একটি শিশুর হাতে ধরা ছোট্ট একটি খেলনা কখনো শুধু প্লাস্টিক, কাঠ কিংবা কাপড়ের তৈরি কোনো বস্তু নয়। সেটি তার প্রথম বন্ধু, প্রথম শিক্ষক, প্রথম কল্পনার জানালা। সেই খেলনাকে আঁকড়ে ধরেই সে শেখে পৃথিবীকে চিনতে, রং আলাদা করতে, শব্দের সঙ্গে পরিচিত হতে, সম্পর্কের ভাষা বুঝতে। কিন্তু কত অদ্ভুত এক বাস্তবতা—যে খেলনাটি শিশুর মুখে হাসি ফোটানোর কথা, সেটিই কখনো কখনো নীরব ঘাতকের রূপ নিয়ে তার শ্বাসরোধ করে, তার স্নায়ুতন্ত্রকে ক্ষতিগ্রস্ত করে, কিংবা অদৃশ্য বিষের মতো ধীরে ধীরে কেড়ে নেয় তার সুস্থ বেড়ে ওঠার অধিকার। শৈশবের রঙিন প্রজাপতির ডানায় যদি বিষের গুঁড়ো লেগে থাকে, তবে সেই উড়ান আর আনন্দের থাকে না; হয়ে ওঠে এক অজানা আশঙ্কার প্রতীক।
আজকের পৃথিবীতে খেলনার বাজার আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বড়, বৈচিত্র্যময় এবং প্রযুক্তিনির্ভর। কথা বলা পুতুল, রিমোটচালিত গাড়ি, স্মার্ট রোবট, আলো-ঝলমলে বন্দুক কিংবা ডিজিটাল গেম—সবকিছুই শিশুর কৌতূহলকে মুহূর্তে আকর্ষণ করে। কিন্তু বাহ্যিক চাকচিক্যের আড়ালে লুকিয়ে থাকতে পারে নিম্নমানের প্লাস্টিক, ক্ষতিকর রাসায়নিক, অতিরিক্ত সিসা, পারদ, ক্যাডমিয়াম কিংবা সহজেই খুলে যাওয়া ছোট ছোট অংশ। শিশুরা স্বভাবতই খেলনা মুখে দেয়, কামড়ায়, ছুড়ে ফেলে, খুলে দেখে। তাই একটি সামান্য ত্রুটিও তাদের জন্য বড় বিপদের কারণ হতে পারে।
বিশ্বজুড়ে শিশুস্বাস্থ্য নিয়ে কাজ করা সংস্থাগুলো বহু বছর ধরে সতর্ক করে আসছে যে নিম্নমানের খেলনায় থাকা ভারী ধাতু শিশুদের মস্তিষ্কের বিকাশ, স্মৃতিশক্তি, আচরণগত পরিবর্তন এবং শারীরিক বৃদ্ধির ওপর দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। অনেক ক্ষেত্রে খেলনার ক্ষুদ্র অংশ শ্বাসনালিতে আটকে গিয়ে দুর্ঘটনা ঘটে, আবার ধারালো প্রান্তে কেটে যায় কোমল হাত। এসব দুর্ঘটনা কেবল একটি পরিবারের নয়; এটি জনস্বাস্থ্যেরও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।
বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরে খেলনার বাজারে নিরাপত্তার বিষয়টি তেমন গুরুত্ব পায়নি। অধিকাংশ অভিভাবক খেলনা কেনার সময় রং, আকৃতি, দাম কিংবা শিশুর পছন্দকে প্রাধান্য দেন। কিন্তু খুব কম মানুষই ভাবেন, খেলনাটি কোন উপাদানে তৈরি, সেটি পরীক্ষিত কি না, অথবা এটি নির্দিষ্ট বয়সের শিশুর জন্য নিরাপদ কি না। অথচ একটি খেলনা কেনার সিদ্ধান্ত কখনো কখনো একটি শিশুর জীবনকে নিরাপদ রাখার সিদ্ধান্তও হতে পারে।
সাম্প্রতিক সময়ে শিশুদের খেলনার জন্য বাধ্যতামূলক নিরাপত্তা মান নির্ধারণের উদ্যোগ বাংলাদেশের জন্য একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ। এটি শুধু একটি প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নয়; এটি আসলে রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে নিরাপদ রাখার অঙ্গীকার। তবে আইন প্রণয়নই শেষ কথা নয়। কার্যকর নজরদারি, নিয়মিত পরীক্ষাগারভিত্তিক মান যাচাই, বাজার তদারকি এবং ভোক্তাদের সচেতনতা—এই চারটি স্তম্ভ একসঙ্গে শক্তিশালী না হলে কোনো নীতিই কাঙ্ক্ষিত ফল দেবে না।
এক সময়ের শৈশব ছিল অন্য রকম। গ্রামের মেঠোপথ, উঠানের ধুলোমাটি, নদীর ঘাট, বর্ষার কাগজের নৌকা, শীতের ঘুড়ি, লাটিম, মার্বেল কিংবা মাটির পুতুল—এসবের মধ্যেই লুকিয়ে ছিল শিশুমনের অফুরন্ত আনন্দ। সেই খেলনাগুলো হয়তো প্রযুক্তির বিস্ময় ছিল না, কিন্তু সেগুলোর সঙ্গে জড়িয়ে ছিল প্রকৃতির গন্ধ, মানুষের স্পর্শ এবং স্থানীয় সংস্কৃতির উষ্ণতা। একজন কারিগরের হাতে গড়া কাঠের ঘোড়া শুধু একটি খেলনা ছিল না; সেটি ছিল একটি গ্রামের গল্প, একটি পরিবারের ভালোবাসা এবং একটি সমাজের ঐতিহ্যের প্রতিচ্ছবি।
আজকের শিশুদের শৈশব অনেকটাই স্ক্রিননির্ভর। খেলনার পাশাপাশি স্মার্টফোন, ট্যাব কিংবা ভিডিও গেম তাদের দৈনন্দিন জীবনের অংশ হয়ে উঠেছে। প্রযুক্তির সুবিধা অস্বীকার করার সুযোগ নেই, কিন্তু যখন বাস্তব খেলাধুলার জায়গা সংকুচিত হয়, তখন শিশুর সামাজিক বিকাশও প্রভাবিত হয়। প্রতিবেশীর সঙ্গে খেলা, দলবদ্ধভাবে শেখা, হার-জিত মেনে নেওয়া কিংবা প্রকৃতির সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করার সুযোগও কমে যায়। ফলে খেলনার নিরাপত্তার পাশাপাশি আমাদের ভাবতে হবে শৈশবের মানসিক নিরাপত্তা নিয়েও।
বিদেশের অনেক দেশ বহু আগে থেকেই খেলনার নিরাপত্তাকে জাতীয় অগ্রাধিকার হিসেবে বিবেচনা করেছে। সেখানে প্রতিটি খেলনা বাজারে আসার আগে যান্ত্রিক নিরাপত্তা, রাসায়নিক উপাদান, দাহ্যতা এবং বয়সভিত্তিক ব্যবহারযোগ্যতার কঠোর পরীক্ষা করা হয়। খেলনার গায়ে মানচিহ্ন থাকলে অভিভাবকেরা নিশ্চিন্তে সেটি কিনতে পারেন। গবেষণা, নকশা, উদ্ভাবন এবং উদ্যোক্তা উন্নয়নের মাধ্যমে খেলনাশিল্পকে একটি আধুনিক শিল্পখাতে পরিণত করা হয়েছে। এই অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের জন্যও অনুপ্রেরণা হতে পারে।
তবে শুধু বিদেশের উদাহরণ অনুসরণ করলেই হবে না। আমাদের নিজস্ব ঐতিহ্যকেও নতুনভাবে মূল্যায়ন করতে হবে। মাটি, কাঠ, বাঁশ, পাট কিংবা কাপড় দিয়ে তৈরি পরিবেশবান্ধব খেলনা আবারও জনপ্রিয় করা সম্ভব। আধুনিক নকশা, উন্নত মান নিয়ন্ত্রণ এবং নিরাপদ উপাদান ব্যবহার করে দেশীয় খেলনাকে আন্তর্জাতিক বাজারেও পরিচিত করা যেতে পারে। এতে যেমন শিশু নিরাপদ থাকবে, তেমনি গ্রামীণ কারিগরদের নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগও তৈরি হবে।
এখানে অভিভাবকদের ভূমিকাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। খেলনা কেনার সময় শুধু আকর্ষণীয় রং বা কম দাম নয়, বরং উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের পরিচয়, নিরাপত্তা নির্দেশনা, বয়সের উপযোগিতা এবং মানের বিষয়গুলোও খেয়াল করতে হবে। ভাঙা খেলনা শিশুর হাতে দেওয়া উচিত নয়। ক্ষুদ্র অংশবিশিষ্ট খেলনা ছোট শিশুদের নাগালের বাইরে রাখতে হবে। খেলনার রং উঠে গেলে বা অস্বাভাবিক গন্ধ বের হলে সেটি ব্যবহার বন্ধ করা উচিত। একই সঙ্গে শিশুদের খেলার সময় একজন প্রাপ্তবয়স্কের পর্যবেক্ষণ অনেক দুর্ঘটনা প্রতিরোধ করতে পারে।
রাষ্ট্রের পাশাপাশি শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোরও সামাজিক দায়িত্ব রয়েছে। লাভের প্রতিযোগিতায় যদি মান বিসর্জন দেওয়া হয়, তবে তার মূল্য দেয় একটি নিরপরাধ শিশু। তাই নিরাপদ কাঁচামাল ব্যবহার, নিয়মিত পরীক্ষাগারভিত্তিক মান যাচাই এবং আন্তর্জাতিক মান অনুসরণ করা এখন সময়ের দাবি। একই সঙ্গে বাজারে নিম্নমানের খেলনা বিক্রির বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে।
গণমাধ্যম, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং সামাজিক সংগঠনগুলোও সচেতনতা তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। যেমন সড়ক নিরাপত্তা বা স্বাস্থ্যবিধি নিয়ে প্রচারণা হয়, তেমনি খেলনার নিরাপত্তা নিয়েও জনসচেতনতা তৈরি করা দরকার। কারণ সচেতন ভোক্তাই পারে অনিরাপদ পণ্যের বাজার সংকুচিত করতে।
একটি জাতির ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হয় তার শিশুদের হাত ধরে। সেই হাত যদি নিরাপদ খেলনার বদলে ঝুঁকিপূর্ণ খেলনার স্পর্শে বড় হয়, তবে আমরা শুধু একটি শিশুকেই নয়, ভবিষ্যতের একটি সম্ভাবনাকেও ঝুঁকির মধ্যে ঠেলে দিই। খেলনা তাই কোনো বিলাসিতা নয়; এটি শিশুর শেখা, বেড়ে ওঠা এবং আত্মবিশ্বাস গড়ে তোলার অন্যতম মাধ্যম।
শৈশবকে আমরা প্রায়ই ফুলের সঙ্গে তুলনা করি। কিন্তু একটি ফুল শুধু সুন্দর হলেই হয় না; তার বেড়ে ওঠার জন্য দরকার নির্মল মাটি, বিশুদ্ধ জল আর নিরাপদ পরিবেশ। তেমনি একটি শিশুর হাসিও তখনই সত্যিকার অর্থে উজ্জ্বল হয়, যখন তার চারপাশের প্রতিটি উপাদান নিরাপদ হয়। খেলনা সেই পরিবেশেরই একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
আমরা এমন একটি বাংলাদেশ চাই, যেখানে কোনো অভিভাবক খেলনা কিনে বাড়ি ফেরার পর উদ্বেগে থাকবেন না; যেখানে শিশুর হাসি হবে নির্ভেজাল, খেলাধুলা হবে নিরাপদ, আর শৈশব হবে বিষমুক্ত। কারণ একটি নিরাপদ খেলনা শুধু একটি শিশুর আনন্দ নিশ্চিত করে না; এটি একটি জাতির আগামী দিনের ভিত্তিকে আরও দৃঢ় করে। শৈশবকে নিরাপদ রাখা মানে ভবিষ্যৎকে নিরাপদ রাখা। আর যে জাতি তার শিশুদের নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেয়, তার উন্নয়নের পথও হয় সবচেয়ে উজ্জ্বল।
আপনার মতামত জানানঃ