বাংলাদেশের অর্থনীতি, কূটনীতি ও বৈশ্বিক বাণিজ্য সম্পর্কের বাস্তবতায় আন্তর্জাতিক চুক্তি এখন শুধু কাগজে লেখা কিছু শর্ত নয়; বরং এটি হয়ে উঠেছে রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক অবস্থান নির্ধারণের অন্যতম বড় উপাদান। বিশেষ করে বিশ্বের বৃহৎ অর্থনীতির দেশগুলোর সঙ্গে উন্নয়নশীল দেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে এসব চুক্তির গুরুত্ব আরও বেশি। সম্প্রতি সিলেটে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির যে বক্তব্য দিয়েছেন, তা দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক বাস্তবতায় গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার জন্ম দিয়েছে। তিনি বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে করা বাণিজ্য চুক্তি পরিবর্তনের সুযোগ আছে, তবে সেটি ইচ্ছেমতো বা একতরফাভাবে করা সম্ভব নয়। এই বক্তব্যের মধ্য দিয়ে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য চুক্তির জটিলতা, রাষ্ট্রীয় স্বার্থের ভারসাম্য এবং বাস্তববাদী কূটনীতির বিষয়টি সামনে এসেছে।
বিশ্ব রাজনীতির ইতিহাসে দেখা যায়, কোনো রাষ্ট্র যখন আরেকটি রাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য বা অর্থনৈতিক চুক্তিতে আবদ্ধ হয়, তখন সেখানে কেবল অর্থনৈতিক লাভ-ক্ষতির হিসাবই থাকে না; বরং থাকে রাজনৈতিক, কৌশলগত ও দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্কের বিষয়ও। বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কও সেই বাস্তবতার বাইরে নয়। যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের অন্যতম বড় রপ্তানি বাজার। তৈরি পোশাক খাত থেকে শুরু করে বিভিন্ন শিল্পপণ্যের ক্ষেত্রে মার্কিন বাজার বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ফলে এই সম্পর্কের যেকোনো পরিবর্তন সরাসরি প্রভাব ফেলতে পারে দেশের রপ্তানি আয়, কর্মসংস্থান ও বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের ওপর।
বাণিজ্যমন্ত্রীর বক্তব্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—তিনি আন্তর্জাতিক চুক্তিকে আবেগের নয়, বাস্তবতার বিষয় হিসেবে তুলে ধরেছেন। অনেক সময় সাধারণ মানুষের মধ্যে এমন ধারণা তৈরি হয় যে, কোনো চুক্তি দেশের জন্য পুরোপুরি সুবিধাজনক না হলে সেটি সহজেই বাতিল বা পরিবর্তন করা সম্ভব। কিন্তু বাস্তবতা অনেক ভিন্ন। রাষ্ট্রের সঙ্গে রাষ্ট্রের সম্পর্ক ব্যক্তিগত সম্পর্কের মতো নয়। দুটি সার্বভৌম রাষ্ট্র যখন কোনো চুক্তিতে পৌঁছায়, তখন সেখানে অসংখ্য আইনি কাঠামো, কূটনৈতিক প্রক্রিয়া ও আন্তর্জাতিক বাধ্যবাধকতা কাজ করে। তাই একতরফাভাবে কোনো চুক্তি বাতিল করা হলে তা শুধু অর্থনৈতিক নয়, কূটনৈতিক সম্পর্কেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশের জন্য এই ভারসাম্য রক্ষা করা আরও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, একদিকে দেশের অভ্যন্তরীণ স্বার্থ রক্ষা করতে হয়, অন্যদিকে বৈশ্বিক বাণিজ্য ব্যবস্থার সঙ্গেও তাল মিলিয়ে চলতে হয়। বাণিজ্যমন্ত্রী যে বলেছেন, চুক্তির ভেতরেই সংশোধনের সুযোগ থাকে, সেটি আন্তর্জাতিক চুক্তির একটি স্বীকৃত নীতি। সাধারণত বড় ধরনের বাণিজ্য চুক্তিতে এমন কিছু ধারা রাখা হয়, যেখানে ভবিষ্যতে কোনো পক্ষের স্বার্থ ক্ষতিগ্রস্ত হলে আলোচনার মাধ্যমে সংশোধনের সুযোগ থাকে। অর্থাৎ আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে দরজা পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায় না; বরং কূটনৈতিক আলোচনার পথ খোলা থাকে।
এই প্রসঙ্গে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক বাস্তবতাও গুরুত্বপূর্ণ। সাম্প্রতিক সময়ে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অস্থিরতা, জ্বালানি সংকট, মুদ্রাস্ফীতি ও যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে বিশ্বের অনেক দেশই তাদের বাণিজ্য নীতিতে পরিবর্তন আনছে। যুক্তরাষ্ট্র, চীন, ইউরোপীয় ইউনিয়ন—সবাই এখন নিজেদের অর্থনৈতিক নিরাপত্তাকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। ফলে বাংলাদেশকেও তার বাণিজ্যিক স্বার্থ রক্ষায় আরও কৌশলী হতে হবে। শুধু আবেগ বা রাজনৈতিক বক্তব্য দিয়ে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের বাস্তবতা মোকাবিলা করা সম্ভব নয়।
বাণিজ্যমন্ত্রী জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি নিয়ে যে মন্তব্য করেছেন, সেটিও দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ। তিনি বলেছেন, ডিজেলের দাম ১৫ শতাংশ বাড়লেও এর প্রভাব স্থায়ী মূল্যস্ফীতিতে রূপ নেবে না। তাঁর ভাষায় এটি একটি “ওয়ান টাইম স্পাইক” বা সাময়িক অভিঘাত। অর্থনীতির ভাষায় এই যুক্তির একটি ভিত্তি আছে। জ্বালানি তেলের দাম বাড়লে প্রথম ধাক্কা পড়ে পরিবহন ব্যয়ে। আর পরিবহন ব্যয় বাড়লে পণ্যের দামও কিছুটা বাড়ে। তবে সেটি যদি নিয়ন্ত্রিত পর্যায়ে থাকে এবং বাজারে অতিরিক্ত মুনাফালোভী আচরণ না ঘটে, তাহলে তা দীর্ঘমেয়াদি মূল্যস্ফীতিতে রূপ নেওয়ার সম্ভাবনা কম থাকে।
কিন্তু বাংলাদেশের বাস্তবতায় সমস্যা হয় অন্য জায়গায়। এখানে অনেক সময় বাজারে “স্পেকুলেটিভ ইনফ্লেশন” বা অনুমাননির্ভর মূল্যবৃদ্ধি দেখা যায়। অর্থাৎ কোনো পণ্যের উৎপাদন ব্যয় সামান্য বাড়লেও বাজারে তার দাম অস্বাভাবিকভাবে বাড়িয়ে দেওয়া হয়। ব্যবসায়ীদের একটি অংশ ভবিষ্যৎ সংকটের আশঙ্কা দেখিয়ে অতিরিক্ত মুনাফা করার চেষ্টা করে। ফলে সাধারণ মানুষের ওপর চাপ বেড়ে যায়। বাণিজ্যমন্ত্রী গণমাধ্যমকে দায়িত্বশীল ভূমিকা রাখার আহ্বান জানিয়ে মূলত এই বিষয়টিকেই ইঙ্গিত করেছেন। কারণ, অনেক সময় গুজব বা অতিরঞ্জিত তথ্য বাজারে আতঙ্ক সৃষ্টি করে, যা মূল্যবৃদ্ধিকে আরও উসকে দেয়।
তবে বাস্তবতা হলো, বাজার শুধু সরকারি বক্তব্যে নিয়ন্ত্রণ হয় না। মানুষের আস্থা তৈরি করাও জরুরি। যদি সাধারণ মানুষ মনে করেন যে বাজারে পর্যাপ্ত তদারকি নেই বা অসাধু ব্যবসায়ীরা পার পেয়ে যাচ্ছে, তাহলে আতঙ্ক আরও বাড়ে। এ ক্ষেত্রে সরকারের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো—বাজারে স্বচ্ছতা ও কার্যকর নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করা। শুধু হুঁশিয়ারি নয়, বাস্তব পদক্ষেপও প্রয়োজন।
বাণিজ্যমন্ত্রী সরকারি কলকারখানা বেসরকারি খাতে ছেড়ে দেওয়ার বিষয়ে যে বক্তব্য দিয়েছেন, সেটিও দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক বিতর্কের অংশ। তিনি বলেছেন, সরকারের কাজ ব্যবসা করা নয় এবং রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন অনেক প্রতিষ্ঠান অদক্ষতার কারণে লোকসানে চলে যায়। এই যুক্তি নতুন নয়। বিশ্বের অনেক দেশই গত কয়েক দশকে রাষ্ট্রীয় শিল্পপ্রতিষ্ঠান বেসরকারি খাতে ছেড়ে দিয়েছে। এর পেছনে মূল যুক্তি হলো—বেসরকারি খাত তুলনামূলক বেশি দক্ষ ও প্রতিযোগিতামূলক।
বাংলাদেশেও বহু সরকারি কলকারখানা বছরের পর বছর লোকসানে চলছে। এতে রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে বিপুল অর্থ ভর্তুকি দিতে হয়। সরকার মনে করছে, এসব প্রতিষ্ঠান বেসরকারি খাতে গেলে উৎপাদন বাড়বে, কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে এবং রাজস্বও বাড়বে। তবে এই নীতির সমালোচনাও রয়েছে। অনেকের আশঙ্কা, রাষ্ট্রীয় সম্পদ কম মূল্যে প্রভাবশালী গোষ্ঠীর হাতে চলে যেতে পারে বা শ্রমিকদের স্বার্থ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। ফলে বেসরকারিকরণের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
আন্তর্জাতিক বাণিজ্য চুক্তি, জ্বালানি মূল্য, বাজার নিয়ন্ত্রণ ও রাষ্ট্রীয় শিল্প—এই চারটি বিষয় আসলে বাংলাদেশের অর্থনীতির বর্তমান বাস্তবতার সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। বিশ্ব অর্থনীতি এখন অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। যুদ্ধ, ভূরাজনৈতিক দ্বন্দ্ব, ডলারের চাপ, বৈদেশিক ঋণের বোঝা এবং জ্বালানি সংকট—সব মিলিয়ে উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য পরিস্থিতি সহজ নয়। বাংলাদেশও সেই চাপের বাইরে নয়। ফলে সরকারকে একদিকে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক সামাল দিতে হচ্ছে, অন্যদিকে দেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতাও বজায় রাখতে হচ্ছে।
বাণিজ্যমন্ত্রীর বক্তব্য থেকে একটি বিষয় পরিষ্কার—সরকার এখন আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে বাস্তববাদী অবস্থান নিতে চাইছে। তারা একদিকে দেশের স্বার্থের কথা বলছে, অন্যদিকে বৈশ্বিক কূটনৈতিক বাস্তবতাকেও স্বীকার করছে। কিন্তু এই বাস্তববাদ কতটা কার্যকর হবে, সেটি নির্ভর করবে নীতির বাস্তব প্রয়োগের ওপর। কারণ জনগণ শেষ পর্যন্ত দেখতে চায় বাজারে স্বস্তি ফিরছে কি না, কর্মসংস্থান বাড়ছে কি না এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্ক দেশের জন্য কতটা সুফল বয়ে আনছে।
বাংলাদেশের সামনে এখন সবচেয়ে বড় প্রয়োজন দক্ষ অর্থনৈতিক কূটনীতি। শুধু চুক্তি করাই যথেষ্ট নয়; সেই চুক্তি থেকে সর্বোচ্চ সুবিধা আদায় করতে পারাও জরুরি। একই সঙ্গে দেশের অভ্যন্তরীণ বাজার ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করা, উৎপাদন ব্যয় নিয়ন্ত্রণ করা এবং সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা ধরে রাখাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। কারণ অর্থনীতির মূল শক্তি শেষ পর্যন্ত দেশের মানুষই। রাষ্ট্রীয় নীতি তখনই সফল হয়, যখন তার সুফল সাধারণ মানুষের জীবনে প্রতিফলিত হয়।
আপনার মতামত জানানঃ