বাংলাদেশের এবারের নির্বাচন শুধু ক্ষমতার পালাবদলের হিসাব নয়, বরং একটি প্রজন্মগত মোড় নেওয়ার ইঙ্গিতও বহন করছে। মোট ভোটারের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ তরুণ—এই পরিসংখ্যানই বলে দেয়, তরুণদের সিদ্ধান্ত নির্বাচনের ফলাফল নির্ধারণে কতটা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। গত এক দশকে যারা ভোটার হয়েছেন কিন্তু ভোটাধিকার প্রয়োগের সুযোগ পাননি, যারা একতরফা ও বিতর্কিত নির্বাচনের কারণে ভোটকেন্দ্রের পথেই হাঁটেননি, তাদের বড় একটি অংশ এবার প্রথমবারের মতো ব্যালট হাতে নেওয়ার অপেক্ষায়। এই প্রত্যাশা, সংশয় ও নতুন করে ভাবার জায়গাটিই তরুণ ভোটারদের মনস্তত্ত্বকে আলাদা করে তুলেছে।
ঢাকার তুনাজ্জিনা জাহানের মতো অনেকেই মনে করেন, বয়স বাড়লেও ভোট দেওয়ার অভিজ্ঞতা যেন এখনো অধরা। তিনি নিরাপত্তা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও দুর্নীতিবিরোধী অবস্থানকে ভোটের প্রধান মানদণ্ড হিসেবে দেখছেন। এই ভাবনা কেবল শহরের শিক্ষিত তরুণদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিস্তারে গ্রাম-শহরের ব্যবধান কমলেও বাস্তবতায় সিদ্ধান্ত গ্রহণের ধরন এখনো ভিন্ন। শহরের তরুণরা প্রার্থীর অতীত, ব্যক্তিগত ভাবমূর্তি ও অনলাইন উপস্থিতি খুঁটিয়ে দেখছেন, আর গ্রামের অনেক তরুণী-তরুণ এখনো পরিবার ও স্থানীয় প্রভাবশালীদের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভরশীল।
বিশ্লেষকেরা বলছেন, জুলাইয়ের গণ-অভ্যুত্থানের পর তরুণদের রাজনৈতিক সচেতনতা নতুন মাত্রা পেয়েছে। তারা ইতিহাসকে অস্বীকার না করলেও ভবিষ্যতের প্রশ্নেই বেশি মনোযোগী—কর্মসংস্থান হবে কি না, শিক্ষা কতটা কর্মমুখী হবে, দক্ষতা বাড়ানোর সুযোগ মিলবে কি না, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো জবাবদিহির আওতায় আসবে কি না। এই বাস্তবতায় রাজনৈতিক দলগুলোর জন্য তরুণদের কাছে পৌঁছানো যেমন জরুরি, তেমনি সহজ নয়। দ্রুত মত বদলানো, সামাজিক প্রভাবের শক্তি এবং তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর জীবনযাপন তাদের আচরণকে অনিশ্চিত করে তুলেছে।
এই অনিশ্চয়তাকেই ভোটের সুযোগ হিসেবে দেখছে বিরোধী রাজনৈতিক শক্তিগুলো। ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতিতে প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে উঠেছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল এবং তাদের দীর্ঘদিনের জোটসঙ্গী জামায়াতে ইসলামী। পাশাপাশি জুলাই আন্দোলনের নেতৃত্বে থাকা তরুণদের দল জাতীয় নাগরিক পার্টি প্রথমবারের মতো জাতীয় নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে। এই তিন ধারার রাজনীতিই তরুণ ভোটারদের মন জয় করতে আলাদা আলাদা কৌশল নিয়েছে।
দীর্ঘ সময় পর নির্বাচনের মাঠে সক্রিয়ভাবে ফিরে বিএনপি নিজেদের রাজনৈতিক আচরণে একটি পরিবর্তনের বার্তা দিতে চাইছে। মিছিল-মিটিংয়ে জনভোগান্তি কমানো, কটূক্তির রাজনীতি এড়িয়ে চলা এবং ভবিষ্যতমুখী প্রতিশ্রুতির কথা বলাই তাদের কৌশল। “তারুণ্যের প্রথম ভোট, ধানের শীষের পক্ষে হোক”—এই স্লোগান দিয়ে তারা তরুণদের আবেগে না গিয়ে প্রত্যাশার জায়গায় আঘাত করতে চাইছে। এক কোটি কর্মসংস্থান সৃষ্টি, শিক্ষিত বেকারদের জন্য ভাতা, আইটি পার্কে উদ্যোক্তাদের অফিস স্পেস, ফ্রি ওয়াই-ফাই, ফ্রিল্যান্সারদের আয়ের বাধা দূর করার মতো প্রতিশ্রুতি তরুণদের কাছে আকর্ষণীয় করে তোলা হচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে থিম সং, রিলস, ফটো কার্ডের মাধ্যমে দলটি নিজেদের দায়িত্বশীল ও ইতিবাচক হিসেবে উপস্থাপন করতে চায়, যাতে অপপ্রচার ও গুজবের রাজনীতি থেকে দূরে থাকার বার্তা যায়।
জামায়াতে ইসলামী ভিন্ন পথ বেছে নিয়েছে। দীর্ঘদিন রাজনৈতিক চাপে থাকার পর তারা এবারের নির্বাচনকে পুনরুত্থানের সুযোগ হিসেবে দেখছে। জুলাইয়ের চেতনার সঙ্গে ধর্মীয় আবেগকে যুক্ত করে তরুণদের কাছে পৌঁছানোর চেষ্টা করছে দলটি। পাঁচ বছরে এক কোটি তরুণকে প্রশিক্ষণ, ইয়ুথ টেক ল্যাব, জেলা পর্যায়ে জব ইয়ুথ ব্যাংক, উদ্যোক্তা ও ফ্রিল্যান্সার গড়ে তোলার পরিকল্পনা—সবই দক্ষতা ও কর্মসংস্থানের প্রতিশ্রুতি ঘিরে। কল্যাণমূলক রাজনীতির ভাষ্য তরুণদের একটি অংশকে আকৃষ্ট করলেও, নারী নীতি ও আদর্শিক অবস্থান নিয়ে সংশয়ও তৈরি করছে, যা শহুরে তরুণদের মধ্যে প্রশ্নের জন্ম দিচ্ছে।
এনসিপি পুরোপুরি তরুণ নেতৃত্বকে সামনে এনে নিজেদের আলাদা করে চিহ্নিত করতে চায়। র্যাপ, ফোক ও আধুনিক সুরের থিম সং, রিলস প্রতিযোগিতা, লাইভ কনটেন্ট—সবকিছুই জেন–জি প্রজন্মের ভাষায় কথা বলার চেষ্টা। কর্মসংস্থান, কর্মমুখী শিক্ষা, বেকার ভাতা, নিরাপত্তার মতো বিষয়গুলো ইশতেহারের কেন্দ্রে রাখার প্রতিশ্রুতি দিয়ে তারা বলছে, তরুণদের প্রত্যাশাই তাদের রাজনীতির মূল শক্তি। নতুন দল হিসেবে মাঠপর্যায়ে সংগঠন দুর্বল হলেও ডিজিটাল উপস্থিতিকে তারা শক্তিতে পরিণত করতে চাইছে।
তরুণ ভোটারদের আচরণ বিশ্লেষণ করলে স্পষ্ট হয়, তারা আর কেবল দলীয় পরিচয়ে আটকে নেই। বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী ঋদ্ধি দাসের মতো অনেকেই বলছেন, অতীতের প্রতিশ্রুতি কতটা বাস্তবায়িত হয়েছে, কথার সঙ্গে কাজের মিল আছে কি না—এই প্রশ্নগুলোই তাদের সিদ্ধান্ত নির্ধারণ করবে। অন্যদিকে কুড়িগ্রামের শারমিন আক্তারের মতো প্রথমবারের ভোটাররা এখনো ভোট দেওয়ার পদ্ধতি ও সিদ্ধান্তে অনিশ্চিত, পরিবার ও সমাজের পথেই হাঁটতে প্রস্তুত। এই বৈচিত্র্যই তরুণ ভোটকে একক কোনো বাক্সে যাওয়ার নিশ্চয়তা দেয় না।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা মনে করেন, তরুণরা মুক্তিযুদ্ধ বা ইতিহাসের গুরুত্ব অস্বীকার না করলেও তাদের প্রধান প্রশ্ন ভবিষ্যৎ। রাষ্ট্র তাদের জীবনে কী পরিবর্তন আনবে, সেটাই তাদের ভোটের মূল চাবিকাঠি। তাই নীতিগত অবস্থান, সুস্পষ্ট পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের রূপরেখা ছাড়া কেবল স্লোগান দিয়ে তরুণদের দীর্ঘমেয়াদে ধরে রাখা কঠিন। শহরের ডিজিটাল সচেতনতা আর গ্রামের সামাজিক বাস্তবতা—এই দুই মেরুর মাঝখানে দাঁড়িয়ে তরুণ ভোটাররা এবারের নির্বাচনে সবচেয়ে বড় অনিশ্চিত শক্তি।
এই অনিশ্চয়তার মধ্যেই একটি বিষয় স্পষ্ট—তরুণরা আর নীরব দর্শক নয়। তারা প্রশ্ন করছে, তুলনা করছে, সমালোচনা করছে এবং সিদ্ধান্ত বদলাচ্ছে। এবারের নির্বাচন তাই কেবল দলগুলোর শক্তি পরীক্ষার মঞ্চ নয়, বরং তরুণদের রাজনৈতিক পরিণত হওয়ার একটি বড় মুহূর্ত। শেষ পর্যন্ত কোন বাক্সে তরুণ ভোট যাবে, তা নির্ভর করবে কে তাদের জীবনের বাস্তব পরিবর্তনের বিশ্বাসযোগ্য ছবি আঁকতে পারে তার ওপর।
আপনার মতামত জানানঃ