বাংলাদেশের রাজনীতিতে আরেকটি মোড় ঘোরানো সময়ের মধ্যে দাঁড়িয়ে আছে আসন্ন জাতীয় নির্বাচন। জুলাইয়ের গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকা আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর এই নির্বাচনকে অনেকেই দেখছেন একটি নতুন রাজনৈতিক অধ্যায়ের সূচনা হিসেবে। কিন্তু একই সঙ্গে এই নির্বাচন ঘিরেই সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি উঠছে—ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ ও তাদের কয়েকটি মিত্র দলকে বাইরে রেখে আয়োজিত একটি নির্বাচন আদৌ কতটা অংশগ্রহণমূলক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক হতে পারে।
২০১৪ সাল থেকে বাংলাদেশে পরপর তিনটি জাতীয় নির্বাচনই কমবেশি বিতর্কের মুখে পড়েছে। ২০১৪ ও ২০২৪ সালের নির্বাচনে বিএনপি ও জামায়াত অংশ না নেওয়ায় সেগুলোকে একতরফা হিসেবে আখ্যা দেওয়া হয়েছে। ২০১৮ সালের নির্বাচনকে বিরোধীরা ‘রাতের ভোট’ বলে অভিহিত করে। সেই প্রেক্ষাপটে এবার পরিস্থিতি উল্টো—এবার আওয়ামী লীগ নির্বাচনের বাইরে, আর বিএনপি ও জামায়াতসহ আওয়ামী লীগবিরোধী শক্তিগুলো মাঠে। ফলে অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন নিয়ে প্রশ্নটি আবারও নতুনভাবে সামনে এসেছে, যদিও এবার প্রশ্নের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে ভিন্ন একটি দল।
গণ-অভ্যুত্থানের পর আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কার্যক্রম নির্বাহী আদেশে নিষিদ্ধ করা হয়েছে এবং নির্বাচন কমিশন দলটির নিবন্ধন বাতিল করেছে। ফলে দলটি সাংগঠনিকভাবে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সুযোগ পাচ্ছে না। আওয়ামী লীগ ও তাদের সমর্থকেরা এটিকে রাজনৈতিক প্রতিহিংসা ও গণতান্ত্রিক পরিসর সংকুচিত করার উদাহরণ হিসেবে দেখছেন। অন্যদিকে বিএনপি ও জামায়াতসহ নতুন প্রতিদ্বন্দ্বী জোটগুলোর দাবি, আইনি ও সাংবিধানিক কাঠামোর মধ্যে যারা আছে, তারাই নির্বাচনে অংশ নিতে পারছে—এটাই যথেষ্ট অন্তর্ভুক্তিমূলক হওয়ার জন্য।
এই দুই ভিন্ন ব্যাখ্যার মাঝখানেই মূলত আটকে আছে ‘ইনক্লুসিভ’ বা অন্তর্ভুক্তিমূলক নির্বাচনের সংজ্ঞা। জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ারের ভাষায়, অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন মানে কোনো নির্দিষ্ট দলের উপস্থিতি নয়, বরং ভোটারদের অংশগ্রহণ। তার মতে, নির্বাচন আইন, নির্বাচন কমিশন ও সাংবিধানিক বিধানের আওতায় যারা যোগ্য, তারা নির্বাচনে অংশ নিলেই সেটিকে অংশগ্রহণমূলক বলা যায়। এই দৃষ্টিভঙ্গিতে আওয়ামী লীগকে বাদ পড়া কোনো ব্যতিক্রমী বা সমস্যাজনক ঘটনা নয়, কারণ দলটি বর্তমানে আইনি যোগ্যতার মধ্যে নেই।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ আরও এক ধাপ এগিয়ে গিয়ে বলেন, আওয়ামী লীগ আদৌ একটি রাজনৈতিক দল হিসেবে নিজেদের অবস্থান ধরে রাখতে পারেনি। তার মতে, গণ-অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে জনগণ আওয়ামী লীগের রাজনীতিকে প্রত্যাখ্যান করেছে। তাই তার ভাষায় ‘ইনক্লুসিভ ইলেকশন’ মানেই আওয়ামী লীগবিহীন নির্বাচন। তিনি মনে করেন, বর্তমানে নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে নিবন্ধিত সব দল অংশ নিচ্ছে, ফলে নির্বাচন স্বাভাবিকভাবেই অন্তর্ভুক্তিমূলক, গ্রহণযোগ্য ও বিশ্বাসযোগ্য হবে।
কিন্তু এই আত্মবিশ্বাসের বিপরীতে জাতীয় পার্টি ভিন্ন সুরে কথা বলছে। অতীতে আওয়ামী লীগের জোটসঙ্গী হলেও এবার তারা নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে ভিন্ন অবস্থান থেকে। দলটির মহাসচিব শামীম হায়দার পাটোয়ারী আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন, আওয়ামী লীগকে বাইরে রেখে একটি ‘আনকন্ট্রোলড ও আনচেকড’ নির্বাচনের দিকে দেশ এগোচ্ছে। তার মতে, মাঠে ভারসাম্য রক্ষার মতো শক্তি না থাকলে স্থানীয় প্রভাবশালী গোষ্ঠী, মব বা ক্ষমতাধর মহল ভোটের দিন পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নিতে পারে, যা শেষ পর্যন্ত নির্বাচনের বিশ্বাসযোগ্যতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে।
জাতীয় পার্টির যুক্তি আরও গভীর। তাদের মতে, জামায়াতকে নিষিদ্ধ করা যেমন আওয়ামী লীগের জন্য রাজনৈতিক সমাধান আনেনি, তেমনি আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করাও বিএনপি-জামায়াতের জন্য স্থায়ী সমাধান নয়। পাটোয়ারীর ভাষায়, ‘ফুল ডেমোক্রেটিক ট্রানজিশন’-এর জন্য অন্তর্ভুক্তিমূলক ভোট অপরিহার্য। তিনি এই নির্বাচনকে একটি ‘সেমি ডেমোক্রেটিক ট্রানজিশন’ হিসেবে দেখছেন—যেখানে কিছু সমস্যার সমাধান হবে, কিন্তু সব নয়।
এই রাজনৈতিক বিতর্কের পাশাপাশি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি উঠে আসে ভোটার উপস্থিতি নিয়ে। বাংলাদেশের রাজনীতিতে ঐতিহাসিকভাবে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি—এই দুই দলেরই বড় ভোটব্যাংক রয়েছে। আওয়ামী লীগ নির্বাচনে না থাকলেও তাদের সমর্থক ভোটাররা সমাজে রয়ে গেছে। দলটি যদি সংগঠিতভাবে ভোট বর্জনের ডাক দেয়, তাহলে তার প্রভাব পড়বে কি না—এ নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন মূল্যায়ন রয়েছে।
বিএনপি ও জামায়াতের দাবি, আওয়ামী লীগ না থাকলেও ভোটার উপস্থিতিতে বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পড়বে না। নতুন প্রজন্মের ভোটাররা, বিশেষ করে ১৮ থেকে ৩৫ বছর বয়সীরা, দীর্ঘদিন পর মুক্ত পরিবেশে ভোট দেওয়ার সুযোগ পেলে কেন্দ্রে আসবেই—এমনটাই তাদের বিশ্বাস। বিএনপির সালাহউদ্দিন আহমদের মতে, কেউ যদি নিজের ইচ্ছায় ভোট না দিতে চায়, সেটি তার ব্যক্তিগত স্বাধীনতা; কিন্তু সেটি সামগ্রিক ভোটের চিত্রকে বড়ভাবে প্রভাবিত করবে না।
এর বিপরীতে জাতীয় পার্টি সতর্ক করছে, আওয়ামী লীগ যদি পুরোপুরি ভোট বর্জনের পথে যায়, তাহলে অনেক কেন্দ্রে কাস্টিং কৃত্রিমভাবে বাড়ানোর চেষ্টা হতে পারে, যা সহজেই দৃশ্যমান হয়ে উঠবে। প্রায় ৪২ হাজার ভোটকেন্দ্রে এমন অনিয়ম ঢেকে রাখা সম্ভব হবে না বলেই তাদের আশঙ্কা। সেই সঙ্গে তারা মনে করে, আওয়ামী লীগের ভোটারদের কেন্দ্রে আনতে হলে রাজনৈতিক সমঝোতা ও আস্থার পরিবেশ তৈরি করা জরুরি।
নির্বাচনী বিশ্লেষকেরা এখানে একটি নির্দিষ্ট সংখ্যার দিকে আঙুল তুলছেন—ভোটার উপস্থিতি যদি ৫০ শতাংশের নিচে নেমে যায়, তাহলে নির্বাচন গ্রহণযোগ্যতা সংকটে পড়তে পারে। অধ্যাপক আনু মুহাম্মদের মতে, দীর্ঘ সময় পর নির্বাচন হলে ভোটের হার আরও বেশি হওয়ার কথা। তা না হলে সেটি শুধু নির্বাচন কমিশনের নয়, অন্তর্বর্তী সরকারেরও ব্যর্থতা হিসেবে বিবেচিত হবে। তার মতে, নির্বাচন কমিশন কতটা আস্থা তৈরি করতে পারে এবং অন্তর্বর্তী সরকার কতটা নিরপেক্ষ ভূমিকা পালন করে—সেটিই হবে মূল পরীক্ষা।
ভোটার উপস্থিতির প্রশ্নটি শুধু সংখ্যার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এর সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে নিরাপত্তা ও ভোটের পরিবেশ। অতীতের অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, সংখ্যালঘু সম্প্রদায়—জাতিগত ও ধর্মীয় উভয় ক্ষেত্রেই—নির্বাচনের সময় বিশেষ ঝুঁকির মুখে পড়ে। কখনো ভোট দিতে গেলে, কখনো ভোট না দিলে—দুই অবস্থাতেই তাদের মধ্যে আতঙ্ক কাজ করে। এই নির্বাচনেও সেই আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ মনে করেন, শুধু সংখ্যালঘুই নয়, সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটারদের মধ্যেও সহিংসতা ও দাপটের ভয় কাজ করছে। সাম্প্রতিক সময়ে মাজারে হামলা, বাউল সম্প্রদায়ের ওপর আক্রমণের ঘটনা সমাজের বড় একটি অংশকে আতঙ্কিত করছে। যদি ভোটাররা মনে করেন ভোট দিতে গেলে সহিংসতার মুখে পড়তে পারেন, তাহলে তারা কেন্দ্রে যাবেন না—এটাই স্বাভাবিক। ফলে ভোটার উপস্থিতি কমে যাওয়ার ঝুঁকি থেকেই যায়।
সব মিলিয়ে আওয়ামী লীগ ছাড়া অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া এই নির্বাচনকে একদিকে কেউ দেখছেন নতুন সূচনা, অন্যদিকে কেউ দেখছেন অসম্পূর্ণ গণতান্ত্রিক যাত্রা হিসেবে। বিএনপি ও জামায়াতের কাছে এটি জনগণের রায়ের প্রতিফলন ও বৈধ আইনি প্রক্রিয়ার ফল। জাতীয় পার্টি ও বিশ্লেষকদের একাংশের কাছে এটি একটি অন্তর্বর্তী, আংশিক সমাধান—যেখানে বড় রাজনৈতিক শক্তির অনুপস্থিতি ভবিষ্যতের জন্য প্রশ্ন রেখে যাচ্ছে।
এই নির্বাচন শেষ পর্যন্ত ইতিহাসে কীভাবে মূল্যায়িত হবে, তা নির্ভর করবে কয়েকটি বিষয়ের ওপর—ভোটার উপস্থিতি, নিরাপত্তা পরিস্থিতি, প্রশাসনের নিরপেক্ষতা এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণভাবে সাধারণ মানুষের আস্থা। আওয়ামী লীগ ছাড়া একটি নির্বাচন হয়তো আইনগতভাবে সম্ভব, কিন্তু সেটি রাজনৈতিকভাবে কতটা অন্তর্ভুক্তিমূলক—সেই প্রশ্নের উত্তর এখনো পুরোপুরি মেলেনি। হয়তো এই নির্বাচনই ঠিক করে দেবে, বাংলাদেশ গণতন্ত্রের পথে এগোচ্ছে নতুন কোনো রাস্তায়, নাকি পুরোনো বিতর্কেরই পুনরাবৃত্তি ঘটছে নতুন
আপনার মতামত জানানঃ