তিস্তা বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের জীবন, কৃষি, অর্থনীতি এবং পরিবেশের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত একটি নদী। কিন্তু বছরের পর বছর ধরে শুষ্ক মৌসুমে পানির সংকট, বর্ষায় ভয়াবহ বন্যা, নদীভাঙন এবং অব্যবস্থাপনার কারণে তিস্তা অববাহিকার মানুষের জীবন হয়ে উঠেছে অনিশ্চিত। বহু প্রতীক্ষিত তিস্তা মহাপরিকল্পনা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই আলোচনা চলছিল। নানা রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক জটিলতার কারণে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের পথে এগোতে পারেনি। তবে সম্প্রতি সরকার চীনের কারিগরি সহায়তা ও ঋণের মাধ্যমে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের ঘোষণা দেওয়ায় নতুন করে আশার আলো দেখছেন উত্তরাঞ্চলের মানুষ। একই সঙ্গে এই উদ্যোগ দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতি, আঞ্চলিক কূটনীতি এবং পানি ব্যবস্থাপনা নিয়ে নতুন বিতর্কও সৃষ্টি করেছে।
সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, তিস্তা মহাপরিকল্পনা শুধু একটি নদী খনন বা বাঁধ নির্মাণ প্রকল্প নয়; এটি একটি সমন্বিত নদী ব্যবস্থাপনা কর্মসূচি। প্রকল্পের আওতায় নদী শাসন, ড্রেজিং, বন্যা নিয়ন্ত্রণ, ভূমি পুনরুদ্ধার, তীর সংরক্ষণ, কৃষি উন্নয়ন, সড়ক যোগাযোগ, পর্যটন এবং পরিকল্পিত নগরায়ণের মতো বহু বিষয় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। সরকার মনে করছে, এই পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে উত্তরাঞ্চলের দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক বৈষম্য অনেকাংশে কমে আসবে এবং কৃষিনির্ভর জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নত হবে।
প্রকল্পটির প্রথম ধাপে প্রায় ৯ হাজার ১৫০ কোটি টাকা ব্যয় ধরা হয়েছে। এর মধ্যে বড় একটি অংশ চীনের ঋণ হিসেবে নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে এবং বাকি অর্থ বহন করবে বাংলাদেশ সরকার। ইতোমধ্যে চীনের রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান পাওয়ার চায়না সম্ভাব্যতা সমীক্ষা সম্পন্ন করেছে। অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ এবং পরিকল্পনা কমিশনের পর্যায়েও প্রাথমিক অগ্রগতি হয়েছে। দুই দেশের মধ্যে আর্থিক চুক্তি সম্পন্ন হলে ২০২৬-২৭ অর্থবছরে প্রকল্পের কাজ শুরু হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
তিস্তা নদী বর্ষাকালে অনেক সময় ভয়াবহ রূপ ধারণ করে। অতিরিক্ত পানির কারণে ফসল, বসতবাড়ি, সড়ক এবং জনপদ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। আবার শুষ্ক মৌসুমে নদী প্রায় পানিশূন্য হয়ে পড়ে। ফলে কৃষকেরা পর্যাপ্ত সেচ সুবিধা পান না। নদীর বিভিন্ন অংশে চর জেগে ওঠে এবং নৌ চলাচলও ব্যাহত হয়। তিস্তা মহাপরিকল্পনার অন্যতম লক্ষ্য হলো বর্ষার অতিরিক্ত পানি নিয়ন্ত্রণ করা এবং শুষ্ক মৌসুমে পানি ব্যবস্থাপনাকে আরও কার্যকর করা। পাশাপাশি নদীর গতিপথ স্থিতিশীল করে নদীভাঙন কমানোর উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, নদীভাঙন উত্তরাঞ্চলের অন্যতম বড় সামাজিক ও অর্থনৈতিক সমস্যা। প্রতিবছর হাজার হাজার পরিবার বসতভিটা হারিয়ে বাস্তুচ্যুত হয়। কৃষিজমি নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যায়। পরিকল্পিত তীর সংরক্ষণ, গ্রোয়েন নির্মাণ এবং নদী শাসনের মাধ্যমে এই ক্ষয়ক্ষতি উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব হতে পারে। একই সঙ্গে নদীর নাব্যতা বজায় রাখতে নিয়মিত ড্রেজিং করা হলে পানি প্রবাহও স্বাভাবিক থাকবে।
তবে প্রকল্পটি নিয়ে যেমন আশাবাদ রয়েছে, তেমনি কিছু বাস্তব প্রশ্নও সামনে এসেছে। বিশেষজ্ঞদের একটি বড় অংশ মনে করেন, অবকাঠামো নির্মাণের মাধ্যমে নদীর ভৌত সমস্যার সমাধান করা গেলেও শুষ্ক মৌসুমে পানির সংকট পুরোপুরি দূর করা সম্ভব নয় যদি উজানে পর্যাপ্ত পানি না আসে। তিস্তা একটি আন্তঃসীমান্ত নদী হওয়ায় ভারতের সঙ্গে ন্যায্য পানিবণ্টন চুক্তি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দীর্ঘদিন ধরে এই চুক্তি ঝুলে রয়েছে। ফলে শুষ্ক মৌসুমে বাংলাদেশের অংশে পর্যাপ্ত পানি প্রবাহ নিশ্চিত করা সম্ভব হচ্ছে না।
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবও তিস্তার ভবিষ্যৎ ব্যবস্থাপনায় বড় একটি চ্যালেঞ্জ। অনিয়মিত বৃষ্টিপাত, আকস্মিক বন্যা এবং দীর্ঘস্থায়ী খরার কারণে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহে পরিবর্তন ঘটছে। তাই শুধু বাঁধ নির্মাণ নয়, পরিবেশবান্ধব নদী ব্যবস্থাপনা, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ এবং নদীকেন্দ্রিক জীবিকার বিষয়গুলোও সমান গুরুত্ব পাওয়া উচিত বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।
চীনের অংশগ্রহণ এই প্রকল্পকে আন্তর্জাতিক কূটনীতির আলোচনায় নিয়ে এসেছে। দক্ষিণ এশিয়ায় চীনের অবকাঠামোগত বিনিয়োগ এবং বেল্ট অ্যান্ড রোড উদ্যোগের অংশ হিসেবে বাংলাদেশে বিভিন্ন প্রকল্পে চীনের সম্পৃক্ততা আগেও দেখা গেছে। তিস্তা মহাপরিকল্পনাও সেই ধারাবাহিকতার একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। অন্যদিকে ভারতও অতীতে এই প্রকল্পে আগ্রহ প্রকাশ করেছিল। ফলে বর্তমান বাস্তবতায় বিষয়টি আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্যের আলোচনায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে।
চীন ইতোমধ্যে স্পষ্ট করেছে যে বাংলাদেশের সঙ্গে তাদের সহযোগিতা কোনো তৃতীয় দেশের বিরুদ্ধে নয়। বরং এটি উন্নয়ন সহযোগিতার অংশ। তবুও আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে, তিস্তা প্রকল্প শুধু অর্থনৈতিক নয়; এটি দক্ষিণ এশিয়ার কৌশলগত সম্পর্কেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতীক হয়ে উঠেছে।
অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকেও প্রকল্পটির সম্ভাবনা অনেক। কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি, নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি, যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন এবং পর্যটনের বিকাশ উত্তরাঞ্চলের অর্থনীতিকে নতুন গতি দিতে পারে। নদীর দুই তীরে পরিকল্পিত অবকাঠামো গড়ে উঠলে শিল্প ও ব্যবসায়িক কার্যক্রমও সম্প্রসারিত হওয়ার সুযোগ তৈরি হবে। একই সঙ্গে নদী পুনরুদ্ধারের মাধ্যমে পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষা করাও সহজ হবে।
তবে ঋণনির্ভর বড় প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং দক্ষ ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অতীতে অনেক বড় প্রকল্পে ব্যয় বৃদ্ধি, সময়ক্ষেপণ এবং বাস্তবায়ন জটিলতার অভিজ্ঞতা রয়েছে। তাই তিস্তা মহাপরিকল্পনার ক্ষেত্রেও সঠিক পরিকল্পনা, পরিবেশগত মূল্যায়ন এবং স্থানীয় জনগণের মতামতকে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
সব মিলিয়ে তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উন্নয়ন উদ্যোগ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। এটি সফলভাবে বাস্তবায়িত হলে উত্তরাঞ্চলের কোটি মানুষের জীবনযাত্রায় ইতিবাচক পরিবর্তন আসতে পারে। কৃষি, পরিবেশ, অর্থনীতি এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচিত হতে পারে। তবে প্রকল্পের দীর্ঘমেয়াদি সফলতা নির্ভর করবে শুধু অবকাঠামো নির্মাণের ওপর নয়; বরং আন্তঃসীমান্ত পানি কূটনীতি, পরিবেশ সংরক্ষণ, স্বচ্ছ অর্থায়ন এবং কার্যকর বাস্তবায়নের ওপরও। তিস্তার ভবিষ্যৎ তাই কেবল একটি নদীর ভবিষ্যৎ নয়, বরং বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের উন্নয়ন, আঞ্চলিক সহযোগিতা এবং টেকসই পানি ব্যবস্থাপনার একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষাও বটে।
আপনার মতামত জানানঃ