মানবসভ্যতার ইতিহাসে এমন কিছু আবিষ্কার রয়েছে, যা প্রতিষ্ঠিত ধারণাকে নাড়িয়ে দেয়। ইন্দোনেশিয়ার ফ্লোরেস দ্বীপে আবিষ্কৃত ক্ষুদ্রাকৃতির মানবপ্রজাতি Homo floresiensis, যাদের জনপ্রিয়ভাবে ‘হবিট’ নামে ডাকা হয়, তেমনই একটি রহস্য। মাত্র এক মিটার উচ্চতা, আঙুরফলের মতো ছোট মাথার খুলি এবং শিম্পাঞ্জির চেয়ে সামান্য বড় মস্তিষ্ক—এই বৈশিষ্ট্যের কারণে শুরু থেকেই তারা বিজ্ঞানীদের কৌতূহলের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল। দীর্ঘদিন ধরে ধারণা করা হতো, তারা পাথরের অস্ত্র তৈরি করত, বিশালাকার স্টেগোডন শিকার করত এবং আগুন ব্যবহার করে খাবার রান্না করত। কিন্তু সাম্প্রতিক এক গবেষণা সেই ধারণাকে নতুন করে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে। গবেষকদের দাবি, এই ক্ষুদ্র মানবপ্রজাতি হয়তো দক্ষ শিকারি ছিল না; বরং তারা কোমোডো ড্রাগনের ফেলে যাওয়া প্রাণীর দেহাবশেষ সংগ্রহ করেই জীবিকা নির্বাহ করত।
২০০৩ সালে ইন্দোনেশিয়ার ফ্লোরেস দ্বীপের লিয়াং বুয়া গুহায় প্রত্নতাত্ত্বিক খননের সময় প্রথম Homo floresiensis-এর জীবাশ্ম আবিষ্কৃত হয়। সেই সময় একই স্তরে পাওয়া যায় অসংখ্য পাথরের সরঞ্জাম এবং বিলুপ্ত হাতির আত্মীয় স্টেগোডনের হাড়। এই দুটি আবিষ্কার একসঙ্গে পাওয়ায় বিজ্ঞানীরা স্বাভাবিকভাবেই ধারণা করেছিলেন, হবিটরাই এসব প্রাণী শিকার করত। একই সঙ্গে কিছু পোড়া হাড় পাওয়া যাওয়ায় মনে করা হয়েছিল, তারা আগুন জ্বালাতে এবং রান্না করতেও সক্ষম ছিল। এ ধরনের আচরণ সাধারণত বড় মস্তিষ্কের মানবপ্রজাতি—যেমন Homo sapiens, Homo erectus কিংবা নিয়ান্ডারথালদের সঙ্গে সম্পর্কিত। ফলে অনেক গবেষক বিশ্বাস করতে শুরু করেন যে Homo floresiensis সম্ভবত Homo erectus-এরই একটি ক্ষুদ্রাকৃতির দ্বীপীয় রূপ।
কিন্তু নতুন গবেষণাটি এই প্রচলিত ব্যাখ্যার সঙ্গে একমত নয়। যুক্তরাষ্ট্রের স্মিথসোনিয়ান ইনস্টিটিউশনের নৃতত্ত্ববিদ ড. এলিজাবেথ গ্রেস ভিচের নেতৃত্বে পরিচালিত গবেষণাটি প্রকাশিত হয়েছে Science Advances সাময়িকীতে। গবেষকরা স্টেগোডনের হাড়ে থাকা দাগ, পাথরের অস্ত্রের কাটার চিহ্ন এবং কোমোডো ড্রাগনের দাঁতের দাগের মধ্যে তুলনামূলক বিশ্লেষণ করেন। তাদের উদ্দেশ্য ছিল, সত্যিই কি হবিটরা বড় প্রাণী শিকার করত, নাকি তারা কেবল মৃত প্রাণীর দেহ থেকে মাংস সংগ্রহ করত।
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গবেষকদের যেতে হয় যুক্তরাষ্ট্রের জর্জিয়ার আটলান্টা চিড়িয়াখানায়। সেখানে ‘রিঙ্কা’ নামের একটি কোমোডো ড্রাগনকে একটি ছাগলের মৃতদেহ খেতে পর্যবেক্ষণ করা হয়। খাওয়া শেষে অবশিষ্ট হাড়গুলো আধুনিক ত্রিমাত্রিক স্ক্যানিং প্রযুক্তির মাধ্যমে বিশ্লেষণ করা হয়। এরপর সেই দাগগুলোর সঙ্গে লিয়াং বুয়া গুহায় পাওয়া স্টেগোডনের হাড়ের দাগ মিলিয়ে দেখা হয়।
ফলাফল ছিল অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। স্টেগোডনের অধিকাংশ হাড়ে যে দাগ দেখা গেছে, তা মানুষের পাথরের অস্ত্রের চেয়ে কোমোডো ড্রাগনের দাঁতের দাগের সঙ্গে অনেক বেশি মিল রয়েছে। বিশেষ করে প্রাণীর শরীরের সবচেয়ে মাংসল অংশে কোমোডো ড্রাগনের কামড়ের চিহ্ন বেশি পাওয়া গেছে। অন্যদিকে হবিটদের পাথরের সরঞ্জামের কাটার দাগ দেখা গেছে অপেক্ষাকৃত কম গুরুত্বপূর্ণ অংশে। গবেষকদের মতে, কোমোডো ড্রাগন প্রথমে স্টেগোডন শিকার করত এবং পেট ভরে খাওয়ার পর অবশিষ্ট অংশ হবিটরা সংগ্রহ করে নিজেদের প্রয়োজন মেটাত।
বর্তমান সময়েও কোমোডো ড্রাগন বড় প্রাণী শিকারে দক্ষ। তাদের বিষাক্ত কামড় শিকারকে দ্রুত দুর্বল করে ফেলে। গবেষকদের ধারণা, হাজার হাজার বছর আগেও একই কৌশলে তারা স্টেগোডন শিকার করত। পরে সুযোগ বুঝে Homo floresiensis সেখানে গিয়ে পাথরের সরঞ্জাম দিয়ে অবশিষ্ট মাংস ও অস্থিমজ্জা সংগ্রহ করত। এভাবে ঝুঁকি কমিয়ে খাদ্য সংগ্রহ করা তাদের জন্য অনেক বেশি বাস্তবসম্মত ছিল।
অনেকের মনে প্রশ্ন জাগতে পারে, বিষাক্ত কোমোডো ড্রাগনের শিকার থেকে মাংস সংগ্রহ করলে কি হবিটদের বিষক্রিয়ার আশঙ্কা ছিল না? গবেষকদের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, কোমোডো ড্রাগনের বিষ মূলত প্রোটিনজাতীয় উপাদান দিয়ে তৈরি। এই প্রোটিন মানুষের পাকস্থলীর এনজাইমের মাধ্যমে ভেঙে যায়। ফলে মৃত প্রাণীর মাংস খাওয়ার মাধ্যমে বিষক্রিয়ার আশঙ্কা কার্যত ছিল না।
গবেষণার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল আগুন ব্যবহারের প্রমাণ অনুসন্ধান। লিয়াং বুয়া গুহা থেকে উদ্ধার করা প্রায় ৪ হাজার ৫০০টি ইঁদুরের হাড় পরীক্ষা করেন গবেষকরা। এসব হাড় বহু হাজার বছর ধরে গুহায় বসবাসকারী পেঁচার মাধ্যমে জমা হয়েছিল। যদি গুহায় নিয়মিত আগুন জ্বালানো হতো, তাহলে অন্তত কিছু হাড়ে পোড়ার চিহ্ন থাকার কথা। কিন্তু বিস্ময়করভাবে একটি হাড়েও আগুনে পোড়ার স্পষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায়নি। একইভাবে স্টেগোডনের হাড়েও আগুনে দগ্ধ হওয়ার কোনো চিহ্ন মেলেনি।
যে কয়েকটি পোড়া হাড় আগে পাওয়া গিয়েছিল, সেগুলো সম্ভবত অনেক পরের সময়ের। গবেষকদের মতে, প্রায় ৪৬ হাজার বছর আগে আধুনিক মানুষ (Homo sapiens) ওই গুহায় বসবাস শুরু করার পরই আগুন ব্যবহারের প্রমাণ দেখা যায়। অর্থাৎ হবিটদের সঙ্গে সেই আগুনের সম্পর্ক ছিল না।
এই গবেষণা মানববিবর্তন নিয়ে দীর্ঘদিনের একটি বিতর্ককে নতুন মাত্রা দিয়েছে। এতদিন মনে করা হতো, Homo floresiensis সম্ভবত Homo erectus-এর একটি বিচ্ছিন্ন শাখা। কিন্তু যদি তারা বড় প্রাণী শিকার কিংবা আগুন ব্যবহারের মতো উন্নত আচরণ না করে থাকে, তাহলে তাদের বিবর্তনীয় ইতিহাস ভিন্ন হতে পারে। গবেষকদের মতে, তারা হয়তো আরও প্রাচীন কোনো মানবগোষ্ঠী—যেমন Homo habilis অথবা Australopithecus-এর কাছাকাছি ছিল।
Homo habilis মানববিবর্তনের অন্যতম প্রাচীন সদস্য, যারা সীমিত পরিসরে পাথরের সরঞ্জাম ব্যবহার করত। অন্যদিকে Australopithecus ছিল দুই পায়ে হাঁটতে সক্ষম, কিন্তু তাদের মস্তিষ্ক আধুনিক মানুষের তুলনায় অনেক ছোট ছিল। যদি Homo floresiensis সত্যিই এই প্রাচীন গোষ্ঠীগুলোর উত্তরসূরি হয়, তাহলে মানববিবর্তনের ইতিহাস আরও জটিল হয়ে ওঠে।
বিখ্যাত জীবাশ্মবিদ ড. ক্রিস স্ট্রিংারের মতে, নতুন গবেষণা সেই ধারণাকেই আরও শক্তিশালী করেছে যে Homo floresiensis হয়তো প্রকৃত অর্থে Homo গণের সদস্যই নয়। বরং তারা আরও আদিম কোনো মানবগোষ্ঠীর বংশধর, যারা দশ লাখ বছরেরও আগে ফ্লোরেস দ্বীপে পৌঁছেছিল এবং বিচ্ছিন্ন পরিবেশে নিজেদের মতো করে বিবর্তিত হয়েছিল।
অবশ্য গবেষকরা এটিও স্বীকার করছেন যে, এই গবেষণাই শেষ কথা নয়। এখনো অনেক প্রশ্নের উত্তর অজানা। Homo floresiensis ঠিক কী কী প্রাণী খেত, তারা কীভাবে সামাজিক জীবন পরিচালনা করত, কীভাবে কোমোডো ড্রাগনের মতো শিকারির সঙ্গে একই পরিবেশে হাজার হাজার বছর টিকে ছিল—এসব বিষয়ে আরও গবেষণা প্রয়োজন। ড. এলিজাবেথ ভিচ ও তাঁর দল ইতোমধ্যে অন্যান্য প্রাণীর জীবাশ্ম বিশ্লেষণের কাজ শুরু করেছেন, যাতে হবিটদের খাদ্যাভ্যাস সম্পর্কে আরও পরিষ্কার ধারণা পাওয়া যায়।
আধুনিক কোমোডো ড্রাগন খুব কম ক্ষেত্রেই বিনা উসকানিতে মানুষের ওপর আক্রমণ করে। তাই গবেষকদের ধারণা, হবিটরা দলবদ্ধভাবে চলাফেরা করত এবং সতর্ক আচরণের মাধ্যমে নিজেদের নিরাপদ রাখত। শিকার না করেও একটি দ্বীপের পরিবেশে হাজার হাজার বছর ধরে টিকে থাকা তাদের অভিযোজন ক্ষমতারই প্রমাণ।
এই গবেষণার সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো, মানববিবর্তনের ইতিহাস কোনো সরলরেখায় এগোয়নি। একই সময়ে পৃথিবীতে বসবাসকারী বিভিন্ন মানবপ্রজাতি সম্পূর্ণ ভিন্ন জীবনধারা অনুসরণ করতে পারে। কেউ বড় প্রাণী শিকার করেছে, কেউ আগুন ব্যবহার করেছে, আবার কেউ হয়তো প্রকৃতির সুযোগকে কাজে লাগিয়ে অন্য প্রাণীর ফেলে যাওয়া খাদ্যের ওপর নির্ভর করেই টিকে থেকেছে। Homo floresiensis সেই বৈচিত্র্যময় বিবর্তনেরই এক অসাধারণ উদাহরণ।
ফ্লোরেস দ্বীপের ছোট্ট গুহায় পাওয়া কয়েকটি হাড়, কিছু পাথরের সরঞ্জাম এবং দাঁতের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র দাগ আজও মানবজাতির অতীত নিয়ে নতুন প্রশ্ন তুলছে। একসময় যাদের দক্ষ শিকারি হিসেবে কল্পনা করা হয়েছিল, তারা হয়তো বাস্তবে ছিল অত্যন্ত ধৈর্যশীল সুযোগসন্ধানী সংগ্রাহক। আর সেই সম্ভাবনাই আমাদের মনে করিয়ে দেয়—বিজ্ঞান কখনো স্থির নয়। নতুন প্রমাণ সামনে এলে বহুদিনের প্রতিষ্ঠিত ধারণাও বদলে যেতে পারে। মানববিবর্তনের ইতিহাস তাই এখনো অসমাপ্ত, আর প্রতিটি নতুন আবিষ্কার সেই ইতিহাসের অজানা অধ্যায়ে নতুন আলো ফেলে।
আপনার মতামত জানানঃ