
আন্তর্জাতিক বার্তাসংস্থা রয়টার্সের এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রকাশ করে বলা হয়েছে, রাশিয়াকে গোপনে সামরিক প্রশিক্ষণ দিচ্ছে চীন। প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, গত বছর রুশ বাহিনীর জন্য একটি গোপন প্রশিক্ষণ কর্মসূচি ব্যক্তিগতভাবে অনুমোদন করেছিলেন রাশিয়ার প্রতিরক্ষামন্ত্রী আন্দ্রেই বেলৌসভ। এই কর্মসূচিতে অন্তত চারজন রুশ ও চীনা জেনারেল সরাসরি যুক্ত ছিলেন বলে ইউরোপীয় দুই কর্মকর্তার বরাতে উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রশিক্ষণের বিবরণ
রয়টার্সের দেখা একটি গোপন রুশ নথি ও ইউরোপীয় গোয়েন্দা সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের নভেম্বরে বেইজিংয়ের একটি সামরিক স্থাপনায় তেজস্ক্রিয়, রাসায়নিক ও জৈবিক সুরক্ষা (NBC) বিষয়ে তিন সপ্তাহব্যাপী একটি প্রশিক্ষণ কোর্স অনুষ্ঠিত হয়। এতে প্রায় ২০০ রুশ সেনা অংশ নেয়, যাদের মধ্যে কেউ কেউ পরে ইউক্রেন যুদ্ধে মোতায়েন হয়েছেন বলে অভিযোগ।
প্রশিক্ষণে রুশ সেনারা চীনা প্রশিক্ষকদের কাছ থেকে একটি মডেল পারমাণবিক চুল্লি পরিদর্শন, রাসায়নিক গোয়েন্দা কার্যক্রম, তেজস্ক্রিয়তা শনাক্তকরণ ও দূষণের মধ্যে বায়ু চলাচল ব্যবস্থা সুরক্ষিত রাখার কৌশল শেখেন। ইউরোপীয় একজন কর্মকর্তা রয়টার্সকে বলেন, “এ ধরনের সংবেদনশীল প্রশিক্ষণ সামরিক বাহিনীর জন্য অত্যন্ত কৌশলগত গুরুত্ব বহন করে।”
উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের সম্পৃক্ততা
রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রশিক্ষণ কর্মসূচির ভিত্তি হিসেবে থাকা ২ জুলাইয়ের একটি চুক্তিতে রাশিয়ার মেজর জেনারেল রুস্তাম খুসাইনভ এবং চীনের সিনিয়র কর্নেল সান দাইউন স্বাক্ষর করেছিলেন। এছাড়া:
-
কর্নেল জেনারেল রুস্তাম মুরাদভ (রুশ স্থলবাহিনীর উপপ্রধান) রুশ প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেন।
-
মেজর জেনারেল লি জিনসুন (পিএলএ-র NBC একাডেমির প্রধান) একটি প্রশিক্ষণ কোর্সের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে অংশ নেন।
-
মেজর জেনারেল ভিটালি গেরাসিমভ বেনবু শহরে অনুষ্ঠিত আরেকটি প্রশিক্ষণ কোর্সে যোগ দেন।
চীন-রাশিয়ার অস্বীকৃতি
অভিযোগের বিষয়ে চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে জানায়, ইউক্রেন সংকট নিয়ে তাদের অবস্থান অপরিবর্তিত রয়েছে এবং এ ধরনের অভিযোগ ‘সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন’। বেইজিং বরাবরের মতোই দাবি করেছে, ইউক্রেন যুদ্ধে তারা নিরপেক্ষ অবস্থানে রয়েছে এবং শান্তি মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করছে।
অন্যদিকে, রাশিয়ার পার্লামেন্টের প্রতিরক্ষা কমিটির প্রধান আন্দ্রেই কার্তাপোলভ দেশটির আরটিভিআই টেলিভিশনকে বলেন, এই প্রশিক্ষণসংক্রান্ত প্রতিবেদন ‘সম্পূর্ণ অর্থহীন’ এবং রাশিয়ার সামরিক বাহিনীর চীনের কাছ থেকে শেখার কিছু নেই। ক্রেমলিনও পশ্চিমা গণমাধ্যমে ‘ভুল তথ্য’ প্রচারের অভিযোগ তোলে।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের উদ্বেগ ও পদক্ষেপ
ইউরোপীয় ইউনিয়নের পররাষ্ট্রনীতি প্রধান কাজা কালাস গত ১৫ জুন বলেন, ব্রাসেলস নিজস্ব সূত্রে এই প্রশিক্ষণের তথ্য নিশ্চিত করেছে এবং এখন এর প্রভাব মূল্যায়ন করছে। তিনি উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, রাশিয়ার যুদ্ধ প্রচেষ্টায় চীনের ক্রমবর্ধমান সহায়তা ইউরোপের নিরাপত্তার জন্য হুমকি।
ইইউ ইতোমধ্যে রাশিয়াকে সামরিক সহায়তার অভিযোগে কয়েকটি চীনা প্রতিষ্ঠানের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। ব্রাসেলসভিত্তিক এক ইউরোপীয় কর্মকর্তা রয়টার্সকে বলেন, “ইউরোপীয় ইউনিয়নের উচিত চীনকে শুধু অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা বন্ধ করা এবং রাশিয়ার যুদ্ধের ‘নির্ণায়ক সহায়ক’ হিসেবে তার ভূমিকাকেও গুরুত্ব দেওয়া।”
যুদ্ধের অভিজ্ঞতা: দুই দেশের পার্থক্য
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ইউক্রেনে চার বছরের বেশি সময় ধরে যুদ্ধ চালিয়ে রাশিয়া ব্যাপক যুদ্ধক্ষেত্রের বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জন করলেও, প্রযুক্তিগতভাবে অত্যন্ত উন্নত চীন কয়েক দশক ধরে কোনো যুদ্ধে অংশ নেয়নি। রয়টার্সের পাওয়া রুশ প্রতিবেদনে চীনা প্রশিক্ষকদের তাত্ত্বিক জ্ঞান ও সিমুলেটরের প্রশংসা করা হলেও চীনের যুদ্ধক্ষেত্রের বাস্তব অভিজ্ঞতার অভাব উল্লেখ করা হয়েছে।
সম্ভাব্য ভূ-রাজনৈতিক প্রভাব
২০২২ সালে ইউক্রেন আক্রমণের পর থেকে ইউরোপীয় দেশগুলো রাশিয়াকে প্রধান নিরাপত্তা হুমকি হিসেবে বিবেচনা করলেও, চীনের সঙ্গে মস্কোর ক্রমবর্ধমান ঘনিষ্ঠতা তাদের বাড়তি উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই প্রতিবেদন ইউরোপ-চীন সম্পর্কে নতুন টানাপোড়েন তৈরি করতে পারে, বিশেষ করে যখন ইইউ চীনকে শুধু অর্থনৈতিক অংশীদার নয়, রাশিয়ার যুদ্ধের সহায়ক হিসেবেও বিবেচনা করতে শুরু করেছে।
এখন দেখার বিষয়, এই প্রতিবেদনের প্রভাবে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও অন্যান্য পশ্চিমা দেশগুলো চীন-রাশিয়া সম্পর্কের বিরুদ্ধে কোনো নতুন নিষেধাজ্ঞা বা কূটনৈতিক পদক্ষেপ নেয় কি না। তবে, উভয় দেশই আপাতত অভিযোগগুলোকে ভিত্তিহীন বলে উড়িয়ে দিচ্ছে।
আপনার মতামত জানানঃ