কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই নিয়ে আমাদের আলোচনা সাধারণত ঘুরপাক খায় চাকরি, শিক্ষা, ব্যবসা কিংবা প্রযুক্তিগত উন্নয়নকে ঘিরে। কিন্তু এই প্রযুক্তি যে মানুষের ব্যক্তিগত জীবন, গোপন কল্পনা এবং যৌন ফ্যান্টাসিরও নতুন এক পরিসর তৈরি করছে, সে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা তুলনামূলকভাবে কম। অথচ সাম্প্রতিক গবেষণা বলছে, এআই এখন শুধু প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার যন্ত্র নয়; অনেক মানুষের কাছে এটি হয়ে উঠেছে এমন এক ব্যক্তিগত সঙ্গী, যার সঙ্গে তারা এমন গল্প, কল্পনা এবং আকাঙ্ক্ষা ভাগ করে নিচ্ছেন, যা বাস্তব জীবনে কাউকেই বলতে চান না।
ওয়াশিংটন বিশ্ববিদ্যালয় এবং ইউনিভার্সিটি অব কলোরাডো বোল্ডারের গবেষকদের পরিচালিত “AI Fiction in the Wild” গবেষণা এই পরিবর্তনের একটি স্পষ্ট চিত্র তুলে ধরেছে। গবেষণায় বিশ্লেষণ করা হয়েছে WildChat নামের একটি উন্মুক্ত তথ্যভাণ্ডার, যেখানে ব্যবহারকারীদের সম্মতি নিয়ে সংরক্ষিত হয়েছে পাঁচ লাখেরও বেশি চ্যাটবট কথোপকথন।
গবেষণার ফলাফল বিস্ময়কর। দেখা গেছে, মোট কথোপকথনের প্রায় এক-তৃতীয়াংশই ছিল গল্প তৈরির অনুরোধ। আরও অবাক করার বিষয় হলো, এই গল্পগুলোর প্রায় অর্ধেকই ছিল ফ্যানফিকশন, অর্থাৎ জনপ্রিয় চরিত্রকে কেন্দ্র করে নতুন গল্প। আর এক-চতুর্থাংশেরও বেশি ছিল সরাসরি যৌন-বিষয়ক কাহিনি বা কল্পনাভিত্তিক বর্ণনা।
এই তথ্য আমাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ সত্যের সামনে দাঁড় করায়। মানুষ এআইকে শুধু তথ্যের জন্য ব্যবহার করছে না; বরং ব্যক্তিগত কল্পনার এমন একটি জগৎ তৈরিতে ব্যবহার করছে, যেখানে কোনো সামাজিক বিচার নেই, কোনো লজ্জা নেই, কোনো পাঠকও নেই। আছে শুধু একজন মানুষ এবং একটি ভাষা মডেল।
গবেষণার সবচেয়ে আলোচিত উদাহরণ ছিল একজন ব্যবহারকারীকে ঘিরে। তিনি কয়েক মাস ধরে একই ধরনের একটি গল্প হাজার হাজারবার লিখিয়েছেন। গল্পটি ছিল জনপ্রিয় ভিজ্যুয়াল নভেল *Doki Doki Literature Club*-এর একটি চরিত্রকে ঘিরে। প্রতিবার একই জায়গায় এসে প্রম্পট শেষ হয়েছে, আর বাকি অংশ লিখেছে এআই। প্রতিবার গল্পে এসেছে সামান্য পরিবর্তন, কিন্তু মূল কাঠামো একই থেকেছে।
প্রথম নজরে এটি অদ্ভুত মনে হতে পারে। কিন্তু মনোবিজ্ঞানের দৃষ্টিকোণ থেকে বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। অনেক মানুষ নিরাপদ ও পরিচিত কল্পনার মধ্যে বারবার ফিরে যেতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। কেউ একই গান বারবার শোনেন, কেউ একই সিনেমা বহুবার দেখেন। এআই সেই পুনরাবৃত্তিকে আরও সহজ করে দিয়েছে। এখন একই গল্পের অসংখ্য নতুন সংস্করণ মুহূর্তেই তৈরি করা সম্ভব।
যৌনতা নিয়ে মানুষের কৌতূহল নতুন নয়। সাহিত্য, সিনেমা, চিত্রকলা কিংবা ইন্টারনেট—সব যুগেই এটি মানুষের সৃজনশীলতার অংশ ছিল। নতুন বিষয় হলো, এখন সেই কল্পনার সঙ্গী হিসেবে এসেছে এআই। এখানে ব্যবহারকারী নিজের ইচ্ছামতো চরিত্র, পরিস্থিতি এবং সংলাপ তৈরি করতে পারেন। কোনো সম্পাদক নেই, কোনো প্রকাশক নেই, এমনকি কোনো পাঠকও নেই।
এই ব্যক্তিগত পরিবেশই এআইকে অন্য সব মাধ্যম থেকে আলাদা করে। একজন ব্যবহারকারী জানেন, তিনি যত অদ্ভুত বা বিব্রতকর কল্পনাই প্রকাশ করুন না কেন, একটি চ্যাটবট তাকে বিচার করবে না। এই বিচারহীন পরিবেশ মানুষকে এমন সব বিষয় প্রকাশ করতে উৎসাহিত করছে, যা তারা অন্য কারও সামনে বলতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন না।
তবে এখানেই শুরু হয় নৈতিক প্রশ্ন। যখন একটি প্রযুক্তি মানুষের সবচেয়ে ব্যক্তিগত কল্পনার অংশ হয়ে ওঠে, তখন গোপনীয়তা, নিরাপত্তা এবং মানসিক সুস্থতার বিষয়গুলোও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। ব্যবহারকারীর তথ্য কতটা নিরাপদ? এই কথোপকথন কি ভবিষ্যতে গবেষণা বা অন্য কোনো কাজে ব্যবহৃত হতে পারে? একটি এআই কি মানুষের আবেগকে প্রভাবিত করতে পারে? এসব প্রশ্নের উত্তর এখনও পুরোপুরি স্পষ্ট নয়।
গবেষণার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, গল্প তৈরির অনুরোধকারীদের মধ্যে মাত্র দুই শতাংশ ব্যবহারকারী মোট গল্পভিত্তিক কথোপকথনের ৮০ শতাংশেরও বেশি তৈরি করেছেন। অর্থাৎ অল্পসংখ্যক ব্যবহারকারী এআইকে অত্যন্ত নিবিড়ভাবে ব্যবহার করছেন। গবেষকরা এদের মধ্যে একদলকে বলেছেন “Infinite Story Demanders”—যারা দীর্ঘদিন ধরে একই গল্পের ভিন্ন ভিন্ন সংস্করণ তৈরি করতে থাকেন।
এটি শুধু প্রযুক্তি ব্যবহারের একটি অভ্যাস নয়; বরং মানুষের সঙ্গে প্রযুক্তির সম্পর্কের একটি নতুন ধাপ। আগে মানুষ বই পড়ত, সিনেমা দেখত কিংবা ভিডিও গেম খেলত। এখন অনেকেই নিজের জন্য ব্যক্তিগত গল্প তৈরি করছেন, যেখানে কাহিনির গতি, চরিত্র এবং সমাপ্তি—সবকিছুই তার ইচ্ছামতো বদলে যাচ্ছে।
তবে এই বাস্তবতাকে শুধুই নেতিবাচক হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এআই অনেকের জন্য সৃজনশীলতারও একটি নতুন মাধ্যম। অনেক লেখক চরিত্র তৈরি, সংলাপ লেখা কিংবা গল্পের খসড়া তৈরিতে এআই ব্যবহার করছেন। আবার কেউ কেউ ব্যক্তিগত ডায়েরির মতো করে কল্পনার গল্প লিখছেন। ফলে একই প্রযুক্তি যেমন সৃজনশীলতা বাড়াতে পারে, তেমনি অতিরিক্ত নির্ভরশীলতার ঝুঁকিও তৈরি করতে পারে।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় মনে রাখা দরকার। গবেষণায় যৌন-বিষয়ক গল্পের উপস্থিতি বেশি পাওয়া গেলেও, এর অর্থ এই নয় যে সব এআই ব্যবহারকারী একই ধরনের উদ্দেশ্যে প্রযুক্তি ব্যবহার করছেন। বরং এটি দেখায়, একটি নির্দিষ্ট শ্রেণির ব্যবহারকারী অত্যন্ত সক্রিয়ভাবে এই ধরনের কনটেন্ট তৈরি করছেন, যার কারণে সামগ্রিক পরিসংখ্যানে এর প্রভাব বেশি দেখা যাচ্ছে।
এআই যত উন্নত হবে, ততই এটি মানুষের ব্যক্তিগত জীবনের অংশ হয়ে উঠবে। ভবিষ্যতে হয়তো এমন এআই আসবে, যা বছরের পর বছর একই চরিত্র, একই গল্প এবং একই ব্যবহারকারীর পছন্দ মনে রাখতে পারবে। তখন এই ব্যক্তিগত কল্পনার জগৎ আরও বিস্তৃত হবে।
প্রযুক্তির ইতিহাসে প্রতিটি বড় উদ্ভাবন মানুষের আচরণ বদলে দিয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বদলে দিয়েছে বন্ধুত্বের ধরন, স্মার্টফোন বদলে দিয়েছে যোগাযোগের অভ্যাস। এআই হয়তো বদলে দেবে মানুষের কল্পনা করার পদ্ধতি। মানুষ শুধু গল্প পড়বে না, নিজের জন্য গল্প তৈরি করবে—বারবার, নিজের ইচ্ছামতো।
সেই কারণেই “AI Fiction in the Wild” গবেষণাটি শুধু প্রযুক্তি নিয়ে নয়; এটি মানুষের মন, একাকিত্ব, কল্পনা এবং যৌনতার নতুন বাস্তবতা নিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ দলিল। এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয়, এআইকে বোঝার জন্য শুধু এর প্রযুক্তিগত ক্ষমতা বিশ্ল
আপনার মতামত জানানঃ