বাংলাদেশের সাম্প্রতিক ইতিহাসে হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর সহিংসতা, হত্যাকাণ্ড ও নিপীড়নের ঘটনাগুলো বিচ্ছিন্ন নয়; বরং রাজনৈতিক পরিবর্তন, সামাজিক উত্তেজনা, ভূমি ও সম্পত্তি বিরোধ, অপরাধ জগতের সংঘাত, ধর্মীয় উসকানি এবং আইনের শাসনের দুর্বলতার সঙ্গে জড়িয়ে থাকা একটি ধারাবাহিক বাস্তবতা। প্রতিটি ঘটনার পেছনে আলাদা আলাদা প্রেক্ষাপট থাকলেও সামগ্রিকভাবে এগুলো একটি ভয়ের পরিবেশ, নিরাপত্তাহীনতা এবং অনিশ্চয়তার ছবি তুলে ধরে, যা শুধু হিন্দু সম্প্রদায়ের জন্য নয়, রাষ্ট্রের সামাজিক সংহতির জন্যও বড় চ্যালেঞ্জ।
সাম্প্রতিক সময়ে যশোরের মনিরামপুরে রানা প্রতাপ বৈরাগী নামের এক হিন্দু ব্যবসায়ীকে প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যার ঘটনা আবারও সেই পুরোনো প্রশ্ন সামনে এনেছে—বাংলাদেশে হিন্দুরা কি নিরাপদ। নিহত ব্যক্তি পেশায় ব্যবসায়ী ছিলেন, স্থানীয়ভাবে একটি বরফকল ও মাছের আড়তের মালিক। একই সঙ্গে তিনি একটি স্থানীয় পত্রিকার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন বলেও জানা যায়। পুলিশ জানিয়েছে, তার বিরুদ্ধে অতীতে একাধিক গুরুতর মামলার রেকর্ড ছিল। এই তথ্য হত্যার কারণ নির্ধারণে জটিলতা তৈরি করলেও ঘটনাটি যে প্রকাশ্যে সংঘটিত হয়েছে এবং নিহত ব্যক্তি হিন্দু সম্প্রদায়ের সদস্য—এই বাস্তবতা সামাজিক আলোচনায় নতুন করে ধর্মীয় নিরাপত্তার প্রসঙ্গ টেনে এনেছে।
এই ঘটনা একা নয়। স্বাধীনতার পর থেকে বিভিন্ন সময়ে বাংলাদেশে হিন্দুদের হত্যা ও সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে নানান কারণে। কখনো রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সময়, কখনো নির্বাচনী সহিংসতায়, কখনো জমি দখল বা সম্পত্তি বিরোধে, আবার কখনো ধর্মীয় গুজব বা উসকানিকে কেন্দ্র করে এসব ঘটনা ঘটেছে। অনেক ক্ষেত্রে নিহত ব্যক্তির রাজনৈতিক পরিচয়, পেশাগত অবস্থান বা অতীত অপরাধের ইতিহাস সামনে আনা হয়, যা তদন্ত ও বিচারকে জটিল করে তোলে। কিন্তু নিহতের ধর্মীয় পরিচয় এবং সংখ্যালঘু বাস্তবতা ঘটনাগুলোকে আলাদা গুরুত্ব দেয়।
১৯৯০-এর দশক থেকে শুরু করে পরবর্তী সময়গুলোতে নির্বাচনকে কেন্দ্র করে হিন্দুদের ওপর সহিংসতার অভিযোগ বারবার উঠেছে। বিশেষ করে ২০০১ সালের জাতীয় নির্বাচনের পর দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর হামলা, ধর্ষণ, লুটপাট ও হত্যার ঘটনা দেশি-বিদেশি গণমাধ্যমে আলোচিত হয়। সে সময় বহু পরিবার দেশ ছাড়তে বাধ্য হয়েছিল বলে মানবাধিকার সংগঠনগুলো জানিয়েছিল। এই সহিংসতার পেছনে রাজনৈতিক প্রতিহিংসা ও ভোটের অঙ্ককে বড় কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।
রাজনৈতিক পালাবদলের সময়ও হিন্দুদের টার্গেট করার অভিযোগ রয়েছে। ক্ষমতার পরিবর্তনের পর পরই কিছু এলাকায় সংখ্যালঘুদের বাড়িঘর ভাঙচুর, মন্দিরে হামলা ও হত্যার খবর পাওয়া গেছে। এসব ঘটনায় অনেক সময় স্থানীয় প্রভাবশালী মহল জড়িত থাকে বলে অভিযোগ ওঠে। রাজনৈতিক ছত্রচ্ছায়া থাকায় অপরাধীরা দীর্ঘদিন ধরেই ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যায়—এমন অভিযোগ নতুন নয়।
ভূমি ও সম্পত্তি বিরোধ বাংলাদেশের হিন্দু হত্যাকাণ্ডের আরেকটি বড় কারণ। বহু ক্ষেত্রে দেখা গেছে, সংখ্যালঘু পরিবারের জমি দখল করতে পরিকল্পিতভাবে তাদের ওপর হামলা চালানো হয়েছে। কখনো মামলা, কখনো মিথ্যা অভিযোগ, আবার কখনো সরাসরি সহিংসতার মাধ্যমে পরিবারগুলোকে এলাকা ছাড়তে বাধ্য করা হয়েছে। এসব ঘটনায় হত্যা ঘটলেও সেগুলোকে অনেক সময় ‘ব্যক্তিগত বিরোধ’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়, ফলে ধর্মীয় সংখ্যালঘু নির্যাতনের সামগ্রিক চিত্র আড়ালেই থেকে যায়।
ধর্মীয় গুজব ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে উসকানি থেকেও হিন্দু হত্যার ঘটনা ঘটেছে। ফেসবুকে ধর্ম অবমাননার অভিযোগ তুলে কয়েকটি ঘটনায় হিন্দুদের বাড়িঘর ও মন্দিরে হামলা হয়েছে, প্রাণহানিও ঘটেছে। তদন্তে অনেক সময় দেখা গেছে, ভুয়া আইডি থেকে পোস্ট দিয়ে পরিকল্পিতভাবে উত্তেজনা ছড়ানো হয়েছিল। কিন্তু ক্ষতিগ্রস্ত হয় স্থানীয় হিন্দু সম্প্রদায়। এসব ঘটনায় রাষ্ট্রের দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপ না থাকায় ক্ষোভ ও ভয়ের পরিবেশ আরও গভীর হয়েছে।
অপরাধ জগতের সংঘাতেও হিন্দুদের হত্যা হয়েছে, যেমন চাঁদাবাজি, মাদক ব্যবসা বা সন্ত্রাসী দ্বন্দ্বের জেরে। এসব ঘটনায় নিহত ব্যক্তি হিন্দু হলেও পুলিশ প্রাথমিকভাবে ঘটনাকে অপরাধী চক্রের অভ্যন্তরীণ সংঘাত হিসেবে তুলে ধরে। এতে করে বৃহত্তর সামাজিক প্রেক্ষাপটে সংখ্যালঘু নিরাপত্তার প্রশ্ন চাপা পড়ে যায়। কিন্তু বাস্তবতা হলো, অপরাধী চক্রে জড়িত না থাকলেও অনেক হিন্দু ব্যবসায়ী চাঁদাবাজি ও হুমকির শিকার হন এবং প্রতিরোধ করতে গিয়ে প্রাণ হারান।
আইনের শাসনের দুর্বলতা ও বিচারহীনতার সংস্কৃতি এই সব ঘটনার একটি সাধারণ পটভূমি। বহু হত্যাকাণ্ডের তদন্ত দীর্ঘসূত্রতায় পড়ে থাকে, সাক্ষী পাওয়া যায় না, কিংবা প্রভাবশালীদের চাপে মামলা দুর্বল হয়ে যায়। ফলে ভুক্তভোগী পরিবার ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হয়। এই বিচারহীনতাই পরবর্তী সহিংসতার জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরি করে।
রাষ্ট্রীয়ভাবে সংখ্যালঘু সুরক্ষার প্রতিশ্রুতি বারবার দেওয়া হলেও বাস্তবে তার প্রতিফলন প্রশ্নবিদ্ধ। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী অনেক ঘটনায় দ্রুত ব্যবস্থা নিলেও দীর্ঘমেয়াদে নিরাপত্তা নিশ্চিত করার কৌশল দেখা যায় না। স্থানীয় প্রশাসনের নিষ্ক্রিয়তা কিংবা রাজনৈতিক প্রভাবও বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়।
হিন্দু হত্যার ঘটনাগুলো আন্তর্জাতিক পর্যায়েও বাংলাদেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ করেছে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা ও বিদেশি সরকার সংখ্যালঘু নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছে। তবে সরকার সাধারণত এসব অভিযোগ অস্বীকার করে বলে এসেছে বা ঘটনাগুলোকে বিচ্ছিন্ন অপরাধ হিসেবে বর্ণনা করেছে। এই অবস্থান অভ্যন্তরীণ আস্থার সংকটও বাড়িয়েছে।
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, এসব হত্যাকাণ্ডের পেছনে দায় কার। একে শুধু আইনশৃঙ্খলার সমস্যা হিসেবে দেখলে পুরো চিত্র ধরা পড়ে না। সামাজিক অসহিষ্ণুতা, রাজনৈতিক মেরুকরণ, ধর্মীয় পরিচয়কে ব্যবহার করে ফায়দা লোটার প্রবণতা এবং রাষ্ট্রীয় জবাবদিহির ঘাটতি—সব মিলেই এই সহিংস বাস্তবতা তৈরি করেছে। হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষরা নিজেদের নাগরিক অধিকার নিয়ে যেমন উদ্বিগ্ন, তেমনি ভবিষ্যৎ নিয়েও শঙ্কিত।
বাংলাদেশের সংবিধান ধর্মনিরপেক্ষতার কথা বললেও বাস্তবে সেই চর্চা কতটা হচ্ছে, তা নিয়েই প্রশ্ন বাড়ছে। হিন্দু হত্যার প্রতিটি ঘটনা শুধু একটি প্রাণহানি নয়; এটি রাষ্ট্র ও সমাজের জন্য একটি ব্যর্থতার চিহ্ন। এসব ঘটনা মোকাবিলায় কেবল তদন্ত ও বিচার নয়, প্রয়োজন রাজনৈতিক সদিচ্ছা, সামাজিক সচেতনতা এবং সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তাকে অগ্রাধিকার দেওয়ার বাস্তব উদ্যোগ।
যশোরের মনিরামপুরে ঘটে যাওয়া সাম্প্রতিক হত্যাকাণ্ড হোক বা অতীতের বড় সহিংস ঘটনাগুলো—সব মিলিয়ে একটি বিষয় স্পষ্ট, বাংলাদেশে হিন্দুদের হত্যা বিভিন্ন কারণে ঘটলেও তার প্রভাব একই রকম গভীর। এটি ভয় সৃষ্টি করে, দেশত্যাগে উৎসাহ দেয় এবং সমাজকে আরও বিভক্ত করে। এই বাস্তবতা থেকে বেরিয়ে আসতে হলে প্রতিটি হত্যাকাণ্ডকে তার যথাযথ প্রেক্ষাপটে বিচার করতে হবে, দায়ীদের শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে এবং সংখ্যালঘু নাগরিকদের নিরাপত্তা ও মর্যাদা রক্ষাকে রাষ্ট্রের অগ্রাধিকার তালিকায় বাস্তবভাবে স্থান দিতে হবে। তবেই বাংলাদেশ তার বহুত্ববাদী পরিচয় ও সামাজিক সংহতি টিকিয়ে রাখার পথে এগোতে পারবে।
আপনার মতামত জানানঃ