আগামী ১২ই ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিনেই অনুষ্ঠেয় গণভোট শুধু একটি সনদ বাস্তবায়নের প্রশ্ন নয়, বরং এটি সরাসরি বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক ক্ষমতার কাঠামো নির্ধারণ করে দিতে পারে। এই গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়ী হলে যে পরিবর্তনগুলো কার্যকর হবে, তার একটি গুরুত্বপূর্ণ এবং বহুল আলোচিত দিক হলো—বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান ভবিষ্যতে প্রধানমন্ত্রী হতে পারবেন না।
জুলাই সনদের একটি মৌলিক প্রস্তাব হলো প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ নির্ধারণ। বিদ্যমান সংবিধানে প্রধানমন্ত্রী কতবার এবং কত বছর ক্ষমতায় থাকতে পারবেন—সে বিষয়ে কোনো সীমা নেই। এর ফলেই দীর্ঘ সময় ধরে একই ব্যক্তি রাষ্ট্রক্ষমতার কেন্দ্রে অবস্থান করতে পেরেছেন। জুলাই সনদ সেই জায়গায় একটি স্পষ্ট সীমারেখা টানতে চায়। এতে বলা হয়েছে, একজন ব্যক্তি তার পুরো জীবনে সর্বোচ্চ দুই মেয়াদ বা মোট ১০ বছরের বেশি প্রধানমন্ত্রী থাকতে পারবেন না। এই বিধান কার্যকর হলে এটি অতীতের সব মেয়াদকেই গণনায় ধরবে।
এই প্রস্তাবটি এখানেই রাজনৈতিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে ওঠে। কারণ বিএনপির নেতৃত্বে যদি ভবিষ্যতে সরকার গঠনের সুযোগ আসে, তখন দলের শীর্ষ নেতা হিসেবে তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী পদে আসবেন—এমন প্রত্যাশা বহুদিনের। কিন্তু গণভোটে জুলাই সনদ কার্যকর হলে সেই সম্ভাবনার পথ কার্যত বন্ধ হয়ে যাবে। কারণ সনদের বিধান অনুযায়ী, ভবিষ্যতে প্রধানমন্ত্রী হওয়ার যোগ্যতা নির্ধারণে নতুন কোনো ব্যতিক্রমের সুযোগ রাখা হয়নি।
এটি শুধু একটি ব্যক্তিগত রাজনৈতিক ভবিষ্যতের প্রশ্ন নয়, বরং দলীয় ক্ষমতার ভারসাম্য ও নেতৃত্বের ধারাবাহিকতা নিয়েও বড় প্রভাব ফেলবে। বিএনপির ভেতরেই এ নিয়ে নানা হিসাব-নিকাশ চলছে বলে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের ধারণা। একদিকে দীর্ঘদিন ধরে নির্বাসিত অবস্থায় থাকা তারেক রহমানকে সামনে রেখে দল পুনর্গঠনের চেষ্টা, অন্যদিকে জুলাই সনদের মতো কাঠামোগত সংস্কার—এই দুইয়ের সংঘাত বিএনপির জন্য কৌশলগত চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে।
গণভোটের প্রচারণায় সরকার সরাসরি ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ইউনূস প্রকাশ্য ভাষণে বলেছেন, ‘হ্যাঁ’ ভোট মানেই বৈষম্য ও নিপীড়নের রাজনীতি থেকে বেরিয়ে আসার সুযোগ। তবে বিরোধী দলগুলোর একটি অংশ মনে করছে, এই সংস্কারের আড়ালে ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক নেতৃত্বকে নিয়ন্ত্রণ করার একটি কাঠামো তৈরি করা হচ্ছে।
জুলাই সনদের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—প্রধানমন্ত্রী একাধিক পদে থাকতে পারবেন না। বর্তমানে প্রধানমন্ত্রী একই সঙ্গে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয় নিজের হাতে রাখতে পারেন। কিন্তু সনদ কার্যকর হলে সেই ক্ষমতা খর্ব হবে। এর ফলে সরকার প্রধানের ওপর প্রাতিষ্ঠানিক নিয়ন্ত্রণ বাড়বে, কিন্তু একই সঙ্গে রাজনৈতিক দলের ভেতরে ক্ষমতার পুনর্বণ্টন ঘটবে।
বিএনপিসহ কয়েকটি দল এই দুটি প্রস্তাবেই নোট অব ডিসেন্ট বা ভিন্নমত জানিয়েছিল। বিশেষ করে প্রধানমন্ত্রী পদের মেয়াদ নির্ধারণ এবং একাধিক পদে থাকার নিষেধাজ্ঞা—এই বিষয়গুলো ভবিষ্যৎ সরকার পরিচালনায় অপ্রত্যাশিত সীমাবদ্ধতা তৈরি করতে পারে বলে তাদের আশঙ্কা। শেষ পর্যন্ত এই মতানৈক্য দূর না হওয়ায় সরকার গণভোটের পথ বেছে নেয়।
গণভোটে যদি ‘হ্যাঁ’ জয়ী হয়, তাহলে পরবর্তী সংসদ সাংবিধানিকভাবে জুলাই সনদের সব ধারা বাস্তবায়নে বাধ্য থাকবে। সে ক্ষেত্রে শুধু তারেক রহমান নন, ভবিষ্যতে কোনো রাজনৈতিক নেতাই দীর্ঘদিন প্রধানমন্ত্রী পদ আঁকড়ে ধরে রাখতে পারবেন না। আর যদি ‘না’ জয়ী হয়, তাহলে পুরো জুলাই সনদই কার্যকর হবে না—বর্তমান সংবিধানই বহাল থাকবে, এবং তারেক রহমানের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পথে সাংবিধানিক কোনো বাধা থাকবে না।
এই কারণেই আসন্ন গণভোটটি কেবল সংস্কার বনাম সংস্কারের প্রশ্ন নয়। এটি এক অর্থে নির্ধারণ করে দেবে—বাংলাদেশের রাজনীতিতে ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব কি ব্যক্তি-কেন্দ্রিক থাকবে, নাকি মেয়াদ ও কাঠামোর কড়াকড়িতে বাঁধা পড়বে। সেই সঙ্গে এটিও স্পষ্ট হয়ে যাচ্ছে, ১২ই ফেব্রুয়ারির ব্যালটে দেওয়া একটি ‘হ্যাঁ’ ভোট তারেক রহমানের প্রধানমন্ত্রিত্বের সম্ভাবনাকে স্থায়ীভাবে ইতিহাসের পাতায় ঠেলে দিতে পারে।
আপনার মতামত জানানঃ