
নির্বাচনকে সামনে রেখে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য আসামে যে রাজনৈতিক ভাষা ও প্রশাসনিক উদ্যোগ সামনে আসছে, তা শুধু একটি রাজ্যের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির প্রশ্ন নয়; এটি নাগরিকত্ব, পরিচয়, ভোটাধিকার এবং রাষ্ট্রক্ষমতার ব্যবহারের মতো মৌলিক বিষয়কে নতুন করে আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে এসেছে।মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্বশর্মার সাম্প্রতিক বক্তব্য ও পদক্ষেপ ঘিরে এই বিতর্ক আরও তীব্র হয়েছে, যেখানে বাঙালি মুসলমান—বিশেষ করে যাদের ‘মিঁয়া’ বলে চিহ্নিত করা হচ্ছে—তারা সরাসরি রাষ্ট্রক্ষমতার লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছেন বলে অভিযোগ উঠছে।
বুধবার এক বক্তব্যে মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্বশর্মা স্পষ্ট ভাষায় বলেন, নির্বাচনমুখী আসামে সন্দেহভাজন বিদেশিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়াই তাদের ‘জাতীয় দায়িত্ব’। এই বক্তব্য এমন এক সময় এসেছে, যখন রাজ্যে ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন প্রক্রিয়া চলছে এবং প্রায় ৩০ লাখ মানুষের নাম বাদ পড়তে পারে—এমন নোটিশে ব্যাপক উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বিরোধী দলগুলোর দাবি, এই তালিকা থেকে বাদ পড়াদের বড় অংশই মুসলমান, যাদের অনেকেই বাংলাভাষী। তাদের আশঙ্কা, প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার আড়ালে একটি নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীকে রাজনৈতিকভাবে বঞ্চিত করার চেষ্টা চলছে।
মুখ্যমন্ত্রী দাবি করেছেন, ক্ষমতাসীন বিজেপির কর্মীরা পাঁচ লাখের বেশি অভিযোগ দায়ের করেছেন সন্দেহভাজন বিদেশিদের বিরুদ্ধে। তার বক্তব্য অনুযায়ী, যদি বিশেষ সংশোধনের আওতায় কেউ নোটিশ না পান, তবে সেটির অর্থ হবে—আসামে কোনো অবৈধ বিদেশি নেই। এই যুক্তির মধ্য দিয়েই তিনি বিজেপি কর্মীদের দায়ের করা অভিযোগকে বৈধতা দিচ্ছেন এবং সরকার ও নির্বাচন কমিশন সেগুলো পরীক্ষা করবে বলে জানাচ্ছেন। তবে সমালোচকদের মতে, এই প্রক্রিয়া বাস্তবে এক ধরনের ‘গণ-সন্দেহ’ তৈরি করছে, যেখানে নাগরিকত্ব প্রমাণের দায় চাপানো হচ্ছে সাধারণ মানুষের ওপর।
এই বক্তব্যের সঙ্গে সঙ্গে হিমন্ত বিশ্বশর্মা যে ভাষা ব্যবহার করেছেন, তা আরও গভীর উদ্বেগ তৈরি করেছে। কংগ্রেসের পক্ষ থেকে ভোট চুরির অভিযোগের জবাবে তিনি বলেন, “আমরা মিঁয়াদের ভোট চুরি করবোই। কারণ, ওদের বাংলাদেশে ভোট দেয়ার কথা।” এই মন্তব্য শুধু রাজনৈতিক শিষ্টাচার লঙ্ঘন করেছে—এমনটাই নয়, বরং এটি ভারতের সংবিধানপ্রদত্ত নাগরিক অধিকার নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে বলে মনে করছেন মানবাধিকারকর্মীরা। একজন নির্বাচিত মুখ্যমন্ত্রীর মুখে এমন বক্তব্য প্রশাসনিক নিরপেক্ষতা ও আইনের শাসনের ধারণাকে দুর্বল করে বলে অভিযোগ উঠেছে।
মুখ্যমন্ত্রী আরও দাবি করেন, মিঁয়া সম্প্রদায়ের কাছে বিজেপিকে পরাজিত করা এখন ‘জেহাদে’ পরিণত হয়েছে। তার ভাষ্য অনুযায়ী, এই জনগোষ্ঠীর জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে আগামী জনগণনায় আসামে তাদের সংখ্যা ৪০ শতাংশে পৌঁছবে। এই ধরনের জনসংখ্যাগত আতঙ্ক বহুদিন ধরেই আসামের রাজনীতিতে ব্যবহৃত হয়ে আসছে, কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে তা আরও প্রকাশ্য ও আক্রমণাত্মক রূপ নিয়েছে। সমালোচকরা বলছেন, জনসংখ্যার পরিসংখ্যানকে ভয় দেখানোর হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে একটি পুরো সম্প্রদায়কে ‘হুমকি’ হিসেবে চিহ্নিত করা হচ্ছে।
ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন (এসআর) নিয়ে বিরোধী দলগুলোর অভিযোগ, এই প্রক্রিয়াকে বিজেপি নিজেদের পক্ষে প্রভাবিত করার চেষ্টা করছে। তাদের মতে, যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়ের করা হচ্ছে, তাদের বেশিরভাগই দরিদ্র, প্রান্তিক এবং প্রশাসনিক প্রক্রিয়া বোঝার বা প্রয়োজনীয় নথি জোগাড় করার সক্ষমতা কম। ফলে প্রকৃত নাগরিক হয়েও তারা তালিকা থেকে বাদ পড়ার ঝুঁকিতে রয়েছেন। মুখ্যমন্ত্রী অবশ্য এসব অভিযোগ উড়িয়ে দিয়ে বলেছেন, আসামে সবাই জানে যে বাংলাদেশি মিঁয়ারা রাজ্যে প্রবেশ করেছে এবং সেই বাস্তবতাকে অস্বীকার করার সুযোগ নেই।
এই বক্তব্যের সবচেয়ে বিতর্কিত অংশ আসে তখন, যখন মুখ্যমন্ত্রী প্রকাশ্যে বলেন—ভোটার তালিকা সংশোধনের সময় চার থেকে পাঁচ লাখ ‘মিঁয়া ভোট’ মুছে ফেলতে হবে এবং কংগ্রেস তাকে যতই গালি দিক না কেন, তার কাজ হলো ‘মিঁয়াদের কষ্ট দেওয়া’। তিনি আরও বলেন, যদি তাদের কষ্ট না দেওয়া হয়, তাহলে তারা উজানি আসামে চলে যাবে, এবং ইতোমধ্যেই তিনসুকিয়ায় তারা এসেছে। এমন বক্তব্যে প্রশাসনিক পদক্ষেপের সঙ্গে সরাসরি সামাজিক চাপ ও ভীতি তৈরির আহ্বান মিলেমিশে গেছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
মুখ্যমন্ত্রী এখানেই থামেননি। তিনি আবেদন জানিয়ে বলেন, “মিঁয়াদের চাপের মধ্যে রাখতে যে যেমন ভাবে পারবেন, ওদের কষ্ট দিন। যাতে বাধ্য হয় রাজ্য ছাড়ে।” একজন মুখ্যমন্ত্রীর মুখে এই ধরনের আহ্বান ভারতের গণতান্ত্রিক কাঠামো ও সংবিধানিক মূল্যবোধের সঙ্গে সাংঘর্ষিক—এমনটাই বলছেন বিরোধীরা। তাদের মতে, এটি কার্যত একটি নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে সামাজিক ও প্রশাসনিক নিপীড়নকে বৈধতা দেওয়ার শামিল।
বিজেপি নেতারা দীর্ঘদিন ধরেই মিঁয়া সম্প্রদায়কে বাংলাদেশ থেকে অনুপ্রবেশকারী হিসেবে চিহ্নিত করে আসছেন। তবে এই বর্ণনার একটি বড় সমস্যা হলো—‘মিঁয়া’ শব্দটি কেবল অবৈধ অভিবাসীদের বোঝাতে ব্যবহৃত হচ্ছে না; বরং বহু প্রজন্ম ধরে আসামে বসবাসকারী বাংলাভাষী মুসলমানদেরও একইভাবে দাগিয়ে দেওয়া হচ্ছে। এতে করে নাগরিক ও অনাগরিকের মধ্যকার পার্থক্য ঝাপসা হয়ে যাচ্ছে এবং পুরো একটি ভাষাভাষী-ধর্মীয় গোষ্ঠীকে সন্দেহের চোখে দেখা হচ্ছে।
এই প্রসঙ্গে ১৯৮৫ সালের আসাম চুক্তির কথা বারবার উঠে আসছে। সেই চুক্তিতে অবৈধ অভিবাসীদের শনাক্তকরণ, অপসারণ ও নির্বাসনের জন্য ২৪ মার্চ ১৯৭১-কে নির্দিষ্ট সময়সীমা হিসেবে নির্ধারণ করা হয়েছিল। অর্থাৎ, ওই তারিখের আগে যারা আসামে প্রবেশ করেছেন, তারা নাগরিক হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়ার কথা। সমালোচকদের প্রশ্ন, বর্তমান সরকার ও বিজেপি নেতারা কি সেই চুক্তির শর্ত মেনেই কাজ করছেন, নাকি তার বাইরেও গিয়ে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে নাগরিকত্বের সংজ্ঞা নতুন করে নির্ধারণ করার চেষ্টা চলছে?
মানবাধিকার সংগঠনগুলো আশঙ্কা প্রকাশ করছে, এই ধরনের বক্তব্য ও পদক্ষেপ সামাজিক বিভাজন আরও গভীর করবে। ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ পড়া মানে শুধু ভোটাধিকার হারানো নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে পরিচয়পত্র, সরকারি সুযোগ-সুবিধা এবং সর্বোপরি রাষ্ট্রের চোখে নাগরিক হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়ার প্রশ্ন। অনেকের জন্য এটি কার্যত রাষ্ট্রহীন হয়ে পড়ার ঝুঁকি তৈরি করছে।
নির্বাচনের রাজনীতিতে কঠোর ভাষা নতুন নয়, কিন্তু যখন সেই ভাষা প্রশাসনিক ক্ষমতার সঙ্গে মিলিত হয়ে নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীকে লক্ষ্যবস্তু করে, তখন তার প্রভাব অনেক গভীর ও দীর্ঘস্থায়ী হয়। আসামে আজ যে পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে, তা শুধু একটি নির্বাচনের ফল নির্ধারণ করবে না; এটি রাজ্যের সামাজিক সহাবস্থান, সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা এবং ভারতের গণতান্ত্রিক চরিত্র নিয়েও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তুলে দিচ্ছে। এই প্রশ্নগুলোর উত্তর কীভাবে দেওয়া হবে, সেটাই হয়তো নির্ধারণ করবে—ভোটের পর আসাম কোন পথে এগোবে।
আপনার মতামত জানানঃ