রাতের সীমান্ত সব সময়ই এক ধরনের অদ্ভুত নীরবতা বহন করে। দূরে কাঁটাতারের ওপারে মৃদু আলো, টহলরত অস্ত্রধারী সদস্যদের ছায়া, আর এপারে নিঃশব্দে ঘুমিয়ে থাকা গ্রাম। কিন্তু সেই নীরবতা কখনো কখনো ভেঙে যায় গুলির শব্দে। তখন সীমান্ত শুধু একটি ভৌগোলিক রেখা থাকে না; সেটি হয়ে ওঠে আতঙ্ক, মৃত্যু আর অসহায় মানুষের কান্নার প্রতীক। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবা উপজেলার ধজনগর সীমান্তে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুর ঘটনা আবারও সেই নির্মম বাস্তবতাকে সামনে নিয়ে এসেছে। শুক্রবার গভীর রাতে বিএসএফের গুলিতে নিহত হন মো. মোরছালিন নামে এক তরুণ এবং আরেকজন অজ্ঞাত ব্যক্তি। এই খবর প্রকাশ হওয়ার পর থেকেই সীমান্তবাসীর মধ্যে নতুন করে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে।
মোরছালিন ছিলেন স্থানীয় শাহআলম ডিগ্রি কলেজের শিক্ষার্থী। বয়স মাত্র বাইশ। পরিবার বলছে, রাতে কয়েকজন তাঁকে বাড়ি থেকে ডেকে নিয়ে যায়। তারপর আর তিনি জীবিত ফিরে আসেননি। সীমান্তের ভারত অংশে গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর তাঁর মরদেহ বিএসএফ নিয়ে যায়। পরিবারের জন্য এটি শুধু একটি মৃত্যুসংবাদ নয়; এটি এমন এক বাস্তবতা, যেখানে একজন তরুণ সন্ধ্যায় বাড়ি থেকে বের হয়ে রাতের অন্ধকারে নিথর দেহে পরিণত হন। মায়ের জন্য সন্তান, ভাইয়ের জন্য ভাই কিংবা বন্ধুর জন্য একজন প্রিয় মানুষ মুহূর্তেই হারিয়ে যায়। সীমান্তের মানুষের কাছে এমন ঘটনা নতুন নয়, কিন্তু প্রতিবারই ক্ষতটা নতুন করে জেগে ওঠে।
বিজিবির ভাষ্য অনুযায়ী, নিহতরা চোরাকারবারের সঙ্গে জড়িত ছিলেন। তাদের দাবি, প্রায় পনেরজন বাংলাদেশি চোরাকারবারি ভারতীয় সহযোগীদের সহায়তায় সীমান্ত পেরিয়ে গিয়েছিলেন। ফেরার পথে বিএসএফ বাধা দিলে ধস্তাধস্তির একপর্যায়ে গুলি চালানো হয়। সরকারি বিবৃতিতে ঘটনাটি একটি নিরাপত্তা অভিযান হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন থেকেই যায়—একজন নিরস্ত্র বা সাধারণ নাগরিক, সে অপরাধে জড়িত হোক বা না হোক, তাকে হত্যা কি সীমান্ত নিরাপত্তার একমাত্র ভাষা হতে পারে? এই প্রশ্ন বহু বছর ধরেই বাংলাদেশের সীমান্ত রাজনীতিতে ঘুরে ফিরে আসে।
বাংলাদেশ-ভারত সীমান্ত বিশ্বের অন্যতম দীর্ঘ স্থলসীমান্ত। প্রায় চার হাজার কিলোমিটারের এই সীমান্তের বহু অংশ ঘনবসতিপূর্ণ। কোথাও কৃষিজমি কাঁটাতারের দুই পাশে ভাগ হয়ে গেছে, কোথাও আত্মীয়স্বজন দুই দেশে বসবাস করেন। সীমান্তবাসীর জীবনে রাষ্ট্রীয় সীমারেখা সবসময় এত স্পষ্ট নয়। তাদের জীবন জড়িয়ে থাকে নদী, মাঠ, হাটবাজার আর প্রতিদিনের বেঁচে থাকার সংগ্রামের সঙ্গে। এই বাস্তবতায় চোরাচালান দীর্ঘদিনের এক সামাজিক-অর্থনৈতিক বাস্তবতা হয়ে দাঁড়িয়েছে। গরু, মাদক, চিনি, সার, পোশাক কিংবা নানা পণ্যের অবৈধ পারাপারের সঙ্গে যুক্ত হয় অনেক দরিদ্র মানুষ। কেউ লাভের আশায়, কেউ বাধ্য হয়ে, আবার কেউ স্থানীয় প্রভাবশালী চক্রের প্ররোচনায় জড়িয়ে পড়ে এই ঝুঁকিপূর্ণ কাজে।
সীমান্ত এলাকায় বসবাসকারী বহু তরুণের কাছে কাজের সুযোগ সীমিত। শিক্ষা শেষ করেও চাকরি মেলে না। কৃষিকাজে আয় কমে গেছে। ফলে দ্রুত অর্থ আয়ের প্রলোভন অনেককে টেনে নেয় চোরাকারবারি চক্রের দিকে। এসব চক্র সাধারণত শক্তিশালী নেটওয়ার্কের মাধ্যমে পরিচালিত হয়। কিন্তু যখন গুলি চলে, তখন মারা যায় প্রান্তিক তরুণরাই। বড় কারবারিরা থাকে আড়ালে। মোরছালিনের মতো ছেলেরা হয়ে ওঠে সংবাদ শিরোনাম, অথচ যাদের কারণে এই অবৈধ অর্থনীতির বিস্তার, তারা খুব কমই ধরা পড়ে।
বাংলাদেশের সীমান্তে বিএসএফের গুলিতে মৃত্যুর ঘটনা নতুন নয়। বহু মানবাধিকার সংগঠন বছরের পর বছর ধরে অভিযোগ করে আসছে, ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী অতিরিক্ত শক্তি প্রয়োগ করছে। বিশেষ করে নিরস্ত্র বাংলাদেশিদের ওপর প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহারের সমালোচনা আন্তর্জাতিক মহলেও হয়েছে। অতীতে ফেলানী হত্যাকাণ্ডের ছবি গোটা উপমহাদেশকে নাড়িয়ে দিয়েছিল। কাঁটাতারে ঝুলে থাকা কিশোরীর নিথর দেহ সীমান্ত রাজনীতির এক নির্মম প্রতীক হয়ে উঠেছিল। এরপর বহুবার দুই দেশের উচ্চপর্যায়ে আলোচনা হয়েছে। সীমান্ত হত্যা শূন্যে নামিয়ে আনার প্রতিশ্রুতিও এসেছে। কিন্তু বাস্তবতা বলছে, গুলির শব্দ থামেনি।
ভারত প্রায়ই দাবি করে, সীমান্তরক্ষীরা আত্মরক্ষার্থে গুলি চালাতে বাধ্য হন। অন্যদিকে বাংলাদেশে সাধারণ মানুষের প্রশ্ন—আত্মরক্ষার নামে কি প্রাণঘাতী গুলি ছাড়া আর কোনো পদ্ধতি নেই? আন্তর্জাতিক মানবাধিকার নীতিমালা বলছে, সীমান্ত নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রাণঘাতী শক্তি ব্যবহার সর্বশেষ বিকল্প হওয়া উচিত। কিন্তু বাস্তবে দক্ষিণ এশিয়ার সীমান্তগুলোতে মানবাধিকার প্রশ্ন প্রায়ই নিরাপত্তা নীতির নিচে চাপা পড়ে যায়।
এ ধরনের ঘটনার পর সাধারণত বিজিবি ও বিএসএফের মধ্যে পতাকা বৈঠক হয়। প্রতিবাদপত্র দেওয়া হয়। কখনো মরদেহ ফেরত আসে, কখনো তদন্তের আশ্বাস দেওয়া হয়। কিন্তু নিহত পরিবারের জীবনে এসব কূটনৈতিক প্রক্রিয়ার খুব বেশি অর্থ থাকে না। তাদের কাছে সবচেয়ে বড় বাস্তবতা হলো—একজন মানুষ আর ফিরে আসবে না। মোরছালিনের পরিবার হয়তো এখনো বিশ্বাস করতে পারছে না যে কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে সবকিছু বদলে গেছে। যে ছেলেটি হয়তো সকালে কলেজে যাওয়ার পরিকল্পনা করছিল, সে এখন সীমান্ত রাজনীতির আরেকটি সংখ্যা।
সীমান্ত হত্যা নিয়ে বাংলাদেশের ভেতরেও দ্বৈত বাস্তবতা রয়েছে। একদিকে জনগণের ক্ষোভ, অন্যদিকে রাষ্ট্রীয় কূটনৈতিক ভারসাম্য। ভারত বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবেশী ও রাজনৈতিক মিত্র। দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য, নিরাপত্তা সহযোগিতা ও আঞ্চলিক কৌশলগত সম্পর্ক ক্রমশ গভীর হয়েছে। ফলে সীমান্ত হত্যা ইস্যুতে বাংলাদেশ সরকার প্রায়ই সতর্ক ভাষা ব্যবহার করে। কড়া প্রতিবাদ জানানো হলেও সম্পর্কের বড় কাঠামো অক্ষুণ্ন রাখার চেষ্টা করা হয়। কিন্তু সাধারণ মানুষের আবেগ সবসময় কূটনৈতিক হিসাব বোঝে না। সীমান্তে প্রতিটি মৃত্যু মানুষের মনে ক্ষোভ জমায়।
ধজনগর সীমান্তের ঘটনাও সেই ক্ষোভকে নতুন করে উসকে দিয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেকেই প্রশ্ন তুলছেন—কেন সীমান্তে বারবার বাংলাদেশিদের প্রাণ দিতে হবে? কেউ বলছেন, চোরাচালান বন্ধে কঠোর ব্যবস্থা প্রয়োজন। আবার কেউ মনে করছেন, দরিদ্র মানুষদের বিকল্প জীবিকার ব্যবস্থা না করে শুধু আইন প্রয়োগে সমস্যার সমাধান হবে না। বাস্তবতা হলো, সীমান্ত অপরাধ কেবল নিরাপত্তার বিষয় নয়; এটি অর্থনীতি, দারিদ্র্য, স্থানীয় রাজনীতি ও আঞ্চলিক বৈষম্যের সঙ্গেও জড়িত।
সীমান্ত গ্রামগুলোর জীবন শহরের মানুষ খুব কমই বোঝে। সেখানে রাত মানেই অনিশ্চয়তা। কখনো গরু পারাপার, কখনো মাদক চক্র, কখনো টহল, কখনো গুলির শব্দ। শিশুদের বড় হওয়া হয় ভয় আর সতর্কতার মধ্যে। অনেক পরিবার জানে, সীমান্তে যাওয়া মানেই ঝুঁকি। তবু অর্থের প্রয়োজন মানুষকে ঠেলে দেয় সেই বিপদের দিকে। কেউ কেউ কয়েক হাজার টাকার আশায় জীবনের ঝুঁকি নেয়। কারণ তাদের কাছে বিকল্প পথ নেই। এই বাস্তবতাকে শুধু অপরাধের চোখে দেখলে পুরো ছবিটা বোঝা যায় না।
মোরছালিনের মৃত্যু তাই কেবল একটি সীমান্ত ঘটনার খবর নয়। এটি বাংলাদেশের প্রান্তিক তরুণদের জীবনের প্রতিচ্ছবি। যেখানে স্বপ্ন, দারিদ্র্য, ঝুঁকি আর রাষ্ট্রীয় সীমারেখা একসঙ্গে জড়িয়ে যায়। একজন কলেজ শিক্ষার্থী কীভাবে এমন এক পরিস্থিতিতে জড়িয়ে পড়ল, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। সমাজ কি তাকে নিরাপদ ভবিষ্যৎ দিতে পেরেছিল? নাকি সীমান্ত অর্থনীতি তাকে টেনে নিয়েছে এমন এক পথে, যেখান থেকে আর ফিরে আসা সম্ভব হয়নি?
বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্ক যতই কৌশলগতভাবে শক্তিশালী হোক, সীমান্তে মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত না হলে সেই সম্পর্কের মানবিক ভিত্তি দুর্বল থেকে যাবে। দুই দেশেরই উচিত সীমান্ত ব্যবস্থাপনায় আরও মানবিক ও আধুনিক পদ্ধতি গ্রহণ করা। প্রাণঘাতী অস্ত্রের ব্যবহার কমানো, যৌথ টহল, নজরদারি প্রযুক্তি বৃদ্ধি এবং সীমান্ত অঞ্চলে বিকল্প কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করা জরুরি। শুধু কাঁটাতার বা গুলি দিয়ে সীমান্ত সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়।
প্রতিবার কোনো সীমান্ত হত্যার পর কিছুদিন আলোচনা হয়, সংবাদ প্রকাশিত হয়, তারপর ধীরে ধীরে বিষয়টি চাপা পড়ে যায়। কিন্তু সীমান্তের গ্রামগুলোতে আতঙ্ক থেকে যায়। মোরছালিনের পরিবারের মতো পরিবারগুলো প্রতিদিন সেই শূন্যতা নিয়ে বেঁচে থাকে। হয়তো তাঁর বই এখনো টেবিলে পড়ে আছে, হয়তো কোনো অসমাপ্ত স্বপ্ন দেয়ালে ঝুলে আছে। কিন্তু সীমান্তের গুলির শব্দ সেই স্বপ্ন থামিয়ে দিয়েছে।
রাতের অন্ধকারে সীমান্তের ওপারে আবারও টহল চলবে। কাঁটাতারের পাশে বাতাস বইবে। কিন্তু ধজনগরের মানুষ হয়তো আরও কিছুদিন আতঙ্ক নিয়ে রাত কাটাবে। কারণ তারা জানে, সীমান্তে মৃত্যু কখনো দূরের কোনো সংবাদ নয়; সেটি খুব সহজেই তাদের নিজের দরজায় এসে দাঁড়াতে পারে।
আপনার মতামত জানানঃ