একটি যুদ্ধবিমান আকাশে ছিল মাত্র সাত মিনিট। কিন্তু সেই সাত মিনিটের শেষ প্রান্তে যে দুর্ঘটনা ঘটেছিল, তার ক্ষত আজও বহন করছে শত শত মানুষ। ঢাকার উত্তরার মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজে বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর একটি এফটি-৭ বিজিআই প্রশিক্ষণ যুদ্ধবিমান বিধ্বস্ত হওয়ার ঘটনায় ৩৬ জনের প্রাণহানি এবং বহু মানুষের জীবন চিরতরে বদলে যায়। দুর্ঘটনার এক বছর পর তদন্ত কমিশনের পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এমন কিছু তথ্য, যা শুধু দুর্ঘটনার কারণই নয়, সামরিক প্রশিক্ষণ, নিরাপত্তা ব্যবস্থা, নগর পরিকল্পনা এবং রাষ্ট্রীয় জবাবদিহি—সবকিছুকেই নতুন করে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে।
দীর্ঘ তদন্ত শেষে কমিশনের পর্যবেক্ষণে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে বিষয়টি সামনে এসেছে, তা হলো নিহত পাইলটের উড্ডয়ন প্রশিক্ষণে ধারাবাহিকতার ঘাটতি ছিল। এটি ছিল তাঁর প্রথম একক বা ‘ফার্স্ট সলো’ ফ্লাইট। তদন্তে বলা হয়েছে, প্রয়োজনীয় দক্ষতা অর্জনের আগেই তিনি এমন একটি ফ্লাইট পরিচালনা করছিলেন, যেখানে সংকটময় পরিস্থিতি মোকাবিলার সক্ষমতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে কমিশন বলেছে, গ্রাউন্ড সুপারভাইজার বা অফিসার কমান্ডিংয়ের পর্যাপ্ত ও কার্যকর তত্ত্বাবধানের অভাবও দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
তদন্ত প্রতিবেদনে বিমানটির উড্ডয়নের প্রতিটি ধাপ বিশ্লেষণ করা হয়েছে। নির্ধারিত রুট অনুসরণ করে প্রশিক্ষণ চলছিল। প্রথম সার্কিট সফলভাবে সম্পন্ন হওয়ার পর দ্বিতীয় সার্কিটে প্রবেশ করে বিমানটি। ঠিক সেই পর্যায়েই কিছু নির্দেশনা ও উড্ডয়ন প্রোফাইলের মধ্যে অসামঞ্জস্য দেখা যায়। কমিশনের মতে, প্রশিক্ষণের নির্ধারিত মিশন প্রোফাইলের সঙ্গে বাস্তবে দেওয়া নির্দেশনার মিল ছিল না। ফলে পাইলট এমন একটি পরিস্থিতির মুখোমুখি হন, যার জন্য তিনি পর্যাপ্তভাবে প্রস্তুত ছিলেন না।
ফ্লাইট ডাটা রেকর্ডার বিশ্লেষণে দেখা গেছে, দুর্ঘটনার আগে বিমানটির ইঞ্জিন, হাইড্রলিক কিংবা নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থায় কোনো বড় ধরনের যান্ত্রিক ত্রুটির সতর্কবার্তা পাওয়া যায়নি। কিন্তু অবতরণের প্রস্তুতিকালে কয়েক সেকেন্ডের ব্যবধানে বিমানটির ব্যাংক অ্যাঙ্গেল অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায়। পরিস্থিতি সামাল দিতে গিয়ে পাইলট নিয়ন্ত্রণ স্টিক জোরে টেনে ধরেন। এর ফলে অ্যাঙ্গেল অব অ্যাটাক নিরাপদ সীমা অতিক্রম করে এবং বিমানটি ‘স্টলড কন্ডিশন’-এ চলে যায়। এই অবস্থায় বিমান দ্রুত উচ্চতা হারাতে শুরু করে এবং খুব অল্প সময়ের মধ্যেই নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়।
প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, দুর্ঘটনার আগে বিমানের উইন্ডশিল্ডে একটি কালো দাগ দেখা যায়, যা পাখি কিংবা অন্য কোনো উড্ডীয়মান বস্তুর আঘাতের ফল হতে পারে। যদিও এটি নিশ্চিতভাবে দুর্ঘটনার কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়নি, তদন্তকারীরা মনে করছেন, এমন কোনো আকস্মিক ঘটনা পাইলটকে হঠাৎ গতিপথ পরিবর্তনের চেষ্টা করতে বাধ্য করে থাকতে পারে। তবে কমিশন স্পষ্ট করেছে, এটি ছিল সম্ভাব্য একটি পরিবেশগত নিয়ামক, মূল কারণ নয়।
এই দুর্ঘটনার ভয়াবহতা কেবল বিমান বিধ্বস্ত হওয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। বিমানটি বিধ্বস্ত হয়েছিল স্কুল ভবনের একমাত্র সিঁড়ির সামনে। ফলে ভবনের ভেতরে থাকা শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও অভিভাবকদের দ্রুত বের হওয়ার সুযোগ প্রায় ছিল না। তদন্তে দেখা গেছে, ভবনটির আয়তন ও ব্যবহারকারীর সংখ্যা বিবেচনায় অন্তত তিনটি জরুরি সিঁড়ি থাকা প্রয়োজন ছিল। কিন্তু বাস্তবে ছিল মাত্র একটি। এর ফলে আগুন ও ধোঁয়ার মধ্যে আটকে পড়ে বহু মানুষের মৃত্যু ঘটে।
দুর্ঘটনার পরপরই বিস্ফোরণের কারণও তদন্তে বিশ্লেষণ করা হয়েছে। বিমানটি আকাশে মাত্র সাত মিনিট থাকায় এর জ্বালানি ট্যাংকে তখনও প্রায় দুই হাজার ১৫০ লিটার জেট ফুয়েল ছিল। ভূমিতে আঘাতের সঙ্গে সঙ্গে ট্যাংকটি চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে বিপুল পরিমাণ জ্বালানি দ্রুত বাষ্পীভূত হয় এবং তীব্র অগ্নিকাণ্ডের সৃষ্টি করে। আগুনের তাপমাত্রা ও ধোঁয়ার কারণে অনেকেই ইনহেলেশন ইনজুরিতে আক্রান্ত হন, যা পরবর্তীতে মৃত্যুর বড় কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
কমিশনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ ছিল নগর পরিকল্পনা ও অবকাঠামোগত দুর্বলতা নিয়ে। বিমানবন্দরের উড্ডয়ন এলাকার আশপাশে উচ্চতা নিয়ন্ত্রণবিষয়ক বিধিনিষেধ যথাযথভাবে বাস্তবায়িত হয়নি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। পাশাপাশি মাইলস্টোন স্কুলের একাধিক ভবনের অনুমোদন সংক্রান্ত প্রশ্নও সামনে এসেছে। তদন্তে বলা হয়েছে, ক্যাম্পাসের অর্ধেকের বেশি ভবনের অনুমোদন নিয়ে অসংগতি ছিল। যদিও প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষ এ অভিযোগ অস্বীকার করেছে এবং দাবি করেছে, প্রয়োজনীয় নথিপত্র আগুনে নষ্ট হয়ে গেছে।
দুর্ঘটনার পর নিহতদের মরদেহ গুম করা হয়েছিল—এমন অভিযোগও বিভিন্ন সময়ে আলোচনায় আসে। তবে তদন্ত কমিশন নিহতদের পরিবারের সঙ্গে কথা বলে এমন কোনো অভিযোগের সত্যতা পায়নি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে। অর্থাৎ এ বিষয়ে প্রচলিত গুঞ্জনের সঙ্গে তদন্তে পাওয়া তথ্যের মিল পাওয়া যায়নি।
তবে তদন্তের সবচেয়ে বেদনাদায়ক অংশ সম্ভবত ক্ষতিপূরণ প্রসঙ্গ। কমিশন আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত একটি মডেলের ভিত্তিতে নিহত শিশুদের পরিবারের জন্য এক কোটি টাকা এবং প্রাপ্তবয়স্কদের ক্ষেত্রে ৮০ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ দেওয়ার সুপারিশ করে। গুরুতর আহত শিশুদের জন্য ৬০ লাখ এবং প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য ৪০ লাখ টাকার ক্ষতিপূরণেরও প্রস্তাব দেওয়া হয়। পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের জন্য আলাদা অর্থ বরাদ্দের সুপারিশ ছিল। কিন্তু এক বছর পার হলেও এসব সুপারিশ বাস্তবায়নের কোনো অগ্রগতি হয়নি।
এদিকে দুর্ঘটনায় আহত বহু শিক্ষার্থী এখনও নিয়মিত চিকিৎসা নিচ্ছে। কারও শরীরের বড় অংশ পুড়ে গেছে, কেউ স্বাভাবিকভাবে হাঁটতে পারে না, আবার কেউ মানসিক আঘাত কাটিয়ে উঠতে পারেনি। অনেক পরিবারকে সন্তানদের স্কুল পরিবর্তন করতে হয়েছে, চিকিৎসার ব্যয় বহন করতে গিয়ে আর্থিক সংকটে পড়তে হয়েছে। নিহত শিশুদের পরিবারও বলছে, অর্থ কখনোই সন্তানের শূন্যতা পূরণ করতে পারে না; কিন্তু রাষ্ট্র যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, সেটিও তারা এখনো পায়নি।
এই দুর্ঘটনা শুধু একটি বিমান বিধ্বস্ত হওয়ার ঘটনা নয়; এটি রাষ্ট্রীয় প্রস্তুতি, সামরিক প্রশিক্ষণের মান, তদারকি ব্যবস্থা, নগর পরিকল্পনা, ভবন নিরাপত্তা এবং দুর্যোগ-পরবর্তী সহায়তা ব্যবস্থার একটি কঠিন পরীক্ষা। তদন্ত কমিশনের প্রতিবেদন দেখিয়েছে, একটি দুর্ঘটনা কখনোই একক কারণে ঘটে না। বরং ছোট ছোট একাধিক ত্রুটি, অবহেলা এবং সিদ্ধান্তগত দুর্বলতা একসঙ্গে মিলে একটি ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনে।
মাইলস্টোনের সেই দুপুর আজ ইতিহাসের একটি শোকাবহ অধ্যায়। কিন্তু ইতিহাসের সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো—ভুল থেকে শিক্ষা নেওয়া। তদন্ত কমিশনের সুপারিশগুলো যদি বাস্তবায়িত না হয়, নিরাপত্তা ব্যবস্থা যদি আগের মতোই থেকে যায়, আর ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলো যদি ন্যায়বিচার ও প্রতিশ্রুত সহায়তা থেকে বঞ্চিত হয়, তাহলে এই ট্র্যাজেডি শুধু অতীতের একটি ঘটনা হয়ে থাকবে না; বরং ভবিষ্যতের জন্যও একটি অমোচনীয় সতর্কবার্তা হয়ে থাকবে।
আপনার মতামত জানানঃ