশ্যই বিদেশে অবস্থানরত প্রত্যেক নাগরিকের উচিত সংশ্লিষ্ট দেশের আইন সম্পর্কে সচেতন থাকা এবং আইন ভঙ্গ করা থেকে বিরত থাকা। কিন্তু একটি মৃত্যুদণ্ডের ঘটনায় শুধু নাগরিকদের জন্য শিক্ষার কথা বললে রাষ্ট্রের নিজের দায়িত্বের প্রশ্নটি আড়ালে পড়ে যায়। প্রশ্ন হলো, এই শিক্ষা কি কেবল প্রবাসীদের জন্য, নাকি বিদেশে নাগরিকদের আইনি সহায়তা দেওয়ার দায়িত্বে থাকা সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্যও?
একজন নাগরিক বিদেশে অপরাধের অভিযোগে গ্রেপ্তার হলে তিনি যেন অভিযোগ বুঝতে পারেন, আইনজীবীর সহায়তা পাওয়ার সুযোগ পান এবং বিচারপ্রক্রিয়ায় নিজের বক্তব্য উপস্থাপন করতে পারেন—এসব বিষয়ে দূতাবাসের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। মামলার প্রকৃতি ও সংশ্লিষ্ট দেশের আইন অনুযায়ী আইনি সহায়তা, কনস্যুলার যোগাযোগ, পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ এবং আপিল বা দণ্ড লঘু করার সম্ভাবনা যাচাইয়ের জন্য কূটনৈতিক উদ্যোগ নেওয়া যায়। কোনো দেশের আদালতের রায় বাংলাদেশের সরকার ইচ্ছামতো বাতিল করতে পারে না। কিন্তু সেই সীমাবদ্ধতা দেখিয়ে রাষ্ট্রের সম্ভাব্য সব উদ্যোগকে অকার্যকর ধরে নেওয়াও দায়িত্বশীল অবস্থান নয়।
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর বক্তব্যে যে অসহায়তার সুর উঠে এসেছে, তা তাই উদ্বেগজনক। অন্য দেশের আইন ও বিচারব্যবস্থার প্রতি সম্মান দেখানো প্রয়োজন, কিন্তু সেই সম্মান নিজের নাগরিকের অধিকার নিয়ে প্রশ্ন তোলার পথে বাধা হওয়া উচিত নয়। কূটনীতি মানে কেবল সম্পর্ক ভালো রাখা নয়; প্রয়োজনে কঠিন প্রশ্ন করা, তথ্য চাওয়া, আইনি সহায়তার ব্যবস্থা করা এবং নিজের নাগরিকের স্বার্থ রক্ষায় সর্বোচ্চ চেষ্টা করাও কূটনীতির অংশ। সৌদি আরব বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হতে পারে, কিন্তু বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের অর্থ এই নয় যে বাংলাদেশের নাগরিকের জীবন ও মর্যাদার প্রশ্নে সরকার নীরব থাকবে।
এখানে সরকারের ব্যর্থতার প্রশ্নটি কয়েকটি নির্দিষ্ট জায়গায় খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। প্রথমত, বাংলাদেশ দূতাবাস ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কখন মামলাগুলোর বিষয়ে জানতে পেরেছিল, তার স্পষ্ট বিবরণ দিতে হবে। দ্বিতীয়ত, তাঁরা আগে থেকে জানলে আইনি সহায়তা ও কূটনৈতিক যোগাযোগের ক্ষেত্রে কী করা হয়েছিল, তা প্রকাশ করতে হবে। তৃতীয়ত, তাঁরা না জানলে তথ্যপ্রাপ্তি ও নাগরিক সুরক্ষার ব্যবস্থায় কোথায় ঘাটতি ছিল, তা নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা প্রয়োজন। চতুর্থত, ভবিষ্যতে কোনো বাংলাদেশি নাগরিক বিদেশে গুরুতর অপরাধের অভিযোগে গ্রেপ্তার হলে দ্রুত আইনি সহায়তা ও কনস্যুলার যোগাযোগ নিশ্চিত করার কার্যকর ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। এসব প্রশ্নের উত্তর ছাড়া শুধু শোক প্রকাশ বা বৈঠকের ঘোষণা দিয়ে দায়িত্ব শেষ করা যাবে না।
১৮ অক্টোবর সৌদি রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে বৈঠক করে বিস্তারিত তথ্য চাওয়ার বিষয়টি সামনে এসেছে। এটি প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ হতে পারে। তবে এমন উদ্যোগের কার্যকারিতা নির্ভর করবে পরবর্তী পদক্ষেপের ওপর। কী তথ্য পাওয়া গেল, মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আগে বাংলাদেশকে জানানো হয়েছিল কি না, দূতাবাসের সঙ্গে যোগাযোগের সুযোগ ছিল কি না এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের পরিস্থিতি মোকাবিলায় কী পরিবর্তন আনা হবে—এসব বিষয়ে সরকারকে স্বচ্ছ হতে হবে। কূটনৈতিক বৈঠক সংবাদ শিরোনাম তৈরি করতে পারে, কিন্তু জবাবদিহি নিশ্চিত না হলে তা নাগরিকের আস্থা ফিরিয়ে আনতে পারবে না।
সরকারের দায়িত্ব নিয়ে প্রশ্ন ওঠার মধ্যেই নতুন বিতর্ক তৈরি করেছেন বিএনপির সংসদ সদস্য কামরুজ্জামান রতন। একটি টক শোতে সৌদি আরবে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়া দুই বাংলাদেশির মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনার প্রসঙ্গে তিনি তাঁদের ‘পাপের লাশ’ বলে মন্তব্য করেন। এমনকি তিনি বলেন, ওই মরদেহ বাংলাদেশে আসুক, তা তিনি চান না এবং এ বিষয়ে মানবতা দেখাবেন না। পরে নিজের বক্তব্য প্রত্যাহার করে তিনি দুঃখ প্রকাশ করেন ও ক্ষমা চান।
একজন সংসদ সদস্যের মুখে এমন মন্তব্য কেবল দুর্ভাগ্যজনক নয়, এটি জনপ্রতিনিধির দায়িত্ববোধ নিয়েও প্রশ্ন তোলে। সংসদ সদস্য কোনো ব্যক্তিগত আড্ডার অংশগ্রহণকারী নন। তিনি জনগণের ভোটে নির্বাচিত প্রতিনিধি। তাঁর বক্তব্যে যুক্তি, সংযম ও মানবিকতার পরিচয় প্রত্যাশিত। বিশেষ করে যখন দুটি মৃত্যু এবং দুটি পরিবারের অপূরণীয় শোকের বিষয় আলোচনায় আসে, তখন একজন জনপ্রতিনিধির কাছ থেকে আরও দায়িত্বশীল আচরণ কাম্য। কিন্তু সেখানে যদি মৃত মানুষকে অপমান করা হয় এবং তাঁদের পরিবারের অনুভূতিকে উপেক্ষা করা হয়, তবে তা রাজনৈতিক নেতৃত্বের নৈতিক অবস্থানকে দুর্বল করে।
কোনো ব্যক্তি অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হলে তাঁর অপরাধের বিচার হবে আইন অনুযায়ী। কিন্তু অপরাধের অভিযোগ বা দণ্ড একজন মানুষকে মৃত্যুর পর অপমান করার অনুমতি দেয় না। বিচারব্যবস্থার কাজ অপরাধের দায় নির্ধারণ করা, আর রাষ্ট্রের দায়িত্ব আইনসম্মত ও মানবিক আচরণ নিশ্চিত করা। মৃত ব্যক্তির মরদেহ দেশে ফিরবে কি না, সেটি তাঁর পরিবারের শোক, ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক অধিকার এবং সংশ্লিষ্ট আইন ও বাস্তবতার সঙ্গে জড়িত একটি বিষয়। একজন সংসদ সদস্যের ব্যক্তিগত পছন্দ বা ঘৃণা দিয়ে এ বিষয়ে চূড়ান্ত অবস্থান নির্ধারণ করা যায় না।
‘পাপের লাশ’ কথাটির মধ্যেও রয়েছে মানুষকে একক পরিচয়ে চিহ্নিত করে তাঁর মানবিক মর্যাদা অস্বীকার করার প্রবণতা। কোনো ব্যক্তির অপরাধের বিচার হতে পারে, তাঁর কাজের কঠোর সমালোচনাও হতে পারে। কিন্তু সেই সঙ্গে মনে রাখতে হবে, মৃত ব্যক্তির পরিবার তাঁর অপরাধের বিচারক নয়। তাঁরা হয়তো একজন বাবা, স্বামী, ভাই বা সন্তানের মরদেহের অপেক্ষায় আছেন। তাঁদের কাছে বিষয়টি রাজনৈতিক বক্তব্যের উপলক্ষ নয়; এটি প্রিয়জনকে হারানোর বেদনা। সেই শোককে আরও গভীর করে এমন বক্তব্য দেওয়ার আগে একজন জনপ্রতিনিধির অন্তত ভাবা উচিত ছিল।
সবচেয়ে লক্ষণীয় বিষয় হলো, টক শোতে দৃঢ়তার সঙ্গে নিজের অবস্থান তুলে ধরার পর সংসদ সদস্যটি অল্প সময়ের মধ্যে তা প্রত্যাহার করে ক্ষমা চেয়েছেন। ক্ষমা চাওয়া অবশ্যই ইতিবাচক পদক্ষেপ। ভুল বুঝতে পারা এবং বক্তব্য সংশোধন করা দায়িত্বশীলতার অংশ। কিন্তু তাঁর অবস্থান পরিবর্তনের কারণ কী ছিল, তা স্পষ্ট নয়। জনসমালোচনা, দলীয় পরামর্শ কিংবা নিজের উপলব্ধি—যে কারণেই হোক, মূল প্রশ্ন থেকে যায়: এত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে কথা বলার আগে তিনি কেন প্রয়োজনীয় বিবেচনাবোধ দেখালেন না? একজন জনপ্রতিনিধির বক্তব্য কি কেবল প্রচারমাধ্যমে আলোচনার সুযোগ তৈরি করার জন্য, নাকি তা দেওয়ার আগে তার সামাজিক প্রভাব ও মানবিক পরিণতি বিবেচনা করা উচিত?
রাজনীতিতে ভুল হতেই পারে। কিন্তু ভুলের পর ক্ষমা চাওয়াই যথেষ্ট নয়, যদি একই ধরনের কাণ্ডজ্ঞানহীনতা বারবার প্রকাশ পায়। ধর্মীয় আবেগকে সামনে রেখে কাউকে অপমান করা সহজ, কিন্তু ন্যায়বিচার, মানবিকতা ও রাষ্ট্রীয় দায়িত্বের মধ্যে ভারসাম্য রাখা কঠিন। দায়িত্বশীল নেতৃত্বের পরিচয় হলো সেই কঠিন কাজটি করতে পারা। ধর্মের ব্যাখ্যা ব্যক্তিভেদে ভিন্ন হতে পারে, কিন্তু জনপ্রতিনিধির বক্তব্যে মানবিক মর্যাদা ও সংযমের প্রয়োজনীয়তা অস্বীকার করার সুযোগ নেই।
এই ঘটনায় বিরোধী দলগুলোর ভূমিকাও আলোচনার দাবি রাখে। এমন একটি স্পর্শকাতর ঘটনায় রাজনৈতিক দলগুলোর অবস্থান কী, তারা প্রবাসীদের সুরক্ষা এবং সরকারের জবাবদিহি নিয়ে কী দাবি তুলছে, তা জনগণের জানার অধিকার রয়েছে। কোনো দল নীরব থাকলেই তার উদ্দেশ্য সম্পর্কে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না। তবে নাগরিকের জীবন, আইনি সুরক্ষা ও মর্যাদার মতো বিষয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর কাছ থেকে সুস্পষ্ট বক্তব্য প্রত্যাশা করা অন্যায় নয়। জনস্বার্থের প্রশ্নে নীরবতা যদি নিয়মিত রাজনৈতিক কৌশলে পরিণত হয়, তাহলে দলগুলোর ওপর জনগণের আস্থা কমে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি পরিচিত প্রবণতা হলো, দেশের ভেতরে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে কঠোর ভাষা ব্যবহার করা হলেও বিদেশি রাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে নাগরিকের অধিকার নিয়ে জোরালো অবস্থান নেওয়ার সময় অনেকেই সতর্ক হয়ে পড়েন। কূটনৈতিক সম্পর্ক রক্ষা করা জরুরি, কিন্তু সেই সম্পর্কের মূল্য নাগরিকের অধিকার বিসর্জন দিয়ে দেওয়া যায় না। রাষ্ট্রের আত্মমর্যাদা শুধু বক্তৃতা বা জাতীয়তাবাদী স্লোগানে প্রতিষ্ঠিত হয় না; তা প্রতিষ্ঠিত হয় নিজের নাগরিকের বিপদে কার্যকর ভূমিকা পালন, অন্যায়ের বিরুদ্ধে যুক্তিসংগত প্রতিবাদ এবং দায়িত্বশীল আচরণের মাধ্যমে।
সৌদি আরবের সঙ্গে বাংলাদেশের শ্রমবাজার, বাণিজ্য ও কূটনৈতিক সম্পর্ক গুরুত্বপূর্ণ। এই সম্পর্কের গুরুত্ব অস্বীকার করার সুযোগ নেই। একই সঙ্গে বাংলাদেশের বিপুলসংখ্যক কর্মী সৌদি আরবে কাজ করেন। তাঁদের নিরাপত্তা, আইনি অধিকার ও জরুরি পরিস্থিতিতে সহায়তা পাওয়ার নিশ্চয়তা বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই দুই দেশের সম্পর্ককে আরও কার্যকর করার একটি পথ হতে পারে গুরুতর অপরাধের মামলায় গ্রেপ্তার বাংলাদেশিদের বিষয়ে দ্রুত তথ্য আদান-প্রদান, দূতাবাসের সঙ্গে যোগাযোগের কার্যকর ব্যবস্থা এবং আইনি সহায়তার সুযোগ নিয়ে স্পষ্ট প্রটোকল তৈরি করা। এ ধরনের উদ্যোগ দুই দেশের সম্পর্ক নষ্ট করার জন্য নয়, বরং তা আরও দায়িত্বশীল ও বিশ্বাসযোগ্য করার জন্য।
এই মর্মান্তিক ঘটনা থেকে সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় শিক্ষা হওয়া উচিত—প্রবাসী নাগরিকের সুরক্ষা নিয়ে কেবল প্রতিশ্রুতি নয়, কার্যকর ব্যবস্থা প্রয়োজন। দূতাবাসগুলোর সক্ষমতা, জরুরি আইনি সহায়তার ব্যবস্থা, পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ এবং গুরুতর মামলার পর্যবেক্ষণ আরও শক্তিশালী করতে হবে। একই সঙ্গে এই দুই বাংলাদেশির মামলার বিষয়ে কী ঘটেছিল, তা নিয়ে একটি স্বচ্ছ পর্যালোচনা প্রয়োজন। কোথাও অবহেলা বা সমন্বয়ের ঘাটতি থাকলে তা শনাক্ত করতে হবে এবং ভবিষ্যতে যাতে একই ধরনের পরিস্থিতি তৈরি না হয়, সে জন্য ব্যবস্থা নিতে হবে।
রাজনৈতিক নেতাদের জন্যও শিক্ষা কম নয়। জনপ্রতিনিধিত্ব মানে শুধু ক্ষমতা ভোগ করা নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে বিবেক, দায়িত্ব এবং মানুষের প্রতি সম্মান। কোনো সংকটের মুহূর্তে অসংবেদনশীল মন্তব্য করে পরে ক্ষমা চাওয়ার চেয়ে শুরু থেকেই দায়িত্বশীল হওয়া অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। একইভাবে সরকারের কাজ কেবল অন্য দেশের আইনকে অজুহাত হিসেবে তুলে ধরা নয়; বরং সেই আইনের কাঠামোর মধ্যেই নাগরিকের জন্য কী করা সম্ভব, তা খুঁজে বের করা।
সৌদি আরবে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়া দুই বাংলাদেশিকে আর ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয়। তাঁদের পরিবারের শোকও কোনো রাজনৈতিক বক্তব্য দিয়ে দূর করা যাবে না। কিন্তু তাঁদের মৃত্যু যেন কেবল কয়েক দিনের সংবাদ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিতর্ক এবং রাজনৈতিক পাল্টাপাল্টি বক্তব্যে সীমাবদ্ধ না থাকে। এই ঘটনা থেকে যদি নাগরিক সুরক্ষাব্যবস্থা শক্তিশালী করার উদ্যোগ নেওয়া যায়, সরকারের জবাবদিহি নিশ্চিত করা যায় এবং রাজনৈতিক নেতৃত্বের মধ্যে দায়িত্ববোধ তৈরি হয়, তবেই ভবিষ্যতের জন্য কিছু ইতিবাচক পরিবর্তনের সম্ভাবনা থাকবে।
রাষ্ট্রের দায়িত্ব নাগরিকের জীবন রক্ষার চেষ্টা করা, বিপদের সময় পাশে দাঁড়ানো এবং মৃত্যুর পরও তাঁর মর্যাদা ও পরিবারের অধিকারকে সম্মান করা। সরকার যদি সেই দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হয়, তবে তার জবাবদিহি করতে হবে। আর জনপ্রতিনিধিরা যদি শোকের মুহূর্তে মানবিকতার বদলে অবমাননাকর ভাষা বেছে নেন, তবে তাঁদেরও জনগণের প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হবে। প্রবাসীর পাঠানো অর্থ গ্রহণ করবে রাষ্ট্র, কিন্তু বিপদের সময় তাঁর পাশে দাঁড়াবে না—এমন ব্যবস্থা গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। নাগরিক কোনো অর্থ উপার্জনের যন্ত্র নন; তিনি রাষ্ট্রের অধিকারসম্পন্ন সদস্য। তাঁর জীবন, তাঁর মর্যাদা এবং তাঁর পরিবারের শোককে সম্মান করা সরকারের দায়িত্ব, রাজনৈতিক দলের দায়িত্ব এবং শেষ পর্যন্ত একটি সভ্য রাষ্ট্রের পরিচয়।
আপনার মতামত জানানঃ