অবিরাম ভারী বৃষ্টি, পাহাড়ি ঢল এবং ভূমিধসে বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্ব ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলে ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয় দেখা দিয়েছে। চট্টগ্রাম বিভাগের বিস্তীর্ণ এলাকা পানির নিচে তলিয়ে গেছে। হাজারো মানুষ খাদ্য, বিশুদ্ধ পানি, ওষুধ ও আশ্রয়ের সংকটে দিন কাটাচ্ছেন। কোথাও সন্তান বৃদ্ধ বাবাকে কাঁধে করে নিরাপদ স্থানে নিয়ে যাচ্ছেন, কোথাও আবার দুই বছরের শিশুকে দাফন করার মতো শুকনো জমিও পাওয়া যাচ্ছে না।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, সাতটি জেলায় বন্যায় এখন পর্যন্ত ৩৯ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে কক্সবাজারে ২৩ জন (যাদের মধ্যে ১৩ জন রোহিঙ্গা), চট্টগ্রামে ৮ জন, বান্দরবানে ৬ জন এবং রাঙামাটিতে ২ জন মারা গেছেন। প্রায় ৯ লাখ ২৮ হাজার মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন।
শুধু চট্টগ্রাম জেলাতেই প্রায় ৪ লাখ ৫০ হাজার মানুষ পানিবন্দী। অনেক এলাকা বিদ্যুৎ ও মোবাইল নেটওয়ার্ক বিচ্ছিন্ন হয়ে দ্বীপের মতো বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে।
দক্ষিণ চট্টগ্রামের ডলু খালের বাঁধ ভেঙে পাহাড়ি ঢলের পানি দ্রুত লোকালয়ে ঢুকে পড়ে। ১৭টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভার প্রায় ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ এলাকা প্লাবিত হয়েছে। দুই লাখের বেশি মানুষ আটকা পড়েছেন। হাজারো ঘরবাড়ি, দোকানপাট, কৃষিজমি ও গ্রামীণ সড়ক পানির নিচে চলে গেছে।
অনেক পরিবারের রান্নাঘর তলিয়ে যাওয়ায় কয়েক দিন ধরে রান্না করা সম্ভব হচ্ছে না। কেউ আত্মীয়ের বাড়ি বা আশ্রয়কেন্দ্রে আশ্রয় নিয়েছেন, আবার কেউ টিনের ছাদ বা উঁচু জায়গায় অবস্থান করছেন।
সাতকানিয়ার বাসিন্দা রহমতউল্লাহ বলেন, এখন পর্যন্ত কেউ ত্রাণ দিতে বা খোঁজ নিতে আসেনি। প্লাস্টিকের নিচে আশ্রয় নিয়ে শিশুরা সামান্য শুকনো খাবার ও পানিতে দিন কাটাচ্ছে।
তিন বছরের সন্তানকে নিয়ে আশ্রয়কেন্দ্রে ওঠা সাফুরা বলেন, সেখানে ঠিকমতো দেখাশোনার কেউ নেই। কয়েক দিন শুকনো খাবার খেয়ে কাটানোর পর এখন তিনি শুধু একবেলা ভাত খেতে চান।
চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক জানিয়েছেন, ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য নগদ অর্থ ও ২০০ টন চাল বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে এবং আরও সহায়তা দ্রুত পৌঁছে দেওয়া হবে।
বন্যা শুধু জীবিতদের নয়, মৃতদের প্রতিও অসম্মানজনক পরিস্থিতি তৈরি করেছে। সাতকানিয়ায় দুই বছরের শিশু ইসমাইল হোসেন বন্যার পানিতে ডুবে মারা যায়। একই দিনে বাঁশখালীতে আরও দুই শিশুর মৃত্যু হলে তাদের দাফনের জন্য শুকনো জায়গা পাওয়া যায়নি। পরে একটি পুকুরপাড়ের সামান্য উঁচু স্থানে কবর দেওয়া হয়।
সাতকানিয়ার বাজালিয়া ইউনিয়নে সাংগু নদীর পানিতে একটি কবরস্থান ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে তিনটি কবর ভেঙে যায়। পরে স্থানীয়রা মরদেহ উদ্ধার করে অন্য কবরস্থানে পুনরায় দাফন করেন।
বাঁশখালীর অনেক পরিবার তাদের ভেঙে যাওয়া ঘরবাড়ির ধ্বংসস্তূপ পরিষ্কার করার চেষ্টা করছে। কাঁচা ঘর পানিতে নরম হয়ে মুহূর্তেই ধসে পড়েছে। বহু পরিবার এখন সম্পূর্ণ গৃহহীন।
যদিও বাঁশখালীর কিছু পাহাড়ি এলাকায় পানি কিছুটা নেমেছে, উপকূলীয় অঞ্চল এখনও পানিতে ডুবে আছে। অনেক নারী ও শিশু আশ্রয়কেন্দ্রে থাকলেও পুরুষরা বাড়িতে থেকে অবশিষ্ট সম্পদ রক্ষার চেষ্টা করছেন।
লোহাগাড়া ও চন্দনাইশেও একই চিত্র। লোহাগাড়ায় কিছুটা পানি কমলেও প্রায় ৪ লাখ মানুষ এখনও পানিবন্দী। সাংগু নদীর পানি বিপৎসীমার ১৯ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। কেরানীহাট-বান্দরবান সড়কে যান চলাচল পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়নি।
পানি উন্নয়ন বোর্ড জানিয়েছে, আগামী ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টায় দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে আরও ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে।
চন্দনাইশে প্রায় ২০ হাজার মানুষ এখনও পানিবন্দী। বহু পরিবার তিন দিনেও কোনো সরকারি ত্রাণ পায়নি। উপজেলা প্রশাসন জানিয়েছে, প্রতিটি ইউনিয়নে সাড়ে চার টন চাল ও শুকনো খাবার বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।
কক্সবাজারে ৭১টির মধ্যে ৬৯টি ইউনিয়ন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। দুই লাখের বেশি মানুষ পানিবন্দী। পেকুয়া, মাতামুহুরী ও চকরিয়ায় হাজার হাজার পরিবার এখনও চারদিকে পানি ঘেরা অবস্থায় রয়েছে।
বান্দরবানের নিচু এলাকা পাহাড়ি ঢলে প্লাবিত হয়েছে। রাঙামাটিতে ১২৫টিরও বেশি ভূমিধসে সড়ক যোগাযোগ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে। খাগড়াছড়ির দীঘিনালায় কয়েক হাজার মানুষ চার দিন ধরে বিচ্ছিন্ন অবস্থায় রয়েছেন। প্রায় ৭ হাজার পরিবার ২০টি আশ্রয়কেন্দ্রে অবস্থান করছে।
আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে আরেকটি বড় সংকট দেখা দিয়েছে—নারী ও শিশুদের নিরাপত্তা। গোপনীয়তার অভাব, নারী-পুরুষের একসঙ্গে অবস্থান এবং পর্যাপ্ত নিরাপত্তার অভাবে যৌন হয়রানি ও নির্যাতনের ঝুঁকি বেড়েছে। এক গবেষণায় দেখা গেছে, বাস্তুচ্যুত মানুষের ৭৫.৫ শতাংশ আশ্রয়কেন্দ্রে তিক্ত অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন।
এদিকে উত্তর-পূর্বাঞ্চলেও নতুন করে বন্যার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জের নিচু এলাকা প্লাবিত হয়েছে। বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র জানিয়েছে, আগামী ২৪ থেকে ৭২ ঘণ্টার মধ্যে সিলেট ও সুনামগঞ্জে বন্যা পরিস্থিতির আরও অবনতি হতে পারে।
খোয়াই, মনু ও কুশিয়ারা নদীর বিভিন্ন স্থানে পানি বিপৎসীমা অতিক্রম করেছে। সুরমা, কুশিয়ারা ও মনু নদীর পানি আরও বাড়তে পারে। পাশাপাশি সারিগোয়াইন, সোমেশ্বরী, যাদুকাটা ও ভুগাই-কংস নদীতেও পানি বিপৎসীমা ছাড়ানোর আশঙ্কা রয়েছে।
হবিগঞ্জ, মৌলভীবাজার, সিলেট ও সুনামগঞ্জ ছাড়াও আরও আটটি জেলা ঝুঁকিতে রয়েছে। সুনামগঞ্জে গত ২৪ ঘণ্টায় ৪৫ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে এবং আরও দুই দিন বৃষ্টি অব্যাহত থাকতে পারে।
অনেক এলাকায় সড়ক যোগাযোগ সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। নৌকাই এখন একমাত্র যাতায়াতের মাধ্যম। চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রেললাইনের প্রায় ছয় কিলোমিটার অংশ পানির নিচে চলে যাওয়ায় রেল যোগাযোগও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলেও বৃষ্টির প্রভাব পড়েছে। খুলনায় ৫১ ঘণ্টায় ১৮৪ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়েছে। শহরের বহু সড়ক, গলি ও নিচু এলাকা পানিতে ডুবে গেছে।
দেশজুড়ে বন্যা পরিস্থিতি এখনও উদ্বেগজনক। আবহাওয়া ও নদীর পানি বৃদ্ধির পূর্বাভাস বলছে, সামনের কয়েক দিন পরিস্থিতি আরও কঠিন হতে পারে। উদ্ধার, ত্রাণ, নিরাপদ আশ্রয় এবং স্বাস্থ্যসেবার পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের দীর্ঘমেয়াদি পুনর্বাসন এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
আপনার মতামত জানানঃ