ভূমধ্যসাগরের মাঝখানে অবস্থিত মাল্টা আজ জনপ্রিয় পর্যটন দ্বীপ হলেও, ভৌগোলিকভাবে এটি ইউরোপের অন্যতম বিচ্ছিন্ন দ্বীপ। এর সবচেয়ে কাছের স্থলভাগ সিসিলি, যা প্রায় ৮৫ কিলোমিটার উত্তরে। আধুনিক যুগে ফেরি ও বিমানে সেখানে পৌঁছানো সহজ, কিন্তু হাজার হাজার বছর আগে মাল্টা ছিল প্রায় অধরা এক গন্তব্য। স্থলভাগ থেকে দ্বীপটি চোখে পড়ার মতো দূরত্বে নয়; সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে তাকালে দিগন্তের ওপারেই হারিয়ে যায়। কাঠের ডিঙি বা ক্যানোতে সেখানে যেতে হলে টানা ২৪ ঘণ্টার বেশি সময় লাগত, যার মানে দিনের আলো ফুরিয়ে গেলে নাবিকদের ভরসা করতে হতো শুধু নক্ষত্রের ওপর।
এই কারণেই দীর্ঘদিন ধরে ধারণা ছিল, প্রস্তর যুগের মানুষের পক্ষে মাল্টার মতো দ্বীপে পৌঁছানো প্রায় অসম্ভব। কিন্তু প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণ সেই ধারণাকে ভেঙে দিয়েছে। জার্মানির জেনা শহরে অবস্থিত ম্যাক্স প্ল্যাঙ্ক ইনস্টিটিউট অব জিওঅ্যানথ্রোপোলজির প্রত্নতত্ত্ববিদ এলেনর স্কেরি এবং তাঁর সহকর্মীরা ২০২১ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত উত্তর মাল্টার একটি সিঙ্কহোলে খনন চালান। সেখানে তাঁরা আবিষ্কার করেন মানুষের বসবাসের স্পষ্ট চিহ্ন—আগুন জ্বালানোর চুলার ছাই, পাথরের তৈরি হাতিয়ার এবং জবাই করা হরিণের হাড়।
কার্বন পরীক্ষায় জানা যায়, এসব নিদর্শনের বয়স প্রায় ৮,৫০০ বছর। অর্থাৎ, মাল্টায় মানুষের উপস্থিতি পূর্বে ধারণা করা সময়ের চেয়ে অন্তত এক হাজার বছর পুরোনো। এই আবিষ্কারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, সেই মানুষগুলো ছিলেন শিকারি-সংগ্রাহক। তাঁরা কৃষিকাজ জানতেন না, ধাতব বা উন্নত কৃষি সরঞ্জামও তাঁদের ছিল না। এতদিন প্রত্নতত্ত্বে একটি প্রচলিত ধারণা ছিল—শিকারি-সংগ্রাহক সমাজ সমুদ্র পাড়ি দিতে পারত না, বিশেষ করে এত দীর্ঘ দূরত্বে। স্কেরির দলের গবেষণা সেই ধারণাকেই চ্যালেঞ্জ করেছে।
এই আবিষ্কার শুধু মাল্টার ইতিহাস নতুন করে লেখেনি, বরং প্রাচীন মানুষের সক্ষমতা সম্পর্কে আমাদের ভাবনার পরিধিও বিস্তৃত করেছে। প্রায় ৮,৫০০ বছর আগে ভূমধ্যসাগরে প্রায় ১০০ কিলোমিটার খোলা সমুদ্র পাড়ি দেওয়া মানে শুধু শারীরিক সাহস নয়, মানসিক প্রস্তুতি ও প্রযুক্তিগত দক্ষতারও প্রমাণ। কাঠের নৌকা তৈরি, দিকনির্ণয়ের কৌশল, আবহাওয়া বোঝার অভিজ্ঞতা—সব মিলিয়ে এসব মানুষের জ্ঞান আধুনিক ধারণার চেয়ে অনেক বেশি উন্নত ছিল।
এই গবেষণা আরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে নিয়ে আসে। যদি ভূমধ্যসাগরের শিকারি-সংগ্রাহকেরা এত আগে সমুদ্র পাড়ি দিতে সক্ষম হয়ে থাকে, তবে তারা আর কোন কোন দ্বীপে গিয়েছিল? মানব ইতিহাসে নৌযাত্রার সূচনা আসলে কতটা প্রাচীন? আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, এসব অভিযাত্রা প্রাচীন মানুষের চিন্তাশক্তি, কল্পনা ও সাহস সম্পর্কে কী বলে?
মাল্টার এই নিঃশব্দ সিঙ্কহোলে পাওয়া ছাই ও হাড় শুধু অতীতের চিহ্ন নয়; এগুলো মানবজাতির এক সাহসী অধ্যায়ের সাক্ষ্য। এমন এক সময়ের গল্প, যখন মানুষ অজানার দিকে তাকিয়ে ভয় পায়নি, বরং তারাদের আলোকে পথ খুঁজে নিয়ে সমুদ্র পাড়ি দিয়েছে।
আপনার মতামত জানানঃ