ভারতজুড়ে এখন গ্রীষ্ম যেন কেবল একটি ঋতুর নাম নয়, বরং ধীরে ধীরে তা পরিণত হয়েছে এক নীরব দুর্যোগে। আকাশের সূর্য যেন আগের চেয়ে আরও বেশি নিষ্ঠুর, বাতাসে নেই স্বস্তির ছোঁয়া, মাটিতে নেই শীতলতার কোনো ইঙ্গিত। রাজধানী দিল্লি থেকে শুরু করে মহারাষ্ট্র, পশ্চিমবঙ্গ, রাজস্থান কিংবা কাশ্মীর—প্রতিটি অঞ্চলে মানুষ যেন একই আগুনের ভেতর দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে। কোথাও তাপমাত্রা ৪৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছাড়িয়ে যাচ্ছে, কোথাও ৪৬ কিংবা ৪৭ ডিগ্রির কাছাকাছি পৌঁছাচ্ছে। এপ্রিলের শেষ দিকে বিশ্বের সবচেয়ে উষ্ণ ৫০টি শহরের সব কটিই ছিল ভারতে—এ তথ্য শুধু একটি পরিসংখ্যান নয়, এটি একটি ভয়াবহ বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি।
এই তাপপ্রবাহের ভয়াবহতা বোঝা যায় সাধারণ মানুষের জীবন দেখলে। সকাল সাতটায় রাস্তায় বের হলেই চোখ ঝলসে যায়। সূর্যের দিকে তাকানো তো দূরের কথা, রাস্তায় কয়েক মিনিট হাঁটাও যেন কষ্টকর হয়ে উঠছে। কৃষকেরা মাঠে কাজ করতে পারছেন না। শ্রমিকেরা কাজের মাঝখানেই অসুস্থ হয়ে পড়ছেন। গবাদিপশু পর্যন্ত তাপের চাপে দুর্বল হয়ে যাচ্ছে। শহরের ফুটপাতে বসে থাকা দোকানদার, রিকশাচালক, নির্মাণশ্রমিক কিংবা দিনমজুরেরা যেন প্রতিদিন মৃত্যুর ঝুঁকি নিয়েই জীবিকা নির্বাহ করছেন।
ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে ইতিমধ্যে তাপজনিত মৃত্যুর খবর পাওয়া যাচ্ছে। কোথাও ভোট দিতে গিয়ে মানুষ মারা যাচ্ছে, কোথাও জনশুমারির কাজে নিয়োজিত কর্মীরা হিটস্ট্রোকে প্রাণ হারাচ্ছেন। এমনকি বিয়ের অনুষ্ঠানে যাওয়ার পথে বাসের ভেতর অতিরিক্ত গরমে মৃত্যুর ঘটনাও ঘটেছে। কিন্তু সমালোচকদের মতে, বাস্তব পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ। কারণ তাপজনিত অধিকাংশ মৃত্যুই সরকারি নথিতে ঠিকভাবে উঠে আসে না। অনেক সময় হৃদরোগ, কিডনি বিকল কিংবা শ্বাসকষ্টের আড়ালে প্রকৃত কারণ হিসেবে তাপপ্রবাহের প্রভাবকে লুকিয়ে ফেলা হয়।
স্বাস্থ্যবিশেষজ্ঞদের মতে, অতিরিক্ত গরম শুধু হিটস্ট্রোক নয়, মানুষের শরীরে দীর্ঘমেয়াদি নানাবিধ জটিলতা তৈরি করছে। কিডনির ক্ষতি, ডায়াবেটিসের অবনতি, শ্বাসকষ্ট, অনিদ্রা, মানসিক চাপ—সবকিছুই বাড়িয়ে দিচ্ছে এই অস্বাভাবিক তাপমাত্রা। বিশেষ করে যারা আগে থেকেই অসুস্থ, বয়স্ক কিংবা শিশু, তারা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে। একদিকে তীব্র গরম, অন্যদিকে বিদ্যুৎ ও পানির সংকট—সব মিলিয়ে পরিস্থিতি হয়ে উঠছে আরও ভয়াবহ।
কিন্তু এই ভয়াবহ বাস্তবতার মাঝেও ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারকে ঘিরে উঠছে তীব্র সমালোচনা। অভিযোগ উঠেছে, সরকার সংকট সমাধানের চেয়ে বরং সেটিকে রাজনৈতিক প্রচারণার অংশে পরিণত করছে। রাজধানীতে চালু করা হয়েছে তথাকথিত ‘কুলিং পয়েন্ট’, যেখানে মানুষের জন্য সাময়িক ঠান্ডা পরিবেশের ব্যবস্থা করা হলেও সেখানে প্রধানমন্ত্রীর ছবি ব্যবহার করা হয়েছে। সমালোচকদের মতে, এটি জনসেবার চেয়ে বেশি রাজনৈতিক ব্র্যান্ডিংয়ের প্রচেষ্টা। কোভিড মহামারির সময় টিকার সার্টিফিকেটে যেমন প্রধানমন্ত্রীর ছবি ব্যবহার করা হয়েছিল, ঠিক তেমনভাবেই এখন তাপপ্রবাহ মোকাবিলার উদ্যোগেও রাজনৈতিক প্রচারের ছাপ স্পষ্ট।
অনেকে বলছেন, ভারতের বর্তমান শাসনব্যবস্থা প্রতিটি সংকটকে প্রচারণার সুযোগ হিসেবে ব্যবহার করছে। কোথাও কর্মকর্তারা ক্যামেরার সামনে দাঁড়িয়ে মানুষের মুখ মুছিয়ে দিচ্ছেন, কোথাও পানি বিতরণ কার্যক্রমকে বড় রাজনৈতিক ইভেন্টে পরিণত করা হচ্ছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, কোটি কোটি মানুষ এখনো নিরাপদ আশ্রয়, বিশুদ্ধ পানি কিংবা পর্যাপ্ত চিকিৎসা পাচ্ছেন না।
জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে ভারতের অবস্থান নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশ যখন গাছপালা সংরক্ষণ, সবুজায়ন, জলাভূমি রক্ষা ও জীববৈচিত্র্য টিকিয়ে রাখার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে, তখন ভারতে চলছে উল্টো চিত্র। বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের নামে ব্যাপক বৃক্ষচ্ছেদন চলছে। মহারাষ্ট্রের নাশিকে শত বছরের পুরোনো বটগাছ কেটে ফেলা হচ্ছে। পুনেতে রাস্তা সম্প্রসারণের জন্য কাটা হচ্ছে পুরোনো বৃক্ষ। বেঙ্গালুরুতে মেট্রোর কাজের জন্য উজাড় হচ্ছে সবুজ এলাকা। এমনকি কাশ্মীরের মতো শীতল অঞ্চলও এখন আর আগের মতো নেই; সেখানে পর্যন্ত গাছ কেটে তৈরি হচ্ছে ‘স্মার্ট সিটি’।
পরিবেশবিদদের মতে, এই নির্বিচার বৃক্ষচ্ছেদন ও অপরিকল্পিত নগরায়ন ভারতের তাপমাত্রা আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে। শহরের কংক্রিটের দেয়াল দিনে সূর্যের তাপ শোষণ করে রাতে তা আবার বাতাসে ছড়িয়ে দিচ্ছে। ফলে রাতেও তাপমাত্রা কমছে না। মানুষ ঘুমাতে পারছে না, বিশ্রাম নিতে পারছে না। গরম যেন ২৪ ঘণ্টার এক অবিরাম যন্ত্রণায় পরিণত হয়েছে।
২০১৪ সালে ক্ষমতায় আসার পর প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে যে মন্তব্য করেছিলেন, সেটিও নতুন করে আলোচনায় এসেছে। তিনি বলেছিলেন, “জলবায়ু বদলায়নি, আমরা বদলেছি।” সেই বক্তব্য তখন যেমন বিতর্ক তৈরি করেছিল, আজকের ভয়াবহ তাপপ্রবাহের প্রেক্ষাপটে সেটি আরও বেশি সমালোচিত হচ্ছে। সমালোচকদের প্রশ্ন, যে নেতৃত্ব জলবায়ু সংকটের বাস্তবতাকেই পুরোপুরি উপলব্ধি করতে চায় না, তারা কীভাবে এই সংকট মোকাবিলায় কার্যকর ভূমিকা রাখবে?
তাপপ্রবাহের সবচেয়ে নির্মম দিক হলো এর বৈষম্যমূলক প্রভাব। ধনী মানুষ শীতাতপনিয়ন্ত্রিত বাসা, গাড়ি ও অফিসে কিছুটা নিরাপদ থাকতে পারছেন। কিন্তু দরিদ্র মানুষদের জন্য গরম মানেই সরাসরি বেঁচে থাকার লড়াই। ফুটপাতের দোকানদার, দিনমজুর, গৃহহীন মানুষ কিংবা নিম্নআয়ের পরিবারগুলো সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। শহরের ছায়াহীন রাস্তাগুলো যেন তাদের জন্য আগুনের চুল্লিতে পরিণত হয়েছে।
হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের সাউথ এশিয়া ইনস্টিটিউটের এক গবেষণায় বলা হয়েছে, প্রায় ৩৮ কোটি ভারতীয় এমন তাপমাত্রার মধ্যে বসবাস করছেন যা মানবদেহের সহ্যসীমার বাইরে চলে গেছে। গবেষকরা বলছেন, আর্দ্র তাপমাত্রা যখন ৩৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস অতিক্রম করে, তখন মানবদেহ আর নিজের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না। পর্যাপ্ত পানি পান কিংবা ছায়ায় বিশ্রাম নেওয়ার পরও শরীরের তাপমাত্রা বাড়তে থাকে, যা কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই মৃত্যুর কারণ হতে পারে।
এ অবস্থায় ভারতের তাপ ব্যবস্থাপনা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। সমালোচকদের অভিযোগ, সরকারের তথ্যব্যবস্থা অস্বচ্ছ ও বিভক্ত। কোথাও সঠিক তাপমাত্রা প্রকাশ করা হচ্ছে না, কোথাও মৃত্যুর প্রকৃত সংখ্যা গোপন রাখা হচ্ছে। এমনকি ২০২৪ সালে ৫২.৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা রেকর্ডের ঘটনাকে পরে ‘যন্ত্রের ত্রুটি’ বলে ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছিল, যা সাধারণ মানুষের মধ্যে আরও সন্দেহ তৈরি করেছে।
ভারতের ষোড়শ অর্থ কমিশন ইতিমধ্যে সুপারিশ করেছে, তাপপ্রবাহকে জাতীয় দুর্যোগ হিসেবে ঘোষণা করা হোক। কিন্তু সেই প্রস্তাব বাস্তবায়ন কিংবা ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের জন্য কার্যকর সহায়তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে এখনো দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই। ক্ষতিপূরণ, ত্রাণ কিংবা স্বাস্থ্যসেবার ক্ষেত্রে মানুষকে আমলাতান্ত্রিক জটিলতার মুখোমুখি হতে হচ্ছে।
এখন প্রশ্ন উঠছে, এই সংকট কি কেবল একটি মৌসুমি সমস্যা, নাকি এটি ভবিষ্যতের ভয়ংকর বাস্তবতার সূচনা? বিজ্ঞানীরা সতর্ক করছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে দক্ষিণ এশিয়ায় তাপপ্রবাহ আরও দীর্ঘ ও ভয়াবহ হতে পারে। অর্থাৎ আজ যা দেখা যাচ্ছে, ভবিষ্যতে তা আরও ভয়ংকর রূপ নিতে পারে।
ভারতের বর্তমান পরিস্থিতি শুধু একটি দেশের সংকট নয়, এটি গোটা দক্ষিণ এশিয়ার জন্য সতর্কবার্তা। বাংলাদেশ, পাকিস্তান, নেপালসহ পুরো অঞ্চলই একই ধরনের জলবায়ুগত ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। তাই এই সংকটকে কেবল রাজনৈতিক বিতর্কের বিষয় হিসেবে দেখলে চলবে না। প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, পরিবেশ সংরক্ষণ, সবুজায়ন, কার্যকর নগর ব্যবস্থাপনা এবং সর্বোপরি জলবায়ু বাস্তবতাকে স্বীকার করার রাজনৈতিক সদিচ্ছা।
কারণ গরম এখন আর কেবল অস্বস্তি নয়, এটি ধীরে ধীরে মানুষের জীবন, স্বাস্থ্য ও ভবিষ্যতের ওপর নেমে আসা এক নীরব বিপর্যয়ে পরিণত হচ্ছে। আর যখন রাষ্ট্র মানুষের নিরাপত্তার চেয়ে প্রচারণাকে বেশি গুরুত্ব দেয়, তখন সাধারণ মানুষের মনে একটাই অনুভূতি জন্ম নেয়—এই দগ্ধ সময়ের লড়াইয়ে তারা আসলে একাই।
আপনার মতামত জানানঃ