
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সম্প্রতি আলোড়ন তুলেছে এক মিছিলের ভিডিও। সেখানে স্লোগান—‘নো আর্জেন্টিনা নো ব্রাজিল, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’। হাতে কালেমা-অঙ্কিত সাদাকালো পতাকা নিয়ে রাস্তায় নেমেছেন তারা। শুধু রাজধানী নয়, নারায়ণগঞ্জের শিবু মার্কেট থেকে লালমনিরহাটের হাতিবান্ধা পর্যন্ত প্রসারিত হয়েছে এই পতাকার উপস্থিতি। বিভিন্ন জায়গায় ছোট ছোট সমাবেশের ছবিও ভাইরাল হচ্ছে।
প্রশ্ন উঠছে—ফুটবল আর ধর্মকে কেন জড়িয়ে ফেলা হচ্ছে? কারা এই আয়োজনের পিছনে? তাঁরা কি নিছক ধর্মীয় আবেগ থেকে কাজ করছেন, নাকি কোনো সুপরিকল্পিত দেশি–বিদেশি চক্রের অংশ? ঘটনার গভীরতা বুঝতে গেলে এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খোঁজা জরুরি।
মিছিলের স্লোগান ও বক্তব্য বিশ্লেষণ করলে বোঝা যায়, এসব আয়োজন কোনো এলোমেলো জনতা করছে না। বরং আয়োজকরা দেখতে প্রশিক্ষিত, তাঁরা কোনো না কোনো রাজনৈতিক বা ধর্মীয় সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত। দেশের বিভিন্ন প্রান্তে হঠাৎ করে এমন পতাকা উড়ানোর হিড়িক কেন পড়ল—সেটিও এখন ব্যাপক আলোচনার বিষয়।
দাবি করা হচ্ছে, বিশ্বকাপ ফুটবলকে কেন্দ্র করে বিদেশি পতাকা প্রদর্শনের প্রতিবাদেই এই উদ্যোগ। কিন্তু এই ব্যাখ্যা কি যথেষ্ট? নাকি এর ভেতরে উগ্রপন্থীদের রাজনৈতিক স্বার্থ লুকিয়ে আছে? অনেকের সন্দেহ, বাংলাদেশকে মৌলবাদী রাষ্ট্র হিসেবে তুলে ধরার জন্য একটি আন্তর্জাতিক এজেন্ডার অংশ হতে পারে এই কার্যক্রম।
সময়টা বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। ভারতে নিযুক্ত ইসরায়েলের রাষ্ট্রদূত রিউভেন আজার ঠিক সেই দিনেই বলেন, ‘বাংলাদেশ ও পাকিস্তানে হামাসের তৎপরতা রয়েছে’—যেদিন দেশে এই পতাকা–প্রদর্শনের তৎপরতা বাড়তে থাকে। এই মিল কি কাকতালীয়?
ইতিহাস দেখায়, প্রতিটি বিশ্বকাপেই বাংলাদেশের শহর–গ্রামে আর্জেন্টিনা, ব্রাজিল, জার্মানিসহ নানা দেশের পতাকা উড়েছে। ছাদ থেকে দোকানপাট—সর্বত্র উৎসবের আমেজ থাকত। মানুষ তা দেখত নিছক বিনোদন হিসেবে। কিন্তু এবার কেন সেই পতাকার বিপরীতে কালেমার পতাকা উড়াতে হবে? কেন সেটা নিয়ে শোভাযাত্রা করতে হবে? কেন ফেইসবুকে ভাইরাল করতে হবে? এটা কি কেবল খেলার বিরোধিতা, নাকি বাংলাদেশকে উগ্র মৌলবাদী দেশ হিসেবে চিহ্নিত করার বছরের পুরোনো প্রচেষ্টার ধারাবাহিকতা?
বাংলাদেশের সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও ধর্মীয় সহনশীলতাকে চ্যালেঞ্জ জানানোর ইতিহাস নতুন নয়। ইসলামাইজেশনের নামে কয়েক দশক ধরে কয়েকটি গোষ্ঠী দেশের উদার চরিত্রকে আঘাত করতে চেয়েছে। নারীদের অগ্রগতিকে বাধাগ্রস্ত করতে চেয়েছে। সোশ্যাল মিডিয়ার অনেক আলোচক পর্যন্ত নারীবিদ্বেষী বক্তব্যে মেতে উঠেছেন। তাঁদের রাজনৈতিক লক্ষ্য স্পষ্ট।
নারায়ণগঞ্জে শিবু মার্কেট থেকে জালকুড়ি পর্যন্ত অন্তত এক কিলোমিটার সড়কজুড়ে পতাকা টাঙানো হয়েছে। পুলিশ জানিয়েছে, এর পেছনে অন্য কোনো উদ্দেশ্য আছে কি না—তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
আবার শনিরআখড়ায় একদল তরুণ রাতের অন্ধকারে হানিফ ফ্লাইওভারের রেলিংয়ে সারিবদ্ধভাবে পতাকা লাগায়। ফেইসবুক লাইভে এসে তাঁদের একজন—এনামুল হাসান—হুমকি দেন, ‘এসব পতাকা কেউ খুললে কঠিন পদক্ষেপ নিতে বাধ্য হব।’ প্রশ্ন হলো, এই ‘আমরা’ বলতে কারা? তাঁদের রাজনৈতিক দিকনির্দেশনা কী? তাঁরা কার হয়ে কাজ করছেন?
ব্রাহ্মণবাড়িয়া সরকারি কলেজের একটি ফেইসবুক পেজে প্রকাশিত ছবিতে ১০ জন তরুণ কালেমার পতাকা হাতে দাঁড়িয়ে। ক্যাপশনে বলা হয়েছে, কলেজের মানবিক বিভাগের প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থীরা এই পতাকা উত্থাপন করেছে। কিন্তু এরা কি আদৌ কলেজের শিক্ষার্থী, নাকি কোনো সংগঠনের প্রতিনিধি? তা খতিয়ে দেখার দাবি উঠেছে।
মুফতি হারুন ইজহারের একটি ভিডিওও ভাইরাল। সেখানে তিনি বলেন, ‘আপনারা সব জায়গায় কালেমার পতাকা লাগায়ে দেবেন। এখন যদি এটা জঙ্গিবাদ হয়ে থাকে, তাহলে আর্জেন্টিনা–ব্রাজিলের সব পতাকা নামাতে হবে। কালেমার পতাকাও থাকবে আমাদের।’
এদিকে বিশ্লেষকেরা বলছেন, এই পতাকার নকশার সঙ্গে আল কায়েদা, আইএসআইএস, তালেবান বা হিজবুত তাহরীরের পতাকার মিল রয়েছে। তাই একে কেবল ধর্মীয় আবেগ বলে চালিয়ে দেওয়া যায় না। ২০২২ সালের বিশ্বকাপেও আর্জেন্টিনা–ব্রাজিলের পতাকা উড়েছিল। কিন্তু তখন তো কালেমার পতাকা টাঙানোর এমন হিড়িক পড়েনি। তাহলে এবারের পার্থক্যটা কোথায়?
ফুটবল—একটি অরাজনৈতিক, সর্বজনীন আনন্দের অনুষ্ঠান—সেখানে ধর্মকে টেনে আনা, খেলা ও ধর্মকে মুখোমুখি দাঁড় করানো—এই প্রবণতা সুপরিকল্পিত বলেই মনে করছেন অনেকে। তাঁদের মতে, বাংলাদেশে উগ্র ধর্মীয় গোষ্ঠীর উত্থান হয়েছে বলে প্রমাণ করার একটি সুদীর্ঘ চক্রান্ত রয়েছে। ২০২৪-এর জুলাই অভ্যুত্থানের পরে এই গোষ্ঠীগুলোর তৎপরতা যেমন বেড়েছিল, তেমনি এখন নির্বাচিত বিএনপি সরকারকে বিব্রত করতে বা এমনকি ক্ষমতা থেকে সরাতে এই পতাকার রাজনীতি কাজে লাগতে পারে।
শুধু তাই নয়, সম্প্রতি ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ‘বনলতা এক্সপ্রেস’ সিনেমা বন্ধের হুমকি সফল হয়েছে। জেলা প্রশাসন ও পুলিশও হুমকিদাতাদের পাশে দাঁড়িয়েছে। সেন্সরপ্রাপ্ত একটি সিনেমা—যার বিরুদ্ধে ধর্মীয় বা রাজনৈতিক কোনো অভিযোগ নেই—সেটিও থামাতে হলো। এই আপসকামিতা কি ফুটবল–পতাকা ইস্যুতেও নতুন করে দ্বিধা তৈরি করছে?
যদি বাংলাদেশকে উগ্রপন্থী রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা যায়, তাহলে তা থেকে লাভবান হয় কিছু গোষ্ঠী ও দেশ। কিন্তু তার মূল্য দিতে হবে বাংলাদেশকেই—বিদেশি বিনিয়োগ কমবে, ভিসা সংকট বাড়বে, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেশের অবস্থান দুর্বল হবে। ২০২৪-এর অভ্যুত্থানের পর থেকেই বাংলাদেশ ইতিমধ্যে এই দুই বিষয়ে নানা সংকটে পড়েছে।
একটি উদার, অসাম্প্রদায়িক, সহনশীল ও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশের ভাবমূর্তি যেন কট্টরপন্থী চরিত্রে রূপান্তরিত না হয়—সেটা এখন সময়ের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। এই বিপদ হয়তো এখনো অনেকের চিন্তার বাইরে, কিন্তু এর দহন আগামী দিনে বাংলাদেশের পথকে অনেক বেশি কঠিন করে তুলতে পারে।
আপনার মতামত জানানঃ