Trial Run

কাতার বিশ্বকাপ প্রস্তুতিতে ১ হাজার ১৮ বাংলাদেশি শ্রমিকের মৃত্যু

ছবি: সংগৃহীত

দশ বছর আগে সিদ্ধান্ত হয় ২০২২ সালের ফুটবল বিশ্বকাপের আয়োজক হবে তেল সমৃদ্ধ দেশ কাতার। সেই থেকেই চলছে আলোচনা। একে তো দেশটি বিশ্বকাপ আয়োজনের দায়িত্বটা বৈধ উপায়ে পায়নি বলে ইতিমধ্যেই প্রমাণ মিলেছে। ওদিকে দেশটি প্রবাসী শ্রমিকদের সঙ্গে মানবাধিকার লঙ্ঘন করা হচ্ছে বলে বহু দিন ধরেই অভিযোগ করে আসছে বিভিন্ন সংগঠন। এ নিয়ে বিশেষ এক প্রতিবেদন ছাপিয়েছে ইংলিশ পত্রিকা গার্ডিয়ান। তাদের বিশেষ প্রতিবেদনে উঠে এসেছে চমকে দেওয়া এক তথ্য। বিশ্বকাপ আয়োজনের সুযোগ পাওয়ার পর এর প্রস্তুতিতে সেখানে সাড়ে ৬ হাজারের বেশি দক্ষিণ এশিয়ান শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে।

গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, বিশ্বকাপ আয়োজনের গৌরব অর্জনের পর থেকে কাতারে প্রতি সপ্তাহে গড়ে বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান, নেপাল ও শ্রীলঙ্কার ১২ জনের মৃত্যু হয়েছে। পাকিস্তান বাদে ৪টি দেশে গার্ডিয়ানের নির্ভরযোগ্য সূত্র ও দেশগুলোর সরকারি হিসাবই বলছে—২০১১ থেকে ২০২০ পর্যন্ত ৫ হাজার ৯২৭ জন প্রবাসী শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে মৃত বাংলাদেশি শ্রমিকের সংখ্যা ১ হাজার ১৮। কাতারে পাকিস্তানের দূতাবাস থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, এ সময়ে ৮২৪ জন পাকিস্তানি শ্রমিক মারা গেছেন মধ্যপ্রাচ্যের এ দেশে।

গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে শুধু দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর হিসেবই দেয়া হয়েছে। তবে সেখানে ফিলিপাইন ও কেনিয়াসহ বিশ্বের আরো অনেক দরিদ্র দেশ থেকে মানুষ শ্রমিক হিসেবে কাজ করতে যায়। আবার এই হিসেবে গত বছরের শেষ দিকে মৃত্যুর সংখ্যা যুক্ত করা হয়নি।

গার্ডিয়ান জানিয়েছে, ১০ বছর আগে কাতার বিশ্বকাপ ফুটবলের আয়োজক রাষ্ট্র হিসেবে ঘোষিত হয়। এরপর থেকেই দেশটি বিশ্বকাপ আয়োজনের জন্য প্রস্তুতি নিতে শুরু করে। তৈরি হয় অসংখ্য ভবন। সৌন্দর্য্য বৃদ্ধিতেও স্থাপিত হয় নানা স্থাপনা। ফুটবলের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত স্থাপনাও রয়েছে এরমধ্যে। তৈরি হয়েছে ৭টি ফুটবল স্টেডিয়াম। এছাড়া নতুন বিমানবন্দর, রাস্তা, গণ-পরিবহণ, হোটেল ও নতুন একটি শহরও তৈরি করা হয়েছে। সবই বিশ্বকাপকে সামনে রেখে।

ফেয়ার স্কোয়ার প্রজেক্টের পরিচালক নিক ম্যাকগিহান বলেন, কাতারে শ্রমিকরা কোন সেক্টরে কাজ করছেন তা নির্দিষ্ট করে তালিকাভুক্ত করা হয় না। তবে ধারণা করা হচ্ছে, বিশ্বকাপ সম্পর্কিত অবকাঠামো প্রকল্পগুলোতে কাজ করতে গিয়েই এই বিশাল সংখ্যক শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে। তিনি আরো বলেন, ২০১১ সালের পর কাতারে অভিবাসী শ্রমিক মৃত্যুর হার বেড়ে গেছে কারণ দেশটি বিশ্বকাপ আয়োজনের সুযোগ পেয়েছে। গার্ডিয়ানের তথ্য বলছে, ভারতীয়, নেপালি ও বাংলাদেশী শ্রমিকদের মধ্যে ৬৯% মৃত্যুর ঘটনাকে প্রাকৃতিক হিসাবে তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। একক হিসেবে ভারতীয়দের ক্ষেত্রে সেই সংখ্যা ৮০%।

গার্ডিয়ান এর আগে জানিয়েছিল, এই ধরনের তালিকা সাধারণত ময়নাতদন্ত ছাড়াই তৈরি করা হয়, প্রায়শই এই মৃত্যুর অন্তর্নিহিত কারণগুলোর জন্য বৈধ চিকিৎসার ব্যাখ্যা দিতেও ব্যর্থ হয়। ২০১৯ সালে দেখা গেছে যে, কাতারের তীব্র গ্রীষ্মের উত্তাপ অনেক শ্রমিকের মৃত্যুর ক্ষেত্রে একটি উল্লেখযোগ্য কারণ হতে পারে। গার্ডিয়ানের অনুসন্ধানে জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা দ্বারা চালিত গবেষণায় দেখা যায়, বছরে কমপক্ষে চার মাস ধরে কর্মীরা বাইরে কাজ করার সময় প্রচণ্ড তাপ ও চাপের সম্মুখীন হন।

২০১৪ সালে কাতার সরকারের নিজস্ব আইনজীবীদের একটি প্রতিবেদনে সুপারিশ করা হয়েছিল যে, এটি কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট (হার্ট অ্যাটাক) থেকে অভিবাসী শ্রমিকদের মৃত্যুর বিষয়ে একটি গবেষণা কমিশন গঠন করা দরকার এবং আইনটিকে অপ্রত্যাশিত বা আকস্মিক মৃত্যুর ক্ষেত্রে.. ময়নাতদন্তের অনুমতি দেওয়ার জন্য তা সংশোধন করার পরামর্শ দেয়। কিন্তু সরকার কিছুই করেনি।

কাতারের সরকার বলেছে, মৃত্যুর সংখ্যা- যা নিয়ে বিতর্ক করা ঠিক না। কারণ প্রবাসী শ্রমশক্তির আকারের সাথে এটা সমানুপাতিক এবং এই পরিসংখ্যানগুলোতে হোয়াইট-কলার কর্মীরাও (কায়িক শ্রমের কাজে নিযুক্ত নয় এমন) রয়েছেন যারা বহু বছর ধরে কাতারে থাকার পরে স্বাভাবিকভাবে মারা গেছেন।

কাতারি সরকার এক মুখপাত্রের এক বিবৃতিতে বলেছে, এই সম্প্রদায়ের মধ্যে মৃত্যুর হার জনসংখ্যার আকার এবং জনসংখ্যার জন্য প্রত্যাশিত সীমার মধ্যে। যাইহোক, প্রতিটি হারানো জীবন ট্র্যাজেডির এবং আমাদের দেশে প্রতিটা মৃত্যু রোধ করার চেষ্টা করা হচ্ছে। ওই কর্মকর্তা আরও যোগ করেছেন যে, সমস্ত নাগরিক এবং বিদেশী নাগরিকদের বিনামূল্যে প্রথম শ্রেণির স্বাস্থ্যসেবার অ্যাক্সেস রয়েছে এবং শ্রম ব্যবস্থায় স্বাস্থ্য ও সুরক্ষা সংস্কারের কারণে গত এক দশক ধরে অতিথি কর্মীদের মধ্যে মৃত্যুর হার ক্রমাগত হ্রাস পেয়েছে।

স্টেডিয়ামের নির্মাণকাজে জড়িত শ্রমিকদের মৃত্যুর ব্যাপারে গার্ডিয়ান কথা বলেছিল দায়িত্বপ্রাপ্তদের সঙ্গে। তারা বলেছেন, আমরা এসব ঘটনায় গভীরভাবে দুঃখ প্রকাশ করছি এবং সব ক্ষেত্রেই তদন্ত করেছি, যেন এ থেকে শিক্ষা নেওয়া যায়। আমরা এ বিষয়ে বরাবর স্বচ্ছতা বজায় রেখেছি এবং আমাদের প্রকল্পে মৃতের সংখ্যা নিয়ে ভুল যে দাবিগুলো করা হয়েছে, সেগুলোর প্রতিবাদ করেছি।

এ ব্যাপারে বিশ্ব ফুটবলের অভিভাবক সংস্থা ও কাতারকে বিশ্বকাপ আয়োজন করতে দিয়ে সমালোচনার মুখে থাকা ফিফা এ ব্যাপারে জানিয়েছে, বিশ্বজুড়ে যত নির্মাণকাজ হচ্ছে, সে তুলনায় ফিফা বিশ্বকাপের নির্মাণকাজে দুর্ঘটনার হার বেশ কম। কারণ, এখানে খুব গুরুত্বের সঙ্গে স্বাস্থ্যবিধি ও নিরাপত্তার বিষয়টা মানা হয়।

এসডব্লিউ/এমএন/ এফএ/১৯০০

ছড়িয়ে দিনঃ
  • 2
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    2
    Shares

আপনার মতামত জানানঃ