দুই সপ্তাহ ধরে প্রতি রাতে ইরানে বোমাবর্ষণ করেও কেন হঠাৎ থেমে গেল যুক্তরাষ্ট্র? সামরিক শক্তি না কূটনৈতিক চাপ—কোনটি আসলে সিদ্ধান্ত পাল্টে দিলো ডোনাল্ড ট্রাম্পের?
সংঘাত যেভাবে ফিরে এলো
২০২৬ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যৌথভাবে ইরানে বিমান হামলা চালিয়ে দেশটির সর্বোচ্চ নেতা আলী খামেনিসহ বহু কর্মকর্তাকে হত্যা করে। এর জবাবে ইরান মার্কিন ঘাঁটি, ইসরায়েল ও আঞ্চলিক মিত্রদের ওপর পাল্টা হামলা চালায় এবং হরমুজ প্রণালী বন্ধ করে দেয়, যা বিশ্ববাণিজ্যে বড় ধাক্কা দেয়। প্রায় পাঁচ সপ্তাহের লড়াইয়ের পর ৭-৮ এপ্রিল পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতি হয়। কিন্তু হরমুজ প্রণালীতে প্রবেশাধিকার নিয়ে বিরোধ থেকেই যায়, আর ৭ জুলাই ট্রাম্প ঘোষণা দেন যে তিনি এই যুদ্ধবিরতিকে আর কার্যকর মনে করছেন না।
এরপর থেকে টানা ১৩ রাত যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড (CENTCOM) ইরানের সামরিক স্থাপনায় হামলা চালানোর কথা জানায়। জুনের শেষ থেকে এই সংঘাতে ইরানে অন্তত ৫৯ জন নিহত ও ৬৬৬ জন আহত হয়েছেন বলে দেশটির স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, আর পেন্টাগনের তথ্যমতে সাম্প্রতিক ইরানি হামলায় অন্তত চারজন মার্কিন সেনা সদস্য নিহত হয়েছেন।
২৫ জুলাই: হঠাৎ যে বিরতি
শুক্রবার রাতে প্রথমবারের মতো যুক্তরাষ্ট্র নতুন কোনো হামলার ঘোষণা দেয়নি। প্রতিরক্ষা বিভাগের একটি সূত্র সিএনএনকে জানিয়েছে, অভিযান আপাতত “স্থগিত” রাখা হয়েছে। হোয়াইট হাউসের এক বৈঠকে ট্রাম্প যখন সংঘাত আরও বাড়ানোর সম্ভাবনা বিবেচনা করছিলেন, তখন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স এবং জয়েন্ট চিফস অব স্টাফের চেয়ারম্যান জেনারেল ড্যান কেইন উদ্বেগ প্রকাশ করেন।
সূত্রমতে, জেনারেল কেইন নির্দিষ্টভাবে যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্রভাণ্ডার (munitions stockpile) নিয়ে সতর্ক করেন—তিনি জানান, প্রেসিডেন্টের চাওয়া পদক্ষেপ কার্যকর করা সম্ভব, তবে এর সম্ভাব্য নেতিবাচক পরিণতিও আছে। যুদ্ধ শুরুর আগেও সামরিক নেতারা ট্রাম্পকে সতর্ক করেছিলেন যে দীর্ঘস্থায়ী সামরিক অভিযান যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্রভাণ্ডারে চাপ ফেলতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি ভাষ্য
হোয়াইট হাউসের যোগাযোগ পরিচালক স্টিভেন চিউং বিবৃতিতে বলেন, প্রেসিডেন্ট বরাবরই কূটনৈতিক সমাধানকে অগ্রাধিকার দেন, তবে ইরান হরমুজ প্রণালীতে বা মিত্রদের বিরুদ্ধে “সন্ত্রাসী তৎপরতা” চালিয়ে গেলে সব বিকল্প খোলা রাখা হবে। তিনি সফল নিষেধাজ্ঞা এবং “১৩ দিনের হামলা”-কে ইরানকে আলোচনার টেবিলে ফেরানোর চাপ হিসেবে তুলে ধরেন। অর্থাৎ প্রশাসনের সরকারি ভাষ্যে বিরতিকে “থেমে যাওয়া” নয় বরং কৌশলগত চাপ হিসেবে দেখানো হচ্ছে।
সংঘাত সম্প্রসারণের ঝুঁকি
একই সময়ে সংঘাত আরও ছড়িয়ে পড়ার লক্ষণ দেখা যাচ্ছে। ইরান-সমর্থিত হুথি বিদ্রোহীরা লোহিত সাগরে সৌদি স্থাপনায় হামলার কথা জানিয়েছে, আর সৌদি আরব এর জবাবে ইয়েমেনে পাল্টা হামলা চালিয়েছে। জুনের শেষ দিকে কাতার তার উপকূলীয় জলসীমায় সব ধরনের নৌ চলাচল সাময়িকভাবে বন্ধ রেখেছিল। এই বিস্তৃত হতে থাকা ফ্রন্ট যুক্তরাষ্ট্রের নীতিনির্ধারকদের মধ্যে আরও সতর্কতার জন্ম দিয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে।
কেন এটি গুরুত্বপূর্ণ
পেন্টাগনের মুখপাত্র শন পারনেল দাবি করেছেন যে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর “সবকিছু আছে”, তবে সিএনএনের প্রতিবেদন বলছে মূল অস্ত্রভাণ্ডার উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে এবং হামলা অব্যাহত থাকলে তাতে আরও চাপ পড়তে পারে। ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ মহল বা পেন্টাগনের ভেতরেও অনেকে মনে করছেন না যে আরও বাড়ানো হলে তা কাঙ্ক্ষিত ফল দেবে। ফলে এই বিরতি নিছক কূটনৈতিক সদিচ্ছার প্রতিফলন নয়—বরং সামরিক সক্ষমতার বাস্তব সীমাবদ্ধতা, মার্কিন সেনা হতাহতের রাজনৈতিক মূল্য এবং আঞ্চলিক সংঘাত আরও ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি—এই তিনটি বিষয় একসঙ্গে মিলেই সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলেছে বলে ধারণা করা যায়।
তবে যুক্তরাষ্ট্র বা ইরান—কোনো পক্ষই মৌখিকভাবে কূটনীতিতে ফেরার ঘোষণা দেয়নি, আর ইরান দাবি করেছে ইরাকের মধ্যস্থতায় প্রস্তাবিত একটি যুদ্ধবিরতি প্রস্তাব যুক্তরাষ্ট্রই প্রত্যাখ্যান করেছে। তাই এই বিরতি স্থায়ী যুদ্ধবিরতি, নাকি সাময়িক পুনর্বিন্যাস—তা এখনো অস্পষ্ট।
পরবর্তী নজর রাখার বিষয়
আগামী দিনগুলোতে দেখার বিষয় হলো, এই বিরতি সাময়িক নাকি দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধবিরতির দিকে গড়ায়। পাশাপাশি নজর রাখা দরকার হুথি-সৌদি নতুন ফ্রন্ট আরও বিস্তৃত হয় কিনা এবং তা হরমুজ প্রণালীর বাণিজ্য পরিস্থিতিতে কী প্রভাব ফেলে। এছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে—বিশেষত সামরিক ব্যয় ও অস্ত্রভাণ্ডার নিয়ে কংগ্রেসে কোনো বিতর্ক দানা বাঁধে কিনা, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণের বিষয়।
আপনার মতামত জানানঃ