১৪৩২ বঙ্গাব্দের ফাল্গুনের শুরুতেই জাতীয় নির্বাচনের প্রহর গোনা—কিন্তু ভোটের দিন ভোর হওয়ার আগেই দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে পড়ে অনিয়মের অভিযোগ। রাতের প্রথম প্রহর থেকেই উত্তেজনা, বাগ্বিতণ্ডা, ভিডিও ভাইরাল, আটক ও অপসারণ—সব মিলিয়ে নির্বাচনী পরিবেশে অস্বস্তির ছায়া। নারায়ণগঞ্জ, সিলেট, ঝিনাইদহ ও পটুয়াখালীর বিভিন্ন কেন্দ্র ঘিরে যে অভিযোগগুলো উঠেছে, তা কেবল বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; বরং ভোটের আগের রাতেই আস্থার প্রশ্নটিকে সামনে এনে দিয়েছে।
নারায়ণগঞ্জ-৩ আসনের সিদ্ধিরগঞ্জে ধনকুন্ডা পপুলার হাইস্কুল কেন্দ্রকে ঘিরে শুরু হয় প্রথম উত্তেজনা। অভিযোগ ওঠে, ভোট শুরুর আগেই ব্যালট পেপার খোলা হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওতে দেখা যায়, ভোটকক্ষের মেঝেতে কয়েকটি বাক্সে ব্যালট বই পড়ে আছে। ভিডিওটি ছড়িয়ে পড়ার পরপরই স্থানীয় সমর্থকদের মধ্যে উত্তেজনা বাড়ে। সংশ্লিষ্ট প্রিজাইডিং অফিসার মো. বশিরুল হক ভূইয়ার রাজনৈতিক অতীত নিয়ে প্রশ্ন তোলে একটি পক্ষ। জানা যায়, তিনি আগে জামায়াতে ইসলামীর স্থানীয় শাখার সেক্রেটারি ছিলেন। বিষয়টি সামনে আসতেই অভিযোগ ও পাল্টা অভিযোগে পরিস্থিতি ঘোলাটে হয়ে ওঠে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়, নির্বাচন কমিশনের নির্দেশনা অনুযায়ী ভোটের আগের রাতে ব্যালট পেপার ও ভোটার তালিকা যাচাইয়ের নিয়মিত প্রক্রিয়া চলছিল, সেখানে কোনো বহিরাগত ছিল না এবং কোনো অনিয়ম ঘটেনি। সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তা শাহীনা ইসলাম চৌধুরী জানান, তিনি নিজে উপস্থিত থেকে যাচাই করেছেন। তবু প্রশ্ন থেকে যায়—ভিডিওটি কেন এবং কীভাবে ভাইরাল হলো, আর কেনই বা কেন্দ্র ঘিরে এমন উত্তেজনা তৈরি হলো?
ঝিনাইদহ-৪ আসনের কালীগঞ্জে ঘটনাপ্রবাহ আরও নাটকীয়। সলিমুন্নেছা মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয় কেন্দ্রে আগাম স্বাক্ষরিত ২৩টি ফলাফল শিট জব্দের খবর ছড়িয়ে পড়তেই চাঞ্চল্য তৈরি হয়। অভিযোগ ছিল, ভোট গ্রহণ শুরুর আগেই ফলাফল শিটে এজেন্টদের স্বাক্ষর নেওয়া হয়েছে। প্রশাসন দ্রুত কেন্দ্র পরিদর্শন করে এবং ওই ফলাফল শিটগুলো জব্দ করে তাৎক্ষণিকভাবে বাতিল ও ছিঁড়ে ফেলে। প্রিজাইডিং অফিসার জেসমিন আরাকে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়। নতুন প্রিজাইডিং অফিসার হিসেবে দায়িত্ব পান শামসুজ্জামান খান। রিটার্নিং অফিসার আব্দুল্লাহ আল মাসউদ জানান, দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। প্রশ্ন উঠেছে—এটি কি কেবল দায়িত্বে অবহেলা, নাকি আরও গভীর কোনো অনিয়মের ইঙ্গিত? ভোটের আগেই ফলাফল শিটে স্বাক্ষর—এ অভিযোগ যে কোনো নির্বাচনের জন্যই অত্যন্ত সংবেদনশীল।
সিলেটে মধ্যরাতের পর কয়েকটি কেন্দ্রে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। জৈন্তাপুরের একটি কেন্দ্রে দুই সহকারী প্রিজাইডিং অফিসার কেন্দ্র ছেড়ে স্থানীয় এক রাজনৈতিক নেতার বাড়িতে বৈঠক করছেন—এমন অভিযোগে স্থানীয়রা তাদের ঘেরাও করেন। পরে পুলিশ এসে তাদের থানায় নিয়ে যায়। একই উপজেলায় আরেক ঘটনায় টাকা বিতরণের অভিযোগে স্থানীয় এক জনপ্রতিনিধি ও তার সহযোগীকে আটক করা হয়। নির্বাচনের আগের রাতে এ ধরনের অভিযোগ নির্বাচনী পরিবেশে অস্বস্তি বাড়িয়েছে। প্রশাসনের দাবি, অভিযোগ পেয়ে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। কিন্তু ভোটের আগেই কর্মকর্তাদের কেন্দ্র ত্যাগ বা টাকা বিতরণের মতো অভিযোগ সাধারণ ভোটারের মনে সংশয় তৈরি করে।
পটুয়াখালীর কলাপাড়ায় আরও বড় অঙ্কের অর্থসহ একজনকে আটক করা হয়। কোস্টগার্ড সদস্যরা পৌরশহরের একটি কেন্দ্রসংলগ্ন এলাকা থেকে রেজাউল করিম ওরফে কাজল মৃধা নামে এক ব্যক্তিকে ব্যাগভর্তি প্রায় ৫০ লাখ টাকাসহ আটক করেন। তিনি নিজেকে স্বেচ্ছাসেবক দলের পৌর যুগ্ম আহ্বায়ক বলে দাবি করেন। সামাজিক মাধ্যমে তাকে একটি রাজনৈতিক দলের নেতা হিসেবে চিহ্নিত করা হলেও সংশ্লিষ্ট দলীয় সূত্র তা অস্বীকার করেছে। আটক ব্যক্তির দাবি, টাকা ব্যক্তিগত প্রয়োজনে রাখা ছিল। পুলিশ জানিয়েছে, আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে। তবে ভোটের আগের রাতে বিপুল পরিমাণ নগদ অর্থ উদ্ধার—এ ঘটনা জনমনে নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।
নির্বাচনের আগের রাত সাধারণত প্রশাসনিক প্রস্তুতি, নিরাপত্তা জোরদার এবং শেষ মুহূর্তের যাচাই-বাছাইয়ের সময়। কিন্তু যখন সেই রাতেই ব্যালট খোলা, আগাম স্বাক্ষর, কর্মকর্তা-কর্মচারীর কেন্দ্র ত্যাগ বা টাকা বিতরণের অভিযোগ ওঠে, তখন ভোটের স্বচ্ছতা ও গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে আলোচনা শুরু হয় স্বাভাবিকভাবেই। নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, নিয়মিত প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে কিছু কার্যক্রম চলছিল এবং কোথাও অনিয়ম প্রমাণিত হলে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। কিন্তু বিরোধী পক্ষগুলোর দাবি, এসব ঘটনা বিচ্ছিন্ন নয়; বরং বৃহত্তর অনিয়মের আলামত।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এখন নির্বাচনী প্রক্রিয়ার একটি বড় ফ্যাক্টর। একটি ভিডিও বা পোস্ট মুহূর্তেই ভাইরাল হয়ে জনমত প্রভাবিত করতে পারে। নারায়ণগঞ্জের ঘটনার ভিডিও তারই উদাহরণ। প্রশাসন বলছে, যাচাই-বাছাই চলছিল; কিন্তু ভিডিওতে ব্যালট বইয়ের দৃশ্য অনেকের মনে সন্দেহ তৈরি করেছে। একইভাবে ঝিনাইদহে ফলাফল শিটের ঘটনায় দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া হলেও প্রশ্ন উঠেছে, এমন ঘটনা ঘটল কীভাবে? প্রিজাইডিং অফিসার অপসারণ একটি শক্ত বার্তা দিলেও আস্থার সংকট পুরোপুরি কাটেনি।
ভোটের আগের রাতের এসব ঘটনা নির্বাচনী পরিবেশকে দুইভাবে প্রভাবিত করতে পারে। একদিকে প্রশাসনের দ্রুত পদক্ষেপ দেখিয়ে স্বচ্ছতার বার্তা দেওয়া যায়; অন্যদিকে অভিযোগের পুনরাবৃত্তি হলে ভোটারদের অংশগ্রহণে অনীহা তৈরি হতে পারে। গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় আস্থা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। ভোটার যদি বিশ্বাস করেন যে তার ভোট সঠিকভাবে গণনা হবে না, তাহলে পুরো ব্যবস্থাই প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে।
এবারের নির্বাচনে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে বলে জানানো হয়েছে। যৌথ বাহিনী মোতায়েন, নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটদের তৎপরতা, কোস্টগার্ডের অভিযান—সবই তার প্রমাণ। কিন্তু বাস্তবে অভিযোগের সংখ্যা ও প্রকৃতি দেখলে বোঝা যায়, মাঠপর্যায়ে এখনও চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে। বিশেষ করে ব্যালট পেপার ও ফলাফল শিটের মতো সংবেদনশীল উপকরণ নিয়ে যে কোনো অভিযোগই গুরুতর।
নির্বাচনের আগে উত্তেজনা নতুন কিছু নয়। তবে রাতের অন্ধকারে ছড়িয়ে পড়া সন্দেহের ছায়া ভোরের আলোতেও পুরোপুরি কাটে না। ভোটের দিন শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন হলেও আগের রাতের ঘটনাগুলো রাজনৈতিক বিতর্কে দীর্ঘদিন ধরে আলোচিত হতে পারে। সংশ্লিষ্টদের দাবি-প্রতিদাবি, প্রশাসনের ব্যাখ্যা, ভাইরাল ভিডিও—সব মিলিয়ে নির্বাচন-পরবর্তী আলোচনায় এসব ঘটনা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
গণতন্ত্রের শক্তি কেবল ভোট গ্রহণে নয়, বরং ভোটের প্রতি মানুষের আস্থায়। নারায়ণগঞ্জ, সিলেট, ঝিনাইদহ ও পটুয়াখালীর ঘটনাগুলো দেখিয়ে দিল, সেই আস্থা রক্ষা করা কতটা গুরুত্বপূর্ণ এবং একইসঙ্গে কতটা কঠিন। অভিযোগের দ্রুত তদন্ত, স্বচ্ছ ব্যাখ্যা ও দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা ছাড়া এ আস্থা ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয়। ভোটের আগের রাতের অস্থিরতা তাই শুধু কয়েকটি কেন্দ্রের ঘটনা নয়; এটি বৃহত্তর প্রশ্ন—নির্বাচন কতটা স্বচ্ছ, কতটা গ্রহণযোগ্য, আর কতটা বিশ্বাসযোগ্য—তারই প্রতিফলন।
আপনার মতামত জানানঃ