Trial Run

বিক্ষোভ মিছিলে দায়িত্ব পালনকালে সাংবাদিকদের মারছে আ’লীগ নেতাকর্মীরা  

ছবি: নিউজবাংলা২৪

কর্তব্য পালন করতে গিয়ে বেধড়ক মার খাচ্ছেন সাংবাদিকেরা। জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমে সংঘর্ষ ও পাল্টাপাল্টি ধাওয়ার ঘটনার সময় সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে হামলার শিকার হয়েছেন সাংবাদিক ও ফটোসাংবাদিকেরা। কারও কারও মুঠোফোন ও ক্যামেরাও কেড়ে নেওয়া হয়। রাজধানীর বায়তুল মোকাররম এলাকায় পাল্টাপাল্টি সংঘর্ষের ঘটনায় পেশাগত দায়িত্ব পালনকালে অন্তত ১৫ জন সাংবাদিক আহত হয়েছেন। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী সংগঠনের নেতা-কর্মীরা এ হামলা চালায় বলে অভিযোগ উঠেছে।

আহত সাংবাদিকদের অভিযোগ, ‘মারধরের ছবি তুলতে গেলেই আমাদের মারছেন সরকার দলের সমর্থকরা। সংঘর্ষে মারধরের ছবি তোলাই কাল হচ্ছে।’

বায়তুল মোকাররমে মারধরের শিকার হয়েছেন দৈনিক প্রথম আলোর ফটো সাংবাদিক হাসান রাজা। তিনি বলেন, ‘আমরা বায়তুল মোকাররমের গেটের পাশ থেকে ছবি তুলছিলাম। সে সময় আমাদের কিছু সহকর্মীকে মারধর করা হচ্ছিল। সেই ছবি তুলতে গেলে আমাকেও মারছে। আমাদের প্রথম আলোর ফটোসাংবাদিক আশরাফুল আলমও আহত হয়েছেন।’

সংঘর্ষের খবর সংগ্রহ করতে গিয়ে ইটের আঘাতে আহত হয়েছেন একাত্তর টেলিভিশনের সাংবাদিক ইশতিয়াক ইমন। তার মাথা ফেটে গেছে। পাঁচটি সেলাই দিতে হয়েছে। রাজধানীর স্কয়ার হাসপাতালে তার চিকিৎসা দেয়া হয়েছে।

এ ছাড়া বায়তুল মোকাররমে পুলিশের ছড়রা গুলিতে আহত হয়েছেন বাংলা ভিশনের সাংবাদিক দীপন দেওয়ান, বাংলা নিউজের শেখ জাহাঙ্গীর আলম ও মেরাজ মাহাবুব।

আহত সাংবাদিকেরা জাতীয় এক দৈনিককে জানান, সংঘর্ষের সময় বিক্ষোভকারীরা মসজিদের ভেতর ও আঙিনায় অবস্থান করেন আর যুবলীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগ ও ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীরা মসজিদের বাইরে থেকে ঢিল ছুঁড়ছিলেন। ঘটনার ছবি তুলতে তারা যখন ক্যামেরা বের করেছেন, তখনই ‘এই ছবি তুলবি না’ বলে নেতা-কর্মীরা তাদের পিটিয়েছেন। সবচেয়ে বেশি হামলার ঘটনা ঘটেছে বায়তুল মোকাররমের দক্ষিণ গেট এলাকায়। এ দিকে কয়েক হাজার সরকারদলীয় নেতা-কর্মী অবস্থান করছিলেন।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, প্রথম আলোর ফটোসাংবাদিক হাসান রাজাকে পিস্তলের বাঁট দিয়ে আঘাত করা হয়। দেশ রূপান্তর-এর ফটোসাংবাদিক রুবেল রশীদের ক্যামেরা এবং প্রথম আলোর ফটোসাংবাদিক শুভ্র কান্তি দাসের মোবাইল কেড়ে নেওয়া হয়। এ ছাড়া ক্যামেরা নিয়ে ছবি ও ভিডিও মুছে ফেলার অভিযোগ করেছেন অনেকে।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, বায়তুল মোকাররম এলাকায় রাখা মোটরসাইকেলগুলোর হেলমেটও নিয়ে নেন যুবলীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগ ও ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীরা। এগুলো পরে তারা হামলা ও সংঘর্ষে অংশ নেন। এই হেলমেটগুলো তারা পরে ফেরতও দেননি।

পল্টন থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আবু বক্কর সিদ্দিক বলেন, সংঘর্ষের ঘটনায় এখনো কোনো মামলা হয়নি কিংবা কাউকে আটকও করা হয়নি। কয়েকজন পুলিশ সদস্যও আহত হয়েছেন। কিন্তু, কতজন তা এখনই বলা যাচ্ছে না।

ঢাকা মহানগর পুলিশের মতিঝিল বিভাগের উপকমিশনার সৈয়দ নুরুল ইসলাম ঘটনার পর সাংবাদিকদের বলেছেন, ভারতের প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশে রাষ্ট্রীয় অতিথি হিসেবে এসেছেন। সুতরাং আজকে যাতে বিব্রতকর পরিস্থিতি সৃষ্টি না হয়, সে জন্য নিরাপত্তাবেষ্টনী ছিল। ভেতরে নামাজ শেষ হলে যখন কিছু মুসল্লি জুতা-স্যান্ডেল দেখিয়ে মিছিল শুরু করেন, তখন অন্য মুসল্লিরা বাধা দেন।

তিনি আরও বলেন, তখন দুই ধরনের মুসল্লিদের মধ্যে সাংঘর্ষিক অবস্থার সৃষ্টি হয়। একটা পর্যায়ে যারা জুতা-স্যান্ডেল দেখিয়েছেন, তারা মসজিদের ভেতরে অবস্থান নিয়ে ইটপাটকেল ছুড়তে থাকেন। অন্য মুসল্লিরা ইটপাটকেলের আঘাতে আহত হন, ছত্রভঙ্গ হয়ে চলে যান। পুলিশের ওপরও তারা চড়াও হন। আইনশৃঙ্খলার অবনতি যাতে না হয়, এ জন্য রাবার বুলেট, টিয়ার শেল ছুড়ে পরিস্থিতি আনার চেষ্টা করা হয়।

বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকী ও স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উদযাপন উপলক্ষে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সফরের বিরোধিতাকারীদের সঙ্গে সংঘর্ষে শুক্রবার জুম্মার নামাজের পর রণক্ষেত্রে পরিণত হয় বায়তুল মোকাররম ও আশপাশের এলাকা।

যে কোনো ধরনের সংঘাত এড়াতে জুমার নামাজের আগে থেকেই বায়তুল মোকাররমের চারপাশসহ মতিঝিল ও গুলিস্তান এলাকায় অবস্থান নিয়েছিলেন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা।

মোদির সফরবিরোধী ধর্মভিত্তিক দলগুলো এক পাশে এবং অপর পাশে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের অঙ্গসংগঠন ছাত্রলীগ, যুবলীগ ও স্বেচ্ছাসেবক লীগের নেতা-কর্মীরা ছিলেন। নামাজ শেষে দুই পক্ষ সংঘর্ষে জড়ায়। প্রায় সাড়ে ৪ ঘণ্টা ধরে বায়তুল মোকাররমের উত্তর ও দক্ষিণ গেটে এই সংঘর্ষ চলে।

এ সময় আরও আহত হয়েছেন দেশ রূপান্তরের রুবের রশিদ, বিডিনিউজের অভি, বণিক বার্তার পলাশ শিকদার, ডেউলি সানের রিয়াদ সুমন, ডেউলি স্টারের এমরান হোসেন, ফজলুল শেখ বাবুসহ অন্তত ১৫ জন সাংবাদিক।

এর আগে বৃহস্পতিবারও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে মারধরের ছবি সংগ্রহ করতে গেলে ছাত্রলীগ নেতা-কর্মীদের হামলায় দুই সাংবাদিক গুরুতর আহত হন। তারা হলেন বাংলা ট্রিবিউনের বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিবেদক আবিদ হাসান রাসেল ও প্রথম আলোর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিবেদক আসিফ হাওলাদার।

এর আগে ২৩মার্চ স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীতে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর বাংলাদেশে আগমনের প্রতিবাদে প্রগতিশীল ছাত্রজোটের বিক্ষোভ ও কুশপুত্তলিকা দাহ কর্মসূচিতে ছাত্রলীগের হামলায় দৈনিক মানব জমিনের জীবন আহমেদ এবং দৈনিক দেশ রূপান্তরের রুবেল রাশিদ আহত হয়েছেন।

সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, দিন দিন আরও বেপরোয়া হয়ে উঠছে আওয়ামী লীগের ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠন ছাত্রলীগ, যুবলীগ, স্বেচ্ছাসেবকলীগ। বিতর্ক যেন কিছুতেই পিছু ছাড়ছে না। অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের পাশাপাশি ভিন্নমতের ছাত্র সংগঠন ও শিক্ষার্থীদের সঙ্গেও দ্বন্দ্ব ও সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ছে তারা। ছাত্রলীগ নেতাদের বেওপরোয়া হয়ে ওঠার কারণেই সাংবাদিক থেকে শুরু করে রাষ্ট্রের কেউ তাদের হাত থেকে রেহাই পাচ্ছে না। দলীয় প্রভাব খাটিয়েই  ছাত্রলীগ নেতারা এ ধরনের কার্যক্রম চালিয়ে আসছে। সরকার দলীয় বিধায় তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলতে কেউ সাহস করে না। এমনকি  প্রশাসনও কোনো ভূমিকা নিতে পারে না। এসবের শাস্তি নিরূপণ নয়, দৃষ্টান্তমূলক শাস্তিও দাবি করেন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা।

বিশেষজ্ঞরা বলেন, বিগত কয়েক দশকে বাংলাদেশে সাংবাদিকদের ওপর নির্যাতন, হয়রানি ও আক্রমণের বেড়ে যাওয়ায় পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন এ পেশার অনেকেই। আইনের দীর্ঘসূত্রিতা, জটিল বিচারিক প্রক্রিয়া সেইসঙ্গে রাষ্ট্র ও প্রতিষ্ঠান পক্ষ থেকে কোন ধরণের সহযোগিতা না থাকার কারণে সাংবাদিক নির্যাতন ও সহিংসতা থামানো যাচ্ছেনা। সাংবাদিকদের স্বার্থ রক্ষায় সক্রিয় কোন প্ল্যাটফর্ম না থাকায় এই পেশা দিন দিন ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে বলেও মন্তব্য করেন তারা।

তারা বলেন, “সাংবাদিকরা নির্যাতনের শিকার হলেও সেগুলো আদালতে নিতে চান না। কেননা মামলা করতে গেলে প্রতিষ্ঠান থেকে যে সাপোর্ট লাগে বা অর্থনৈতিকভাবে যে সাপোর্ট লাগে, সেটা তাদের সবার থাকেনা। এ অবস্থায় বিচার নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে যায়। বাংলাদেশের সংবিধানে মত প্রকাশের স্বাধীনতার কথা বলা হলেও রাষ্ট্রীয় সামাজিকভাবে সেই স্বাধীনতা নিশ্চিত করা যায়নি বলে জানান তারা।

এসডব্লিউ/এমএন/কেএইচ/২০৩১ 


State watch সকল পাঠকদের জন্য উন্মুক্ত সংবাদ মাধ্যম, যেটি পাঠকদের অর্থায়নে পরিচালিত হয়। যে কোন পরিমাণের সহযোগীতা, সেটি ছোট বা বড় হোক, আপনাদের প্রতিটি সহযোগীতা আমাদের নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে ভবিষ্যতে বড় অবদান রাখতে পারে। তাই State watch-কে সহযোগীতার অনুরোধ জানাচ্ছি।

ছড়িয়ে দিনঃ
  • 38
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    38
    Shares

আপনার মতামত জানানঃ