মধ্যপ্রাচ্য বহু দশক ধরেই বিশ্বের অন্যতম অস্থিতিশীল অঞ্চল। এই অঞ্চলের প্রতিটি সামরিক অভিযান, প্রতিটি কূটনৈতিক পদক্ষেপ এবং প্রতিটি পাল্টা হামলা শুধু সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর জন্য নয়, বরং গোটা বিশ্বের অর্থনীতি, জ্বালানি নিরাপত্তা ও আন্তর্জাতিক রাজনীতির ওপরও গভীর প্রভাব ফেলে। সাম্প্রতিক সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের ইরানের দক্ষিণাঞ্চলে ব্যাপক বিমান হামলা এবং তার জবাবে ইরানের দাবি অনুযায়ী বাহরাইন ও কুয়েতে মার্কিন সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে হামলার ঘটনায় আবারও মধ্যপ্রাচ্য নতুন এক অনিশ্চয়তার মুখোমুখি হয়েছে। যুদ্ধবিরতির পরিবেশ ভেঙে পড়ার আশঙ্কা, হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে নতুন উত্তেজনা এবং পারস্য উপসাগরে সামরিক উপস্থিতি বৃদ্ধির সম্ভাবনা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নতুন উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের দাবি অনুযায়ী, তাদের সাম্প্রতিক অভিযানে ইরানের ৮০টিরও বেশি সামরিক স্থাপনা লক্ষ্য করে নির্ভুল হামলা চালানো হয়েছে। হামলার লক্ষ্য ছিল আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, উপকূলীয় রাডার, কমান্ড ও নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্র এবং ক্ষেপণাস্ত্র পরিচালনাসংশ্লিষ্ট অবকাঠামো। ওয়াশিংটনের ভাষ্য, আঞ্চলিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং ভবিষ্যৎ হুমকি মোকাবিলার উদ্দেশ্যেই এই অভিযান পরিচালিত হয়েছে। তবে তেহরান এই ব্যাখ্যা প্রত্যাখ্যান করে এটিকে সরাসরি আগ্রাসন এবং বিদ্যমান সমঝোতার গুরুতর লঙ্ঘন হিসেবে অভিহিত করেছে।
ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী বা আইআরজিসি জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের হামলার জবাবে তারা বাহরাইন ও কুয়েতে অবস্থিত ৮৫টি মার্কিন সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হেনেছে। একই সঙ্গে একটি মার্কিন এমকিউ-৯ রিপার ড্রোন ভূপাতিত করার দাবিও করেছে তারা। যদিও এসব দাবির সবগুলো স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি, তবুও ঘটনাগুলো মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে নতুন করে আলোচনায় নিয়ে এসেছে।
এই সংঘাতের বিশেষ তাৎপর্য রয়েছে সময় নির্বাচনের কারণেও। ইরানের প্রয়াত সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির শেষ বিদায় উপলক্ষে দেশজুড়ে সাত দিনের আনুষ্ঠানিক কর্মসূচি চলাকালেই যুক্তরাষ্ট্র হামলা চালায়। ইরানের রাজনৈতিক নেতৃত্ব এটিকে শুধু সামরিক পদক্ষেপ নয়, বরং জাতীয় আবেগকে আঘাত করার একটি প্রচেষ্টা হিসেবেও তুলে ধরছে। ফলে সাধারণ জনগণের মধ্যেও ক্ষোভের মাত্রা বেড়েছে।
ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার ও শীর্ষ আলোচক মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ বলেছেন, সাম্প্রতিক মার্কিন হামলা দুই দেশের মধ্যে বিদ্যমান সমঝোতার পরিপন্থী। তাঁর মতে, ইরানের ওপর নতুন নিষেধাজ্ঞা, সামরিক হুমকি, দক্ষিণাঞ্চলে হামলা এবং আঞ্চলিক মিত্রদের বিরুদ্ধে ধারাবাহিক অভিযান—সব মিলিয়ে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে। ইরানের বক্তব্যে স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে যে তারা ঘটনাটিকে বিচ্ছিন্ন কোনো সামরিক অভিযান হিসেবে নয়, বরং বৃহত্তর ভূরাজনৈতিক চাপের অংশ হিসেবে দেখছে।
এই সংকটের কেন্দ্রে রয়েছে হরমুজ প্রণালি। বিশ্বের মোট সমুদ্রপথে পরিবাহিত অপরিশোধিত তেলের একটি বড় অংশ এই সংকীর্ণ জলপথ দিয়ে পরিবহন করা হয়। ফলে এখানে সামান্য অস্থিরতাও আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে। ইরান বারবার জানিয়ে এসেছে, হরমুজ প্রণালিতে তাদের নির্ধারিত নিরাপত্তা ব্যবস্থার বাইরে কোনো বহিরাগত হস্তক্ষেপ তারা মেনে নেবে না। সাম্প্রতিক উত্তেজনার পর এই অবস্থান আরও কঠোর হয়েছে।
হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে উদ্বেগের কারণ কেবল সামরিক নয়, অর্থনৈতিকও। বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম অনেকাংশেই এই অঞ্চলের স্থিতিশীলতার ওপর নির্ভরশীল। যদি সংঘাত আরও বিস্তৃত হয় অথবা জাহাজ চলাচল ব্যাহত হয়, তাহলে জ্বালানির দাম দ্রুত বেড়ে যেতে পারে। এর প্রভাব পড়বে পরিবহন ব্যয়, খাদ্যপণ্যের মূল্য, শিল্প উৎপাদন এবং বৈশ্বিক মুদ্রাস্ফীতির ওপর।
মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের সামরিক উপস্থিতি নতুন নয়। বাহরাইন, কুয়েত, কাতারসহ উপসাগরীয় বিভিন্ন দেশে যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ সামরিক ঘাঁটি রয়েছে। এসব ঘাঁটি শুধু আঞ্চলিক নিরাপত্তা নয়, বরং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক রুট রক্ষার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ফলে এসব স্থাপনাকে লক্ষ্য করে হামলার দাবি পরিস্থিতিকে আরও সংবেদনশীল করে তুলেছে।
অন্যদিকে ইরান দীর্ঘদিন ধরে তাদের প্রতিরক্ষা কৌশলকে অসম যুদ্ধ বা অ্যাসিমেট্রিক ওয়ারফেয়ারের ওপর ভিত্তি করে গড়ে তুলেছে। সরাসরি বড় আকারের যুদ্ধের পরিবর্তে তারা ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন, নৌ সক্ষমতা এবং আঞ্চলিক মিত্র গোষ্ঠীর মাধ্যমে চাপ সৃষ্টি করতে বেশি আগ্রহী। সাম্প্রতিক ঘটনাও সেই কৌশলের ধারাবাহিকতা হিসেবে বিশ্লেষণ করছেন নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা।
এই উত্তেজনার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো তথ্যযুদ্ধ। উভয় পক্ষই নিজেদের অবস্থানকে শক্তিশালী করতে বিভিন্ন দাবি করছে, যার অনেকগুলো স্বাধীনভাবে যাচাই করা কঠিন। আধুনিক সংঘাতে সামরিক অভিযান যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি তথ্যপ্রচারও একটি বড় অস্ত্র হয়ে উঠেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের যুগে একটি ভিডিও, একটি বিবৃতি কিংবা একটি দাবি মুহূর্তের মধ্যেই বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে এবং জনমতকে প্রভাবিত করে।
আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ও পরিস্থিতির দিকে গভীর নজর রাখছে। কারণ মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে পূর্ণমাত্রার সংঘাত শুরু হলে শুধু সংশ্লিষ্ট দেশ নয়, গোটা বিশ্বের নিরাপত্তা ও অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। জাতিসংঘ, ইউরোপীয় বিভিন্ন দেশ এবং আঞ্চলিক শক্তিগুলো ইতোমধ্যে সংযম প্রদর্শনের আহ্বান জানাচ্ছে। কূটনৈতিক সমাধানের পথ খোলা রাখার ওপরও জোর দেওয়া হচ্ছে।
বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশের জন্যও এই পরিস্থিতি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশ মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল। একই সঙ্গে এই অঞ্চলে লাখো বাংলাদেশি কর্মরত। যুদ্ধের বিস্তার ঘটলে প্রবাসীদের নিরাপত্তা, রেমিট্যান্স প্রবাহ, জ্বালানি আমদানি এবং বৈদেশিক বাণিজ্যে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। ফলে ঢাকা পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে।
বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান সংকটের সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হলো ভুল হিসাব বা ভুল বোঝাবুঝি। একটি সীমিত সামরিক অভিযান দ্রুতই বৃহত্তর সংঘাতে রূপ নিতে পারে, যদি কোনো পক্ষ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হয়। ইতিহাস বলছে, মধ্যপ্রাচ্যের বহু বড় সংঘাতই ছোট পরিসরের সামরিক ঘটনার মাধ্যমে শুরু হয়েছে।
তবে একই সঙ্গে কূটনৈতিক সম্ভাবনাও পুরোপুরি শেষ হয়ে যায়নি। অতীতেও ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র একাধিকবার উত্তেজনার মধ্যেও আলোচনার টেবিলে ফিরেছে। আন্তর্জাতিক মধ্যস্থতা, আঞ্চলিক অংশীদারদের ভূমিকা এবং অর্থনৈতিক বাস্তবতা অনেক সময় সংঘাতকে সীমিত রাখতে সহায়তা করেছে। বর্তমান পরিস্থিতিতেও অনেক পর্যবেক্ষক মনে করছেন, সামরিক শক্তি প্রদর্শনের পাশাপাশি উভয় পক্ষ শেষ পর্যন্ত কূটনৈতিক পথেই ফিরে আসতে বাধ্য হবে।
মধ্যপ্রাচ্যের এই নতুন উত্তেজনা আবারও মনে করিয়ে দিল, আধুনিক বিশ্বের নিরাপত্তা এক দেশের ভেতরে সীমাবদ্ধ নয়। একটি অঞ্চলের সংঘাত খুব দ্রুত বৈশ্বিক সংকটে রূপ নিতে পারে। তাই সামরিক প্রতিক্রিয়ার পাশাপাশি সংলাপ, আস্থা পুনর্গঠন এবং আন্তর্জাতিক আইনকে সম্মান জানানোই দীর্ঘমেয়াদে স্থিতিশীলতার একমাত্র কার্যকর পথ। যুদ্ধ হয়তো তাৎক্ষণিক শক্তির প্রদর্শন ঘটায়, কিন্তু স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠিত হয় কূটনীতি, সংযম এবং পারস্পরিক আস্থার ভিত্তিতেই। মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান পরিস্থিতি সেই বাস্তবতাকেই আবারও স্পষ্ট করে তুলেছে।
আপনার মতামত জানানঃ