২০২১ সালের ১৫ আগস্ট। মাত্র কয়েক সপ্তাহের দ্রুত সামরিক অভিযানের পর তালেবান যোদ্ধারা কাবুলে প্রবেশ করে। মার্কিন নেতৃত্বাধীন বিদেশি বাহিনী আফগানিস্তান থেকে প্রত্যাহারের প্রক্রিয়া শেষ করার আগেই দেশটির দীর্ঘদিনের সরকার ভেঙে পড়ে। কাবুল বিমানবন্দরে তখন হাজার হাজার মানুষের মরিয়া দেশত্যাগের চেষ্টা, আর আফগানিস্তানের ভবিষ্যৎ নিয়ে বিশ্বজুড়ে তৈরি হয় গভীর অনিশ্চয়তা।
পাঁচ বছর পর সেই দৃশ্য অনেকটাই দূরের স্মৃতি। তালেবান এখন আর শুধু একটি সশস্ত্র বিদ্রোহী গোষ্ঠী নয়; তারা আফগানিস্তানের কার্যত শাসক। দেশটির প্রশাসন, নিরাপত্তা কাঠামো এবং অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ তাদের নিয়ন্ত্রণে। আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি এখনো সীমিত হলেও বাস্তবতা হলো, বিশ্বের বহু দেশ তালেবান সরকারের সঙ্গে কোনো না কোনোভাবে যোগাযোগ রাখছে। প্রশ্নটি তাই বদলে গেছে। তালেবান ক্ষমতায় থাকবে কি না—এটি এখন আর প্রধান প্রশ্ন নয়। বরং প্রশ্ন হলো, এই শাসনব্যবস্থা আফগানিস্তানকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছে এবং পাঁচ বছরে দেশটির সমাজ, অর্থনীতি ও মানুষের জীবনে কী পরিবর্তন এসেছে?
তালেবান ক্ষমতায় ফিরে আসার পর তাদের শাসনের সবচেয়ে আলোচিত দিক হয়ে উঠেছে নারীদের ওপর আরোপিত বিধিনিষেধ। মেয়েদের মাধ্যমিক শিক্ষা কার্যত বন্ধ। বিশ্ববিদ্যালয়েও নারীদের পড়াশোনার সুযোগ নেই। কর্মক্ষেত্র, চলাফেরা, পোশাক এবং জনজীবনে অংশগ্রহণের ক্ষেত্রেও একের পর এক বিধিনিষেধ এসেছে। ফলে আফগান নারীদের একটি বড় অংশ নিজেদের ঘর, পরিবার কিংবা সীমিত কিছু কর্মক্ষেত্রের মধ্যে আবদ্ধ হয়ে পড়েছেন।
এর প্রভাব বোঝা যায় কাবুলের দক্ষিণে একটি ছোট জ্যাম তৈরির কর্মশালার গল্পে। সেখানে কয়েকজন নারী চেরি ও আলুবোখরার রস থেকে জ্যাম তৈরি করেন, বোতলে লেবেল লাগান এবং নিজেদের দক্ষতা কাজে লাগিয়ে আয় করার চেষ্টা করেন। ৪৭ বছর বয়সী নাজিয়া, নয় সন্তানের মা এবং উদ্যোক্তা হিসেবে এই উদ্যোগ পরিচালনা করছেন। তাঁর মেয়েও সেখানে কাজ করেন এবং অন্য নারীদের প্রশিক্ষণ দেন।
এই ছোট কর্মশালাটি যেন বর্তমান আফগানিস্তানের একটি প্রতিচ্ছবি। নারীদের জন্য যখন স্কুল, বিশ্ববিদ্যালয় ও অনেক পেশাগত ক্ষেত্রের দরজা বন্ধ, তখন ছোট ব্যবসা বা ঘরে বসে কাজ করার মতো কিছু পথ তাদের সামনে এখনো খোলা। কিন্তু সেই পথও ক্রমেই সংকুচিত হচ্ছে। নতুন নিয়ম অনুযায়ী নারীদের উৎপাদিত পণ্য বাজারে নিতে পুরুষের সহায়তা প্রয়োজন হতে পারে এবং বাণিজ্য মেলায় নারীদের নিজের পণ্যের স্টলে বসার সুযোগও সীমিত করা হয়েছে। তালেবানের যুক্তি, নারীদের পোশাক ও মাথা ঢাকার বিধি যথাযথভাবে মানানো প্রয়োজন।
ফলে নারীদের অর্থনৈতিক অংশগ্রহণের যে সামান্য সুযোগ তৈরি হয়েছিল, সেটিও অনিশ্চিত হয়ে পড়ছে। একজন নারী উদ্যোক্তা হিসেবে নাজিয়ার মতো মানুষ শুধু ব্যবসা করছেন না; তারা একই সঙ্গে একটি প্রশ্নও তুলে ধরছেন—একটি দেশের অর্ধেক জনগোষ্ঠীকে যদি শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও সামাজিক অংশগ্রহণ থেকে দূরে রাখা হয়, তাহলে সেই দেশ কীভাবে দীর্ঘমেয়াদে এগোবে?
তালেবান অবশ্য তাদের নীতিকে ইসলামী মূল্যবোধ ও নারীদের নিরাপত্তার সঙ্গে যুক্ত করে ব্যাখ্যা করে। তাদের সর্বোচ্চ নেতা হিবাতুল্লাহ আখুন্দজাদা বিভিন্ন ফরমানের মাধ্যমে সমাজ ও জনজীবন পরিচালনার নির্দেশ দিয়েছেন। এসব নির্দেশের একটি বড় অংশ নারীদের জীবনযাত্রাকে প্রভাবিত করেছে। তালেবানের দৃষ্টিতে এগুলো ধর্মীয় ও সামাজিক শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার অংশ। কিন্তু আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠন, আফগান নারী অধিকারকর্মী এবং পশ্চিমা দেশগুলোর বড় অংশ এসব নীতিকে নারীদের মৌলিক অধিকার হরণের উদাহরণ হিসেবে দেখছে।
তবে তালেবান শাসনের মূল্যায়ন শুধু নারী অধিকার দিয়ে করলে পুরো চিত্র পাওয়া যাবে না। ক্ষমতায় ফেরার পর দেশটি ভয়াবহ অর্থনৈতিক সংকট, বৈদেশিক সহায়তা কমে যাওয়া, খাদ্য ও কর্মসংস্থানের সংকট এবং ধারাবাহিক প্রাকৃতিক দুর্যোগের মুখোমুখি হয়েছে। জাতিসংঘের হিসাবে, আফগানিস্তানের প্রায় অর্ধেক মানুষ কোনো না কোনোভাবে বৈদেশিক সহায়তার ওপর নির্ভরশীল। অর্থাৎ তালেবান সরকার ক্ষমতা ধরে রাখতে পারলেও দেশের অর্থনৈতিক ভিত্তি এখনো দুর্বল।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে প্রতিবেশী পাকিস্তানের সঙ্গে উত্তেজনা, বিভিন্ন দেশ থেকে ফেরত পাঠানো আফগান নাগরিকদের চাপ এবং নানা ধরনের নিরাপত্তা ঝুঁকি। ইসলামিক স্টেটের মতো সশস্ত্র গোষ্ঠীর হামলা পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। তবু তালেবান প্রশাসন দেশটির ওপর নিজেদের নিয়ন্ত্রণ আগের তুলনায় অনেক বেশি শক্তিশালী করেছে। তাদের বিরুদ্ধে সশস্ত্র বিরোধিতা থাকলেও জাতীয় পর্যায়ে এমন কোনো শক্তি এখনো গড়ে ওঠেনি, যা তাদের ক্ষমতাকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ করতে পারে।
অন্যদিকে আন্তর্জাতিক বিচ্ছিন্নতার চিত্রও আগের মতো সরল নয়। প্রথম দিকে অনেক দেশ তালেবান সরকারকে কঠোরভাবে বর্জনের নীতি নিয়েছিল। কিন্তু পাঁচ বছর পর বাস্তবতা অনেক বেশি জটিল। চীন, রাশিয়া, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও উজবেকিস্তানসহ কয়েকটি দেশের সঙ্গে তালেবানের বিভিন্ন অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক যোগাযোগ তৈরি হয়েছে। খনি, জ্বালানি ও অন্যান্য খাতে চুক্তির সম্ভাবনাও বাড়ছে। রাশিয়া আনুষ্ঠানিকভাবে তালেবান সরকারকে স্বীকৃতি দেওয়া প্রথম দেশ হয়েছে।
অবশ্য আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি এখনো বড় প্রশ্ন। তালেবান সরকার জাতিসংঘে আফগানিস্তানের আসন এবং পূর্ণ কূটনৈতিক বৈধতা চায়। কিন্তু নারী অধিকার, সন্ত্রাসবাদ, অন্তর্ভুক্তিমূলক শাসন ও মানবাধিকার নিয়ে আন্তর্জাতিক উদ্বেগের কারণে সেই স্বীকৃতি সহজে আসছে না। তবু বাস্তব কূটনীতি তাদের পুরোপুরি উপেক্ষা করতে পারছে না। কারণ আফগানিস্তানকে বাদ দিয়ে এই অঞ্চলের নিরাপত্তা, অভিবাসন, সন্ত্রাসবাদ, মাদক ও বাণিজ্য নিয়ে কার্যকর নীতি তৈরি করা কঠিন।
এখানেই আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সামনে সবচেয়ে কঠিন প্রশ্নটি তৈরি হয়েছে—তালেবানকে চাপ দিয়ে পরিবর্তন আনা হবে, নাকি তাদের সঙ্গে যোগাযোগ রেখে ধীরে ধীরে পরিবর্তনের চেষ্টা করা হবে?
গত পাঁচ বছরে এই দুই মতের মধ্যে তীব্র বিতর্ক হয়েছে। একদল মনে করে, তালেবানকে স্বাভাবিক কূটনৈতিক সম্পর্ক ও অর্থনৈতিক সুবিধা দিলে তাদের আচরণ আরও কঠোর হওয়ার ঝুঁকি আছে। বিশেষ করে নারীদের শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের মতো বিষয়ে তালেবান যদি কোনো বড় পরিবর্তন না আনে, তাহলে তাদের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করা আন্তর্জাতিক চাপকে দুর্বল করতে পারে।
অন্যদিকে আরেকটি মত হলো, আফগানিস্তানকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন করে রাখলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে সাধারণ মানুষ। দেশটির কোটি কোটি মানুষ খাদ্য, স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের জন্য আন্তর্জাতিক সহায়তার ওপর নির্ভরশীল। সরকারকে বর্জন করতে গিয়ে যদি মানুষের জীবন আরও কঠিন হয়ে যায়, তাহলে সেই নীতি কতটা কার্যকর—সেই প্রশ্নও থাকে।
জাতিসংঘ এই দুই অবস্থানের মাঝামাঝি একটি পথ অনুসরণ করছে। তালেবানের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ পুরোপুরি বন্ধ না করে মানবিক সহায়তা, বন্দিদের সঙ্গে আচরণ, নারী অধিকার, মানবাধিকার, অন্তর্ভুক্তিমূলক শাসন এবং সন্ত্রাসবাদবিরোধী কার্যক্রমসহ বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে। জাতিসংঘের কর্মকর্তাদের মতে, অগ্রগতি ধীর হলেও কোনো ধরনের যোগাযোগ না থাকার চেয়ে ধাপে ধাপে আলোচনা চালিয়ে যাওয়া বেশি কার্যকর।
কিন্তু এই পদ্ধতিরও সমালোচনা রয়েছে। নারী অধিকারকর্মীদের একটি অংশ মনে করেন, বছরের পর বছর আলোচনা হলেও তালেবানের মূল নীতিতে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আসেনি। বরং নতুন নতুন বিধিনিষেধ যুক্ত হয়েছে। ফলে শুধু আলোচনা চালিয়ে গেলে তালেবান কেন তাদের অবস্থান বদলাবে—সেই প্রশ্নের উত্তরও প্রয়োজন।
আফগান নারী অধিকারকর্মী মেহবুবা সিরাজের অভিজ্ঞতা এই হতাশার প্রতীক। দীর্ঘদিন ধরে তিনি নারীদের জন্য আশ্রয়কেন্দ্র পরিচালনা করেছেন এবং তালেবান ক্ষমতায় ফেরার পরও দেশ ছাড়েননি। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তার পরিচালিত আশ্রয়কেন্দ্র বন্ধ হয়ে যায়। মেয়েদের শিক্ষার সুযোগ ফিরিয়ে দেওয়ার আবেদনও কার্যকর হয়নি। তাঁর মতো অনেক নারী অধিকারকর্মীর আশঙ্কা, বিশ্ব ধীরে ধীরে আফগান নারীদের সমস্যা ভুলে যাচ্ছে।
আফগানিস্তানে আন্তর্জাতিক সহায়তা সংস্থাগুলোর কাজও তাই সহজ নয়। তালেবানের বিধিনিষেধের মধ্যে নারীদের কাছে সহায়তা পৌঁছানো, নারী কর্মীদের কাজে রাখা এবং স্থানীয় পর্যায়ে প্রকল্প চালানো অনেক ক্ষেত্রে কঠিন হয়ে উঠেছে। কোথাও নারীরা ঘরে বসে কাজ করছেন, কোথাও পুরুষ সহকর্মীদের থেকে আলাদা জায়গায় কাজ করার ব্যবস্থা করা হচ্ছে। স্থানীয় কর্মকর্তাদের সঙ্গে ব্যক্তিগত সম্পর্ক ও আলোচনার মাধ্যমে অনেক প্রকল্প চালু রাখার চেষ্টা হচ্ছে।
এই বাস্তবতা দেখিয়ে দেয়, তালেবান শাসনের ভেতরেও এক ধরনের বৈপরীত্য রয়েছে। কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের কঠোর নির্দেশনার পাশাপাশি স্থানীয় পর্যায়ে বাস্তব পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার চেষ্টা দেখা যায়। কোথাও স্থানীয় কর্মকর্তারা বাস্তবসম্মত সমাধান খুঁজছেন, আবার কোথাও কেন্দ্রীয় নীতির কঠোর প্রয়োগ হচ্ছে। ফলে আফগানিস্তানের ভবিষ্যৎ শুধু তালেবান বনাম আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দ্বন্দ্ব দিয়ে বোঝা সম্ভব নয়; তালেবানের ভেতরের মতপার্থক্যও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
কিছু তালেবান কর্মকর্তা মেয়েদের শিক্ষা বন্ধ রাখার মতো সিদ্ধান্ত নিয়ে ভিন্নমত পোষণ করেছেন বলে বিভিন্ন সূত্রে উঠে এসেছে। যদিও এসব মতপার্থক্য এখনো সর্বোচ্চ নেতৃত্বের সিদ্ধান্ত পরিবর্তনের মতো শক্তিশালী হয়নি। তালেবানের রাজনৈতিক কাঠামোতে সর্বোচ্চ নেতার নির্দেশ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং তার ফরমানকে চূড়ান্ত হিসেবে দেখা হয়।
তবু পাঁচ বছরের অভিজ্ঞতা একটি বিষয় দেখিয়েছে—শুধু বাইরের চাপ দিয়ে তালেবানের নীতিতে দ্রুত পরিবর্তন আনা কঠিন। আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা, কূটনৈতিক চাপ কিংবা অর্থনৈতিক বিচ্ছিন্নতা তাদের ওপর প্রভাব ফেললেও নারীদের শিক্ষা বা সামাজিক নীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন আনতে পারেনি। বরং তালেবান নিজেদের অভ্যন্তরীণ ঐক্য ও ক্ষমতার নিয়ন্ত্রণ আরও শক্তিশালী করেছে।
তাই ভবিষ্যতের প্রশ্নটি সম্ভবত ‘তালেবানকে কীভাবে পরাজিত করা যায়’—এমন নয়। বরং ‘কীভাবে বাস্তব পরিবর্তনের জন্য কার্যকর চাপ ও যোগাযোগ একসঙ্গে ব্যবহার করা যায়’—সেটিই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সামনে একদিকে মানবাধিকার ও নারী অধিকার রক্ষার নৈতিক দায়িত্ব, অন্যদিকে কোটি কোটি আফগানের মানবিক প্রয়োজন। এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য তৈরি করা সহজ নয়।
আফগানিস্তানকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন করলে তালেবান দুর্বল হবে—এমন নিশ্চয়তা নেই। আবার সম্পর্ক স্বাভাবিক করলে তারা নিজেদের নীতি বদলাবে—এমন নিশ্চয়তাও নেই। ফলে প্রয়োজন হতে পারে শর্তযুক্ত যোগাযোগের একটি কাঠামো, যেখানে মানবিক সহায়তা অব্যাহত থাকবে, কিন্তু রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্কের প্রতিটি ধাপে দৃশ্যমান পরিবর্তনের শর্ত রাখা হবে।
বিশেষ করে মেয়েদের শিক্ষা, নারীদের কর্মসংস্থান, মানবাধিকার, অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রশাসন এবং সন্ত্রাসবাদ দমনের মতো বিষয়ে পরিমাপযোগ্য অগ্রগতি ছাড়া পূর্ণ স্বাভাবিকীকরণ কতটা যুক্তিসঙ্গত—তা নিয়ে আন্তর্জাতিক ঐকমত্য তৈরি করা জরুরি।
পাঁচ বছর আগে তালেবান কাবুল দখল করার সময় আফগানিস্তানকে ঘিরে বিশ্বে যে আতঙ্ক ও মনোযোগ তৈরি হয়েছিল, আজ তা অনেকটাই কমে গেছে। ইউক্রেন যুদ্ধ, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত এবং অন্যান্য বৈশ্বিক সংকট আন্তর্জাতিক মনোযোগের বড় অংশ দখল করেছে। কিন্তু আফগানিস্তানের সংকট শেষ হয়নি। বরং এটি ধীরে ধীরে এমন এক বাস্তবতায় পরিণত হয়েছে, যেখানে একটি সরকার ক্ষমতায় স্থিতিশীল, কিন্তু তার জনগণের বড় অংশ এখনো অর্থনৈতিক ও সামাজিক অনিশ্চয়তার মধ্যে।
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে ঘিরে। একটি দেশের মেয়েরা যদি বছরের পর বছর মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা থেকে দূরে থাকে, তাহলে তার সামাজিক ও অর্থনৈতিক মূল্য কতটা হবে? আজকের সিদ্ধান্তের প্রভাব হয়তো আগামী এক বা দুই বছরে পুরোপুরি বোঝা যাবে না। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে শিক্ষাবঞ্চিত একটি প্রজন্ম আফগানিস্তানের মানবসম্পদ, অর্থনীতি ও সামাজিক কাঠামোর ওপর গভীর প্রভাব ফেলতে পারে।
তবু আফগানদের মধ্যে আশার জায়গা পুরোপুরি হারিয়ে যায়নি। ছোট ব্যবসা, স্থানীয় শিক্ষা, ঘরে বসে কাজ, সামাজিক উদ্যোগ এবং নানা ধরনের সীমিত কর্মসংস্থানের মাধ্যমে অনেকে নিজেদের ভবিষ্যৎ ধরে রাখার চেষ্টা করছেন। নাজিয়ার জ্যাম তৈরির কর্মশালাও তার একটি উদাহরণ। নানা বিধিনিষেধের মধ্যেও তিনি ও তার সহকর্মীরা কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন।
তালেবান শাসনের পাঁচ বছর তাই একদিকে ক্ষমতার স্থায়িত্বের গল্প, অন্যদিকে অপূর্ণ প্রতিশ্রুতি ও গভীর সংকটের গল্প। তালেবান নিজেদের নিয়ন্ত্রণ সুসংহত করেছে, কিছু আন্তর্জাতিক সম্পর্ক তৈরি করেছে এবং রাষ্ট্রের প্রশাসনিক কাঠামো ধরে রেখেছে। কিন্তু নারীদের অধিকার, শিক্ষার সুযোগ, অর্থনৈতিক দুর্বলতা এবং আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির প্রশ্ন এখনো অমীমাংসিত।
আফগানিস্তানের ভবিষ্যৎ শেষ পর্যন্ত শুধু কাবুলের ক্ষমতাকেন্দ্র বা বিদেশি রাজধানীগুলোর আলোচনায় নির্ধারিত হবে না। এর বড় অংশ নির্ভর করবে আফগান সমাজের ভেতরে পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা কতটা শক্তিশালী হয়, তালেবানের অভ্যন্তরে বাস্তববাদী মত কতটা জায়গা করে নেয় এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় চাপ ও সংলাপের মধ্যে কী ধরনের ভারসাম্য তৈরি করতে পারে তার ওপর।
পাঁচ বছর পর তাই সবচেয়ে কঠিন সত্যটি হলো—তালেবানকে উপেক্ষা করে আফগানিস্তানের সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়, আবার তালেবানের সব নীতি মেনে নিয়েও আফগান জনগণের ভবিষ্যৎ নিরাপদ করা যাবে না। পরিবর্তনের পথ হয়তো দীর্ঘ, ধীর এবং জটিল। কিন্তু সেই পথের কেন্দ্রে যদি আফগান মানুষের অধিকার, শিক্ষা, নিরাপত্তা ও মর্যাদা না থাকে, তাহলে যে কোনো কূটনৈতিক সাফল্যই শেষ পর্যন্ত অসম্পূর্ণ থেকে যাবে।
আপনার মতামত জানানঃ