স্কটল্যান্ডে আবিষ্কৃত প্রায় ৩৭ কোটি বছর পুরোনো একটি জীবাশ্ম নিয়ে বিজ্ঞানীদের সাম্প্রতিক ঘোষণা যেন পৃথিবীর জীবনের ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায় খুলে দিয়েছে। প্রথম দেখায় এটি ছিল বিশাল এক গাছের কাণ্ডের মতো—পাতাহীন, ডালপালাহীন, সোজা আকাশমুখী দাঁড়িয়ে থাকা এক অদ্ভুত কাঠামো। উচ্চতায় প্রায় ২৬ ফুট, যা সেই সময়ের অন্য সব স্থলজ উদ্ভিদ ও প্রাণীর তুলনায় ছিল রীতিমতো দানবীয়। দীর্ঘদিন ধরে একে ছত্রাক বলে ধরে নেওয়া হলেও, নতুন গবেষণা বলছে—এটি ছত্রাকও নয়, উদ্ভিদও নয়। এটি ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন এক ধরনের জীবন, যা আজ পৃথিবীতে আর নেই।
এই রহস্যময় জীবের নাম প্রোটোট্যাক্সাইটিস (Prototaxites)। প্রায় দেড় শতাব্দীর বেশি সময় ধরে এটি বিজ্ঞানীদের কৌতূহল আর বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে আছে। ১৮৪৩ সালে প্রথম এর জীবাশ্ম সংগ্রহ করা হলেও, ১৪ বছর পর কানাডীয় বিজ্ঞানী জে ডব্লিউ ডসন এটিকে আংশিক পচে যাওয়া বিশাল কনিফার গাছের অবশেষ বলে মনে করেছিলেন। এরপর বহু গবেষক একে কখনো ছত্রাক, কখনো লাইকেনজাতীয় কোনো জীব বলে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করেছেন। কিন্তু কোন ব্যাখ্যাই পুরোপুরি সন্তোষজনক ছিল না।
সাম্প্রতিক এই গবেষণায় যুক্ত ছিলেন University of Edinburgh এবং National Museums Scotland-এর বিজ্ঞানীরা। তারা স্কটল্যান্ডের Rhynie এলাকার বিখ্যাত রাইনি চার্ট নামের এক বিশেষ ধরনের অবসাদী শিলায় সংরক্ষিত ৪০৭ মিলিয়ন বছর পুরোনো জীবাশ্মের অণু-রাসায়নিক গঠন বিশ্লেষণ করেন। এই চার্টে এমনভাবে জীবাশ্ম সংরক্ষিত হয়েছে যে, কোটি কোটি বছর পরও জীবের ভেতরের সূক্ষ্ম গঠন ও রাসায়নিক চিহ্ন শনাক্ত করা সম্ভব।
গবেষণার প্রধান সহলেখক স্যান্ডি হেদারিংটন বলেন, “এগুলো নিঃসন্দেহে জীবন ছিল, কিন্তু আমরা আজ যে জীবনকে চিনি, তার সঙ্গে এদের মিল নেই। এদের গঠন ও রাসায়নিক বৈশিষ্ট্য উদ্ভিদ বা ছত্রাক—কোনোটির সঙ্গেই মেলে না। তাই আমরা মনে করি, এটি জীবনের এক সম্পূর্ণ বিলুপ্ত শাখার প্রতিনিধি।” এই বক্তব্য আসলে পুরো গবেষণার সারকথা। প্রোটোট্যাক্সাইটিস ছিল ইউক্যারিওটিক জীব, অর্থাৎ যাদের কোষে নিউক্লিয়াস থাকে, কিন্তু তারা উদ্ভিদ, প্রাণী বা ছত্রাক—এই পরিচিত কোনো রাজ্যেই পড়ে না।
আগের গবেষণাগুলোতেই কিছু অস্বস্তিকর প্রশ্ন উঠে এসেছিল। যদি এটি উদ্ভিদ হতো, তাহলে কেন এর দেহে ফটোসিনথেসিসের স্পষ্ট চিহ্ন নেই? উদ্ভিদ তো সূর্যালোক ব্যবহার করে নিজের খাদ্য তৈরি করে। আবার যদি এটি ছত্রাক হতো, তাহলে এর বিশাল আকার টিকিয়ে রাখার জন্য প্রয়োজনীয় ভূগর্ভস্থ মাইসেলিয়াল নেটওয়ার্ক—অর্থাৎ ছত্রাকের সেই বিস্তৃত ‘মূল’—কোথায়? প্রোটোট্যাক্সাইটিসের জীবাশ্মে এমন কোনো কাঠামোর প্রমাণ পাওয়া যায়নি। লাইকেন হলে তো তাকে শৈবালের সঙ্গে সহাবস্থানে থাকতে হতো, সেটারও কোনো প্রমাণ নেই।
নতুন গবেষণায় রাসায়নিক বিশ্লেষণ দেখিয়েছে, এই জীবের দেহে থাকা জৈব যৌগগুলো সেই সময়কার পরিচিত ছত্রাক বা উদ্ভিদের সঙ্গে মেলে না। এর কোষপ্রাচীর, অভ্যন্তরীণ স্তরবিন্যাস এবং কার্বনের উৎস—সবকিছুই আলাদা। তাই গবেষকেরা সিদ্ধান্তে পৌঁছান যে, প্রোটোট্যাক্সাইটিসকে সবচেয়ে ভালোভাবে ব্যাখ্যা করা যায় “সম্পূর্ণ বিলুপ্ত এক ইউক্যারিওটিক জীবনধারা” হিসেবে।
এই সিদ্ধান্তের গুরুত্ব শুধু একটি জীবের শ্রেণিবিন্যাস ঠিক করার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এটি আমাদের শেখায়, পৃথিবীতে জীবন বিবর্তনের পথে একাধিক “পরীক্ষা” চালিয়েছে। আজ আমরা যে উদ্ভিদ, প্রাণী আর ছত্রাক দেখি, তারা সেই পরীক্ষাগুলোর মধ্যে টিকে যাওয়া কয়েকটি পথের ফল। প্রোটোট্যাক্সাইটিস ছিল আরেকটি পথ—যেটি বিশাল আকার ধারণ করেছিল, স্থলভাগে রাজত্ব করেছিল, কিন্তু শেষ পর্যন্ত বিলুপ্ত হয়ে গেছে। ইউনিভার্সিটি অব এডিনবরার গবেষক লরা কুপার বলেন, “এটি ছিল বড়, জটিল জীব গঠনের এক স্বাধীন প্রচেষ্টা। আমরা শুধু অসাধারণভাবে সংরক্ষিত জীবাশ্মের কারণেই আজ এর কথা জানতে পারছি।”
সময়টা ছিল লেট সিলুরিয়ান থেকে লেট ডেভোনিয়ান যুগ—প্রায় ৪২০ থেকে ৩৭০ মিলিয়ন বছর আগে। এই সময়েই পৃথিবীর স্থলভাগ নাটকীয়ভাবে বদলাতে শুরু করে। আগে যেখানে মূলত শৈবাল আর অণুজীবের আধিপত্য ছিল, সেখানে ধীরে ধীরে গাছপালা, আর্থ্রোপড ও অন্যান্য প্রাণী স্থলভাগে ছড়িয়ে পড়তে শুরু করে। মাটি তৈরি হচ্ছিল, বায়ুমণ্ডলে অক্সিজেনের মাত্রা বাড়ছিল। ঠিক এই রূপান্তরের মুহূর্তে প্রোটোট্যাক্সাইটিস ছিল স্থলভাগের সবচেয়ে বড় জীব। ছোট ছোট উদ্ভিদ আর প্রাথমিক প্রাণীদের ওপর এটি যেন এক বিশাল ছায়া ফেলে দাঁড়িয়ে থাকত।
কল্পনা করা যায়, সেই আদিম পৃথিবীর দৃশ্যপট কেমন ছিল। চারদিকে নিচু উদ্ভিদ, জলাভূমি আর কাদামাটির মধ্যে হঠাৎ হঠাৎ মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে ২০-২৬ ফুট লম্বা প্রোটোট্যাক্সাইটিসের স্তম্ভ। কোনো পাতা নেই, কোনো ফুল নেই, কিন্তু বিশাল এক উপস্থিতি। কীভাবে তারা শক্তি পেত, কী খেত, কীভাবে বংশবিস্তার করত—এসব প্রশ্নের অনেকটাই এখনো অজানা। তবে এটুকু পরিষ্কার, তারা প্রচলিত ফটোসিনথেসিস বা পরিচিত ছত্রাকীয় পদ্ধতির ওপর নির্ভর করত না।
এই গবেষণা আবারও মনে করিয়ে দেয়, জীবনের ইতিহাস কতটা বৈচিত্র্যময় এবং কতটা অনিশ্চিত। আমরা প্রায়ই ধরে নিই, বর্তমান জীববৈচিত্র্যই যেন বিবর্তনের চূড়ান্ত ফল। কিন্তু বাস্তবে, অগণিত জীবনরূপ এসেছে ও হারিয়ে গেছে, যাদের কোনো উত্তরসূরি আজ নেই। প্রোটোট্যাক্সাইটিস তাদেরই একজন—এক সময়ের স্থলভাগের দানব, আজ কেবল পাথরের ভেতর বন্দী এক স্মৃতি।
স্কটল্যান্ডের রাইনি চার্টের মতো জায়গাগুলো তাই শুধু ভূতাত্ত্বিক কৌতূহলের বিষয় নয়, বরং জীবনের বিকল্প ইতিহাসের জানালা। এখানকার জীবাশ্ম আমাদের দেখায়, জীবন কীভাবে নানা পথে এগোতে পারত। হয়তো যদি পরিবেশগত চাপ, জলবায়ু পরিবর্তন বা প্রতিযোগিতার ফল ভিন্ন হতো, তাহলে আজ পৃথিবীর বনভূমিতে আমরা গাছের বদলে প্রোটোট্যাক্সাইটিসের মতো স্তম্ভ দাঁড়িয়ে থাকতে দেখতাম।
শেষ পর্যন্ত এই আবিষ্কার আমাদের একধরনের বিনয় শেখায়। আমরা যে জীবনকে “স্বাভাবিক” বলে জানি, তা আসলে অসংখ্য সম্ভাবনার মধ্য থেকে টিকে যাওয়া একমাত্র পথ নয়। প্রোটোট্যাক্সাইটিস প্রমাণ করে, প্রকৃতি পরীক্ষা করতে ভালোবাসে—কখনো সফল হয়, কখনো ব্যর্থ। আর সেই ব্যর্থ পরীক্ষাগুলোর গল্পই আজ কোটি কোটি বছর পর বিজ্ঞানীদের নতুন করে ভাবতে শেখাচ্ছে, জীবন আসলে কতটা বিস্ময়কর ও অপ্রত্যাশিত হতে পারে।
আপনার মতামত জানানঃ