দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে প্রায় আট দশক এবং বিশেষ করে ১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর প্রায় সাড়ে তিন দশক বিশ্ব রাজনীতি ও অর্থনীতির কেন্দ্রবিন্দু ছিল যুক্তরাষ্ট্র। সামরিক শক্তি, অর্থনৈতিক আধিপত্য, প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন, আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান নির্মাণ এবং উদার গণতন্ত্রের আদর্শ—সব মিলিয়ে যুক্তরাষ্ট্র এমন একটি বৈশ্বিক ব্যবস্থার নেতৃত্ব দেয়, যা অনেকের কাছে “আমেরিকান-নেতৃত্বাধীন বিশ্বব্যবস্থা” হিসেবে পরিচিত। কিন্তু মাত্র ৩৫ বছরের ব্যবধানে সেই একমেরুকেন্দ্রিক বিশ্বব্যবস্থার ভিত্তি নড়ে গেছে। আন্তর্জাতিক রাজনীতির নতুন বাস্তবতায় যুক্তরাষ্ট্র আর একচ্ছত্র শক্তি নয়; বরং বিশ্ব দ্রুত একটি বহুমেরুকেন্দ্রিক ব্যবস্থার দিকে অগ্রসর হচ্ছে।
বিশ শতকের শুরু থেকেই যুক্তরাষ্ট্রের উত্থান ছিল ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। দ্বিতীয় শিল্পবিপ্লবের সময় দেশটি রসায়ন, বিদ্যুৎ, ইস্পাত, টেলিযোগাযোগ, চিকিৎসাবিজ্ঞান, বিমান প্রযুক্তি এবং পরে তথ্যপ্রযুক্তিতে অসাধারণ অগ্রগতি অর্জন করে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় থেকেই যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বের সবচেয়ে বড় অর্থনীতিতে পরিণত হয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষে ইউরোপ ও জাপানের অর্থনীতি বিধ্বস্ত হলেও যুক্তরাষ্ট্র প্রায় অক্ষত অবস্থায় থেকে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পুনর্গঠনের নেতৃত্ব দেয়। ব্রেটন উডস ব্যবস্থা, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (IMF), বিশ্বব্যাংক এবং পরবর্তীকালে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক বাণিজ্য কাঠামো গড়ে ওঠে মূলত যুক্তরাষ্ট্রের উদ্যোগেই। একই সময়ে ন্যাটো গঠন করে পশ্চিমা নিরাপত্তা কাঠামোরও নেতৃত্ব দেয় ওয়াশিংটন।
এরপর শুরু হয় ঠান্ডা যুদ্ধ। প্রায় অর্ধশতাব্দী ধরে যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যে আদর্শিক, সামরিক ও রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা বিশ্ব রাজনীতিকে নিয়ন্ত্রণ করে। ১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের মাধ্যমে সেই প্রতিযোগিতার অবসান ঘটে এবং যুক্তরাষ্ট্র হয়ে ওঠে বিশ্বের একমাত্র পরাশক্তি। সে সময় অনেক বিশ্লেষক মনে করেছিলেন, উদার গণতন্ত্র, মুক্তবাজার অর্থনীতি এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার ওপর ভিত্তি করে একটি স্থায়ী শান্তিপূর্ণ বিশ্বব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হবে। এমনকি কেউ কেউ ইতিহাসের “সমাপ্তি” ঘটেছে বলেও মন্তব্য করেছিলেন।
কিন্তু বাস্তবতা ছিল ভিন্ন। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে দেখা যায়, কোনো একক শক্তির আধিপত্য চিরস্থায়ী নয়। ইতিহাসের প্রায় সব সাম্রাজ্যের মতো যুক্তরাষ্ট্রও নতুন নতুন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে শুরু করে। সবচেয়ে বড় পরিবর্তন আসে চীনের উত্থানের মাধ্যমে। ১৯৭৮ সালে দেং জিয়াওপিংয়ের অর্থনৈতিক সংস্কারের পর চীন ধীরে ধীরে বিশ্বের উৎপাদনকেন্দ্রে পরিণত হয়। কয়েক দশকের মধ্যে দেশটি বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতি হয়ে ওঠে এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, বৈদ্যুতিক যানবাহন, অবকাঠামো উন্নয়ন ও উন্নত উৎপাদন প্রযুক্তিতে দ্রুত অগ্রগতি অর্জন করে। আজ আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, বিনিয়োগ এবং সরবরাহ ব্যবস্থায় চীনের প্রভাব এতটাই বিস্তৃত যে যুক্তরাষ্ট্রের একক নেতৃত্বকে তা সরাসরি চ্যালেঞ্জ করছে।
শুধু অর্থনীতিই নয়, প্রযুক্তির ক্ষেত্রেও প্রতিযোগিতা আরও তীব্র হয়েছে। একসময় তথ্যপ্রযুক্তি ও উদ্ভাবনের প্রায় সব গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র ছিল যুক্তরাষ্ট্রে। এখন চীন, দক্ষিণ কোরিয়া, জাপান, ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং অন্যান্য দেশও উন্নত প্রযুক্তির দৌড়ে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান তৈরি করেছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সেমিকন্ডাক্টর, কোয়ান্টাম কম্পিউটিং এবং মহাকাশ প্রযুক্তি নিয়ে প্রতিযোগিতা নতুন ভূরাজনৈতিক বাস্তবতা তৈরি করছে। প্রযুক্তি এখন শুধু অর্থনৈতিক নয়, জাতীয় নিরাপত্তারও অন্যতম প্রধান উপাদান।
একই সময়ে বিশ্বায়নের সুফলের পাশাপাশি তার নেতিবাচক দিকও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। উৎপাদন খাতের বিপুল অংশ বিদেশে স্থানান্তরিত হওয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের বহু শিল্পাঞ্চলে কর্মসংস্থান কমে যায়। অর্থনৈতিক বৈষম্য বাড়তে থাকে। মধ্যবিত্ত শ্রেণির মধ্যে অসন্তোষ সৃষ্টি হয়। অভিবাসন, সাংস্কৃতিক পরিবর্তন এবং বৈশ্বিক প্রতিযোগিতা নিয়ে উদ্বেগ থেকে জন্ম নেয় নতুন ধরনের জাতীয়তাবাদী রাজনীতি। এরই প্রেক্ষাপটে ডোনাল্ড ট্রাম্পের মতো নেতার উত্থান ঘটে, যিনি “আমেরিকা ফার্স্ট” নীতির মাধ্যমে বহু আন্তর্জাতিক চুক্তি, বহুপক্ষীয় সহযোগিতা এবং দীর্ঘদিনের মিত্রতার কাঠামোকে প্রশ্নবিদ্ধ করেন।
যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বিভাজনও বিশ্বব্যবস্থার ওপর গভীর প্রভাব ফেলেছে। কংগ্রেসে দলীয় সংঘাত, নির্বাচন নিয়ে বিতর্ক, বিচারব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন, সামাজিক মেরুকরণ এবং রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে যুক্তরাষ্ট্রের ভাবমূর্তিকে দুর্বল করেছে। যে দেশ দীর্ঘদিন গণতন্ত্র, আইনের শাসন এবং মানবাধিকারের পক্ষে বিশ্বকে নেতৃত্ব দিয়েছে, সেই দেশকেই এখন নিজের গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর স্থিতিশীলতা নিয়ে প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হচ্ছে।
অন্যদিকে ইউরোপও আগের মতো ঐক্যবদ্ধ ও শক্তিশালী অবস্থানে নেই। ব্রেক্সিট, জ্বালানি সংকট, অভিবাসন সমস্যা, ইউক্রেন যুদ্ধ এবং অর্থনৈতিক চাপ ইউরোপীয় রাজনীতিকে নতুন চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে। যদিও ইউরোপ এখনও বৈশ্বিক অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র, তবুও আন্তর্জাতিক সংকট মোকাবিলায় তারা আগের তুলনায় অনেক বেশি নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে।
রাশিয়াও নতুন করে ভূরাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করছে। ইউক্রেন যুদ্ধ দেখিয়েছে যে সামরিক শক্তির ব্যবহার এখনও আন্তর্জাতিক রাজনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। একই সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্য, আফ্রিকা এবং ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলেও নতুন শক্তির প্রতিযোগিতা বাড়ছে। ভারত, তুরস্ক, সৌদি আরব, ব্রাজিল এবং ইন্দোনেশিয়ার মতো মধ্যম শক্তিগুলোও নিজেদের কৌশলগত অবস্থান শক্তিশালী করছে। ফলে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক এখন আর কেবল দুই বা এক পরাশক্তির মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই।
আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যকারিতাও আগের মতো নেই। জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের অচলাবস্থা, বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার সীমাবদ্ধতা এবং আন্তর্জাতিক আইন বাস্তবায়নের দুর্বলতা বহুমেরুকেন্দ্রিক বিশ্বের বাস্তবতাকে আরও স্পষ্ট করেছে। বড় শক্তিগুলো এখন অনেক ক্ষেত্রেই নিজেদের স্বার্থকে আন্তর্জাতিক নিয়মের ওপরে স্থান দিচ্ছে।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে জলবায়ু পরিবর্তন, মহামারি, খাদ্য নিরাপত্তা, জ্বালানি সংকট এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মতো বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ। এসব সমস্যা কোনো একক রাষ্ট্র একা সমাধান করতে পারে না। অথচ আন্তর্জাতিক সহযোগিতার ক্ষেত্রেও রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা ক্রমেই বাড়ছে। ফলে বৈশ্বিক শাসনব্যবস্থা আরও জটিল হয়ে উঠছে।
তবে যুক্তরাষ্ট্রের আধিপত্য কমে গেলেও দেশটি এখনও বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী রাষ্ট্র। সামরিক ব্যয়, গবেষণা, উচ্চশিক্ষা, উদ্ভাবন, আর্থিক বাজার, ডলারের বৈশ্বিক অবস্থান এবং বিশ্বের শীর্ষ প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের বড় অংশ এখনও যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে। বিশ্বের বহু দেশ নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক সহযোগিতার জন্য এখনও ওয়াশিংটনের ওপর নির্ভরশীল। তাই যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব পুরোপুরি শেষ হয়ে যায়নি; বরং তার একচ্ছত্র আধিপত্যের যুগ শেষ হয়ে একটি প্রতিযোগিতামূলক নতুন যুগের সূচনা হয়েছে।
বিশ্ব ইতিহাস বারবার দেখিয়েছে, কোনো শক্তিই চিরস্থায়ী নয়। ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের পর যুক্তরাষ্ট্র নেতৃত্ব দিয়েছে; এখন সেই নেতৃত্বকে বিভিন্ন শক্তির সঙ্গে ভাগাভাগি করতে হচ্ছে। ভবিষ্যতের বিশ্বব্যবস্থা সম্ভবত এমন হবে, যেখানে যুক্তরাষ্ট্র, চীন, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, ভারত এবং আরও কয়েকটি আঞ্চলিক শক্তি একসঙ্গে বৈশ্বিক রাজনীতিকে প্রভাবিত করবে। এই পরিবর্তনের মধ্যেই নির্ধারিত হবে আগামী দশকের আন্তর্জাতিক অর্থনীতি, প্রযুক্তি, নিরাপত্তা এবং গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ।
অতএব, যুক্তরাষ্ট্রের একচ্ছত্র আধিপত্যের অবসান মানে তার পতন নয়; বরং এটি আন্তর্জাতিক শক্তির ভারসাম্যে একটি মৌলিক পরিবর্তনের প্রতিফলন। আগামী পৃথিবী হবে আরও প্রতিযোগিতামূলক, আরও জটিল এবং একই সঙ্গে আরও আন্তঃনির্ভরশীল। সেই বাস্তবতায় কোনো একটি রাষ্ট্রের একক নেতৃত্বের পরিবর্তে সহযোগিতা, কৌশলগত ভারসাম্য এবং বহুপক্ষীয় সমন্বয়ই বৈশ্বিক স্থিতিশীলতার প্রধান ভিত্তি হয়ে উঠতে পারে।
আপনার মতামত জানানঃ