তিন সপ্তাহ আগে ভার্সাই প্রাসাদে সই হওয়া চুক্তি এখন কার্যত অকার্যকর। কী ঘটল, যার কারণে আবার শুরু হলো হামলা-পাল্টা হামলা?
চুক্তি যেভাবে হয়েছিল
গত ফেব্রুয়ারি থেকে চলা যুদ্ধের পর গত ১৭ জুন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান একটি স্মারকলিপি (মেমোরান্ডাম অব আন্ডারস্ট্যান্ডিং) সই করে। যুক্তরাষ্ট্র-এর পক্ষে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং ইরান-এর পক্ষে প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান এতে সই করেন। চুক্তির আওতায় নৌ-অবরোধ প্রত্যাহার করা হয়, হরমুজ প্রণালী পুনরায় খুলে দেওয়া হয় এবং ইরানের তেল রপ্তানির ওপর থাকা নিষেধাজ্ঞা ৬০ দিনের জন্য স্থগিত করা হয়। তবে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির ভবিষ্যৎ এবং হরমুজ প্রণালীর নিয়ন্ত্রণ কার প্রধান হাতে থাকবে—এই দুটি স্পর্শকাতর প্রশ্ন অমীমাংসিত রেখেই চুক্তি সই হয়। ৬০ দিনের আলোচনার মধ্য দিয়ে এসব সমাধানের কথা ছিল।
যেভাবে ভাঙল যুদ্ধবিরতি
গত সপ্তাহে কাতার ও সৌদি আরবের তিনটি বাণিজ্যিক ট্যাংকারে হামলার অভিযোগ ওঠে ইরানের বিরুদ্ধে, যেগুলো হরমুজ প্রণালী দিয়ে যাচ্ছিল। এর জবাবে যুক্তরাষ্ট্র মঙ্গলবার (৭ জুলাই) রাতভর ইরানের ৮০টিরও বেশি লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালায় বলে দাবি করে মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম)। হামলায় ইরানের বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, কমান্ড-কন্ট্রোল নেটওয়ার্ক, উপকূলীয় রাডার স্থাপনা এবং বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (আইআরজিসি) ৬০টিরও বেশি স্পিডবোট ধ্বংস করা হয় বলে জানানো হয়। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের তেলের ওপর নিষেধাজ্ঞাও পুনরায় বহাল করে।
পরদিন বুধবার তুরস্কের আঙ্কারায় ন্যাটো সম্মেলনে ট্রাম্প ঘোষণা দেন, যুদ্ধবিরতি “শেষ”। একই রাতে যুক্তরাষ্ট্র দ্বিতীয় দফায় আরও জোরালো হামলা চালায়—এবার লক্ষ্যবস্তুর সংখ্যা দাঁড়ায় ৯০টিতে। জবাবে ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনী বাহরাইন ও কুয়েতে থাকা মার্কিন ঘাঁটি লক্ষ্য করে হামলা চালায় বলে দাবি করে, যাতে প্রায় ৮৫টি লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানার কথা বলা হয়। পরবর্তীতে জর্ডানে অবস্থিত একটি মার্কিন স্থাপনায়ও ইরান দশটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ে বলে দাবি করা হয়।
সংকট আরও জটিল হওয়ার কারণ
এই উত্তেজনার সময়টা এমন একটি মুহূর্তে ঘটছে, যখন ইরানে চলছিল নিহত সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির বহুদিনের শেষকৃত্যানুষ্ঠান। যুদ্ধের শুরুতে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের যৌথ অভিযানে খামেনি নিহত হন। তার উত্তরসূরি ও পুত্র মোজতবা খামেনি এখনো জনসমক্ষে হাজির হননি, এমনকি বাবার দাফন অনুষ্ঠানেও তার অনুপস্থিতি ছিল লক্ষণীয়।
বিশ্লেষকদের মতে, এই যুদ্ধবিরতি শুরু থেকেই ভঙ্গুর ছিল। সাবেক মার্কিন প্রশান্ত মহাসাগরীয় কমান্ডের যৌথ গোয়েন্দা কেন্দ্রের পরিচালক কার্ল শুস্টার বলেন, চুক্তিতে সই করা ইরান সরকারের ওপর বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (আইআরজিসি) কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই বলেই এই চুক্তি টিকে থাকার সম্ভাবনা কম ছিল। আইআরজিসি সরাসরি সর্বোচ্চ নেতার অধীনে কাজ করে এবং হরমুজ প্রণালীর ওপর নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে আগ্রহী—যে প্রণালী দিয়ে স্বাভাবিক সময়ে বিশ্বের মোট তেল সরবরাহের প্রায় ২০ শতাংশ পরিবহন হয়।
হরমুজ প্রণালী নিয়ন্ত্রণের প্রশ্নে চুক্তির ভাষাও অস্পষ্ট ছিল। চুক্তিতে শুধু বলা হয়েছিল, বাণিজ্যিক জাহাজের নিরাপদ চলাচলের জন্য ইরান ব্যবস্থা নেবে এবং ওমানের সঙ্গে আলোচনা করে প্রণালীর ভবিষ্যৎ প্রশাসন নির্ধারণ করবে। যুক্তরাষ্ট্র বলছে, প্রণালীর ওপর ইরানের কোনো নিয়ন্ত্রণ থাকতে পারবে না, কিন্তু চুক্তির লেখায় তা স্পষ্টভাবে উল্লেখ নেই।
এখন কী অবস্থা
শুক্রবার (১০ জুলাই) ট্রাম্প জানান, ইরান আলোচনা চালিয়ে যাওয়ার অনুরোধ জানিয়েছে এবং যুক্তরাষ্ট্র তাতে রাজি হয়েছে। তবে তিনি আবারও স্পষ্ট করে বলেন, যুদ্ধবিরতি শেষ হয়ে গেছে। ইরানের প্রধান আলোচক ও পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাগের গালিবাফ বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের ওপর তাদের “কোনো আস্থা নেই”। কাতার ও পাকিস্তান মধ্যস্থতার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে বলে জানা গেছে।
এদিকে হরমুজ প্রণালীতে জাহাজ চলাচল উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। যুদ্ধ শুরুর আগে দৈনিক প্রায় ১১০টি জাহাজ প্রণালী দিয়ে চলাচল করত; সাম্প্রতিক হামলার পর তা নেমে এসেছে দিনে ১৩-১৫টিতে।
সামনে কী হতে পারে
বিশ্লেষকদের মূল্যায়ন মিশ্র। কেউ কেউ মনে করছেন, সাম্প্রতিক হামলাগুলোর তীব্রতা যুদ্ধের শুরুর তুলনায় কম হওয়ায় শান্তি প্রক্রিয়া টিকে থাকার সুযোগ এখনও আছে। আবার সাবেক মার্কিন নৌবাহিনী অ্যাডমিরাল জেমস স্ট্যাভরিডিসের মতে, ড্রোন যুদ্ধের এই নতুন যুগে ইরানের সক্ষমতা দুর্বল করা গেলেও তা সম্পূর্ণ নিশ্চিহ্ন করা সম্ভব নয়।
মূল প্রশ্ন এখনো অমীমাংসিত: হরমুজ প্রণালীর নিয়ন্ত্রণ কার হাতে থাকবে, আর ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির ভবিষ্যৎ কী হবে। যতক্ষণ না এই দুটি বিষয়ে সমঝোতা হচ্ছে, ততক্ষণ হামলা-পাল্টা হামলার এই চক্র থামার সম্ভাবনা কম বলেই মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা।
আপনার মতামত জানানঃ