বাংলাদেশে বর্ষাকাল নতুন কিছু নয়। প্রতি বছরই মৌসুমি বৃষ্টিপাত দেশের নদী-নালা, খাল-বিল ও জনজীবনে প্রভাব ফেলে। কিন্তু চলতি বছরের পরিস্থিতি সাধারণ বর্ষার সীমা ছাড়িয়ে একটি বড় মানবিক ও পরিবেশগত সংকটে রূপ নিয়েছে। দেশের প্রায় সব অঞ্চলে টানা মাঝারি থেকে অতি ভারী বৃষ্টিপাতের কারণে একদিকে যেমন জলাবদ্ধতা ও বন্যা দেখা দিয়েছে, অন্যদিকে পাহাড়ি ঢল, ভূমিধস, নদীর পানি বৃদ্ধি এবং অবকাঠামোগত ক্ষয়ক্ষতি মানুষের দুর্ভোগকে আরও বাড়িয়ে তুলেছে। আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, সক্রিয় মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে দেশের বিভিন্ন বিভাগে ভারী থেকে অতি ভারী বর্ষণ অব্যাহত থাকতে পারে। একই সঙ্গে বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র জানিয়েছে, কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ নদীর পানি ইতোমধ্যে বিপদসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে এবং আগামী দিনগুলোতে পরিস্থিতি আরও অবনতির আশঙ্কা রয়েছে। ফলে দেশের উত্তরাঞ্চল, উত্তর-পূর্বাঞ্চল এবং উপকূলসংলগ্ন এলাকার লাখো মানুষ নতুন করে উদ্বেগের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন।
গত এক সপ্তাহেরও বেশি সময় ধরে চলমান বৃষ্টিপাত প্রথমে পার্বত্য চট্টগ্রামে ভয়াবহ পরিস্থিতির সৃষ্টি করে। পাহাড়ি ঢল ও ভূমিধসে বহু মানুষের প্রাণহানি ঘটে এবং অসংখ্য পরিবার ঘরবাড়ি হারিয়ে আশ্রয়কেন্দ্রে যেতে বাধ্য হয়। এরপর ধীরে ধীরে একই বৃষ্টির প্রভাব দেশের অন্যান্য অঞ্চলেও ছড়িয়ে পড়ে। রাজধানী ঢাকাসহ বিভিন্ন জেলা শহরে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে। অনেক এলাকায় রাস্তাঘাট তলিয়ে যাওয়ায় যান চলাচল ব্যাহত হয়েছে, কর্মজীবী মানুষ সময়মতো কর্মস্থলে পৌঁছাতে পারেননি এবং শিক্ষার্থীদেরও চরম ভোগান্তি পোহাতে হয়েছে। কোথাও কোথাও বাসাবাড়িতে পানি ঢুকে পড়ায় মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, টানা ভারী বৃষ্টিপাতের সঙ্গে নদীর উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল যুক্ত হওয়ায় বন্যার ঝুঁকি আরও বেড়ে যায়। উত্তরাঞ্চলের তিস্তা ও দুধকুমার নদীর পানি দ্রুত বৃদ্ধি পাওয়ায় কয়েকটি স্থানে স্বল্পমেয়াদি বন্যার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। একইভাবে সিলেট ও সুনামগঞ্জ অঞ্চলের সুরমা ও কুশিয়ারা নদীর পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় নদীসংলগ্ন এলাকার মানুষ নতুন করে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছেন। যদিও দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের কয়েকটি নদীর পানি কিছুটা কমতে শুরু করেছে, তবুও সামগ্রিকভাবে দেশের বন্যা পরিস্থিতিকে এখনো ঝুঁকিপূর্ণ বলেই বিবেচনা করা হচ্ছে।
দুর্যোগের সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়েছে সাধারণ মানুষের জীবনে। নিম্নাঞ্চলের অনেক পরিবার তাদের বসতবাড়ি ছেড়ে আশ্রয়কেন্দ্রে যেতে বাধ্য হয়েছে। কৃষিজমি পানির নিচে তলিয়ে যাওয়ায় ফসলের ক্ষতির আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। অনেক স্থানে মাছের ঘের ও পুকুর ভেসে গেছে। গবাদিপশুর খাদ্য সংকটও দেখা দিয়েছে। গ্রামীণ অর্থনীতি মূলত কৃষিনির্ভর হওয়ায় এই ক্ষতির দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব স্থানীয় মানুষের আয় ও জীবনযাত্রার ওপর পড়বে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
শুধু অর্থনৈতিক ক্ষতিই নয়, জনস্বাস্থ্যও এখন বড় উদ্বেগের বিষয়। বন্যার পানির কারণে বিশুদ্ধ পানির সংকট, ডায়রিয়া, চর্মরোগ এবং পানিবাহিত রোগের ঝুঁকি বেড়েছে। এর পাশাপাশি বন্যাকবলিত এলাকায় সাপের উপদ্রবও বৃদ্ধি পেয়েছে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, চট্টগ্রাম জেলায় ইতোমধ্যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মানুষ সাপের কামড়ে আক্রান্ত হয়েছেন। তবে সরকার জানিয়েছে, পর্যাপ্ত অ্যান্টিভেনম মজুত রয়েছে এবং আক্রান্তদের দ্রুত চিকিৎসা দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে। একই সঙ্গে বন্যাকবলিত জেলাগুলোতে স্বাস্থ্যকর্মীদের ছুটি বাতিল করে জরুরি চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পানি বিশুদ্ধকরণ ট্যাবলেট, ওরস্যালাইন এবং প্রয়োজনীয় ওষুধও মাঠপর্যায়ে সরবরাহ করা হচ্ছে।
প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময়ে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকে শিশু, বয়স্ক ব্যক্তি, গর্ভবতী নারী এবং দীর্ঘমেয়াদি রোগে আক্রান্ত মানুষ। নিরাপদ আশ্রয়, বিশুদ্ধ পানি এবং পর্যাপ্ত পুষ্টিকর খাবারের অভাব তাদের জন্য পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে। অনেক শিশু বিদ্যালয়ে যেতে পারছে না। কোথাও কোথাও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান আশ্রয়কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। আবার চট্টগ্রাম অঞ্চলে জলাবদ্ধতা ও ভূমিধসের কারণে এইচএসসি পরীক্ষার কয়েকটি তারিখের পরীক্ষা স্থগিত করতে হয়েছে। যদিও দেশের অন্যান্য শিক্ষা বোর্ডে পূর্বনির্ধারিত সূচি অনুযায়ী পরীক্ষা চলছে, তবুও ক্ষতিগ্রস্ত শিক্ষার্থীদের জন্য এটি মানসিক চাপের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব বাংলাদেশে ক্রমেই স্পষ্ট হয়ে উঠছে। অতীতে যে ধরনের ভারী বৃষ্টিপাত কয়েক বছর পরপর দেখা যেত, এখন তা প্রায় প্রতিবছরই ঘটছে। অল্প সময়ের মধ্যে অতিরিক্ত বৃষ্টিপাতের ফলে শহরের ড্রেনেজ ব্যবস্থা ভেঙে পড়ছে এবং গ্রামাঞ্চলে নদীর পানি দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। অপরিকল্পিত নগরায়ণ, খাল-নদী দখল এবং জলাধার ভরাটের কারণে বৃষ্টির পানি দ্রুত নিষ্কাশনের সুযোগ কমে গেছে। ফলে রাজধানীসহ বড় শহরগুলোতে সামান্য সময়ের বৃষ্টিতেই জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হচ্ছে।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় সরকারের পাশাপাশি স্থানীয় প্রশাসন, সেনাবাহিনী, স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন এবং সাধারণ মানুষও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন। বিভিন্ন এলাকায় ত্রাণ বিতরণ, উদ্ধার কার্যক্রম এবং আশ্রয়কেন্দ্র পরিচালনা অব্যাহত রয়েছে। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু তাৎক্ষণিক ত্রাণ কার্যক্রম নয়, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনাও জরুরি। নদী খনন, কার্যকর পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা, পাহাড় সংরক্ষণ, বন উজাড় বন্ধ এবং জলবায়ু সহনশীল অবকাঠামো নির্মাণ ছাড়া ভবিষ্যতে এ ধরনের দুর্যোগের ক্ষতি কমানো কঠিন হবে।
বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ দেশ। ভৌগোলিক অবস্থান, বিস্তীর্ণ নদী ব্যবস্থা এবং নিম্নভূমির কারণে প্রাকৃতিক দুর্যোগ এখানে নতুন নয়। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে দুর্যোগের তীব্রতা ও ঘনত্ব বাড়ছে। তাই শুধু দুর্যোগের পর ক্ষয়ক্ষতি মোকাবিলা করলেই হবে না; প্রয়োজন আগাম সতর্কতা, বৈজ্ঞানিক পরিকল্পনা এবং পরিবেশবান্ধব উন্নয়ন নীতি। একই সঙ্গে জনগণের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি, দুর্যোগ প্রস্তুতি বিষয়ে প্রশিক্ষণ এবং স্থানীয় পর্যায়ে স্বেচ্ছাসেবী নেটওয়ার্ক শক্তিশালী করাও সময়ের দাবি।
বর্তমান পরিস্থিতি আমাদের আবারও মনে করিয়ে দেয়, প্রকৃতির সঙ্গে ভারসাম্য রক্ষা না করলে ভবিষ্যতের সংকট আরও গভীর হতে পারে। টানা বৃষ্টি, বন্যা, ভূমিধস ও জলাবদ্ধতা শুধু একটি মৌসুমি সমস্যা নয়; এটি জলবায়ু পরিবর্তনের বাস্তব প্রভাবেরও প্রতিফলন। তাই সরকার, স্থানীয় প্রশাসন, উন্নয়ন সংস্থা এবং সাধারণ মানুষ—সবাইকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। দুর্যোগ মোকাবিলায় আগাম প্রস্তুতি, দ্রুত উদ্ধার, কার্যকর পুনর্বাসন এবং পরিবেশ সংরক্ষণের সমন্বিত উদ্যোগই পারে ভবিষ্যতে এমন সংকটের ক্ষতি অনেকাংশে কমিয়ে আনতে। বাংলাদেশের মানুষ বহু প্রতিকূলতা অতিক্রম করে এগিয়ে যাওয়ার ইতিহাস তৈরি করেছে। সেই অভিজ্ঞতা, পরিকল্পনা এবং সম্মিলিত প্রচেষ্টাই বর্তমান দুর্যোগ মোকাবিলায় সবচেয়ে বড় শক্তি হয়ে উঠতে পারে।
আপনার মতামত জানানঃ