
সকালবেলা শ্রমিকেরা যথারীতি কারখানায় আসছেন। হাজিরা দিচ্ছেন, পোশাক বদলাচ্ছেন, উৎপাদনলাইনের সামনে বসছেন। কিন্তু মেশিন চলছে না। বয়লার গরম হচ্ছে না, ডায়িং ইউনিটে কাপড় ঢুকছে না, স্পিনিং মেশিনের বড় অংশ বন্ধ। কয়েক ঘণ্টা অপেক্ষার পর কাউকে maintenance-এর কাজে লাগানো হচ্ছে, কাউকে বলা হচ্ছে দুপুরেই বাড়ি চলে যেতে।
কাগজে তাঁদের চাকরি এখনো আছে। কিন্তু কাজ নেই, ওভারটাইম নেই, কোনো কোনো ক্ষেত্রে পুরো দিনের আয় নিয়েও অনিশ্চয়তা রয়েছে।
বাংলাদেশের চলমান গ্যাস সংকট এতদিন মূলত উৎপাদন, বিদ্যুৎ ও বিনিয়োগের সমস্যা হিসেবে আলোচিত হয়েছে। সাম্প্রতিক পরিস্থিতি দেখাচ্ছে, সংকটটি এখন সরাসরি শ্রমবাজারের দরজায় পৌঁছেছে। কারখানা সাময়িক বন্ধ হওয়া এখনো সর্বত্র স্থায়ী ছাঁটাইয়ে পরিণত হয়নি; কিন্তু শিফট কমানো, ওভারটাইম বন্ধ, শ্রমিককে ছুটিতে পাঠানো এবং নতুন নিয়োগ স্থগিত হওয়া কর্মসংস্থানে আঘাতের প্রাথমিক পর্যায়।
এই পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে প্রশ্নটি আর “কারখানা কতটা উৎপাদন হারাল”—এখানে সীমাবদ্ধ থাকবে না। প্রশ্ন হবে—কতজন শ্রমিক আয় হারালেন, কতটি পরিবার নতুন করে অনিশ্চয়তায় পড়ল এবং কতটি চাকরি শেষ পর্যন্ত আর ফিরল না।
সংকটটি কতটা বিস্তৃত
বাংলাদেশের দৈনিক গ্যাসের চাহিদা প্রায় ৩৮০ কোটি ঘনফুট। স্বাভাবিক সময়েও সরবরাহ সর্বোচ্চ ২৭০ কোটি ঘনফুটের কাছাকাছি থাকে। অর্থাৎ কোনো বড় দুর্ঘটনা বা সরবরাহ বিঘ্ন না ঘটলেও দৈনিক ঘাটতি প্রায় ১১০ কোটি ঘনফুট।
স্বাভাবিক সরবরাহের প্রায় ১০৫ কোটি ঘনফুট আসে আমদানি করা তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা LNG থেকে। দেশীয় ক্ষেত্রের উৎপাদন কমতে থাকায় এই আমদানিনির্ভরতা দ্রুত বেড়েছে। ফলে মহেশখালীর দুটি ভাসমান LNG টার্মিনালের কোনো একটিতে সমস্যা দেখা দিলে তার প্রভাব কয়েক দিনের মধ্যে সারা দেশের শিল্প, বিদ্যুৎ ও আবাসিক গ্রাহকের ওপর পড়ে।
২১ জুলাই এক্সিলারেট এনার্জির টার্মিনালে অগ্নিকাণ্ডের পর সরবরাহ বড়ভাবে কমে যায়। পরে আংশিক সরবরাহ ফিরলেও বৈরী আবহাওয়া, জাহাজ থেকে LNG খালাসে বাধা এবং মেরামতের কারণে পরিস্থিতি আবার খারাপ হয়। সংকটের একপর্যায়ে জাতীয় সরবরাহ প্রায় ২১৩ কোটি ঘনফুটে নেমে আসে—চাহিদার তুলনায় ঘাটতি দাঁড়ায় প্রায় ১৬৭ কোটি ঘনফুট। প্রথম আলো
জাতীয় গ্রিডে গ্যাস কমলে একই সম্পদের জন্য বিদ্যুৎকেন্দ্র, সার কারখানা, শিল্প, CNG এবং আবাসিক গ্রাহকের মধ্যে প্রতিযোগিতা তৈরি হয়। সরকার বিদ্যুৎ উৎপাদন সচল রাখতে বেশি গ্যাস দিলে শিল্পে চাপ কমে যায়। শিল্পকে অগ্রাধিকার দিলে বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন কমে কারখানাই আবার লোডশেডিংয়ের মুখে পড়ে।
অর্থাৎ শিল্পকারখানা একই সঙ্গে গ্যাস সংকট এবং গ্যাসের কারণে সৃষ্ট বিদ্যুৎ সংকট—দুই দিক থেকেই আক্রান্ত হচ্ছে।
৯০০ মিল বন্ধ—সংখ্যাটি কী বলছে
বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে বলেছেন, সংগঠনটির ১ হাজার ৮০০-এর বেশি সদস্য মিলের মধ্যে ৯০০টির বেশি গ্যাস সরবরাহের সমস্যায় পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে। এটি সরকারি পরিসংখ্যান নয়; শিল্প সংগঠনের দেওয়া তাৎক্ষণিক হিসাব। তারপরও সংকটের ব্যাপ্তি বোঝার জন্য সংখ্যাটি গুরুত্বপূর্ণ।
টেক্সটাইলের পাশাপাশি ইস্পাত, কাগজ, সিরামিক, প্লাস্টিক ও পার্টিকেল বোর্ড শিল্পেও উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। এসব শিল্পের বড় অংশে গ্যাস কেবল বিদ্যুৎ তৈরির জ্বালানি নয়; বয়লার, চুল্লি, ডায়িং ও শুকানোর প্রক্রিয়ায় সরাসরি প্রয়োজন হয়। বিদ্যুতের বিকল্প সংযোগ পেলেও অনেক উৎপাদনপ্রক্রিয়া চালু রাখা যায় না। দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড
নরসিংদীর শিল্পমালিকদের হিসাবে জেলার শতাধিক কারখানা টানা কয়েক দিন বন্ধ ছিল। যেসব প্রতিষ্ঠান কাঠ বা অন্য জ্বালানি ব্যবহার করে কিছু উৎপাদন চালু রেখেছে, তাদের কারও উৎপাদন ৭০ শতাংশ পর্যন্ত কমেছে। প্রায় ৪০০ গ্যাসনির্ভর কারখানায় স্বাভাবিক উৎপাদনের জন্য ১০ থেকে ১৫ PSI চাপ প্রয়োজন হলেও অনেক এলাকায় চাপ প্রায় শূন্যের কাছাকাছি।
আশুলিয়ার একটি wet processing কারখানায় উৎপাদন ৭৫ শতাংশ পর্যন্ত কমে যায়। দৈনিক ৫০ হাজার পোশাক তৈরির সক্ষমতা থাকা প্রতিষ্ঠানটি বিকল্প উৎস থেকে গ্যাস এনে সর্বোচ্চ ২০ হাজার পিস উৎপাদন করতে পেরেছে। বাড়তি গ্যাসের জন্য ঘণ্টায় প্রায় ৩০ হাজার টাকা ব্যয়ের কথাও জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ। একই এলাকার অন্য একটি ডায়িং কারখানার ৯০ টন দৈনিক সক্ষমতার বিপরীতে উৎপাদন দুই টনের নিচে নেমে এসেছে। দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড
ময়মনসিংহে গ্যাসচালিত ৯৯টি শিল্পপ্রতিষ্ঠানের প্রায় সব কটিই সংকটে পড়েছে। অন্তত ২০টি কারখানা দুপুরের মধ্যে শ্রমিকদের বাড়ি পাঠিয়েছে। শিল্প পুলিশের হিসাবে সেখানকার বড় কারখানাগুলোর উৎপাদন গড়ে প্রায় অর্ধেকে নেমেছে। প্রথম আলো
এগুলো বিচ্ছিন্ন কোনো কারখানার সমস্যা নয়। নরসিংদী, নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুর, সাভার, আশুলিয়া, ময়মনসিংহ, মানিকগঞ্জ ও চট্টগ্রামের শিল্পাঞ্চলে একই ধরনের অভিজ্ঞতা তৈরি হয়েছে।
কারখানা বন্ধ মানেই কি চাকরি চলে যাওয়া?
এ মুহূর্তে “৯০০ মিল বন্ধ” আর “৯০০ মিলের সব শ্রমিক চাকরি হারিয়েছেন”—দুটি এক কথা নয়। অনেক প্রতিষ্ঠান উৎপাদন বন্ধ রেখেও শ্রমিকদের বেতন দিচ্ছে। কোথাও শ্রমিকদের ছুটিতে পাঠানো হয়েছে, কোথাও maintenance ও পরিচ্ছন্নতার কাজে রাখা হয়েছে। বড় রপ্তানিমুখী প্রতিষ্ঠানগুলো ক্রেতা ধরে রাখা এবং শ্রমিক অসন্তোষ এড়াতে যত দিন সম্ভব কর্মী ছাঁটাই না করার চেষ্টা করবে।
কিন্তু কর্মসংস্থানে আঘাত শুধু নিয়োগপত্র বাতিল দিয়ে শুরু হয় না।
প্রথমে হারিয়ে যায় ওভারটাইম। বাংলাদেশের পোশাক ও টেক্সটাইল শ্রমিকদের একটি বড় অংশের মাসিক আয় মূল মজুরির পাশাপাশি অতিরিক্ত কাজের ওপর নির্ভরশীল। উৎপাদনলাইন এক শিফটে নেমে এলে শ্রমিক চাকরিতে থেকেও আয় হারান।
দ্বিতীয় পর্যায়ে কমে কর্মদিবস। দৈনিকভিত্তিক, অস্থায়ী, চুক্তিভিত্তিক এবং subcontracting কারখানার শ্রমিকেরা “কাজ নেই, মজুরি নেই” পরিস্থিতির মুখে পড়েন। তাঁদের চাকরি আনুষ্ঠানিকভাবে বাতিল করার প্রয়োজনও হয় না; শুধু আর কাজে ডাকা হয় না।
তৃতীয় পর্যায়ে বন্ধ হয় নতুন নিয়োগ এবং শূন্য পদ পূরণ। কেউ চাকরি ছেড়ে গেলে তাঁর জায়গায় নতুন কাউকে নেওয়া হয় না। ফলে সরকারি ছাঁটাইয়ের পরিসংখ্যানে না এলেও মোট কর্মসংস্থান ধীরে ধীরে সংকুচিত হয়।
চতুর্থ পর্যায়ে শুরু হয় layoff, retrenchment অথবা কারখানা স্থায়ীভাবে বন্ধ। একটি প্রতিষ্ঠান উৎপাদন না করেও কয়েক সপ্তাহ মজুরি, ব্যাংকঋণের কিস্তি, ভাড়া ও অন্যান্য স্থায়ী ব্যয় বহন করতে পারে। কিন্তু সংকট মাসের পর মাস চললে প্রথমে দুর্বল ও ঋণগ্রস্ত প্রতিষ্ঠানগুলো শ্রমিক কমাতে বাধ্য হয়।
তাই বর্তমান পরিস্থিতিকে এখনই “গণছাঁটাই” বলা অতিরঞ্জন হতে পারে; আবার “কেউ চাকরি হারায়নি” বলে স্বস্তি নেওয়াও বিপজ্জনক। আমরা মূলত চাকরি হারানোর আগের সংকেতগুলো দেখতে পাচ্ছি।
সবচেয়ে আগে আঘাত পাবে কারা
বড় রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানের তুলনায় ছোট ও মাঝারি কারখানাগুলো বেশি ঝুঁকিতে। বড় প্রতিষ্ঠান ডিজেল জেনারেটর, CNG, LPG বা অন্য উৎসে বাড়তি খরচ করে জরুরি অর্ডার শেষ করতে পারে। তাদের ব্যাংকঋণ ও নগদ প্রবাহের সুযোগও তুলনামূলক বেশি।
ছোট কারখানার সেই সক্ষমতা নেই। অনেক subcontracting প্রতিষ্ঠান বড় পোশাক কারখানার কাছ থেকে অর্ডার নিয়ে কাজ করে। নির্ধারিত সময়ে পণ্য দিতে না পারলে তারা শুধু একটি চালানের টাকা হারায় না; পরবর্তী অর্ডারটিও হারায়। ফলে গ্যাস ফিরলেও কারখানার কাজ সঙ্গে সঙ্গে ফিরে না-ও আসতে পারে।
সবচেয়ে ঝুঁকিতে থাকবেন অস্থায়ী, শিক্ষানবিশ, দৈনিক মজুরির এবং সাম্প্রতিক সময়ে নিয়োগ পাওয়া শ্রমিকেরা। ছাঁটাই প্রয়োজন হলে প্রতিষ্ঠানগুলো সাধারণত প্রথমে কম সুরক্ষিত কর্মীদের বাদ দেয়।
নারী শ্রমিকদের ঝুঁকিও আলাদা। পোশাকশিল্পে বিপুলসংখ্যক নারী কাজ করেন। আয় কমলে তাঁদের বাসাভাড়া, খাবার, সন্তানের শিক্ষা ও গ্রামে পাঠানো টাকায় সরাসরি প্রভাব পড়ে। আবার অনেক পরিবারে নারীর চাকরি হারানোর পর তাঁকে শ্রমবাজারে ফিরতে না দিয়ে গৃহকাজে স্থায়ীভাবে আটকে দেওয়ার প্রবণতা থাকে।
টেক্সটাইল থামলে পোশাকশিল্পও নিরাপদ নয়
বাংলাদেশের পোশাকশিল্পকে প্রায়ই শুধু সেলাই কারখানা হিসেবে দেখা হয়। বাস্তবে এটি একটি দীর্ঘ উৎপাদন-শৃঙ্খল। তুলা থেকে সুতা, সুতা থেকে কাপড়, ডায়িং, washing, finishing, printing এবং শেষে পোশাক তৈরি—প্রতিটি ধাপ পরবর্তী ধাপের সঙ্গে যুক্ত।
গ্যাসনির্ভর spinning, sizing, dyeing ও finishing মিল বন্ধ হলে সেলাই কারখানা কিছুদিন মজুত কাপড় দিয়ে উৎপাদন চালাতে পারে। কিন্তু মজুত শেষ হলে অথবা নির্দিষ্ট ক্রেতার রং ও মানের কাপড় না এলে সেলাই লাইনও থামবে।
বাংলাদেশ ২০২৫–২৬ অর্থবছরে প্রায় ৩৮ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলারের তৈরি পোশাক রপ্তানি করেছে; টেক্সটাইলসহ রপ্তানি প্রায় ৪০ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। আপাতত অধিকাংশ আন্তর্জাতিক ক্রেতা বাংলাদেশ থেকে অর্ডার সরিয়ে নেয়নি। কয়েকটি বড় ক্রেতা জানিয়েছে, বিকল্প জ্বালানির বাড়তি ব্যয় বহন করেও সরবরাহকারীরা সময়মতো পণ্য দিচ্ছে।
তবে একজন ইউরোপীয় ক্রেতা গ্যাস সংকটের ঝুঁকিতে একটি প্রতিষ্ঠানের অর্ডার এক-তৃতীয়াংশ কমিয়েছেন বলে জানিয়েছে বিকেএমইএ। ক্রেতারা নিয়মিত পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছেন। অর্থাৎ অর্ডার এখনো আছে, কিন্তু আস্থা নিঃশর্ত নয়। দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড
একবার ক্রেতা উৎপাদনক্ষমতা নিয়ে সন্দিহান হয়ে অর্ডারের অংশ অন্য দেশে সরিয়ে নিলে তা ফিরিয়ে আনা কঠিন। তখন গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক হলেও শ্রমিকের কাজ আগের মাত্রায় ফিরবে না।
বিকল্প জ্বালানি কেন পূর্ণ সমাধান নয়
গ্যাস না পেয়ে কোনো কারখানা ডিজেল, LPG, CNG এমনকি কাঠ ব্যবহার করছে। এটি জরুরি ভিত্তিতে কিছু উৎপাদন বাঁচাতে পারে, কিন্তু শিল্পের দীর্ঘমেয়াদি সমাধান নয়।
ডিজেল দিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদনের খরচ গ্রিড বিদ্যুৎ বা গ্যাসভিত্তিক captive power-এর তুলনায় অনেক বেশি। একটি বড় রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান ডিজেল ব্যবহারে মাসে অতিরিক্ত প্রায় তিন কোটি টাকা ব্যয়ের কথা জানিয়েছে। বড় প্রতিষ্ঠান হয়তো লাভের অংশ কমিয়ে এই ব্যয় বহন করতে পারবে; ছোট প্রতিষ্ঠান পারবে না।
কাঠ পোড়ালে খরচের পাশাপাশি বায়ুদূষণ, বনজ সম্পদের ওপর চাপ এবং শ্রমিকের স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ে। অনিয়ন্ত্রিতভাবে CNG বা LPG এনে শিল্পপ্রাঙ্গণে ব্যবহার করলে অগ্নি ও বিস্ফোরণের ঝুঁকিও তৈরি হতে পারে।
সৌরবিদ্যুৎ গুরুত্বপূর্ণ বিকল্প, কিন্তু এর সীমাবদ্ধতাও বুঝতে হবে। ছাদে সৌর প্যানেল আলো, ফ্যান, অফিস, কিছু মোটর ও সহায়ক যন্ত্র চালাতে পারে। কিন্তু বড় ডায়িং বয়লার, সিরামিক চুল্লি কিংবা উচ্চ তাপমাত্রার শিল্পপ্রক্রিয়া শুধু rooftop solar দিয়ে চালানো এখনই সম্ভব নয়।
ফলে “কারখানাকে বিকল্প জ্বালানিতে চলে যেতে হবে”—এই সহজ পরামর্শ বাস্তব শিল্পপ্রযুক্তির পুরো চিত্র তুলে ধরে না।
সংকট কি শুধু দুর্ঘটনার ফল?
একটি LNG টার্মিনালে আগুন এবং প্রতিকূল আবহাওয়া সাম্প্রতিক সংকটকে তীব্র করেছে। কিন্তু এগুলো মূল সমস্যার সৃষ্টি করেনি; আগে থেকে থাকা দুর্বলতাকে প্রকাশ করেছে।
স্বাভাবিক সময়েই চাহিদার তুলনায় সরবরাহ এক-চতুর্থাংশের বেশি কম। দেশীয় গ্যাসক্ষেত্রের উৎপাদন কমছে, নতুন অনুসন্ধান প্রত্যাশিত গতিতে হয়নি এবং ক্রমবর্ধমান চাহিদা মূলত LNG আমদানি দিয়ে সামলানোর চেষ্টা করা হয়েছে।
কিন্তু পর্যাপ্ত LNG মজুত, বিকল্প খালাসব্যবস্থা কিংবা একটি টার্মিনাল বন্ধ হলে অন্য পথ দিয়ে পুরো ঘাটতি পূরণের সক্ষমতা তৈরি হয়নি। ফলে সমুদ্রে খারাপ আবহাওয়া অথবা একটি বৈদ্যুতিক যন্ত্রাংশের দুর্ঘটনাও জাতীয় শিল্প উৎপাদনের সংকটে পরিণত হয়।
এটি কেবল জ্বালানির ঘাটতি নয়; এটি অবকাঠামোগত redundancy ও ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার ব্যর্থতা।
সরকার এখন কী করতে পারে
সংকটের তাৎক্ষণিক সমাধানে প্রথম প্রয়োজন শিল্পাঞ্চলভিত্তিক একটি স্বচ্ছ gas-rationing schedule। খুব কম চাপ সারাক্ষণ দিয়ে কোনো কারখানাকেই কার্যকর উৎপাদন করতে না দেওয়ার চেয়ে নির্দিষ্ট শিল্পাঞ্চলে নির্দিষ্ট সময় ব্যবহারযোগ্য চাপ দেওয়া বেশি কার্যকর হতে পারে। তবে এই ব্যবস্থা শিল্পের ধরন ও ধারাবাহিক উৎপাদনের প্রয়োজন বিবেচনা করে তৈরি করতে হবে।
দ্বিতীয়ত, রপ্তানির সময়সীমা ও বিপুল কর্মসংস্থান বিবেচনায় textile, dyeing, ceramic ও অন্য উচ্চ-নির্ভরশীল শিল্পের জন্য অগ্রাধিকার তালিকা প্রয়োজন। কোন খাত কত গ্যাস পাচ্ছে—তার তথ্য নিয়মিত প্রকাশ করলে বৈষম্য ও অনানুষ্ঠানিক প্রভাবের অভিযোগ কমবে।
তৃতীয়ত, যেসব প্রতিষ্ঠান সাময়িক সহায়তা পাবে, তাদের জন্য শ্রমিক ধরে রাখা ও সময়মতো মজুরি দেওয়ার শর্ত যুক্ত করা যেতে পারে। শুধু মালিকের ঋণ পুনঃতফসিল করলে চাকরি সুরক্ষিত হবে না। আর্থিক সহায়তার বিনিময়ে প্রতিষ্ঠানকে ছাঁটাইয়ের তথ্য, বকেয়া মজুরি এবং কর্মীসংখ্যা প্রকাশ করতে হবে।
চতুর্থত, শ্রম অধিদপ্তর ও শিল্প পুলিশের মাধ্যমে কারখানাভিত্তিক কর্মসংস্থান পর্যবেক্ষণ জরুরি। কত শ্রমিককে ছুটিতে পাঠানো হয়েছে, কার ওভারটাইম বন্ধ হয়েছে, কতজন বেতন পাচ্ছেন না এবং কোথায় ছাঁটাই শুরু হয়েছে—এসব তথ্য না থাকলে সরকার সংকটের সামাজিক মূল্য বুঝতে পারবে না।
মধ্যমেয়াদে দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান ও কূপ সংস্কার, LNG অবকাঠামোর বিকল্প ব্যবস্থা, শিল্পে দক্ষ বয়লার ও waste-heat recovery এবং ব্যবহারযোগ্য ক্ষেত্রে বিদ্যুতায়ন বাড়াতে হবে। কেবল নতুন আমদানি চুক্তি করলেই সরবরাহের ভৌত দুর্বলতা দূর হবে না।
শ্রমিকের চাকরি বাঁচানোই শিল্প বাঁচানো
কারখানা মালিকের ক্ষতি দৃশ্যমান—উৎপাদন কমে, অর্ডার বাতিল হয় এবং ঋণের কিস্তি জমে। শ্রমিকের ক্ষতি অনেক সময় পরিসংখ্যানে ধরা পড়ে না। তাঁর চাকরির পরিচয়পত্র হয়তো বহাল থাকে, অথচ ওভারটাইম বন্ধ হয়ে মাসিক আয় কয়েক হাজার টাকা কমে যায়। এক সপ্তাহ কাজ না থাকলে বাসাভাড়া কিংবা খাবারের টাকা ধার করতে হয়।
এই আঘাত শুধু একটি পরিবারের মধ্যে থাকে না। শিল্পাঞ্চলের বাড়িওয়ালা, দোকান, পরিবহন, খাবারের হোটেল ও ক্ষুদ্র সেবাদাতাদের আয়ও শ্রমিকের ব্যয়ের ওপর নির্ভর করে। কারখানায় একটি শিফট বন্ধ হলে আশপাশের স্থানীয় অর্থনীতিতেও অদৃশ্যভাবে আরেকটি শিফট বন্ধ হয়ে যায়।
বর্তমান গ্যাস সংকট তাই উৎপাদনের পাশাপাশি একটি সম্ভাব্য কর্মসংস্থান সংকট। এখনো বড় পরিসরে স্থায়ী ছাঁটাই শুরু হয়নি—এই বাস্তবতা স্বস্তির। কিন্তু শ্রমিককে বাড়ি পাঠানো, দুই শিফট থেকে এক শিফটে নামা, ওভারটাইম হারানো এবং ছোট কারখানা বন্ধ হওয়া স্পষ্ট সতর্কসংকেত।
গ্যাস সরবরাহ কয়েক দিনের মধ্যে বাড়লে অনেক প্রতিষ্ঠান আবার উৎপাদনে ফিরবে। কিন্তু মূল ঘাটতি, আমদানিনির্ভরতা ও অবকাঠামোর একক ব্যর্থতার ঝুঁকি অমীমাংসিত থাকলে একই সংকট আবার ফিরে আসবে।
তখন প্রতিবার কারখানা চালু করা গেলেও সব চাকরি ফিরিয়ে আনা সম্ভব হবে না। কারণ ক্রেতা অপেক্ষা করে না, ঋণের সুদ থেমে থাকে না এবং আয়হীন শ্রমিকও অনির্দিষ্টকাল অপেক্ষা করতে পারেন না।
কারখানায় গ্যাস না থাকা এখন আর শুধু জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের সমস্যা নয়। এটি শিল্পনীতি, রপ্তানি, ব্যাংকিং এবং শ্রমিকের জীবিকার প্রশ্ন। সরকার কত দ্রুত এই সংযোগটি বুঝতে পারে, তার ওপরই নির্ভর করবে বর্তমান উৎপাদন সংকট সাময়িক বিঘ্ন হয়ে থাকবে, নাকি বাংলাদেশের পরবর্তী বড় কর্মসংস্থান সংকটে পরিণত হবে।
আপনার মতামত জানানঃ