ভোটকে সামনে রেখে দেশের বিভিন্ন জেলায় টাকাসহ নেতাকর্মী আটকের ঘটনাগুলো নির্বাচনী পরিবেশ নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে। সৈয়দপুর, কুমিল্লা, শরীয়তপুর, পটুয়াখালী, সিরাজগঞ্জ, জামালপুর, নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁ, ঢাকার সূত্রাপুর এবং চট্টগ্রামের চন্দনাইশ—সব মিলিয়ে অন্তত এক ডজনের বেশি ব্যক্তিকে আটক করা হয়েছে বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে। অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছে ভোট কেনার উদ্দেশ্যে নগদ অর্থ বিতরণ বা বহন।
সবচেয়ে আলোচিত ঘটনা ঘটেছে নীলফামারীর সৈয়দপুরে। সেখানে ৭৪ লাখ টাকাসহ ঠাকুরগাঁও জেলা জামায়াতের আমির বেলাল উদ্দিন প্রধানকে আটক করে সেনাবাহিনী, পরে তাকে থানায় সোপর্দ করা হয়। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, নির্বাচনী প্রেক্ষাপটে বড় অঙ্কের নগদ অর্থ বহনের বিষয়ে যাচাই-বাছাই চলছে। অপরদিকে সংশ্লিষ্টরা দাবি করেছেন, এটি সাংগঠনিক বা বৈধ খরচের টাকা।
কুমিল্লার মুরাদনগরে দুই লাখ টাকা বিতরণের অভিযোগে স্থানীয় জনতা একজন জামায়াত নেতাকে আটক করে প্রশাসনের হাতে তুলে দেয়। সিরাজগঞ্জে চারজন নেতাকর্মীকে ৭১ হাজার টাকাসহ আটক করার পর প্রশাসন ছেড়ে দেয়—যদিও সেখানে পাল্টাপাল্টি অভিযোগ উঠেছে ছিনতাই ও কেন্দ্র খরচের টাকা নিয়ে বিরোধের বিষয়ে। শরীয়তপুরে সাড়ে সাত লাখ টাকা উদ্ধারসহ যৌথ বাহিনীর অভিযানের খবরও এসেছে। সূত্রাপুরে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে একজনকে দুই দিনের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে।
পটুয়াখালী, সোনারগাঁ ও জামালপুরেও একই ধরনের অভিযোগে স্থানীয়দের হস্তক্ষেপে আটকের ঘটনা ঘটেছে। চট্টগ্রামের চন্দনাইশে আবার ১০ লাখ ৪৯ হাজার টাকা ও একটি মাইক্রোবাসসহ তিনজনকে আটক করা হয়েছে। সেখানে আটক ব্যক্তিরা দাবি করেছেন, টাকা পোলিং এজেন্টদের খরচের জন্য বহন করা হচ্ছিল।
এই ঘটনাগুলোর মধ্যে একটি সাধারণ বৈশিষ্ট্য হলো—প্রায় সব ক্ষেত্রেই নগদ অর্থের উপস্থিতি এবং “কেন্দ্র খরচ” বা “সাংগঠনিক ব্যয়”–এর ব্যাখ্যা। বাংলাদেশের নির্বাচনী বাস্তবতায় পোলিং এজেন্ট, পরিবহন, খাবার ও অন্যান্য ব্যবস্থাপনার জন্য দলগুলো অর্থ ব্যয় করে থাকে—এটি অস্বীকার করা যায় না। তবে নির্বাচন কমিশনের বিধিমালা অনুযায়ী ব্যয়ের সীমা, হিসাব ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা বাধ্যতামূলক। নগদ অর্থ সরাসরি ভোটারদের মাঝে বিতরণ করা হলে তা স্পষ্টতই আইনবিরোধী।
এখানে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—অনেক ক্ষেত্রে “স্থানীয় জনতা” বা প্রতিদ্বন্দ্বী দলের কর্মীরা আগে আটক করে পরে প্রশাসনের হাতে তুলে দিয়েছেন। এতে রাজনৈতিক উত্তেজনা, পারস্পরিক অবিশ্বাস ও সংঘর্ষের ঝুঁকি বাড়ে। নির্বাচনকে ঘিরে এমন পরিস্থিতি তৈরি হলে নিরপেক্ষতা ও আইন প্রয়োগের প্রশ্ন সামনে আসে।
রাজনৈতিক দলগুলোর পক্ষ থেকে পাল্টা বক্তব্যও এসেছে। কেউ বলছেন, এটি পরিকল্পিতভাবে প্রতিপক্ষকে হেয় করার চেষ্টা; কেউ বলছেন, বৈধ সাংগঠনিক অর্থকে ‘ভোট কেনা’ হিসেবে প্রচার করা হচ্ছে। আবার আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বলছে, তারা অভিযোগের ভিত্তিতে নিয়মিত অভিযান চালাচ্ছে এবং নির্বাচনকে সুষ্ঠু রাখতে কঠোর অবস্থানে রয়েছে।
ভোটের আগে বড় অঙ্কের নগদ অর্থ উদ্ধার সবসময়ই জনমনে সন্দেহ তৈরি করে। কারণ আধুনিক ব্যাংকিং ব্যবস্থার যুগে এত বিপুল অর্থ নগদে বহনের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হলে দলগুলোর উচিত হবে অর্থের উৎস, উদ্দেশ্য ও হিসাব স্পষ্টভাবে তুলে ধরা। অন্যথায় “ভোট কেনা”র অভিযোগ রাজনৈতিক আস্থাকে আরও দুর্বল করবে।
নির্বাচনের সময় প্রশাসনের ভূমিকা অত্যন্ত সংবেদনশীল। একদিকে আইন প্রয়োগ, অন্যদিকে নিরপেক্ষতার ইমেজ—দুই দিকই সমান গুরুত্বপূর্ণ। কোনো দল যদি মনে করে তাকে লক্ষ্য করে অভিযান চালানো হচ্ছে, তাহলে তা নির্বাচন-পরবর্তী বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তুলতে পারে। আবার অভিযোগ উপেক্ষা করলে ভোটের স্বচ্ছতা ক্ষুণ্ন হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
সব মিলিয়ে, বিভিন্ন জেলায় টাকাসহ আটকের ধারাবাহিক ঘটনা প্রমাণ করে যে নির্বাচন ঘিরে প্রতিযোগিতা তীব্র আকার নিয়েছে। এখন মূল চ্যালেঞ্জ হলো—আইনের শাসন নিশ্চিত করা, অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত করা এবং প্রকৃত সত্য উদঘাটন করা। ভোটারদের আস্থা ধরে রাখতে হলে শুধু আটক নয়, স্বচ্ছ ও বিশ্বাসযোগ্য তদন্ত-প্রক্রিয়াই হবে সবচেয়ে বড় পরীক্ষার জায়গা।
আপনার মতামত জানানঃ