তিস্তা শুধু একটি নদীর নাম নয়; এটি বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের লাখো মানুষের জীবন, কৃষি, অর্থনীতি ও ভবিষ্যতের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা একটি জাতীয় বাস্তবতা। বছরের পর বছর ধরে শুষ্ক মৌসুমে তিস্তার পানির সংকটে রংপুর অঞ্চলের বিস্তীর্ণ এলাকা কৃষি উৎপাদনে ক্ষতির মুখে পড়েছে। অন্যদিকে বর্ষাকালে অতিরিক্ত প্রবাহ আবার বন্যা ও নদীভাঙনের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। ফলে তিস্তাকে কেন্দ্র করে একটি দীর্ঘমেয়াদি সমন্বিত ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনার দাবি বহুদিনের। সম্প্রতি এই তিস্তা মহাপরিকল্পনা নিয়ে বাংলাদেশ, ভারত ও চীনের ভূরাজনৈতিক হিসাব-নিকাশ নতুন করে আলোচনায় এসেছে। বিশেষ করে প্রকল্পে চীনের সম্পৃক্ততা এবং বাংলাদেশের দৃঢ় অবস্থান ভারতের মধ্যে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে বলে দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বক্তব্যে ইঙ্গিত মিলেছে।
ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নিয়মিত ব্রিফিংয়ে মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল জানান, তিস্তা নদীর সমন্বিত ব্যবস্থাপনা ও পুনরুদ্ধার প্রকল্প সম্পর্কে ভারতের অবস্থান ইতোমধ্যেই বাংলাদেশকে আনুষ্ঠানিকভাবে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে। তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশে ভারতের উন্নয়ন সহযোগিতা পারস্পরিক বোঝাপড়া ও আলোচনার ভিত্তিতে পরিচালিত হয় এবং বিভিন্ন প্রকল্প একটি যৌথভাবে সম্মত রোডম্যাপ অনুসরণ করে। একই সঙ্গে তিনি উল্লেখ করেন, তিস্তা ইস্যুতে সাম্প্রতিক সব ধরনের পরিবর্তন ও নতুন পরিস্থিতি বিবেচনায় রেখে ভারত তাদের নীতিগত অবস্থান নির্ধারণ করবে।
ভারতের এই বক্তব্য কেবল একটি কূটনৈতিক মন্তব্য নয়; এর পেছনে রয়েছে দক্ষিণ এশিয়ার পরিবর্তিত ভূরাজনৈতিক বাস্তবতা। দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে তিস্তার পানিবণ্টন চুক্তি স্বাক্ষরের আলোচনা চললেও তা এখনো বাস্তবায়িত হয়নি। বিভিন্ন সময়ে দুই দেশের শীর্ষ পর্যায়ে আশাবাদ ব্যক্ত হলেও পশ্চিমবঙ্গ সরকারের আপত্তি, ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সমীকরণ এবং নানা প্রশাসনিক জটিলতার কারণে চুক্তিটি বারবার আটকে গেছে। ফলে বাংলাদেশ বহু বছর ধরে ন্যায্য পানির হিস্যা না পাওয়ার অভিযোগ করে আসছে।
এই দীর্ঘসূত্রতার মধ্যেই বাংলাদেশ তিস্তা নদীকে ঘিরে একটি বৃহৎ উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়নের উদ্যোগ গ্রহণ করে। পরিকল্পনার লক্ষ্য শুধু নদী খনন বা বাঁধ নির্মাণ নয়; বরং নদীর প্রবাহ নিয়ন্ত্রণ, পানি সংরক্ষণ, সেচব্যবস্থার আধুনিকীকরণ, নদীভাঙন রোধ, পরিবেশ পুনরুদ্ধার এবং উত্তরাঞ্চলের সামগ্রিক অর্থনৈতিক উন্নয়ন নিশ্চিত করা। অর্থাৎ এটি একটি অবকাঠামোগত প্রকল্পের পাশাপাশি একটি আঞ্চলিক উন্নয়ন কর্মসূচিও।
এই প্রকল্পে চীনের সম্ভাব্য অংশগ্রহণই ভারতের উদ্বেগের মূল কারণ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দক্ষিণ এশিয়ায় চীনের অর্থনৈতিক ও অবকাঠামোগত বিনিয়োগ উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। বন্দর, সড়ক, সেতু, বিদ্যুৎকেন্দ্র এবং রেলপথ নির্মাণে চীনের উপস্থিতি ইতোমধ্যেই ভারতকে সতর্ক করে তুলেছে। তিস্তা প্রকল্পেও যদি চীনের প্রত্যক্ষ ভূমিকা থাকে, তাহলে ভারতের দৃষ্টিতে সেটি কেবল একটি নদী উন্নয়ন প্রকল্প নয়; বরং তাদের সীমান্তসংলগ্ন অঞ্চলে চীনের কৌশলগত প্রভাব বিস্তারের সম্ভাবনা হিসেবেও দেখা হতে পারে।
অন্যদিকে বাংলাদেশের দৃষ্টিভঙ্গি ভিন্ন। বাংলাদেশের জন্য তিস্তা প্রকল্প মূলত একটি জাতীয় উন্নয়ন পরিকল্পনা। দেশের উত্তরাঞ্চলের কৃষি উৎপাদন, খাদ্যনিরাপত্তা, পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনা এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলার জন্য দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ অপরিহার্য। যদি কোনো উন্নয়ন সহযোগী সেই বিনিয়োগে আগ্রহ দেখায় এবং বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থের সঙ্গে তা সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়, তাহলে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশ তার উন্নয়ন অংশীদার নির্বাচন করার অধিকার রাখে।
সম্প্রতি বেইজিং সফরকালে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তিস্তা মহাপরিকল্পনাকে জাতীয় অগ্রাধিকার হিসেবে উল্লেখ করেন এবং এটি বাস্তবায়নের ব্যাপারে সরকারের দৃঢ় অঙ্গীকারের কথা জানান। তিনি বলেন, নদী, খাল এবং সেচ অবকাঠামোতে বড় ধরনের বিনিয়োগের মাধ্যমে দীর্ঘদিনের পানি ব্যবস্থাপনা সংকটের সমাধান করা হবে। বিশেষ করে উত্তরাঞ্চলের কৃষিনির্ভর এলাকায় সারা বছর পর্যাপ্ত পানির ব্যবস্থা নিশ্চিত করাই সরকারের অন্যতম লক্ষ্য।
চীনও এ বিষয়ে নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করেছে। বেইজিংয়ের বক্তব্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের সঙ্গে তাদের জলসম্পদ সহযোগিতা কোনো তৃতীয় দেশকে লক্ষ্য করে নয়। বরং এটি দুই দেশের উন্নয়ন সহযোগিতার অংশ। তবে আন্তর্জাতিক সম্পর্কের বাস্তবতায় বড় শক্তিগুলোর প্রতিটি বিনিয়োগই অনেক সময় রাজনৈতিক ও কৌশলগত দৃষ্টিকোণ থেকে বিশ্লেষণ করা হয়। ফলে চীনের এই ব্যাখ্যা ভারতের উদ্বেগ পুরোপুরি দূর করতে পারেনি।
তিস্তা ইস্যুতে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো পানিবণ্টন চুক্তির দীর্ঘ অচলাবস্থা। আন্তর্জাতিক নদীর পানিবণ্টনে উজান ও ভাটির দেশের মধ্যে সহযোগিতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশ বহু বছর ধরে ন্যায্য হিস্যার দাবি জানিয়ে এলেও চুক্তি বাস্তবায়ন না হওয়ায় দেশের উত্তরাঞ্চলে শুষ্ক মৌসুমে নদীর প্রবাহ আশঙ্কাজনকভাবে কমে যায়। এতে কৃষকরা সেচ সংকটে পড়েন, ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভরতা বাড়ে এবং পরিবেশগত ভারসাম্যও ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
এই বাস্তবতা বাংলাদেশকে বিকল্প সমাধানের দিকে এগোতে উৎসাহিত করেছে। নদীর পানি সংরক্ষণ, জলাধার নির্মাণ, সেচ অবকাঠামোর উন্নয়ন এবং নদী পুনরুদ্ধারের মতো উদ্যোগ গ্রহণ করলে কেবল বর্তমান সংকটই কমবে না, ভবিষ্যতের জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলাও সহজ হবে। বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশের নদীগুলোর টেকসই ব্যবস্থাপনার জন্য দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার বিকল্প নেই।
তবে এই প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে পরিবেশগত বিষয়ও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বড় ধরনের নদী উন্নয়ন প্রকল্পে জীববৈচিত্র্য, মাছের প্রজনন, নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ এবং স্থানীয় জনগণের জীবনযাত্রার ওপর কী ধরনের প্রভাব পড়বে, তা আগে থেকেই মূল্যায়ন করা প্রয়োজন। আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণ করে পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ন, স্থানীয় জনগণের মতামত গ্রহণ এবং বিজ্ঞানভিত্তিক পরিকল্পনা নিশ্চিত করা হলে প্রকল্পটি আরও গ্রহণযোগ্য ও টেকসই হবে।
তিস্তা নিয়ে বর্তমান পরিস্থিতি দক্ষিণ এশিয়ার কূটনীতির একটি বড় পরীক্ষাও বটে। একদিকে বাংলাদেশ তার উন্নয়ন চাহিদা পূরণে নতুন অংশীদার খুঁজছে, অন্যদিকে ভারত তার কৌশলগত নিরাপত্তা ও আঞ্চলিক প্রভাব বজায় রাখতে সচেষ্ট। একই সময়ে চীন দক্ষিণ এশিয়ায় অর্থনৈতিক সহযোগিতা সম্প্রসারণে আগ্রহী। ফলে একটি নদীকে কেন্দ্র করে তিন দেশের স্বার্থ এক বিন্দুতে এসে মিলেছে।
বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়া। উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে কোনো দেশের সঙ্গে সহযোগিতা করা হবে, সেটি নির্ধারণের অধিকার একটি সার্বভৌম রাষ্ট্রের নিজস্ব বিষয়। তবে একই সঙ্গে প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখা, স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এবং পারস্পরিক আস্থার পরিবেশ তৈরি করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
ভবিষ্যতে যদি তিস্তা পানিবণ্টন চুক্তি বাস্তবায়নের উদ্যোগ নতুন করে গতি পায়, তাহলে সেটি দুই দেশের জন্যই ইতিবাচক হবে। কারণ সীমান্ত ভাগাভাগি করা নদীগুলোর টেকসই ব্যবস্থাপনা কখনো এককভাবে সম্ভব নয়। যৌথ উদ্যোগ, তথ্য আদান-প্রদান, বৈজ্ঞানিক গবেষণা এবং নিয়মিত সংলাপের মাধ্যমেই দীর্ঘমেয়াদি সমাধান খুঁজে পাওয়া যেতে পারে।
সবশেষে বলা যায়, তিস্তা মহাপরিকল্পনা এখন শুধু একটি উন্নয়ন প্রকল্প নয়; এটি বাংলাদেশের পানি নিরাপত্তা, কৃষি, পরিবেশ, কূটনীতি এবং আঞ্চলিক রাজনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতীক হয়ে উঠেছে। ভারতের উদ্বেগ, চীনের আগ্রহ এবং বাংলাদেশের উন্নয়ন পরিকল্পনা—এই তিনটি বিষয় মিলিয়ে তিস্তা এখন দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম আলোচিত ইস্যু। তবে যেকোনো আলোচনা বা কূটনৈতিক অবস্থানের কেন্দ্রে থাকা উচিত নদীকেন্দ্রিক অঞ্চলের সাধারণ মানুষের জীবনমান উন্নয়ন, টেকসই পানি ব্যবস্থাপনা এবং পারস্পরিক সহযোগিতার ভিত্তিতে একটি স্থায়ী সমাধান খুঁজে বের করা।
আপনার মতামত জানানঃ