ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘিরে উত্তেজনা, অভিযোগ, প্রত্যাশা ও রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশের মধ্যেই রাজধানীর গুলশানে এক সম্মেলন কক্ষে জমে উঠেছিল অন্য এক আবহ। গভীর রাত পেরিয়ে গেলেও সেখানে আলো জ্বলছিল, আসা-যাওয়ায় ব্যস্ত ছিলেন দলীয় নেতাকর্মীরা। সেই পরিবেশেই আত্মবিশ্বাসী কণ্ঠে ঘোষণা এলো—দুই-তৃতীয়াংশের বেশি আসনে বিজয়ী হয়ে সরকার গঠন করবে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। দলটির কেন্দ্রীয় নির্বাচন পরিচালনা কমিটির মুখপাত্র ড. মাহদী আমিন সাংবাদিকদের সামনে দাঁড়িয়ে বললেন, এখন পর্যন্ত প্রাপ্ত ফলাফল ও আসনভিত্তিক হিসাব তাদের এই আত্মবিশ্বাস জোগাচ্ছে।
নির্বাচনের রাত মানেই সাধারণত টানটান উত্তেজনা। কোথাও আনন্দ মিছিল, কোথাও উদ্বেগ, কোথাও আবার অভিযোগের ঝড়। এবারের নির্বাচনে তার ব্যতিক্রম হয়নি। বিএনপির পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, জনগণের ‘আন্তরিক ভালোবাসা ও সমর্থন’ তাদের বিপুল ব্যবধানে এগিয়ে দিয়েছে। মুখপাত্র জানান, দলের চেয়ারপারসন নন, বরং ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হিসেবে নেতৃত্ব দেওয়া তারেক রহমান নিজেই তার দুটি আসন—বগুড়া-৬ ও ঢাকা-১৭—এ বেসরকারিভাবে বিজয়ী হয়েছেন। এই ঘোষণা শুধু একটি আসনের ফল নয়, বরং প্রতীকী বার্তা হিসেবেও বিবেচিত হচ্ছে দলীয় মহলে।
তবে এই আত্মবিশ্বাসের পাশাপাশি অভিযোগও ছিল স্পষ্ট। ড. মাহদী আমিন বলেন, ভোটের আগের রাত থেকেই রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ কারচুপি, জালিয়াতি ও কেন্দ্র দখলের মতো অপরাধে সম্পৃক্ত ছিল। নির্বাচনের দিনও দেশের বিভিন্ন স্থানে অনিয়ম, সহিংসতা ও ‘ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং’-এর অভিযোগ তুলেছেন তিনি। বিশেষ করে কিছু নির্দিষ্ট আসনে ফল ঘোষণা বিলম্বিত করার বিষয়টি তিনি উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে দাবি করেন। ঢাকা-৮, ঢাকা-১১, ঢাকা-১৩ ও ঢাকা-১৬-এর মতো কয়েকটি আসনের উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, গণনা ও ফল ঘোষণায় অস্বাভাবিক বিলম্ব ঘটানো হয়েছে।
বাংলাদেশের নির্বাচনী রাজনীতিতে ‘ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং’ শব্দবন্ধটি নতুন নয়। অতীতে বিভিন্ন দলই ফলাফল প্রভাবিত করার অভিযোগ তুলেছে। কিন্তু এবারের প্রেক্ষাপটে বিএনপি দাবি করছে, তাদের ‘অপ্রতিরোধ্য বিজয়ের ব্যবধান’ কমিয়ে আনার জন্য পরিকল্পিতভাবে অপপ্রচার ও আচরণবিধি লঙ্ঘন করা হয়েছে। প্রশ্ন উঠছে—এটি কি কেবল নির্বাচনী বক্তব্য, নাকি সত্যিই ভোট ব্যবস্থাপনায় গভীর কোনো সমস্যা বিদ্যমান?
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, নির্বাচন-পরবর্তী এই সময়টিই সবচেয়ে সংবেদনশীল। কারণ চূড়ান্ত ফল ঘোষণার আগে দলগুলো নিজেদের অবস্থান শক্ত করতে চায়—সমর্থকদের মনোবল ধরে রাখা, প্রতিপক্ষের অভিযোগের জবাব দেওয়া এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে বার্তা পৌঁছানো—সবই এই পর্যায়ে গুরুত্বপূর্ণ। বিএনপির পক্ষ থেকে দুই-তৃতীয়াংশ আসনে বিজয়ের দাবি নিঃসন্দেহে একটি বড় রাজনৈতিক বার্তা। দুই-তৃতীয়াংশ মানে শুধু সরকার গঠন নয়, বরং সংবিধান সংশোধনের মতো গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়ার সাংবিধানিক সক্ষমতাও অর্জন করা।
এই আত্মবিশ্বাসের পেছনে কী যুক্তি? মুখপাত্র জানিয়েছেন, প্রাপ্ত ভোটের হিসাব ও আসনভিত্তিক বিস্তারিত তথ্যের ওপর ভিত্তি করেই তারা এমন দাবি করছেন। দলীয় পর্যবেক্ষকদের পাঠানো তথ্য, এজেন্টদের রিপোর্ট এবং বেসরকারি ফলাফল মিলিয়ে একটি চিত্র তারা পেয়েছেন—যেখানে ‘ধানের শীষ’ প্রতীকের প্রার্থীরা বড় ব্যবধানে এগিয়ে। তবে আনুষ্ঠানিক ফল ঘোষণার আগে এমন ঘোষণা রাজনৈতিকভাবে সাহসী হলেও ঝুঁকিপূর্ণও বটে।
নির্বাচনের দিনজুড়ে ভোটার উপস্থিতি নিয়ে বিভিন্ন আলোচনা ছিল। কেউ বলছেন স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ হয়েছে, কেউ বলছেন কিছু জায়গায় ভয়ভীতি ও সহিংসতা ভোটারদের নিরুৎসাহিত করেছে। বিএনপির ভাষ্য অনুযায়ী, দেশব্যাপী ভোটারদের অংশগ্রহণে কিছুটা বিঘ্ন ঘটেছে, বিশেষ করে যেখানে তারা শক্তিশালী অবস্থানে ছিল। তা সত্ত্বেও তারা দাবি করছে, গণতন্ত্রকামী মানুষের উৎসাহ-উদ্দীপনা তাদের জয় নিশ্চিত করেছে।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে নির্বাচন শুধু ভোটের প্রক্রিয়া নয়, বরং জনআস্থার পরীক্ষা। ক্ষমতায় থাকা বা ক্ষমতার বাইরে থাকা—দুই অবস্থাতেই বড় দলগুলোর জন্য নির্বাচন মানে নিজেদের রাজনৈতিক বৈধতা প্রতিষ্ঠা করা। বিএনপির এই দাবি, যদি চূড়ান্ত ফলাফলে প্রতিফলিত হয়, তবে তা রাজনৈতিক সমীকরণে বড় পরিবর্তন আনবে। দীর্ঘ সময় ধরে ক্ষমতার বাইরে থাকা একটি দল দুই-তৃতীয়াংশ আসনে জয় পেলে তা শুধু সরকার গঠন নয়, বরং নীতিগত ও প্রাতিষ্ঠানিক পুনর্গঠনের সুযোগ তৈরি করবে।
অন্যদিকে, অভিযোগের বিষয়গুলোও গুরুত্ব পাচ্ছে। ফলাফল ঘোষণায় বিলম্ব, নির্দিষ্ট আসনে সন্দেহজনক কার্যক্রম—এসব নিয়ে যদি আনুষ্ঠানিক তদন্ত বা আইনি লড়াই শুরু হয়, তাহলে নির্বাচনের পরবর্তী সময় আরও উত্তপ্ত হতে পারে। নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা, প্রশাসনের নিরপেক্ষতা এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর আচরণ—সবই তখন আলোচনার কেন্দ্রে চলে আসবে।
ড. মাহদী আমিনের বক্তব্যে একটি বিষয় স্পষ্ট—দলটি নিজেদের বিজয়কে শুধু রাজনৈতিক অর্জন হিসেবে নয়, জনসমর্থনের প্রতিফলন হিসেবে তুলে ধরতে চায়। তিনি বলেন, জনগণের ভালোবাসায় সিক্ত হয়ে বিএনপি সরকার গঠন করবে। এই বক্তব্যে আবেগের ছোঁয়া যেমন আছে, তেমনি রয়েছে কৌশলগত বার্তা—দলটি নিজেদের ‘জনগণের দল’ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চায়।
রাজনৈতিক বাস্তবতায় দুই-তৃতীয়াংশ আসনে জয় মানে বিরোধী দলের ভূমিকা অনেকটাই সীমিত হয়ে যাওয়া। সংসদে শক্তিশালী বিরোধী কণ্ঠ না থাকলে গণতান্ত্রিক ভারসাম্য নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে। তাই এমন ফলাফল এলে তা একদিকে স্থিতিশীলতা আনতে পারে, অন্যদিকে বিরোধী রাজনীতির ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন আলোচনা শুরু হতে পারে।
নির্বাচনের রাতের গুলশান কার্যালয়ের দৃশ্যটি তাই শুধু একটি দলীয় সম্মেলন নয়, বরং বৃহত্তর রাজনৈতিক পরিবর্তনের ইঙ্গিতও বহন করছে। সমর্থকদের উচ্ছ্বাস, নেতাদের আত্মবিশ্বাস, অভিযোগের তালিকা—সব মিলিয়ে একটি নাটকীয় অধ্যায়। তবে চূড়ান্ত ফল ঘোষণার আগে রাজনৈতিক বক্তব্য ও বাস্তব ফলাফলের মধ্যে ব্যবধান থেকে যেতে পারে।
গণতন্ত্রের শক্তি নির্ভর করে স্বচ্ছতা, গ্রহণযোগ্যতা ও জনগণের আস্থার ওপর। বিএনপির দাবি সত্য হলে তা হবে এক বড় রাজনৈতিক প্রত্যাবর্তন। আর যদি অভিযোগ-প্রতিযোগিতা ও ফলাফল নিয়ে বিতর্ক দীর্ঘায়িত হয়, তবে তা রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে।
এই মুহূর্তে দেশ তাকিয়ে আছে নির্বাচন কমিশনের আনুষ্ঠানিক ঘোষণার দিকে। রাজনৈতিক দলগুলোর দাবি-প্রতিদাবির বাইরে সাধারণ মানুষ জানতে চায়—তাদের ভোট কতটা সুরক্ষিত ছিল, ফলাফল কতটা সঠিকভাবে প্রতিফলিত হয়েছে। কারণ শেষ পর্যন্ত নির্বাচন কেবল আসন সংখ্যা নয়, বরং আস্থার প্রশ্ন।
গুলশানের সেই রাতের ঘোষণায় যে আত্মবিশ্বাস উচ্চারিত হয়েছে, তা বাস্তবে রূপ নিলে দেশের রাজনৈতিক মানচিত্রে নতুন অধ্যায় শুরু হতে পারে। আর যদি বাস্তব ফলাফল ভিন্ন চিত্র দেখায়, তবে সেটিও হবে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ারই অংশ। এখন অপেক্ষা চূড়ান্ত ঘোষণার—যা নির্ধারণ করবে এই আত্মবিশ্বাস ইতিহাস হয়ে থাকবে, নাকি নির্বাচনী রাতের একটি রাজনৈতিক উচ্চারণ হিসেবেই সীমাবদ্ধ থাকবে।
আপনার মতামত জানানঃ