রংপুর-৬ (পীরগঞ্জ) আসনের একটি ভোটকেন্দ্র ঘিরে ব্যালট উদ্ধারের দাবি, প্রশাসনের উপস্থিতি, জনতার অবরোধ এবং সরকারি গাড়ি ভাঙচুর—সব মিলিয়ে ঘটনাটি নির্বাচনী পরিবেশ ও প্রশাসনিক কর্তৃত্ব নিয়ে নতুন প্রশ্ন তুলেছে। স্থানীয়দের দাবি, হাসারপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্র থেকে ধানের শীষ প্রতীকে সিল মারা দুটি ব্যালট এবং গণভোটের চারটি ব্যালট উদ্ধার হয়েছে। যদিও প্রশাসন বলছে, এগুলো আসল কি না—তা যাচাই না করে কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব নয়। কিন্তু ঘটনাস্থলে যে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে, তা নির্বাচনের পরবর্তী পরিস্থিতিকে আরও স্পর্শকাতর করে তুলেছে।
সোমবার সকালেই স্থানীয় কিছু শিক্ষার্থীর মাধ্যমে সিল মারা ব্যালট পাওয়ার খবর ছড়িয়ে পড়ে। বিষয়টি জানানো হয় উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) পপি খাতুনকে। দুপুরে তিনি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ও নির্বাচন কর্মকর্তাকে সঙ্গে নিয়ে ঘটনাস্থলে যান। উদ্দেশ্য ছিল প্রাথমিক যাচাই-বাছাই ও জব্দ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা। কিন্তু সেখানে গিয়ে পরিস্থিতি দ্রুত পাল্টে যায়। ভোট কারচুপির অভিযোগ তুলে উত্তেজিত জনতা তাঁদের ঘিরে ধরে। প্রায় দেড় ঘণ্টা অবরুদ্ধ থাকার পর বিকেলে পুলিশ ও স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাদের সহায়তায় তাঁরা সেখান থেকে বের হতে পারেন। বের হওয়ার সময় ইউএনওর গাড়ির কাচ ভাঙচুর করা হয়।
ইউএনও পপি খাতুনের ভাষ্য অনুযায়ী, ব্যালটগুলো আসল কি না, তা তাৎক্ষণিকভাবে নিশ্চিত করা সম্ভব ছিল না। কারণ সংরক্ষিত ব্যালটের সঙ্গে সিল ও নম্বর মিলিয়ে দেখতে একটি নির্দিষ্ট প্রক্রিয়া রয়েছে। জব্দ তালিকা তৈরি, সাক্ষ্য গ্রহণ, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের জিজ্ঞাসাবাদ—এসব সম্পন্ন না করে কোনো সরকারি ঘোষণা দেওয়া যায় না। তাঁর দাবি, ঘটনাস্থলে ‘মব ভায়োলেন্স’ তৈরি করে তাৎক্ষণিক বক্তব্য আদায়ের চেষ্টা করা হয়েছে এবং রাষ্ট্রীয় কাজে বাধা দেওয়া হয়েছে। এ বক্তব্য ইঙ্গিত করে, প্রশাসন ঘটনাটিকে কেবল একটি নির্বাচন-সংক্রান্ত অভিযোগ নয়, আইনশৃঙ্খলার প্রশ্ন হিসেবেও দেখছে।
পুলিশও একই ধরনের বিবরণ দিয়েছে। পীরগঞ্জ থানার ওসি জানিয়েছেন, ইউএনও বের হওয়ার সময় উত্তেজিত জনতা গাড়ি ঘিরে ধরে এবং কাচ ভাঙে। এতে স্পষ্ট যে ঘটনাটি কেবল ব্যালট উদ্ধারের অভিযোগে সীমাবদ্ধ থাকেনি; বরং তা প্রশাসনের সঙ্গে জনতার সরাসরি সংঘাতে রূপ নিয়েছে।
স্থানীয় সূত্রের দাবি, উদ্ধার হওয়া ব্যালটগুলোতে নির্বাচন কমিশনের সিল ও স্বাক্ষর ছিল। দুটি ব্যালটে ধানের শীষ প্রতীকে সিল মারা এবং গণভোটের চারটির মধ্যে দুটি ‘হ্যাঁ’ ও দুটি ‘না’ সিলযুক্ত ছিল বলে বলা হচ্ছে। যদি এ দাবি সত্য হয়, তাহলে প্রশ্ন উঠবে—কেন্দ্রের বাইরে এ ব্যালট এল কীভাবে? আবার যদি এগুলো ভুয়া বা বাইরে থেকে আনা হয়ে থাকে, তবে তা নির্বাচন-পরবর্তী অস্থিতিশীলতা তৈরির চেষ্টাও হতে পারে। এই দ্বৈত সম্ভাবনার মাঝখানেই প্রশাসনের যাচাই প্রক্রিয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
কেন্দ্রটির সরকারি তথ্য বলছে, মোট ভোটার ছিল ৩ হাজার ৩৬৯ জন; ভোট পড়েছে ২ হাজার ৪০২টি। ধানের শীষ পেয়েছে ১ হাজার ৫৩২ ভোট এবং দাঁড়িপাল্লা ৮৩২। পুরো আসনে জয়ী হয়েছেন জামায়াত প্রার্থী মো. নুরুল আমীন, আর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন বিএনপি প্রার্থী মো. সাইফুল ইসলাম। এই ফলাফলের প্রেক্ষাপটে উদ্ধার দাবিকৃত ব্যালটগুলোর সংখ্যা খুব বড় না হলেও প্রতীকী গুরুত্ব বিশাল। কারণ, নির্বাচনী প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে যে কোনো প্রশ্ন জনমনে আস্থা সংকট তৈরি করতে পারে।
কেন্দ্রের প্রিসাইডিং কর্মকর্তা দাবি করেছেন, সব এজেন্টের উপস্থিতিতে ব্যালট বাক্স দেখিয়ে ভোট শুরু হয় এবং সবার সম্মতিক্রমে গণনা শেষে ফলাফল তৈরি করা হয়। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, ব্যালট বাক্সের বাইরে যদি আলাদা ব্যালট পাওয়া যায়, সে দায় তাঁদের নয়। এই বক্তব্য নির্বাচন ব্যবস্থাপনার একটি মৌলিক বাস্তবতাকে সামনে আনে—ভোটগ্রহণ প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার পরও কেন্দ্রের নিরাপত্তা ও সামগ্রিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে প্রশ্ন থেকে যেতে পারে।
ঘটনাটি আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সামনে এনেছে—নির্বাচন-পরবর্তী পরিস্থিতিতে প্রশাসনের ভূমিকা কতটা চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে। অভিযোগ উঠলে তা তদন্ত করা প্রশাসনের দায়িত্ব, কিন্তু জনতার চাপের মুখে তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত দেওয়া সম্ভব নয়। আইনগত প্রক্রিয়া অনুসরণ না করলে সিদ্ধান্তের বৈধতা প্রশ্নবিদ্ধ হতে পারে। আবার দীর্ঘসূত্রতা বা অস্পষ্টতা জনমনে সন্দেহও বাড়াতে পারে। এই ভারসাম্য রক্ষা করাই প্রশাসনের বড় পরীক্ষা।
এখানে রাজনৈতিক আবেগও বড় ভূমিকা রাখে। নির্বাচনের ফল ঘোষণার পরপরই যেকোনো অনিয়মের অভিযোগ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে, বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। অনেক সময় যাচাইয়ের আগেই জনমত তৈরি হয়ে যায়। এতে স্থানীয় পর্যায়ে উত্তেজনা বাড়ে এবং প্রশাসনিক কর্মকর্তারা সরাসরি চাপের মুখে পড়েন। পীরগঞ্জের ঘটনাটি সেই প্রবণতার একটি উদাহরণ হিসেবে দেখা যেতে পারে।
এখন মূল প্রশ্ন হলো, তদন্ত প্রক্রিয়া কতটা স্বচ্ছ ও দ্রুত হবে। জেলা প্রশাসন জানিয়েছে, বিষয়টি অবগত হয়েছেন এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবেন। একটি নিরপেক্ষ তদন্তেই পরিষ্কার হবে উদ্ধার দাবিকৃত ব্যালটগুলো আসল কি না, সেগুলো কোথা থেকে এলো এবং কারা এর সঙ্গে জড়িত। একই সঙ্গে ইউএনওকে অবরুদ্ধ ও গাড়ি ভাঙচুরের ঘটনায় আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে কি না, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।
গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় নির্বাচন কেবল ভোটের দিনেই সীমাবদ্ধ থাকে না; ফল ঘোষণার পরও আস্থা রক্ষা করা জরুরি। একটি কেন্দ্রে কয়েকটি ব্যালট উদ্ধারের দাবি হয়তো সংখ্যাগতভাবে বড় নয়, কিন্তু প্রতীকীভাবে তা নির্বাচনব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতার সঙ্গে যুক্ত। আবার অভিযোগের প্রেক্ষিতে প্রশাসনের ওপর হামলা বা অবরোধও আইনের শাসনের প্রশ্ন তোলে। উভয় দিক থেকেই ঘটনাটি গুরুত্ব দাবি করে।
রংপুর-৬ আসনের এই ঘটনা দেখিয়ে দিয়েছে, নির্বাচন-পরবর্তী রাজনীতিতে উত্তেজনা কত দ্রুত বাস্তব সংঘাতে রূপ নিতে পারে। অভিযোগ থাকলে তা তদন্তের মাধ্যমে প্রমাণ বা খণ্ডন করতে হবে; জনতার চাপ বা পেশিশক্তি দিয়ে নয়। একই সঙ্গে প্রশাসনকেও দ্রুত, স্বচ্ছ ও গ্রহণযোগ্য প্রক্রিয়ায় সত্য উদঘাটন করতে হবে, যাতে কোনো পক্ষই আস্থাহীনতায় না ভোগে।
শেষ পর্যন্ত এই ঘটনাটি কেবল একটি কেন্দ্রের সীমায় আবদ্ধ নয়; এটি বৃহত্তর প্রশ্নের অংশ—বাংলাদেশে নির্বাচন-পরবর্তী পরিবেশ কতটা শান্ত, প্রাতিষ্ঠানিক এবং আইনের শাসনভিত্তিক থাকবে। সত্য উদঘাটন ও দায় নির্ধারণের মধ্য দিয়েই সেই আস্থা পুনর্গঠন সম্ভব।
আপনার মতামত জানানঃ