‘জঙ্গলে থাকার চেয়ে মেয়েকে নিয়ে রাস্তায় ঘুমানো বেশি ভয়ঙ্কর’—এই একটি বাক্যই যেন ভারতের রাজধানী দিল্লির হাজারো গৃহহীন নারী ও শিশুর জীবনের নির্মম বাস্তবতাকে সামনে নিয়ে আসে। সাধারণভাবে রাজধানী শহরকে উন্নয়ন, সুযোগ-সুবিধা ও নিরাপত্তার প্রতীক হিসেবে দেখা হলেও, সেই শহরের ফুটপাথে রাত কাটানো মানুষের কাছে প্রতিটি রাতই এক অনিশ্চয়তা, আতঙ্ক ও বেঁচে থাকার লড়াই। সম্প্রতি দিল্লির মেহরৌলি এলাকায় ফুটপাথে ঘুমন্ত এক কিশোরীকে অপহরণ, ধর্ষণ ও হত্যার অভিযোগ নতুন করে গৃহহীন নারী ও শিশুদের নিরাপত্তার প্রশ্ন সামনে এনে দিয়েছে। ঘটনাটি শুধু একটি অপরাধের বিবরণ নয়; এটি একটি বৃহত্তর সামাজিক সংকটের প্রতিফলন।
দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে কাজের সন্ধানে হাজারো মানুষ প্রতিদিন দিল্লিতে আসেন। অনেকেই অস্থায়ী বা স্থায়ীভাবে থাকার জায়গা জোগাড় করতে পারেন না। বাধ্য হয়ে তারা রাস্তার ধারে, ফুটপাথে, উড়ালসেতুর নিচে কিংবা খোলা আকাশের নিচে বসবাস শুরু করেন। তাদের কাছে দিন মানে জীবিকার সংগ্রাম, আর রাত মানেই নিরাপত্তাহীনতার সঙ্গে যুদ্ধ। বৃষ্টি, প্রচণ্ড গরম কিংবা শীতের পাশাপাশি সবচেয়ে বড় ভয় হয়ে দাঁড়ায় যৌন হয়রানি, ধর্ষণ, অপহরণ ও সহিংসতা।
ফুটপাথে বসবাসকারী নারীদের অভিজ্ঞতা শুনলে বোঝা যায়, তাদের জীবনের সবচেয়ে কঠিন সময় রাত। দিনের বেলা তারা বেলুন বিক্রি করেন, ফুল গাঁথেন, মূর্তি তৈরি করেন কিংবা অন্য কোনো ছোটখাটো কাজে যুক্ত থাকেন। কিন্তু সূর্য ডুবে গেলে শুরু হয় অন্য এক বাস্তবতা। অপরিচিত লোকজনের অশ্লীল মন্তব্য, মাতালদের উৎপাত, হঠাৎ কাছে এসে বসে পড়া কিংবা ঘুমন্ত অবস্থায় শ্লীলতাহানির চেষ্টা—এসব যেন তাদের জীবনের নিত্যদিনের ঘটনা। অনেকেই জানান, গভীর ঘুম তাদের জন্য বিলাসিতা। কারণ একবার ঘুমিয়ে পড়লে কখন কী ঘটে যাবে, তার কোনো নিশ্চয়তা নেই।
সবচেয়ে অসহায় অবস্থায় থাকে শিশু ও কিশোরীরা। অনেক মা বাধ্য হয়ে সন্তানকে আত্মীয়স্বজনের কাছে রেখে আসেন, কারণ ফুটপাথে বড় হওয়া মানে প্রতিনিয়ত ঝুঁকির মধ্যে বেড়ে ওঠা। যাদের সেই সুযোগও নেই, তারা সন্তানকে বুকের সঙ্গে জড়িয়ে ঘুমান। অনেক পরিবার পালা করে ঘুমায়—একজন জেগে থাকে, অন্যজন বিশ্রাম নেয়। কারণ সবাই একসঙ্গে ঘুমিয়ে পড়লে শিশুকে অপহরণ কিংবা নারীদের ওপর হামলার আশঙ্কা বেড়ে যায়। এমন জীবন কেবল শারীরিক কষ্ট নয়, মানসিকভাবেও মানুষকে ভেঙে দেয়।
দিল্লির অনেক গৃহহীন পরিবার বছরের পর বছর একই ফুটপাথে বাস করলেও তাদের কোনো স্থায়ী ঠিকানা নেই। তারা কখনো অস্থায়ীভাবে ত্রিপল টাঙিয়ে আশ্রয় বানানোর চেষ্টা করেন, আবার কখনো প্রশাসনের উচ্ছেদ অভিযানে সব হারান। ফলে প্রতিবারই নতুন করে জীবন শুরু করতে হয়। দিনের সামান্য আয় দিয়ে খাবার জোগাড় করাই যেখানে কঠিন, সেখানে বাড়িভাড়া দেওয়া তাদের কাছে কল্পনার বিষয়। তাই নিরাপদ আশ্রয়ের চেয়ে খোলা ফুটপাথই অনেকের কাছে একমাত্র বাস্তবতা হয়ে দাঁড়ায়।
সমাজকর্মীরা বলছেন, গৃহহীন নারী ও শিশুরা যৌন সহিংসতার সবচেয়ে বড় ঝুঁকিতে থাকেন। অনেক ঘটনা প্রকাশই পায় না। কারণ ভুক্তভোগীরা অভিযোগ করতে জানেন না, পুলিশের কাছে যাওয়ার সাহস পান না, কিংবা মনে করেন অভিযোগ করেও কোনো লাভ হবে না। ফলে বহু নির্যাতনের ঘটনা অন্ধকারেই থেকে যায়। বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘদিন ধরে একই ধরনের সহিংসতার শিকার হতে হতে অনেকেই এটিকে নিজেদের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে মেনে নিতে বাধ্য হন। এটি শুধু আইনের ব্যর্থতা নয়, সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থারও বড় সংকেত।
আশ্রয়কেন্দ্র থাকলেও অনেক গৃহহীন পরিবার সেখানে যেতে চান না। তাদের অভিযোগ, অনেক আশ্রয়কেন্দ্রে পর্যাপ্ত নিরাপত্তা নেই, পরিবেশও স্বস্তিদায়ক নয়। কোথাও অতিরিক্ত ভিড়, কোথাও ঝগড়া-বিবাদ, আবার কোথাও ব্যক্তিগত গোপনীয়তার অভাব। ফলে খোলা ফুটপাথের ঝুঁকি জেনেও অনেকে সেখানেই থাকতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। তবে সমাজকর্মীদের মতে, আশ্রয়কেন্দ্রগুলোর মানোন্নয়ন এবং মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনতে না পারলে এই সংকট আরও গভীর হবে।
পুলিশ বলছে, সাম্প্রতিক ঘটনার পর টহল বাড়ানো হয়েছে এবং নিরাপত্তা জোরদারের চেষ্টা চলছে। অভিযুক্তকে দ্রুত গ্রেপ্তারের কথাও জানানো হয়েছে। তবে শুধু অপরাধী গ্রেপ্তার করলেই সমস্যার সমাধান হবে না। কারণ মূল সংকট হলো নিরাপদ বাসস্থানের অভাব, দারিদ্র্য, সামাজিক বৈষম্য এবং গৃহহীন মানুষের প্রতি দীর্ঘদিনের অবহেলা। অপরাধ সংঘটিত হওয়ার পর ব্যবস্থা নেওয়ার চেয়ে অপরাধ প্রতিরোধে কার্যকর পদক্ষেপ অনেক বেশি জরুরি।
দিল্লিতে ঠিক কতজন গৃহহীন মানুষ বাস করেন, তার নির্ভুল সরকারি হিসাব নেই। তবে বিভিন্ন সংগঠনের ধারণা, এই সংখ্যা কয়েক লাখে পৌঁছেছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য অংশ নারী ও শিশু। জনসংখ্যা বৃদ্ধি, কর্মসংস্থানের খোঁজে শহরমুখী মানুষের চাপ, উচ্চ বাড়িভাড়া এবং নগর পরিকল্পনার সীমাবদ্ধতা এই সমস্যাকে আরও জটিল করে তুলেছে। ফলে প্রতিদিনই নতুন মানুষ যুক্ত হচ্ছেন ফুটপাথের জীবনে।
এই বাস্তবতা শুধু ভারতের নয়; বিশ্বের অনেক বড় শহরেই গৃহহীন মানুষের সংখ্যা বাড়ছে। কিন্তু একটি সভ্য সমাজে কোনো শিশুর শৈশব যদি ফুটপাথে কাটে, কোনো মা যদি রাতভর সন্তানকে আঁকড়ে ধরে আতঙ্কে জেগে থাকেন, কিংবা কোনো পরিবার যদি নিরাপত্তার বদলে শুধু বেঁচে থাকার চিন্তায় দিন কাটায়—তবে সেটি শুধু মানবিক নয়, সামাজিক ও নীতিগত সংকটও বটে।
একটি শহরের উন্নয়ন কেবল উঁচু ভবন, প্রশস্ত সড়ক কিংবা আধুনিক অবকাঠামো দিয়ে পরিমাপ করা যায় না। সেই শহরের সবচেয়ে দুর্বল ও অসহায় মানুষ কতটা নিরাপদ, সেটিও উন্নয়নের অন্যতম মানদণ্ড। দিল্লির ফুটপাথে বসবাসকারী নারী ও শিশুদের জীবন আমাদের মনে করিয়ে দেয়, মাথার ওপর একটি ছাদ শুধু আশ্রয় নয়—এটি নিরাপত্তা, মর্যাদা ও মানবাধিকারের প্রতীক। গৃহহীন মানুষের জন্য নিরাপদ আবাসন, কার্যকর সামাজিক সুরক্ষা, সহজলভ্য আশ্রয়কেন্দ্র, নারী ও শিশুদের জন্য বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং আইনের কঠোর প্রয়োগ নিশ্চিত করা না গেলে এমন মর্মান্তিক ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঠেকানো কঠিন হবে। উন্নয়নের আলো তখনই সত্যিকার অর্থে সবার কাছে পৌঁছাবে, যখন রাজধানীর ফুটপাথে ঘুমানো কোনো মা আর এই কথা বলতে বাধ্য হবেন না—’জঙ্গলে থাকার চেয়ে মেয়েকে নিয়ে রাস্তায় ঘুমানো বেশি ভয়ঙ্কর’।
আপনার মতামত জানানঃ